এশিয়ায় দীর্ঘদিনের মিত্রদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ এবং লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে তীব্র জ্বালানি সংকটে পড়েছে এশিয়ার দেশগুলো। নিজেদের অর্থনীতি বাঁচাতে এবং তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও ভারতের মতো মার্কিন মিত্ররা এখন ওয়াশিংটনের কট্টর প্রতিপক্ষ রাশিয়া ও ইরানের দিকে ঝুঁকছে। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস। বিশ্লেষকরা বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্পষ্ট পররাষ্ট্রনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার কারণে এশীয় দেশগুলো এখন 'জাতীয় স্বার্থ'কে প্রাধান্য দিচ্ছে। এতদিন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে যারা রাশিয়া বা ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ রেখেছিল, বর্তমান বাস্তবতায় তারা সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। কোন দেশ কী পদক্ষেপ নিচ্ছে? দক্ষিণ কোরিয়া: তীব্র ন্যাপথা ও তেল সংকটে থাকা দেশটি রাশিয়া থেকে পণ্য আমদানির অনুমতি দিয়েছে। দেশটির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পর্ষদ এখন রাশিয়া ও ইরানকে বিকল্প উৎস হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করছে। ফিলিপাইন: জ্বালানি ঘাটতির কারণে দেশটিতে জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। পাঁচ বছর পর দেশটি রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেলের প্রথম চালান গ্রহণ করেছে। ভারত: সাত বছরের দীর্ঘ বিরতি শেষে চলতি সপ্তাহে ভারতে পৌঁছেছে ইরানের তেলের ট্যাংকার। লোহিত সাগরের অস্থিরতায় রাশিয়ার তেলের ওপর ভারতের নির্ভরতা আবারও বাড়ছে। ইন্দোনেশিয়া: প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো মস্কো সফর করে পুতিনের প্রশংসা করেছেন এবং জ্বালানি আমদানির বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত করছেন। জাপান: ঐতিহাসিকভাবে ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা জাপান এখন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের পাশাপাশি নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। পুতিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বমঞ্চে পুতিনকে কোণঠাসা করার যে চেষ্টা পশ্চিমা বিশ্ব করেছিল, এই জ্বালানি সংকট তা ব্যর্থ করে দিচ্ছে। এশীয় দেশগুলোর কাছে এখন রাশিয়ার তেল কেবল সস্তা নয়, বরং ভৌগোলিকভাবে দ্রুত সরবরাহযোগ্য একমাত্র উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এশিয়া প্রোগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর হুয়ং লে থু মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি অনেক দেশকে মার্কিন বলয় থেকে দূরে ঠেলে দিয়ে বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করছে। ওয়াশিংটনও বৈশ্বিক সংকট এড়াতে বাধ্য হয়ে কিছু ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ি শিথিল করছে।
দীর্ঘ উত্তেজনা ও সংঘাতের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন বাস্তবসম্মত একমাত্র পথ হয়ে উঠছে একটি সমঝোতা চুক্তি। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদে প্রথম দফার দীর্ঘ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র মূলত দর-কষাকষিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার কৌশল নিয়েছে। একই সময়ে ইরানি বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপের মাধ্যমে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে ইরান-এর জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। টানা বোমাবর্ষণ, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক চাপ দেশটিকে দ্রুত একটি সমঝোতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যদিও বাহ্যিকভাবে শক্ত অবস্থান প্রদর্শন করা হচ্ছে, বাস্তবে দেশটির ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে একটি চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের জন্যও একটি সমঝোতা জরুরি হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় দফার আলোচনায় মূল বিরোধ বড় কোনো নীতিগত প্রশ্নে নয়, বরং সময়সীমা ও শর্ত নিয়ে। ইরান পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পাঁচ বছরের জন্য স্থগিত রাখতে চাইলেও যুক্তরাষ্ট্র চাইছে দীর্ঘমেয়াদি—প্রায় ২০ বছরের—নিয়ন্ত্রণ। এই বিরোধের মধ্যেও উভয় পক্ষ অন্তত হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু রাখার বিষয়ে একমত হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে মার্কিন অবরোধ ইরানের দর-কষাকষির ক্ষমতা কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ইসরাইল এবং লেবানন সীমান্তে সক্রিয় হিজবুল্লাহ। ইরান চায় তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাপ কমানো হোক, অন্যদিকে ইসরাইল নিরাপত্তা ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান আলোচনায় এসব ইস্যু আলাদা করে বিবেচনা করা হতে পারে, যাতে মূল চুক্তির পথে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত না হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তির মূল চ্যালেঞ্জ হলো—দুই পক্ষই যেন নিজেদের জনগণের কাছে এটিকে ‘জয়’ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র চাইবে পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার সাফল্য দেখাতে ইরান চাইবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরোধ ক্ষমতা অটুট আছে—এ বার্তা দিতে সব মিলিয়ে, বড় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটলে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের বদলে কূটনৈতিক সমাধানের পথই এখন বেশি সম্ভাবনাময় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই সম্ভাব্য চুক্তি কি ২০১৫ সালের চুক্তির চেয়েও কার্যকর হবে, নাকি নতুন করে আরও জটিল বাস্তবতার জন্ম দেবে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন করে জটিল সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সক্রিয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কূটনৈতিক তৎপরতা, নিরাপত্তা বিবেচনা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা- পরিস্থিতি ক্রমেই বহুমাত্রিক রূপ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ঘিরে বিশেষায়িত বাসভবন নির্মাণের পরিকল্পনার খবর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে সম্ভাব্য বাসভবনে বাংকার ও সুড়ঙ্গ রাখার চিন্তা করা হচ্ছে। যদিও সরকারিভাবে এটিকে নিরাপত্তাজনিত প্রস্তুতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, বিশ্লেষকদের মতে এর পেছনে রাজনৈতিক বার্তাও থাকতে পারে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর স্থায়ী বাসভবন এখনো নির্ধারিত না হওয়ায় প্রশাসনিক মহলেও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সম্ভাব্য স্থান খুঁজছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনায় সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে। এদিকে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে ঘিরে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় কৌশল গ্রহণ করেছে। নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত দায়িত্ব নেওয়ার পরই চীনের প্রভাব মোকাবিলার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। এর জবাবে ঢাকায় চীনা দূতাবাস কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর তৃতীয় কোনো দেশের প্রভাব গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও নতুন মাত্রা পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সফর ও আলোচনাকে সরকার ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরলেও, পর্দার আড়ালে ভিন্ন ধরনের হিসাব-নিকাশ চলছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে পাকিস্তানও আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তাদের ভূমিকা আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখন এক ধরনের ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ নীতিতে এগোচ্ছে যেখানে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এই বহুমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয় এবং ভবিষ্যতে এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত জলসীমায় একটি চীনা জাহাজে বিষাক্ত সায়ানাইড পাওয়ার দাবি করেছে ফিলিপাইন, যা অঞ্চলটিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, Second Thomas Shoal এলাকায় নৌ অভিযানের সময় জব্দ করা উপকরণ পরীক্ষার পর সায়ানাইডের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। এই এলাকাটি ফিলিপাইনে আইয়ুনগিন শোল নামে পরিচিত এবং দীর্ঘদিন ধরে চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। ফিলিপাইনের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, এটি শুধু পরিবেশগত অপরাধ নয়, বরং একটি সম্ভাব্য নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড। তাঁদের আশঙ্কা, সায়ানাইড ব্যবহার সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করতে পারে, মাছের মজুত কমিয়ে দিতে পারে এবং প্রবাল প্রাচীরের কাঠামো দুর্বল করে ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওই প্রবাল প্রাচীর ফিলিপাইনের কৌশলগত অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে তাদের একটি নৌজাহাজ অবস্থান করছে, যা ম্যানিলার আঞ্চলিক দাবিকে শক্তিশালী করে। ফলে প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফিলিপাইনের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এই অভিযোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন South China Sea এলাকায় চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিকবার দুই দেশের নৌবাহিনী মুখোমুখি হয়েছে। ২০২৪ সালে এক সংঘর্ষে ফিলিপাইনের এক নাবিক আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। ফিলিপাইন অভিযোগ করে আসছে, চীন তাদের রসদ সরবরাহে বাধা দিচ্ছে। তবে বেইজিং এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বরং ফিলিপাইনকেই নিজেদের জলসীমা লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করছে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ চীন সাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, যার মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য পরিচালিত হয়। ২০১৬ সালে একটি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল চীনের বিস্তৃত দাবিকে অবৈধ ঘোষণা করলেও চীন সেই রায় প্রত্যাখ্যান করে। বিশ্লেষকদের মতে, সায়ানাইডের এই অভিযোগ সমুদ্রবিরোধে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক নয়, বরং পরিবেশগত নিরাপত্তাকেও এখন এই বিরোধের অংশ করে তুলছে।
ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আন্দোলনের ভেতরে ঢুকে সাধারণ মানুষকে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সম্পৃক্ততার দাবি ঘিরে আলোচনা তীব্র হয়েছে, যদিও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদ দিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। কয়েক মাস আগের সেই আন্দোলনের কিছু রহস্যময় ঘটনার বর্ণনা এখনো আলোচনায় রয়েছে। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, তেহরানের একটি শান্ত গলিতে ঝাড়ুদারের ছদ্মবেশে থাকা এক ব্যক্তি হঠাৎ আগ্নেয়াস্ত্র বের করে দুই নারীকে গুলি করেন। একই ধরনের আরেকটি ঘটনার কথা জানা গেছে উত্তরাঞ্চলের একটি শহর থেকে, যেখানে বাড়ির ছাদ থেকে এমন দৃশ্য দেখার দাবি করেছেন স্থানীয় একজন। তেহরান থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরের কাজভিন শহরেও একই ধরনের ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর একটি সূত্রের বরাতে জানা যায়, কোনো বিক্ষোভ ছাড়াই রাস্তায় এক নারী ও তার শিশুকে হত্যা করা হয়। ব্যবহৃত অস্ত্রটি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও দাবি করা হয়েছে। আরেকজন বিক্ষোভকারী জানান, পূর্ব তেহরানে একটি মিছিলে মুখোশধারী একটি দল হঠাৎ নেতৃত্ব নেয় এবং সংঘর্ষ শুরু হলে দ্রুত সরে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশল ইউরোপে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘ব্ল্যাক ব্লক’ পদ্ধতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা ইরানে অচেনা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এসব বিক্ষোভে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে মার্কিনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার কর্মী সংবাদ সংস্থা দাবি করেছে, প্রকৃত সংখ্যা সাত হাজারের বেশি হতে পারে। এদিকে ইসরায়েলের একাধিক কর্মকর্তার মন্তব্য এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সামাজিক মাধ্যমে ইরানে থাকা মোসাদ এজেন্টদের উদ্দেশে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। পাশাপাশি ইসরায়েলের এক মন্ত্রীও দাবি করেছেন, তাদের লোকজন ইরানে সক্রিয় রয়েছে। তবে এসব বক্তব্য ও অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে তথ্যযুদ্ধ, গুজব ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল—সবই সমানভাবে ভূমিকা রাখতে পারে।
হরমুজ প্রণালীতে সম্ভাব্য মার্কিন নৌ অবরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখন এক ভিন্নধর্মী বার্তা দিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ইরান। প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার বদলে গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন— ΔOBSOH>0⇒f(f(O))>f(O)\Delta O_{BSOH} > 0 \Rightarrow f(f(O)) > f(O)ΔOBSOH>0⇒f(f(O))>f(O) এই সমীকরণের মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ আরোপ করা হলে বিশ্ব তেলবাজারে এমন এক শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। কী বোঝাচ্ছে এই সূত্র বিশ্লেষকদের মতে, এই সমীকরণটি মূলত দুটি স্তরে কাজ করে। প্রথম অংশ—ΔO₍BSOH₎ > 0—ইঙ্গিত করে, হরমুজ প্রণালীতে অবরোধের মাত্রা বাড়লে তেলের দাম সরাসরি বৃদ্ধি পাবে। কারণ, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয় অংশ—f(f(O)) > f(O)—আরও গভীর সংকেত বহন করে। এখানে বোঝানো হয়েছে, তেলের দামের প্রথম ধাক্কার চেয়েও পরবর্তী ধাক্কাগুলো হবে বেশি শক্তিশালী। অর্থাৎ, বাজারে আতঙ্ক, সরবরাহ সংকট, শিপিং খরচ বৃদ্ধি এবং মজুত প্রবণতা—সব মিলিয়ে দামের ওপর বহুগুণ প্রভাব পড়বে। ‘চেইন রিঅ্যাকশন’-এর সতর্কতা গালিবাফের বার্তার মূল বিষয় হলো, এটি একটি সাধারণ মূল্যবৃদ্ধি নয়; বরং একটি অরৈখিক বা চক্রবৃদ্ধি প্রতিক্রিয়া। প্রথম ধাপে সরবরাহ কমে দাম বাড়বে। দ্বিতীয় ধাপে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে বিশ্ববাজারে। তৃতীয় ধাপে জাহাজ ভাড়া ও বিমা খরচ বেড়ে যাবে। পরবর্তী ধাপে এই সব প্রভাব একে অপরকে ত্বরান্বিত করে দামের আরও বড় উল্লম্ফন ঘটাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের পরিস্থিতিতে বাজারের আচরণ গাণিতিকভাবে সরলরেখায় না বাড়ে, বরং ধাপে ধাপে লাফিয়ে বাড়ে—যা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। রাজনৈতিক বার্তা ও কৌশল এই গাণিতিক বার্তার মাধ্যমে ইরান সরাসরি একটি রাজনৈতিক সংকেত দিতে চেয়েছে—হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের কৃত্রিম বাধা শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। গালিবাফ তার পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের উদ্দেশে তেলের বর্তমান মূল্য উপভোগ করার পরামর্শ দিয়ে ইঙ্গিত দেন, পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধের হুমকি দেন। যদিও পরবর্তীতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, এই পদক্ষেপ আংশিকভাবে প্রয়োগ করা হতে পারে। সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই সংকট বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে— তেলের দাম দ্রুত অস্বাভাবিক উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নতুন করে বাড়তে পারে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে জ্বালানি নির্ভর দেশগুলো মারাত্মক চাপে পড়বে সব মিলিয়ে, ইরানের এই ‘গাণিতিক হুঁশিয়ারি’ শুধু প্রতীকী নয়—বরং সম্ভাব্য এক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝড়ের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
প্রায় ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির সুর বাজলেও, যুদ্ধের প্রকৃত ফলাফল বলছে ভিন্ন কথা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে দুর্বল করার যে ছক কষেছিলেন, তা কার্যত বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। দৃশ্যত কোনো সামরিক বিজয় ছাড়াই ইরানের দেওয়া ১০ দফা শর্ত মেনে নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন ট্রাম্প। একসময়ের ‘পাথর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি এখন ফিকে হয়ে গেছে মার্কিন নৌবহরের নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেওয়ার মধ্য দিয়ে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্য মার্কিন মেরিন সেনাদের কড়া পাহারার হুমকি উপেক্ষা করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন তেহরানের হাতে। কোন জাহাজ চলবে আর কোনটি থামবে, তা নির্ধারিত হচ্ছে ইরানের ইশারায়। এমনকি আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে এখন ডলারের বদলে চাইনিজ ইউয়ানে টোল দিতে হচ্ছে, যা মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্যের মুখে এক বড় চপেটাঘাত। জ্বালানি সরবরাহের এই নিয়ন্ত্রণ ইউরোপে ডিজেলের দাম এক ধাক্কায় ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা প্রমাণ করে ইরান এখন পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী 'জ্বালানি অস্ত্র' হাতে পেয়েছে। অটুট কমান্ড ব্যবস্থা ও সামরিক সক্ষমতা ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও সিআইএ-র একের পর এক গুপ্তহত্যা এবং অনুপ্রবেশের চেষ্টা সত্ত্বেও ইরানের কমান্ড কাঠামো ভেঙে পড়েনি। ইরাক বা সিরিয়ার মতো সরকার পতনের যে দুঃস্বপ্ন পশ্চিমা বিশ্ব দেখেছিল, তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। বরং ১৩ হাজার বিমান হামলার পরও ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন আরও দুর্ভেদ্য। মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো নিয়মিত ইরানের প্রতিরোধের মুখে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা মোসাদ প্রধানের ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’ তত্ত্বকে ভুল প্রমাণিত করেছে। আরব বিশ্বে নতুন সমীকরণ ও আব্রাহাম চুক্তির মৃত্যু এই যুদ্ধ আরব জনগণের মনস্তত্ত্বে আমূল পরিবর্তন এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তথাকথিত ‘আব্রাহাম চুক্তি’ এখন এক অলীক কল্পনা বা হ্যালুসিনেশন মাত্র। মিশর, জর্ডান থেকে শুরু করে বাহরাইন পর্যন্ত সাধারণ মানুষ এখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে ইরানকে সমর্থনের কাতারে দাঁড়িয়েছে। সিরিয়ার রাজপথে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মিছিলে ফিলিস্তিনি পতাকার সাথে যে ক্ষোভ দেখা গেছে, তা আরব বসন্তের নতুন কোনো স্ফুলিঙ্গের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভবিষ্যৎ কোন দিকে? নেতানিয়াহু ইরানকে ধ্বংস করার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার বিপরীতে এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া-সুন্নি, ধনী-দরিদ্র এবং বিভিন্ন আরব জাতিকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। ট্রাম্প হয়তো সাময়িক ‘বিজয়’ ঘোষণা করে বিদায় নেবেন, কিন্তু ভূ-রাজনীতির চালকের আসনে ইরান যে স্থায়ীভাবে বসে গেছে, তা এখন আন্তর্জাতিক মহলে অনস্বীকার্য এক সত্য।
যুক্তরাজ্যের লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজ-কে লক্ষ্য করে হামলার আহ্বান ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। রাশিয়ার কিছু গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও বিশ্লেষক দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-কে ওই সেতুতে হামলার আহ্বান জানিয়েছেন বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি স্টার জানিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনে রাশিয়ার দখলে থাকা একটি সেতু ধ্বংসের ঘটনায় এই প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দাবি করা হয়েছে, ওই হামলায় ব্রিটিশ প্রযুক্তির ভারী ড্রোন ব্যবহৃত হয়েছিল। যদিও ঘটনাটি গত বছরের মার্চে ঘটলেও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। রুশ বিশ্লেষক ভ্লাদিমির কর্নিলভ অভিযোগ করেন, রুশ ভূখণ্ডে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ব্রিটেনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে স্বীকার করা হচ্ছে, যা ‘উদ্বেগজনক’। তবে উল্লেখ্য, যে সেতুটি ধ্বংস করা হয়েছিল সেটি আন্তর্জাতিকভাবে ইউক্রেনের ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃত, যদিও তা রাশিয়ার দখলে ছিল। ইউক্রেনীয় বাহিনীর দাবি, তাদের লক্ষ্য ছিল সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এদিকে রাশিয়ার আরেকটি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলোর এমন পদক্ষেপের জবাবে ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রগুলো’ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে—যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য বাস্তব সামরিক পদক্ষেপে রূপ নিলে তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আহ্বান বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত রাশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনার ঘোষণা আসেনি।
বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক উত্তেজনা নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে—যেখানে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক উন্নয়নশীল দেশ ক্রমশ চীন-নির্ভরতার দিকে ঝুঁকছে। ব্লুমবার্গ-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতির প্রেক্ষাপটে এই প্রবণতা আরও ত্বরান্বিত হতে পারে। বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে চীনা ঋণ ও সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই ধারণা কিছুটা পাল্টে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইরান-কে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় পাকিস্তান-এর উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। অতীতে জ্বালানি সংকটে পড়া দেশটি এবার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে চীন থেকে আমদানি করা সস্তা সৌর প্যানেল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারকে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির বিপুলসংখ্যক পরিবার এখন সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করছে, যা জ্বালানি সংকটের ধাক্কা কিছুটা কমিয়েছে। একইভাবে নেপাল-এ সস্তা বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে সহায়তা করছে। এসব ক্ষেত্রেই চীনা প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়। তবে এই নির্ভরতা সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয় বলেও সতর্ক করা হয়েছে। চীন তার সরবরাহ শৃঙ্খল বিশেষ করে বিরল খনিজ ও প্রযুক্তি খাতে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে পারে, এমন আশঙ্কাও রয়েছে। বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, যদি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য থেকে কৌশলগতভাবে সরে যান বা হরমুজ প্রণালি-সংকট সমাধানে সক্রিয় না হন, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে একটি বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে তারা কি যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর ভরসা রাখবে, নাকি চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার দিকে আরও ঝুঁকবে? বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু আঞ্চলিক নয়; বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বাড়তে থাকা সংঘাতের প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় ধরনের প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ভারতীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান মারসেলাস ইনভেস্টমেন্টসের বিশ্লেষক সৌরভ মুখার্জি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, চীন ধীরে ধীরে ইরানের সঙ্গে কৌশলগতভাবে এগিয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতে দুই দেশ একসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তার মতে, এতে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানকে কঠোর ভাষায় হুমকি দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে তীব্র সমালোচনা করেন। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল স্বল্পমেয়াদি উত্তেজনা নয়; বরং এটি জ্বালানি ও কৌশলগত আধিপত্যকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার অংশ। এনডিটিভি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সৌরভ মুখার্জি বলেন, এই সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম এবং এটি কয়েক মাস পর্যন্ত গড়াতে পারে। অন্যদিকে, কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর বিশ্লেষক আবদুল্লাহ বাবুদ মনে করেন, উপসাগরীয় তেলের ওপর চীন-এর নির্ভরতা এখন কৌশলগত অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক হিসেবে চীনের জন্য হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ও প্রবাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন ইতোমধ্যে ইরান থেকে কম দামে তেল আমদানি করছে এবং ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে বন্দর ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে বেইজিং। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তেলের দাম বৃদ্ধি, মুদ্রার চাপ এবং সুদের হার বৃদ্ধির মতো অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে দেশটি। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এই প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যার প্রভাব আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
ইসলামাবাদ ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে আখ্যায়িত করেছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তেহরান কখনোই ইসলামাবাদের প্রস্তাবিত শান্তি আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেনি। শনিবার (৪ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি এই স্পষ্টীকরণ প্রদান করেন। এর আগে মার্কিন প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ (WSJ) এক প্রতিবেদনে দাবি করেছিল যে, পাকিস্তান ও আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা ‘ব্যর্থ’ হয়েছে এবং ইরান আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। মার্কিন মিডিয়ার এমন প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ইরানের অবস্থানকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছে। আমরা পাকিস্তানের প্রচেষ্টার জন্য তাদের প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ এবং কখনোই ইসলামাবাদে আলোচনায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানাইনি। "আরাগচি আরও জোর দিয়ে বলেন, ইরান মূলত তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই ‘অবৈধ যুদ্ধের’ একটি স্থায়ী এবং চূড়ান্ত অবসান চায়। আলোচনার ক্ষেত্রে সেই শর্তাবলিই ইরানের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিজের পোস্টের শেষে তিনি উর্দুতে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ লিখে পাকিস্তানের জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন এবং ইরানি নাগরিকদের পাকিস্তানি পতাকা হাতে উল্লাস করার একটি ভিডিও শেয়ার করেন। ইরানের এই দ্রুত স্পষ্টীকরণকে স্বাগত জানিয়েছেন পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার। আরাগচির পোস্টের জবাবে তিনি একে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা’ হিসেবে অভিহিত করেন। পাশাপাশি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আনদ্রাবি সংবাদমাধ্যমগুলোকে কেবল দাপ্তরিক বিবৃতির ওপর নির্ভর করার পরামর্শ দিয়েছেন এবং ভিত্তিহীন জল্পনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং চীনের সাথে সুসম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ইসলামাবাদ সরাসরি আলোচনার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। গত সপ্তাহে একটি চতুর্ভুক্তি বৈঠকে ইসলামাবাদ ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, আগামী দিনগুলোতে তাদের মাটিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন গণমাধ্যমের এই ধরনের প্রতিবেদন মূলত শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার একটি অপচেষ্টা হতে পারে, যা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সময়োপযোগী বিবৃতিতে স্পষ্ট হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে জিসিসি (উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ) দেশগুলোর অংশগ্রহণ অপরিহার্য বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হামাদ বিন জাসিম বিন জাবের আল থানি। সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার খবর ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে তিনি এই কড়া হুঁশিয়ারি দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে আল থানি বলেন, "যেখানে অঞ্চলের ভবিষ্যৎ মানচিত্র আঁকা হচ্ছে, সেখানে জিসিসি রাষ্ট্রগুলোর অনুপস্থিত থাকার কোনো সুযোগ নেই।" তিনি স্পষ্ট করেন যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে এই দেশগুলোকে আলোচনার টেবিলে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মতে, এই প্রণালীটি কোনো পক্ষই রাজনৈতিক দর কষাকষি বা চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। এটি যেকোনো পরিস্থিতিতে শর্তহীনভাবে উন্মুক্ত রাখতে হবে। আল থানি সতর্ক করে বলেন, "হরমুজ প্রণালীর ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যেকোনো চেষ্টা বা একে জিম্মি করার প্রচেষ্টা কেবল উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক সরাসরি হুমকি।"
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক পরিণতির খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ জামিল লিমনের (২৭) মরদেহ উদ্ধার করা হলেও, পুলিশ ধারণা করছে নাহিদা বৃষ্টিকেও (২৭) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। অভিযুক্ত ঘাতক ও লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়ার ফ্ল্যাটে ‘প্রচুর রক্ত’ পাওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছে, বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভবত আর কখনোই সম্ভব হবে না। নিহত বৃষ্টির বড় ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘১০ টাম্পা বে নিউজ’-কে জানান, শুক্রবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারীরা বাংলাদেশে তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, লিমন ও হিশামের শেয়ার করা ফ্ল্যাটে যে পরিমাণ রক্ত পাওয়া গেছে, তা থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে বৃষ্টি আর বেঁচে নেই। পুলিশের আশঙ্কা, হত্যার পর মরদেহটি সম্ভবত ছিন্নবিচ্ছিন্ন বা টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে, যার ফলে এটি খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। গত শুক্রবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশ থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই সকাল ৯টার দিকে ইউএসএফ ক্যাম্পাসের কাছে লেক ফরেস্ট এলাকায় অভিযুক্ত হিশাম আবুগারবিয়ার বাড়িতে অভিযান চালায় হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়। পুলিশ হিশামের বাড়িতে পৌঁছালে তিনি নিজেকে ঘরের ভেতর তালাবদ্ধ করে রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ‘সোয়াট’ (SWAT) তলব করা হয়। প্রায় ২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির পর হিশাম আত্মসমর্পণ করেন। তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা এবং অবৈধভাবে মরদেহ সরানোর মতো ছয়টি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হিশাম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। তিনি লিমনের রুমমেট হিসেবে একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। অন্যদিকে, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি গবেষণারত নাহিদা বৃষ্টি গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন। লিমনের সাথে তার আগে প্রেমের সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে ছিল না বলে জানিয়েছেন বৃষ্টির পরিবার। তদন্তকারীরা লিমনের মৃত্যু নিশ্চিত করলেও বৃষ্টির নিখোঁজ রহস্য ও তাকে হত্যার নৃশংসতা এখন পুরো ফ্লোরিডা ও বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া ফেলেছে।