লেবাননে বুধবার ও বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো ভয়াবহ হামলাকে "প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন" হিসেবে অভিহিত করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই কড়া প্রতিক্রিয়া জানান। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ইসরায়েলি এই আগ্রাসনকে "প্রতারণা এবং সম্ভাব্য চুক্তিগুলো না মানার একটি বিপজ্জনক লক্ষণ" বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইসরায়েলের এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে চলমান শান্তি আলোচনা সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়বে। লেবাননের জনগণের প্রতি তেহরানের অবিচল সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি স্পষ্ট জানান, "ইরান তার লেবানিজ ভাই-বোনদের কখনোই একা ফেলে যাবে না।" একইসাথে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, "আমাদের হাত এখনো (বন্দুকের) ট্রিগারেই আছে।" বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী শনিবার ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দ্বিপাক্ষিক শান্তি আলোচনার প্রাক্কালে পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতিকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিল। উল্লেখ্য, বুধবার বৈরুতসহ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ২০০ জন নিহত হয়েছেন, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধে বিশ্বনেতাদের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বুধবার (৮ এপ্রিল) বিকেলে ইউনূস সেন্টারের মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এই আহ্বান জানান। বিবৃতিতে ড. ইউনূস বলেন, চলমান সংঘাত বিশ্বকে আরও গভীর অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বাড়ছে, বিশেষ করে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; উপেক্ষিত হচ্ছে মানুষের মৌলিক চাহিদা। এই সংকটকে কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, এটি পুরো মানবজাতির জন্য একটি গুরুতর নৈতিক চ্যালেঞ্জ। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে, যার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। বিবৃতিতে বৈশ্বিক ঐক্য ও সহমর্মিতার ওপর জোর দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক উত্তেজনার পরিবর্তে কূটনৈতিক সংলাপকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করতে বিশ্বনেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, “আমাদের যুদ্ধ নয়, শান্তিকে বেছে নিতে হবে; হামলা নয়, সংলাপকে বেছে নিতে হবে; বিভাজন নয়, ঐক্যকে বেছে নিতে হবে।” উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া সংঘাত ৩৯ দিন ধরে চলার পর বুধবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানালেন ড. ইউনূস।
ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর স্বস্তির আশা জাগলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবারও উত্তেজনা বাড়িয়েছে ইরান। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করে দিয়েছে দেশটি, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বুধবার (৮ এপ্রিল) লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলার প্রতিবাদে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম ফারস নিউজ এজেন্সি। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, এই সময়ের জন্য বোমাবর্ষণ ও সামরিক হামলা স্থগিত রাখা হবে। পরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি পাল্টা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে সামরিক ইউনিটগুলোকে সংযত থাকার নির্দেশ দেন। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর সকালে পরীক্ষামূলকভাবে দুটি তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হলেও, লেবাননে নতুন করে হামলা শুরু হলে ইরান বাকি সব জাহাজের চলাচল স্থগিত করে দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির শর্ত ও আওতা নিয়ে অস্পষ্টতাই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলের এই সমঝোতায় লেবানন ফ্রন্টও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, যুদ্ধবিরতি কেবল ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এর পরপরই ইসরায়েল লেবাননে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের সমন্বিত বিমান হামলা চালায়, যা চলমান সংঘাতের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ হামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই হামলার জেরে ক্ষুব্ধ হয়ে ইরান পুনরায় প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে শত শত তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার ভারত মহাসাগর এলাকায় আটকা পড়েছে বলে জানা গেছে। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে জরুরি ফোনালাপে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। তেহরান সতর্ক করেছে, লেবাননে হামলা বন্ধ না হলে তারা পুরো শান্তি প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়াতে পারে এবং পাল্টা জবাব দেবে। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি এখন অনিশ্চয়তার মুখে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান এখনো ইসরায়েল-এর দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতা রাখে। তবে তিনি দাবি করেছেন, এই সক্ষমতা ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি নয়। ধারণকৃত এক বার্তায় দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের শক্তিও আগের মতো নেই এবং তারা এখন আর ইসরায়েলের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে বিবেচিত নয়। তিনি আরও বলেন, চলমান সংঘাত ইসরায়েলের জন্য কৌশলগতভাবে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে এই পরিস্থিতিতে অঞ্চলের কিছু দেশের সঙ্গে নতুন ধরনের মিত্রতা গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। যদিও সম্ভাব্য এসব মিত্র দেশের নাম প্রকাশ করেননি, তবে শিগগিরই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন নেতানিয়াহু। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য একদিকে যেমন ইরানের সামরিক সক্ষমতা স্বীকার করছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে—এমন বার্তা দেওয়ার কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় ইয়াজদে অবস্থিত একটি ইউরেনিয়াম উত্তোলন কেন্দ্রে হামলার ঘটনা নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হওয়ায় এ ধরনের স্থাপনায় হামলা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। দীর্ঘদিন ধরেই এ ইস্যুতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। তবে ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, হামলার ফলে কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়েনি এবং পরিবেশে তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়েনি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা, যারা আশঙ্কা করছেন—এই হামলার জেরে অঞ্চলজুড়ে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে ইরানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে নামার ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় সামরিক অভিযান শুরু করতে তারা প্রস্তুত। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে হুতির এক নেতা বলেন, তাদের সামরিক প্রস্তুতি সম্পূর্ণ রয়েছে এবং সব ধরনের বিকল্প পরিকল্পনাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং প্রতিদিন শত্রুপক্ষকে চাপে রাখছে। হুতির ওই নেতা আরও জানান, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং কখন সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো উপযুক্ত হবে, সে বিষয়ে সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিশ্লেষকদের মতে, হুতি গোষ্ঠী সরাসরি সংঘাতে জড়ালে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি যুদ্ধফ্রন্ট খুলে যেতে পারে। বিশেষ করে ইয়েমেনের উপকূলবর্তী গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। এই প্রণালি দিয়ে সুয়েজ খালমুখী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবেও উত্তেজনা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন সময় এই জলপথে ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে হুতি গোষ্ঠী, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান–ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে ফিলিপাইন সরকার। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) দেশটির প্রেসিডেন্ট Ferdinand Marcos Jr. এক নির্বাহী আদেশে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। সরকার বলছে, বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন এবং দ্রুত মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। ফিলিপাইনের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যার বড় অংশ আসে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে এই সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে গত কয়েক সপ্তাহে দেশটিতে জ্বালানির দাম একাধিকবার বেড়েছে এবং বর্তমানে ডিজেল ও পেট্রোলের মূল্য আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, দেশে বিদ্যমান জ্বালানি মজুত দিয়ে সর্বোচ্চ ৪৫ দিন চাহিদা মেটানো সম্ভব। এই সীমিত মজুতকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি হিসেবেই জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। এই ঘোষণার ফলে সরকার জ্বালানি খাতে বিশেষ ক্ষমতা পেয়েছে। এখন থেকে সরাসরি জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম পণ্য ক্রয় ও মজুত করা যাবে। পাশাপাশি খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদারকি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার লক্ষ্য বাজারে কৃত্রিম সংকট ঠেকানো এবং সাধারণ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়া। প্রাথমিকভাবে এই জরুরি অবস্থা এক বছরের জন্য বলবৎ থাকবে। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন অনুযায়ী এর সময়সীমা বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ফিলিপাইন সরকার আশা করছে, এই বিশেষ ব্যবস্থা দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চাপ কমাতে সহায়তা করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের জেরে মঙ্গলবার ইসরায়েলে একাধিক দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এর আগেই তেহরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ট্রাম্পের এই দাবির পরদিনই হামলার ঘটনা পরিস্থিতির ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ইসরায়েলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ট্রাম্প একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী হলেও ইরান মার্কিন শর্ত মেনে নেবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। এর আগে ট্রাম্প তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইরানের সঙ্গে আলোচনার কথা উল্লেখ করেন। পরে সাংবাদিকদের কাছেও একই বক্তব্য দেন তিনি। যদিও তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এখনো কোনো ধরনের আলোচনা শুরু হয়নি। এদিকে ট্রাম্পের একটি মন্তব্য ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় উঠেছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পাশাপাশি তিনিও হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেন। এর জবাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত ইরান দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি ব্যঙ্গাত্মক ছবি পোস্ট করে। ছবিতে গাড়ির ড্যাশবোর্ডে একটি খেলনা স্টিয়ারিং হুইল দেখানো হয়, যা ট্রাম্পের মন্তব্যকে পরোক্ষভাবে উপহাস করেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন বলে জানা গেছে। বৈঠকে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি এবং চলমান উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। অন্যদিকে পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলতি সপ্তাহেই ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। ইরানের অভ্যন্তরেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি-এর প্রভাব বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি এই বাহিনীর সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ বাকের জোলকাদরকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি-এর কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন। উল্লেখ্য, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে ব্যর্থ আলোচনার অভিযোগ তুলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটির ওপর হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান শুধু ইসরায়েলই নয়, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এছাড়া, উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানার পাশাপাশি ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত করেছে। বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়, ফলে এর প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে দক্ষিণ ইসরায়েল থেকে প্রায় ২৭০০ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দেশটির জনকল্যাণ ও সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের বরাতে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে। সরিয়ে নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আরদ ও দিমোনা শহরের প্রায় এক হাজার বাসিন্দা রয়েছেন। শনিবার রাতে এই দুই শহরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইসরায়েলের জরুরি পরিষেবা বিভাগ জানিয়েছে, হামলায় অন্তত ১৮০ জন আহত হয়েছেন। দিমোনা শহর থেকে ৬০ জন এবং আরদ শহর থেকে ১১৫ জনেরও বেশি মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজন শিশু রয়েছে। কিছু ব্যক্তির অবস্থা আশঙ্কাজনক। এদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন ও জরুরি সেবাদল তৎপর রয়েছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ৪০০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। রোববার দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। সংস্থাটির মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে ইসরায়েল। তিনি দাবি করেন, তাদের প্রতিরোধের সফলতার হার প্রায় ৯২ শতাংশ। তবে সব হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। শনিবার দক্ষিণ ইসরায়েল-এর দুটি শহরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে অন্তত ১৮০ জনের চিকিৎসা সহায়তার প্রয়োজন হয়। এই পরিস্থিতির মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি যুদ্ধে সরাসরি সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ইরান কেবল ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র-এর জন্য নয়, বরং ইউরোপসহ বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি তৈরি করছে। রোববার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে নেতানিয়াহু বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও দেশকে এই অভিযানে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ অভিযান শুরু করার পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতকে ঘিরে বিশ্বনেতাদের সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তিনি দাবি করেছেন, ইরান শুধু ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। রোববার দক্ষিণ ইসরায়েল-এর ক্ষতিগ্রস্ত একটি এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে নেতানিয়াহু এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। নেতানিয়াহুর ভাষায়, “ইরান পুরো বিশ্বকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, এখন সময় এসেছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের নেতাদের এই অভিযানে যুক্ত হওয়ার। যদিও ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ এই পথে এগোতে শুরু করেছে, তবে আরও শক্ত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরান-এর পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। প্রায় এক মাস ধরে চলা এই অভিযানের প্রেক্ষাপটেই নেতানিয়াহুর এই আহ্বান এসেছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে ‘আদর্শ মিত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেন যে, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য করেছে। নেতানিয়াহু আরও দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ইতোমধ্যে বহু বিশ্বনেতা ব্যক্তিগতভাবে এ অভিযানে সমর্থন জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক পরিণতির খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ জামিল লিমনের (২৭) মরদেহ উদ্ধার করা হলেও, পুলিশ ধারণা করছে নাহিদা বৃষ্টিকেও (২৭) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। অভিযুক্ত ঘাতক ও লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়ার ফ্ল্যাটে ‘প্রচুর রক্ত’ পাওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছে, বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভবত আর কখনোই সম্ভব হবে না। নিহত বৃষ্টির বড় ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘১০ টাম্পা বে নিউজ’-কে জানান, শুক্রবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারীরা বাংলাদেশে তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, লিমন ও হিশামের শেয়ার করা ফ্ল্যাটে যে পরিমাণ রক্ত পাওয়া গেছে, তা থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে বৃষ্টি আর বেঁচে নেই। পুলিশের আশঙ্কা, হত্যার পর মরদেহটি সম্ভবত ছিন্নবিচ্ছিন্ন বা টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে, যার ফলে এটি খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। গত শুক্রবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশ থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই সকাল ৯টার দিকে ইউএসএফ ক্যাম্পাসের কাছে লেক ফরেস্ট এলাকায় অভিযুক্ত হিশাম আবুগারবিয়ার বাড়িতে অভিযান চালায় হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়। পুলিশ হিশামের বাড়িতে পৌঁছালে তিনি নিজেকে ঘরের ভেতর তালাবদ্ধ করে রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ‘সোয়াট’ (SWAT) তলব করা হয়। প্রায় ২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির পর হিশাম আত্মসমর্পণ করেন। তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা এবং অবৈধভাবে মরদেহ সরানোর মতো ছয়টি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হিশাম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। তিনি লিমনের রুমমেট হিসেবে একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। অন্যদিকে, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি গবেষণারত নাহিদা বৃষ্টি গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন। লিমনের সাথে তার আগে প্রেমের সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে ছিল না বলে জানিয়েছেন বৃষ্টির পরিবার। তদন্তকারীরা লিমনের মৃত্যু নিশ্চিত করলেও বৃষ্টির নিখোঁজ রহস্য ও তাকে হত্যার নৃশংসতা এখন পুরো ফ্লোরিডা ও বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া ফেলেছে।