মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে বড় হুমকি তৈরি করেছে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী। ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠী ঘোষণা দিয়েছে, তারা লোহিত সাগর হয়ে সৌদি আরবের বন্দরগুলোতে জাহাজ প্রবেশ বা সেখান থেকে পণ্য পরিবহন করতে দেবে না। এই হুমকি বাস্তবায়িত হলে বিশ্বের তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। হুথিদের দাবি, সৌদি বন্দর লক্ষ্য করে এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা আঞ্চলিক সংঘাতে চাপ বাড়াবে। এতে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৭ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যদি হুথিরা সত্যিই লোহিত সাগরে নৌ চলাচলে বাধা দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তাঁর ভাষায়, “হুথিদের বিরুদ্ধে আমরা আগেও ব্যবস্থা নিয়েছি, প্রয়োজনে আবারও নেব।” হুথিরা দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা মোকাবিলা করে টিকে আছে। তাদের কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং জাহাজবিধ্বংসী অস্ত্রের সক্ষমতা রয়েছে, যা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী একই সময়ে ইরান, ইরাক, সিরিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং লোহিত সাগরে সক্রিয় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ২০টিরও বেশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং শত শত সামরিক বিমান মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যেই নতুন করে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হলে যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করতে হতে পারে। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য এবং জ্বালানি এই পথেই পরিবহন হয়। অতীতে হুথিদের হামলার কারণে বিশ্বের বড় বড় শিপিং কোম্পানি এই রুট এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলাচল করতে বাধ্য হয়েছিল। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময়—দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অন্যদিকে, ইরানের ওপর চলমান অবরোধের কারণে হুথিদের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহও আগের তুলনায় সীমিত হয়ে পড়তে পারে। তবুও হুথিদের এই নতুন হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির জন্যও এটি নতুন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস তাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খলিল আল-হাইয়া-কে নির্বাচিত করেছে। সোমবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটি এ ঘোষণা দেয়। আল-হাইয়া দায়িত্ব নিচ্ছেন হামাসের সাবেক প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে সিনওয়ার নিহত হন। হামাসের গাজা শাখার সাবেক প্রধান এবং সংগঠনটির অন্যতম প্রধান আলোচক হিসেবে পরিচিত খলিল আল-হাইয়া দীর্ঘদিন ধরেই কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থান করছেন। ২০২৪ সালে হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়ার মৃত্যু এবং পরে সিনওয়ারের নিহত হওয়ার পর থেকেই তিনি সংগঠনের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে উঠে আসেন। হামাসের নেতৃত্বের দৌড়ে সাবেক রাজনৈতিক প্রধান খালেদ মেশআল-এর নামও আলোচনায় ছিল। তবে আল-হাইয়াকে তুলনামূলকভাবে আরও কঠোর অবস্থানের নেতা হিসেবে দেখা হয়। হামাসের নতুন প্রধান নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলতি বছরের জানুয়ারিতে শুরু হলেও ইরান, লেবানন ও গাজায় চলমান সংঘাতের কারণে তা বিলম্বিত হয়। শেষ পর্যন্ত গাজা, পশ্চিম তীর, ইসরায়েলের কারাগারে থাকা হামাস সদস্য এবং বিদেশে অবস্থানরত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত নির্বাচনী পরিষদ আল-হাইয়াকে সংগঠনের নেতৃত্বে নির্বাচিত করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন হামাসের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা। এর মাধ্যমে সংগঠনটি জানিয়ে দিল, তারা এখনই নিরস্ত্রীকরণের পথে হাঁটতে প্রস্তুত নয় এবং নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের লক্ষ্য থেকে সরে আসছে না। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এ পর্যন্ত হামাস, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনায় স্থায়ী কোনো সমঝোতা হয়নি। দুই বছরের যুদ্ধের পর গাজার বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সংঘাতে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল।
বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পর ইরানকে লক্ষ্য করে কড়া বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক হামলায় নিহত মার্কিন সেনাসদস্যদের স্মরণেই ইরানের ওপর নতুন করে কঠোর সামরিক অভিযান চালানো হচ্ছে। রোববার রাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, “আমরা আজ রাতে আবারও তাদের ওপর খুব কঠোর হামলা চালিয়েছি। সম্ভবত তিনজন মহান দেশপ্রেমিকের সম্মানেই এই হামলা।” এর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, শনিবার ইরাকের উত্তরাঞ্চলে ইরানের একটি হামলায় একজন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ইরানের একটি হামলাকারী ড্রোন ভূপাতিত করার পর সেটির অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ বিস্ফোরিত হলে ওই সেনাসদস্য নিহত হন। একই ঘটনায় আরও একজন সেনা আহত হন। এর মাত্র একদিন আগে জর্ডানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় আরও দুই মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন। ওই ঘটনায় আরও একজন সেনাসদস্য নিখোঁজ হন। পরে সেন্টকম জানায়, হামলার স্থান থেকে অজ্ঞাতপরিচয়ের মানবদেহের কিছু অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। সেগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। পরপর দুই দিনে তিন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তারা লড়াই করছিলেন, যাতে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে।” এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার ভোররাতে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা ইরানের বিরুদ্ধে আরও এক দফা সামরিক অভিযান শুরু করেছে। সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, টানা নবম রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করা একাধিক ড্রোন প্রতিহত করা হচ্ছে। একই সময়ে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা সিরিয়ায় শত্রুপক্ষের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র লক্ষ্য করে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, দেশজুড়ে বিমান হামলার সতর্কতাসূচক সাইরেন বাজানো হয়েছে। নাগরিক ও বিদেশি বাসিন্দাদের দ্রুত নিকটস্থ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর ধারাবাহিক হামলা এবং ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কূটনৈতিক সমাধানের কোনো ইঙ্গিত এখনো না থাকায় সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে জর্ডানের উপকূলীয় শহর আকাবা অভিমুখে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এ ঘটনায় সীমান্তবর্তী এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর গতিপথ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং এর কিছু অংশ ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় আকাশসীমা বা ভূখণ্ডে প্রবেশের সম্ভাবনাও রয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এর আগে একাধিকবার জর্ডান জানিয়েছে, নিজেদের আকাশসীমা লক্ষ্য করে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তারা প্রতিহত করেছে। দেশটির সামরিক বাহিনী বলেছে, জর্ডানের আকাশসীমা বা সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। আকাবা জর্ডানের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর এবং এটি ইসরায়েলের ইলাত শহরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে এ অঞ্চলে যেকোনো সামরিক তৎপরতা দ্রুত আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং জর্ডানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অস্থিরতার পর এবার নতুন কূটনৈতিক ভূমিকায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে ইরাক। লক্ষ্য—সংঘাতের কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা। Arab News-এর বিশ্লেষণধর্মী এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুয়াদ হুসেইন এমন একটি আঞ্চলিক সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে ইরান এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) ছয়টি দেশ নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে এক টেবিলে বসবে। ইরান ইতোমধ্যে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তেহরানের দাবি, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা বাইরের শক্তির পরিবর্তে অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর হাতেই থাকা উচিত। অন্যদিকে বাগদাদ এই উদ্যোগকে নিজেদের আঞ্চলিক কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে দেখছে। তবে Arab News-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরাক বিশ্লেষক লাহিব হিগেল বলেন, ইরাকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উপসাগরীয় দেশগুলোকে এই আস্থা দেওয়া যে, তাদের ভূখণ্ড আর কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবে না। তার মতে, এই বিষয়টি অনেক দেশের জন্য “ডিল ব্রেকার” বা চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার কারণও হতে পারে। নতুন প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে নিরাপত্তা সহযোগিতা থেকে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে আল-জাইদি বলেন, “আমেরিকান সেনারা চলে যাবে, কিন্তু আমেরিকান কোম্পানিগুলো আসবে।” তার এই বক্তব্যকে ইরাকের নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনো জটিল। সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতারসহ একাধিক উপসাগরীয় দেশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। কিছু হামলার সঙ্গে ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। Arab News-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক জন কালাব্রেস বলেন, ইরান এই উদ্যোগের মাধ্যমে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি নিজেদের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা হ্রাস এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চায়। তবে শুধু আলোচনা নয়, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা কমানো এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান পদক্ষেপ ছাড়া এই উদ্যোগ সফল হবে না। ইরাক অতীতেও সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সংলাপ আয়োজন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। কারণ এখন ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একাধিক সংকট একই সঙ্গে চলছে। ইরাকের এই কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হলে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং এতে বিদেশি বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। তবে যদি বাগদাদ নিজ ভূখণ্ডে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইরাক শান্তি প্রক্রিয়ার আয়োজক হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে, প্রকৃত মধ্যস্থতাকারী হয়ে উঠতে পারবে না।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। শনিবার উভয় পক্ষ অবকাঠামো ও সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে নতুন করে হামলা চালায়। এতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, টানা সপ্তম রাতের অভিযানে ইরানের নজরদারি কেন্দ্র, সামরিক রসদ অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডার এবং সামুদ্রিক সক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, দেশটির বাহিনী কুয়েতের আল-আদিরি সামরিক শিবির, আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটি, জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কুয়েত, জর্ডান ও কাতার জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে। বাহরাইনেও বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বাজানো হয়। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ায় বেশিরভাগ ফ্লাইট পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। কুয়েতের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে আগুন লাগে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের একাধিক ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। পানীয় জলের সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে। এদিকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলেও হামলার পরিধি বেড়েছে। দেশটির কর্মকর্তাদের দাবি, সেতু, বন্দর, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং চাবাহার বন্দরের একটি নজরদারি টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত পুনরায় শুরুর পর থেকে অন্তত ৩৮ জন নিহত এবং ৪০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, নতুন করে আরও ১৩ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু এখন হরমুজ প্রণালি, যার মাধ্যমে শান্তিকালে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল সীমিত করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৬ ডলারের ওপরে উঠে গেছে এবং জাহাজ চলাচল তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সময়ে চীন ও পাকিস্তান উভয় পক্ষকে যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত এখন আর শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ নেই; জ্বালানি, বন্দর, বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর আরও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে চীন। এক মাসের ব্যবধানে দুই দেশের মধ্যে একাধিক উচ্চপর্যায়ের সফর ও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ চীনের চতুর্থ সর্বোচ্চ নেতা ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম নীতিনির্ধারক ওয়াং হুনিং তিন দিনের সফরে পিয়ংইয়ং গিয়ে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি তিনি কিমের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ওনসান-কালমা উপকূলীয় পর্যটন প্রকল্পও পরিদর্শন করেন। এই সফরকে কেবল সৌজন্য সফর হিসেবে দেখছেন না কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। বরং এটি বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈঠকে দুই দেশ রাজনৈতিক আস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ আরও জোরদারের বিষয়ে একমত হয়েছে। সফরকালে ওয়াং হুনিং ওনসান-কালমা পর্যটন প্রকল্প ঘুরে দেখেন। প্রায় ২০ হাজার পর্যটকের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই সমুদ্র উপকূলীয় রিসোর্টকে কিম জং উনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চীনা প্রতিনিধি দলকে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয় এবং ওয়াং এটিকে উত্তর কোরিয়ার ‘জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়ন নীতির’ একটি উদাহরণ হিসেবে প্রশংসা করেন। এই সফরের আগে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উত্তর কোরিয়া সফর করেন। সেই সফরে দুই দেশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়াং হুনিংয়ের সফরকে সেই সমঝোতা বাস্তবায়নের ধারাবাহিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে পূর্ব এশিয়ায় নিজের ঐতিহ্যগত প্রভাব ধরে রাখতে এবং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতেই সক্রিয় হয়েছে বেইজিং। একই সঙ্গে অর্থনীতি ও পর্যটন খাত পুনরুজ্জীবিত করতে চীনের সহযোগিতাও উত্তর কোরিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের সফর, কিম জং উন–ওয়াং হুনিং বৈঠক এবং ওনসান-কালমা প্রকল্পে চীনা প্রতিনিধিদলের আগ্রহ—সব মিলিয়ে চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক আগের তুলনায় আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে এবং বেইজিং পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। তথ্যসূত্র: রয়টার্স (১৫–১৭ জুলাই ২০২৬), কেসিএনএ।
ইরানের রাজধানী তেহরানের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা প্যালেস্টাইন স্কয়ারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে একটি বড় বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। বিলবোর্ডে ট্রাম্প, তার স্ত্রী ও সন্তানদের ছবির নিচে মার্কিন পতাকায় মোড়ানো কফিনের ছবি দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি ফারসি ও ইংরেজি ভাষায় লেখা রয়েছে, ‘রক্তের বদলে রক্ত’। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার মধ্যে বিলবোর্ডটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, বিলবোর্ডটি তেহরানের প্যালেস্টাইন স্কয়ারে স্থাপন করা হয়েছে। এতে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এবং ট্রাম্পের সন্তানদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের নিচে মার্কিন পতাকায় মোড়ানো একাধিক কফিনের প্রতীকী ছবি দিয়ে প্রতিশোধের বার্তা তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে তেহরানের এঙ্গেলাব স্কয়ারেও আরেকটি বিলবোর্ডে ট্রাম্পকে খোলা কালো কফিনে শোয়ানো অবস্থায় দেখানো হয়। সেখানে ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় ‘We Kill Trump’ বা ‘আমরা ট্রাম্পকে হত্যা করব’ লেখা ছিল। এসব বিলবোর্ড এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে আনা হয়েছে, যখন ইরানে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিও প্রকাশ্যে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তেহরানের প্যালেস্টাইন স্কয়ার ও এঙ্গেলাব স্কয়ারের বড় বড় দেয়ালচিত্র ও বিলবোর্ড দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের জন্য পরিচিত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী নানা প্রচারণায় এসব স্থান নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, তার বা তার পরিবারের ওপর ইরানের পক্ষ থেকে কোনো হামলার চেষ্টা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর ও বিধ্বংসী জবাব দেবে। সাম্প্রতিক বিলবোর্ডগুলো দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চীন হস্তক্ষেপ করেছিল—এমন অভিযোগ আবারও সামনে এনেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি এ-সংক্রান্ত কিছু গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশের (ডিক্লাসিফাই) নির্দেশ দিয়েছেন। তবে চীন এসব অভিযোগকে “সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন” এবং “অপপ্রচার” বলে উড়িয়ে দিয়েছে। হোয়াইট হাউসে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, চীন কোটি কোটি মার্কিন ভোটারের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি তৈরি করেছিল। তবে তিনি তার দাবির পক্ষে নতুন কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মনগড়া। চীন কখনো যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।” তিনি ওয়াশিংটনকে ভিত্তিহীন অভিযোগ না তোলার আহ্বান জানান। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্রও একই বক্তব্য দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার কোনো নীতি বা উদ্দেশ্য চীনের নেই। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, চীনা সরকার চেয়েছিল তিনি নির্বাচনে হেরে যান, কারণ তার প্রশাসন বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। তবে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যৌথ তদন্তে বলা হয়েছিল, চীনসহ কোনো বিদেশি দেশ ভোটার তালিকা, ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা বা নির্বাচনের ফল পরিবর্তনের মতো কোনো কারিগরি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এমন সময় ট্রাম্প নতুন করে এই অভিযোগ তুললেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার চেষ্টা চলছে। আগামী সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ওয়াশিংটন সফর নিয়েও আলোচনা চলছে। ফলে এই অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করতে ইসরায়েল সরকারের কিছু সদস্য সচেষ্ট ছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। জনপ্রিয় পডকাস্ট উপস্থাপক জো রোগানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইরান-নীতি পরিবর্তনের জন্য ইসরায়েল সরকারের কিছু ব্যক্তি মার্কিন জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। তার দাবি, তারা চেয়েছিলেন সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত হোক এবং কূটনৈতিক সমাধান ব্যর্থ হোক। ভ্যান্স আরও দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তাকে ব্যক্তিগতভাবেও লক্ষ্য করে একটি “অত্যন্ত অর্থায়ন-সমৃদ্ধ বিদেশি প্রভাব প্রচারণা” চালানো হয়েছিল। তবে তিনি এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি এখনো বিশ্বাস করেন ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানো জরুরি। তবে তার মতে, সেই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় সবসময় সামরিক অভিযান নয়; কূটনৈতিক পথও গুরুত্বপূর্ণ। ভ্যান্স যে সমঝোতার পক্ষে কথা বলেছেন, সেটি গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ইরানের সঙ্গে সংঘাত কমানোর লক্ষ্যে হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমালোচকদের দাবি, ওই সমঝোতায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা পারমাণবিক স্থাপনাগুলো নিয়ে পর্যাপ্ত বিধিনিষেধ রাখা হয়নি। ভ্যান্সের এই মন্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কোনো ভাইস প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে ইসরায়েলি নীতির বিরুদ্ধে অন্যতম কঠোর প্রকাশ্য সমালোচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে কূটনীতি নাকি সামরিক চাপ—এই প্রশ্নে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
সৌদি আরবের কাছে প্রায় ১ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন (১৯৬ কোটি) মার্কিন ডলার মূল্যের উন্নত রকেট নির্দেশনা ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির সম্ভাব্য অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট। মার্কিন আইনে নির্ধারিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ বিষয়ে কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। অনুমোদিত প্রস্তাবে রয়েছে ১০ হাজার ‘অ্যাডভান্সড প্রিসিশন কিল ওয়েপন সিস্টেম (এপিকেডব্লিউএস-টু)’ আকাশ থেকে আকাশে ব্যবহারের নির্দেশনা ব্যবস্থা এবং আরও ১০ হাজার আকাশ থেকে স্থলভাগে ব্যবহারের নির্দেশনা ব্যবস্থা। এগুলোর মাধ্যমে সাধারণ ৭০ মিলিমিটার রকেটকে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা দেওয়া যায়। চুক্তিতে আরও রয়েছে রকেট উৎক্ষেপণ যন্ত্র, উচ্চ বিস্ফোরক ওয়ারহেড, রকেট মোটর, ফিউজ, পরীক্ষামূলক ও প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম, খুচরা যন্ত্রাংশ, কারিগরি নথি, রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা এবং প্রকৌশল ও লজিস্টিক সেবা। প্রধান ঠিকাদার হিসেবে কাজ করবে মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান বিএই সিস্টেমস। মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো-বহির্ভূত প্রধান মিত্র। এ বিক্রয় দেশটির নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে যৌথ সামরিক কার্যক্রমে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মার্কিন কৌশলেরও অংশ। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও সীমান্তপারের নিরাপত্তা হুমকি বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই অনুমোদনকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কম খরচে ড্রোন প্রতিরোধে এই নির্দেশনা ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই অনুমোদন চূড়ান্ত বিক্রয় চুক্তি নয়। কংগ্রেস নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপত্তি না জানালে এবং দুই পক্ষের আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হলে অস্ত্র সরবরাহের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের জাহাজগুলো আর হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে না। একই সঙ্গে অন্যান্য দেশের নির্দিষ্ট পণ্যবাহী জাহাজ থেকে ২০ শতাংশ টোল আদায় করবে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের ভাষায়, এই অর্থ হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যয়ের প্রতিদান হিসেবে নেওয়া হবে। সোমবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফায় সামরিক হামলা শুরু করেছে এবং অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি দাবি করেন, ইরানের আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা হচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। ট্রাম্প আরও বলেন, বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। তাই সেই নিরাপত্তা ব্যয়ের অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী দেশগুলোর কাছ থেকে টোল আদায় করা হবে। তবে এই টোল কীভাবে আদায় করা হবে বা কোন কোন দেশের ওপর তা প্রযোজ্য হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিষয়ক কঠোর অবস্থানের সমর্থক এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর তাঁর বোন ডারলিন গ্রাহাম নরডোনকে অস্থায়ীভাবে মার্কিন সিনেটে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের বড় একটি অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এ অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং নতুন টোল আরোপের ঘোষণা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দফার সামরিক হামলার পর পাল্টা জবাব হিসেবে বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। হামলার পর দেশজুড়ে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে এবং বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের হামলার মূল লক্ষ্য ছিল বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক স্থাপনা। হামলার সময় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে একাধিক আকাশীয় লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করার চেষ্টা চালায়। ইরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ বিমান হামলার জবাব দিতেই এ অভিযান চালানো হয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন বলছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতেই সাম্প্রতিক হামলা পরিচালনা করা হয়েছে। (Reuters) বাহরাইন কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে চলমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে আরও বিস্তৃত আকার নেওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান “মানুষ যতটা ভাবছে, তার চেয়েও অনেক কাছাকাছি” পৌঁছে গেছে। তিনি জানান, চলতি সপ্তাহে তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ইউক্রেন যুদ্ধই অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং সাম্প্রতিক আলোচনা ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে তিনি সম্ভাব্য কোনো চুক্তি বা আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করেননি। ট্রাম্প আরও জানান, ন্যাটো নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে ইউক্রেনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হবে। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের এই সংঘাতের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উভয় পক্ষই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা জোরদার করেছে। একই সময়ে পশ্চিমা দেশগুলো কিয়েভকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখলেও যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়িয়েছে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন সময় এলো, যখন ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নতুন করে গতি পাওয়ার আভাস মিলছে। তবে এখন পর্যন্ত রাশিয়া বা ইউক্রেন—কোনো পক্ষই সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয় ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাবে, না হলে “কাজ শেষ করবে”। এর মাধ্যমে তিনি আবারও তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিলেন। সোমবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “আমরা হয় একটি চুক্তি করব, নয়তো কাজ শেষ করব। তবে আমি চুক্তিই করতে চাই, কারণ ৯১ মিলিয়ন মানুষের ওপর এর প্রভাব পড়ুক, সেটা আমি চাই না।” তিনি আরও দাবি করেন, প্রয়োজন হলে অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন সময় এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা গত সপ্তাহে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়েছে। এর আগে সংঘাতের পর কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ তৈরি করতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়েছিল। অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-র জানাজায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপের মুখেও নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার বার্তা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের নতুন বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশ সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্কে নতুন এক কূটনৈতিক বার্তা দেখা গেল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য উপলক্ষে দেশটির প্রেসিডেন্টের কাছে আনুষ্ঠানিক সমবেদনা জানিয়েছেন সৌদি বাদশাহ সালমান ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ আল-খুরাইজি তেহরানে অনুষ্ঠিত শেষকৃত্যে অংশ নেন। সেখানেই তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের হাতে সৌদি নেতৃত্বের সমবেদনা বার্তা পৌঁছে দেন। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় খামেনির মরদেহ রাখা হয়েছে। কয়েক দিনব্যাপী এ শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে লাখো মানুষের অংশগ্রহণের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও উপস্থিত রয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে সৌদি নেতৃত্বের এই সমবেদনা বার্তাকে শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়, বরং আঞ্চলিক কূটনীতিতে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি না থাকলে বিশ্বের মানচিত্রে ইসরায়েলের কোনো অস্তিত্বই থাকত না। মিত্র দেশটির প্রতি এমন অভাবনীয় দাবির পাশাপাশি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আরও ‘দায়িত্বশীল’ হওয়ার কড়া পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা চুক্তির প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোড়ন তুলেছে। উল্লেখ্য, ইসরায়েলের অনেক শীর্ষ নেতা শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই সমঝোতার তীব্র সমালোচনা করে আসছিলেন। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-সেভেন (G7) সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। সম্মেলনে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র না থাকলে ইসরায়েল থাকত না। আর আমি না থাকলেও ইসরায়েল থাকত না; কারণ ইসরায়েলের জন্য আমি যা করেছি, তা করতে অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট কখনো প্রস্তুত ছিলেন না।" বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে নিজের সুসম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, "নেতানিয়াহুর সঙ্গে আমার খুবই ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে লেবাননের বিষয়ে বিবিকে (নেতানিয়াহু) আরও অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে।" লেবানন ও সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর চলমান সামরিক অভিযানের ধরন ও সময়কাল নিয়ে প্রকাশ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। ইসরায়েলি সামরিক কৌশলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, "লেবানন ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েল যে আচরণ করছে, তা আমার মোটেও ভালো লাগেনি। তাদের উচিত ছিল আরও দ্রুত এই লড়াইয়ের সমাপ্তি টানা।" সংঘাতটি অতিরিক্ত দীর্ঘায়িত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করে দেন যে, পরিস্থিতির এমন অবনতি ঘটতে থাকলে তা শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় পরিসরের সমঝোতা চুক্তির ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা চুক্তি মানতে ইসরায়েল বাধ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন গাভির। তিনি দাবি করেছেন, ওই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, বেন গাভির ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা চুক্তি নিয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া প্রথম ইসরায়েলি শীর্ষ নেতাদের একজন। সোমবার নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই চুক্তি আমাদের ওপর বাধ্যতামূলক নয়। আমরা এই চুক্তির কোনো পক্ষ নই। এটি আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।” লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের লক্ষ্য কেবল যুদ্ধবিরতি নয়, বরং হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা। তার ভাষায়, “হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার কম কোনো কিছুতেই আমরা সন্তুষ্ট হব না।” বেন গাভির আরও বলেন, ইসরায়েলি সেনারা যেসব এলাকা দখল করেছে এবং যেগুলোকে তিনি “সন্ত্রাসী অবকাঠামোমুক্ত” বলে উল্লেখ করেছেন, সেসব এলাকা থেকে কোনোভাবেই সেনা প্রত্যাহার করা উচিত নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পক্ষের কূটনৈতিক উদ্যোগের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। ওই সমঝোতায় চলমান সংঘাত কমে আসবে এবং লেবাননসহ আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। তবে বেন গাভিরের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি অংশ এই চুক্তিকে সমর্থন করছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বিভক্ত মতামতকে আরও স্পষ্ট করছে, যেখানে একপক্ষ কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে এবং অন্যপক্ষ সামরিক অবস্থান অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।
লেবাননের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশকারী ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ওপর একদিনেই মুহুর্মুহু ১৭টি সফল হামলা চালানোর দাবি করেছে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। গোষ্ঠীটির এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন ফ্রন্টে অবস্থান নেওয়া ইসরায়েলি সেনা ও সামরিক যানের বহর লক্ষ্য করে এসব সুনির্দিষ্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। মূলত নাবাতিয়েহ, বিন্ত জাবিল, মাজদাল জাউন, সোর, কানতারা এবং মারজায়ুন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর সমাবেশ ও অবস্থানকে কেন্দ্র করে এই তীব্র আক্রমণগুলো চালানো হয়। এর ফলে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। স্থলভাগে সরাসরি আক্রমণের পাশাপাশি আকাশপথেও কড়া প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে লেবাননের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, জেজিন এবং সাইদা শহরের কাছাকাছি এলাকায় নজরদারি চালানো ইসরায়েলি ড্রোনের ওপর তারা সফলভাবে মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। এছাড়া একটি ইসরায়েলি সামরিক ট্রাকেও সরাসরি এবং নির্ভুল আঘাত হানার দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। একদিনের ব্যবধানে হিজবুল্লাহর এতগুলো সুপরিকল্পিত হামলা লেবানন সীমান্তে চলমান সংঘাতকে যেমন আরও ঘনীভূত করেছে, তেমনি গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে এক নতুন সামরিক উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের নতুন অধ্যায়ের সূচনা এবং প্রভাবশালী বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করার কড়া বার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ সামরিক কমান্ডার আলি আবদুল্লাহি ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সির মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে শত্রুদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ওই বিশেষ বার্তায় তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি শক্তিশালী, আধুনিক এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ইরানের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে আলি আবদুল্লাহি বলেন, তাদের এই অবিচল প্রতিরোধ আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক অঙ্গনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি ইরানকে একটি প্রভাবশালী ও অদম্য বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত করেছে। দেশের অকুতোভয় সামরিক বাহিনী সব সময় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে উল্লেখ করে এই কমান্ডার জানান, শত্রুর যেকোনো উসকানি বা আগ্রাসনের তাৎক্ষণিক ও চূড়ান্ত জবাব দিতে তাদের সেনাদের 'ট্রিগারে আঙুল' প্রস্তুত রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে শত্রুর বুকে সরাসরি ও নিখুঁত আঘাত হানতে তারা বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করবে না। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যেই ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার এই আত্মবিশ্বাসী ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উত্তেজনা ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক শান্তিচুক্তি রোববার স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে চুক্তিতে সই করবেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের আশাবাদের পর একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ইরান বলছে, রোববার নয়, চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে। শনিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত, সহজ এবং নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা করছেন। তিনি লিখেছেন, “আগামীকাল (আজ) চুক্তিটি সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি সই হওয়ার পরপরই হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে।” এর আগে শনিবার বেলা ১১টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, “আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন শান্তিচুক্তির আরও কাছাকাছি অবস্থানে আছি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তির চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হতে পারে। এরপরই শান্তিচুক্তি ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সই হবে। পাকিস্তান এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর পরের সপ্তাহে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা হবে।” তবে চুক্তি স্বাক্ষরের নির্দিষ্ট সময় নিয়ে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, স্বাক্ষরের সঠিক সময় সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তি আগামীকাল নয়, বরং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে স্বাক্ষর হতে পারে। এদিকে এমন এক সময় এই অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যখন শনিবার ভোরেও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একাধিক ড্রোন ধ্বংস করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইরান। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের কর্মকর্তারা গত শুক্রবার থেকে ধারাবাহিকভাবে চুক্তি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে আসছেন। যুদ্ধ শুরুর পর গত তিন মাসে এমন ইতিবাচক বার্তা আগে দেখা যায়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, “ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছেছে।” পরে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি সতর্ক করে বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি না হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো সমঝোতা হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। তিনি আরও জানান, চুক্তিটি দূরবর্তী বা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হবে। আরাগচির এই বক্তব্যের আগে পশ্চিমা এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও পরোক্ষভাবে সেই সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। চুক্তিতে ইরান বেশি সুবিধা পাচ্ছে বলে যে আলোচনা চলছে, তার জবাবে শুক্রবার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “ইরান যেসব শর্ত ফেক নিউজ বা ভুয়া খবর হিসেবে ফাঁস করেছে, তার সঙ্গে লিখিতভাবে যেসব শর্তে সম্মতি হয়েছে, তার কোনো সম্পর্ক নেই।” যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত সমঝোতা চুক্তির ধারাগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করা হতে পারে। এ ছাড়া ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, তেহরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং দেশটির জব্দ অর্থের একটি অংশ ছাড় দেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, প্রাথমিক এই চুক্তিতে পারমাণবিক কর্মসূচি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত থাকছে না। এ বিষয়ে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আলাদা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে এখনো পার্থক্য রয়েছে। হোয়াইট হাউসের দাবি, প্রাথমিক সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরান নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি বাতিল এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা অন্যত্র স্থানান্তরে সম্মত হয়েছে। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস করা হবে না এবং কোনো বিদেশি রাষ্ট্রেও পাঠানো হবে না। বরং দেশের ভেতরেই সংরক্ষণ করে এর সমৃদ্ধতার মাত্রা কমিয়ে আনা হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। সংঘাত শুরুর ৪০ দিন পর, গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এরপর ১১ ও ১২ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। পরে নতুন করে দ্বিতীয় দফা আলোচনার চেষ্টা চলতে থাকে। বর্তমানে যে সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে, তা দুই দেশের কর্মকর্তাদের সরাসরি উপস্থিতিতে নয়; বরং ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হবে বলে জানা গেছে। সংঘাতের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির একাধিক শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতা আগামী ৪ জুলাই শুরু হবে এবং ৯ জুলাই মাশহাদ শহরে তাঁকে দাফন করা হবে। এদিকে সম্ভাব্য চুক্তির আলোচনার মধ্যেই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত আরও কঠোর নিরাপত্তার আওতায় নিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য কোনো মার্কিন অভিযানের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম জব্দ ঠেকাতে কিছু ভূগর্ভস্থ টানেল ধ্বংস করা হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে। বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যার সক্ষমতা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পর্যায়ে বলে ধারণা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।