মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইরান যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে, তখন পাশ্ববর্তী মুসলিম দেশগুলোর নীরবতা এক বড় রহস্যের জন্ম দিয়েছে। তথাকথিত 'প্যান-ইসলামিক' সংহতির বুলি ছাপিয়ে কেন আরব দেশগুলো তেহরানের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো দেশই ইরানকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে না, বরং অনেকে দেশটিকে হুমকি হিসেবেও দেখছে। মুসলিম দেশগুলো তথাকথিত 'প্যান-মুসলিম' বা বৃহত্তর মুসলিম সংহতির কথা বারবার প্রচার করলেও সাম্প্রদায়িক বৈপরীত্য, পারস্পরিক অবিশ্বাস, নিজ নিজ জাতীয় স্বার্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতার মতো বাস্তব পরিস্থিতিরও মুখোমুখি। একইসাথে, একটি অনিশ্চিত পরিণতির যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারেও তাদের মধ্যে চরম অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আরব বিশ্বের কাছে নিজেদেরকে ইসলামি সংহতির রক্ষক এবং সকল মুসলিমের জন্য একটি মানবিক বার্তার বাহক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে তেহরান। কিন্তু আজ সেই ইরানই রমজান মাসের মাঝখানে আরব দেশগুলোর ওপর হামলা চালাচ্ছে, বলছেন মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ইয়াসমিনা আসরাগিস। পারমাণবিক শক্তি অর্জনের মধ্য দিয়ে একটি আঞ্চলিক প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চায় ইরান। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালানোর পর থেকে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতেও ইরান হামলা চালাচ্ছে। যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের অন্যতম বড় কৌশলগত ভুল বলেই মনে করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, মুসলিম বিশ্ব কোনো একক বা অখণ্ড সত্তা নয়। প্রতিটি মুসলিম দেশ (যার বেশিরভাগই আরব) মূলত তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ দ্বারাই পরিচালিত হয়। ফলে কেবল সংহতির খাতিরে তারা ইরানকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে ইচ্ছুক নয় বলেই মনে হচ্ছে। তাছাড়া, মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোরও ইরানের প্রতি মনোভাব বেশ জটিল। ইরান কোনো আরব দেশ নয়, তারা ভিন্ন ভাষায় কথা বলে এবং জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ শিয়া। যদিও বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই সুন্নি। বর্তমান যুদ্ধের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক খুবই সামান্য, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে এই সুন্নি-শিয়া বিভাজন। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট পলিসির বিশেষজ্ঞ ফ্যাব্রিস ব্যালানশ বিবিসিকে বলছেন, "শিয়াদের সঙ্গে সুন্নিদের কোনো সংহতি হতে পারে না, বিশেষ করে যখন শিয়া অধ্যুষিত ইরান সুন্নি রাষ্ট্রগুলোতে হামলা চালায়।" তাছাড়া, ইরান তার সুন্নি প্রতিবেশীদের ওপর এমন একটি সময়ে হামলা চালিয়েছে যখন পবিত্র রমজান মাস চলছে। এমনকি ওই দেশগুলোকে আরও গুরুতর সংঘাতে টেনে আনার হুমকিও দিয়েছে, যা সরাসরি তাদের স্বার্থে আঘাত হানে। কী করতে চেয়েছিল ইরান? এই অঞ্চলে কিংবা বিশ্বজুড়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের খুব বেশি মিত্র কোনোকালেই ছিল না, কিন্তু এখন কার্যত পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে দেশটি। প্রায় অর্ধশতাব্দীর ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি বিঘ্নকারী প্রধান দেশগুলোর একটিতে পরিণত করেছে। মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশই ইরানকে সন্দেহের চোখে দেখে এবং প্রায়শই তাদের প্রতি প্রকাশ্যে শত্রুতা পোষণ করে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে, ইরান সুপরিকল্পিতভাবে নিজেকে একটি শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে শুরু করে এবং মুসলিম বিশ্বের সংগ্রামের অগ্রনায়ক হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি সুসংহত করার চেষ্টা চালায়। সাবেক বন্ধু দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের 'প্রধান শত্রু' এবং ইসরায়েলকে 'অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর শত্রু' হিসেবেও ঘোষণা করেছিল ইরান। তাদের লক্ষ্য ছিল নিজেদের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার মডেল অন্যান্য দেশে রপ্তানি করা। বিশেষ করে এই অঞ্চলের শিয়া সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়া ও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করা। ইরানের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে, বিশেষ করে সৌদি আরবকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি, যাদের ভূখণ্ডে ইসলামের প্রধান পবিত্র স্থানগুলো অবস্থিত। বহু বছর ধরে এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে একে অপরকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে রিয়াদ এবং তেহরান। পারস্য উপসাগরের তেল-সমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর রাজনৈতিক ব্যবস্থার (রাজতন্ত্র) সঙ্গে ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত ইরানের শাহ শাসনামলের মিল রয়েছে। ফলে, আরব দেশগুলো নিজেদের দেশেও ইরানের মতো গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়ে বেশ আতঙ্কিত। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো বেশ আগে থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। ফলে আঞ্চলিক শক্তি হয়ে ওঠা নিয়ে ইরানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাদের নিজস্ব স্বার্থের সাথে সরাসরি দ্বন্দ্ব তৈরি করে। মধ্যপ্রাচ্যের এই 'স্নায়ুযুদ্ধ' কয়েক দশক ধরে চলেছিল, যা অবশেষে ২০২৩ সালে এসে থামে। সে সময় চীনের মধ্যস্থতায় নিজেদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করতে রাজি হয় রিয়াদ এবং তেহরান। আর এবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর, সৌদি আরব এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলো এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পেয়েছে যে, ইরান তাদের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে হুমকির মুখে ফেলতে দ্বিধাবোধ করবে না। 'আটলান্টিক কাউন্সিল' এ এক মন্তব্যে 'মিডল ইস্ট গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল'-এর নির্বাহী পরিচালক খালিদ আল-জাবের লিখেছেন, "চলমান সংঘাত যেদিকেই যাক না কেন, আঞ্চলিকভাবে ইরানের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে সেটি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। একবার আস্থা নষ্ট হয়ে গেলে, তা পুনরায় ফিরে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।" এই অঞ্চলে নিজের প্রভাব সংহত করতে ইরান কয়েক দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তথাকথিত 'প্রতিরোধ অক্ষ' গড়ে তুলছে। লেবানন, সিরিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেনের সংঘাতে হস্তক্ষেপ করার পাশাপাশি লেবাননের শিয়া মিলিশিয়া 'হেজবুল্লাহ', ইয়েমেনের 'হুথি' এবং ইরাকের বিভিন্ন মিত্র বাহিনীকে অস্ত্র ও অর্থায়ন করেছে তেহরান। এমনকি হামাস ও ইসলামিক জিহাদকে সমর্থনের মাধ্যমে, ইরান মুসলিমদের রক্ষক হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করতে ফিলিস্তিন ইস্যুকেও ব্যবহার করেছে। ইরানের এই পদক্ষেপগুলোকে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের জন্য লড়াইয়ের থেকেও বরং তেহরানের নিজস্ব প্রভাব বিস্তার এবং এই অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবেই বেশি দেখেছে অনেক আরব দেশ। এছাড়া পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হওয়ার জন্য ইরানের আকাঙ্ক্ষা তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেও ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। আস্থার সংকট যে কারণে অনেক আরব দেশ মনে করে, অতীত কিংবা বর্তমান যেকোনো সময়েই, ইরানকে সাহায্য করার অর্থ হলো এমন একটি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা, যাকে তারা আঞ্চলিক ভারসাম্য বিনষ্টকারী এবং নিজেদের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি বলে মনে করে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির পরিণতি কী হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়, কিন্তু এটি বোঝা যাচ্ছে যে, এর মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভঙ্গুর ভারসাম্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফরাসি বিশেষজ্ঞ ফ্যাব্রিস ব্যালানশ বলছেন, "উপসাগরীয় দেশগুলো বুঝতে পারছে যে ইরান মাত্র কয়েকটি আঘাতেই তাদের সমস্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধ্বংস করে দিতে পারে। সব মিলিয়ে ইরান আবারও এই অঞ্চলের প্রধান হুমকি হয়ে উঠছে।" ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের এই বিশেষজ্ঞ আরও যোগ করেন, "বর্তমান প্রেক্ষাপট অনিবার্যভাবে সৌদি আরবকে ইসরায়েলের আরও কাছাকাছি যেতে বাধ্য করবে।" "বিশেষ করে 'আয়রন ডোম'-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পেতে, যা দেশটির (সৌদি আরব) সুরক্ষা ব্যবস্থাকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করতে পারে," বলেন তিনি। এদিকে, ইরান সমর্থিত শিয়া বাহিনীগুলো তাদের পৃষ্ঠপোষকের সহায়তায় এগিয়ে আসতে চাইলেও বর্তমানে তাদের সেই সক্ষমতা ও সুযোগ খুবই সীমিত। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের ওপর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী যুদ্ধের ফলে যে তথাকথিত 'প্রতিরোধের অক্ষ' গড়ে উঠেছিল, সেটি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। হেজবুল্লাহর নেতৃত্বকে অনেকটাই নির্মূল করেছে ইসরায়েল, পঙ্গু করে দিয়েছে হামাসকেও। এছাড়া বিদ্রোহীদের হাতে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে মস্কো পালিয়ে গেছেন সিরিয়ার সাবেক নেতা ও ইরানের বন্ধু হিসেবে পরিচিত বাশার আল-আসাদ। সবশেষ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে ইসলামি বিশ্বে ইরানের প্রতি অবিশ্বাস আরও তীব্রতর হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ইয়াসমিনা আসরাগিস বলছেন, "তেহরান সম্ভবত ভেবেছিল যে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর ওপর চাপ বাড়লে, তারাও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টি করবে এবং যুদ্ধের অবসান ঘটাবে। কিন্তু বাস্তবে ঠিক তার উল্টোটা ঘটছে।" পারস্য উপসাগরের কিছু দেশ ইরানের সাথেও ভালো সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেছিল। ওমান এবং কাতার অনেকবারই ইরান সরকারের সাথে সংলাপে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে। তবে ভবিষ্যতে এই দেশগুলো তাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে কি না, সেটিও এখন দেখার বিষয়। সুন্নি এবং শিয়া বিশ্বের ১৮০ কোটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই সুন্নি (প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ), যেখানে শিয়াদের সংখ্যা তুলনামূলক কম (প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ)। প্রধান শিয়া জনগোষ্ঠীগুলোর বসবাস মূলত ইরান, আজারবাইজান, ইরাক এবং পাকিস্তানে। মূলত ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের নবীর মৃত্যু পরবর্তী উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিরোধের মধ্য দিয়ে এই বিভাজনের সূত্রপাত হয়। সে সময় তার অনুসারীদের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়েছিল এই প্রশ্নে যে, কে মুসলিম উম্মাহর পরবর্তী নেতৃত্ব দেবেন? শিয়ারা (যাদের নামের অর্থই হলো আলীর 'অনুসারী' বা 'দল') নবীর রক্তের সম্পর্কীয় আত্মীয় আলী ইবনে আবি তালিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে ছিলেন। তাদের দাবি ছিল যে, নবীর নিকটতম আত্মীয় এবং শিষ্য হিসেবে আলীরই খলিফা হওয়ার বৈধ অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, সুন্নিরা বিশ্বাস করত যে, নবীর সবচেয়ে যোগ্য এবং সম্মানিত সাহাবীদের মধ্য থেকেই মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতা বেছে নেওয়া উচিত। ইসলামের নবীর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবু বকর প্রথম খলিফা নির্বাচিত হন। খেলাফতের এই ক্ষমতার লড়াই শেষ পর্যন্ত ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে আলীর হত্যাকাণ্ডের দিকে মোড় নেয়। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র হাসান ও হুসাইনও শাহাদাত বরণ করেন। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালা শহরের (বর্তমান ইরাক) কাছে হুসাইনের মৃত্যু আজও শিয়াদের কাছে একটি ঐতিহাসিক শোকাবহ ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচিত। এর মধ্য দিয়ে প্রাথমিক রাজনৈতিক মতবিরোধ ধীরে ধীরে এক গভীর ধর্মীয় ও মতাদর্শগত বিভাজনে রূপান্তরিত হয়। মূলত ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবই এই ধর্মীয় সংঘাতকে একটি ভূ-কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপান্তরিত করেছিল। তখন থেকেই মুসলিম বিশ্বে আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছে শিয়া অধ্যুষিত ইরান এবং সুন্নি অধ্যুষিত সৌদি আরব। ইরানের নেতারা প্রকাশ্যে ইসলামের প্রধান দুই পবিত্র স্থান- মক্কা ও মদিনার রক্ষক হিসেবে সৌদি রাজবংশের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। এছাড়া হজের সময় ইরানিদের উস্কানিতে ঘটা বেশ কয়েকটি ঘটনা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনাকে আরও তীব্র করে তোলে। তেহরানের প্রভাব সীমিত রাখতে কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন নেটওয়ার্ক ও আন্দোলনকে অর্থায়ন করেছিল রিয়াদ। যেখান থেকে পরবর্তীতে এমন সব জিহাদি সংগঠনের উত্থান ঘটে যারা সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। মুসলমানদের উপর প্রভাব বিস্তার ইরান ও সৌদি আরবের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে চলা এই সংঘাত দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। সৌদি আরবের শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান দেশটিকে পর্যটক ও বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে চান। তিনি তার জাতীয় মহাপরিকল্পনা 'ভিশন ২০৩০'-এ তেল থেকে অর্জিত বিপুল রাজস্ব বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। সৌদি আরব বর্তমানে সৌর ও বায়ু শক্তির উন্নয়ন ঘটাচ্ছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে দামী ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে তাদের স্থানীয় ফুটবল লিগে খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এসব কারণেই সৌদি আরব এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং ইরানসহ তার সমস্ত প্রতিবেশীদের সাথে একটি বাস্তবসম্মত সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এই লক্ষ্যেই ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় রিয়াদ এবং তেহরান তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনেও সম্মত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞ ব্যালানশের মতে, যুবরাজ বিন সালমান যেকোনো মূল্যে এই স্থিতিশীলতা 'ধরে রাখতে' এবং সবার সাথে আলোচনা করতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু এখন সেই সম্ভাবনা হুমকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, আমিরাতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নাজাত আল-সাইদ মনে করেন, ইরান কখনোই তার অতীত নীতিগুলো বাতিল করতে চায়নি, বরং তারা একটি 'বিপ্লবী আদর্শের রাষ্ট্র' হিসেবেই রয়ে গেছে। যা পারস্য উপসাগরের অন্য দেশগুলোর ঠিক বিপরীত, যারা অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্বার্থে আদর্শিক গোঁড়ামি থেকে সরে এসেছে। আল-সাইদ আরও উল্লেখ করেন যে, "সৌদি আরবের ধর্মীয় রাজনীতি থেকে জাতীয়তাবাদের দিকে বিবর্তন এবং আদর্শ নিয়ে ইরানের অনড় অবস্থান এটাই প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা সময়ের প্রয়োজনে নিজেকে পরিবর্তন করতে সক্ষম। "কিন্তু আদর্শিক ব্যবস্থাগুলো সময়ের সাথে সাথে আরও বেশি অনড় হয়ে ওঠে, তাদের জন্য যেকোনো বড় ধরনের পরিবর্তন মানেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে," বলেন তিনি। আবারও প্রধান হুমকি ইরান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তিত হয় মূলত "আব্রাহাম অ্যাকর্ডস" চুক্তি স্বাক্ষরের পর। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান এবং পরবর্তীতে মরক্কো- ইসরায়েলের সাথে নিজেদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। এই নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থায় ক্রমেই বেশ কিছু আরব রাষ্ট্রের সাধারণ শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকে ইরান। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সৌদি আরবও ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি বিবেচনা করেছিল, যদিও এই চুক্তির পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ফিলিস্তিন ইস্যুটি। এখন মূল প্রশ্ন হলো, যুদ্ধের পর কী ঘটবে? তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা- যা দুর্বল হলেও এখনও টিকে আছে এবং হয়তো আরও বেশি বিপজ্জনক- সেটিই কি বহাল থাকবে, নাকি ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটবে? বিশেষজ্ঞ ব্যালানশ মনে করেন, "ঘটনাপ্রবাহ যেদিকেই যাক না কেন, একটি বিষয় পরিষ্কার যে- ইরানের পক্ষে খুব শিগগিরই তার অতীত ক্ষমতার স্তরে ফিরে যাওয়া অসম্ভব বলেই মনে হয়।" তিনি আরও যোগ করেন, "বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকুক বা নতুন কোনো নেতৃত্ব আসুক- ইরানকে তার প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে, যা শাহ শাসনামলে ছিল। যখন ইরান কার্যকরভাবে মধ্যপ্রাচ্যের "পুলিশম্যান" বা প্রধান নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করত।"
ফিলিস্তিনি জনগণের স্বার্থ এবং অধিকার রক্ষায় কোনো অগ্রগতি না হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অফ পিস’ (শান্তি বোর্ড) থেকে ইন্দোনেশিয়া নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো। শুক্রবার (৬ মার্চ, ২০২৬) সরকারের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার এই বোর্ডে অংশগ্রহণ এবং গাজায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজ দেশে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রাবোও। স্থানীয় বিভিন্ন ইসলামি দল ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগে শামিল হওয়া ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘকালীন নীতি ও সমর্থনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে গত বৃহস্পতিবার রাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন প্রেসিডেন্ট প্রাবোও। বৈঠকে তিনি তার এই কৌশলগত সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করেন এবং আশ্বস্ত করেন যে, দেশের ও ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার সামান্যতম সম্ভাবনা দেখা দিলেও তিনি এই জোট ত্যাগ করবেন। বৈঠক শেষে ইসলামিক ব্রাদারহুড ফ্রন্টের নেতা হানিফ আলাতাস বলেন, “প্রেসিডেন্ট আমাদের পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, যদি তিনি দেখেন যে ফিলিস্তিনের জন্য এই বোর্ড আর কোনো উপকারে আসছে না এবং এটি ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হচ্ছে, তবে তিনি অবিলম্বে এটি থেকে সরে আসবেন।” ইন্দোনেশিয়ার প্রভাবশালী ওলামা কাউন্সিল (MUI) ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় ওয়াশিংটনের ভূমিকার প্রতিবাদ জানিয়ে এই বোর্ড থেকে নাম প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, দেশটির বৃহত্তম মুসলিম সংগঠন ‘নাহদলাতুল উলামা’ মনে করে, ইন্দোনেশিয়া এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুগিওনো এর আগে জানিয়েছিলেন যে, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বোর্ড অফ পিস-এর সকল আলোচনা আপাতত স্থগিত রয়েছে। তবে প্রাবোও প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান এটাই প্রমাণ করে যে, ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ইন্দোনেশিয়া কোনো আপস করতে রাজি নয়। উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ‘বোর্ড অফ পিস’ উদ্যোগটি শুরু থেকেই বিতর্কিত এবং গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় এর কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা সংশয় রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।