ইসরায়েলি পার্লামেন্টে পাস হওয়া ফিলিস্তিনিদের জন্য বিশেষ মৃত্যুদণ্ড আইনের কঠোর সমালোচনা করে একে 'বর্ণবাদের পথে আরও এক ধাপ' হিসেবে অভিহিত করেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে তৈরি এই আইন বিচারব্যবস্থাকে চরম বৈষম্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেয়া এক বিবৃতিতে সানচেজ সরাসরি এই পদক্ষেপের নিন্দা জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই আইনটি কেবলমাত্র অ-ইহুদি বা ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রয়োগের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যা সরাসরি মানবাধিকারের লঙ্ঘন। স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রীর মতে, একই অপরাধের জন্য ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের আলাদা শাস্তির বিধান কোনোভাবেই ন্যায়বিচার হতে পারে না। তিনি একে "অপ্রতিসম ব্যবস্থা" হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, "একই অপরাধ কিন্তু ভিন্ন শাস্তি—এটি বিচার নয়। এটি বর্ণবাদের (Apartheid) দিকে আরও একটি সুস্পষ্ট পদক্ষেপ। বিশ্ববাসী এই পরিস্থিতিতে চুপ করে থাকতে পারে না।" আন্তর্জাতিক মহলে সানচেজের এই মন্তব্য বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে যেখানে সামরিক আদালতে ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, অথচ একই ধরণের অপরাধে ইসরায়েলিদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। স্পেনের এই অবস্থানকে মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনিদের ওপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের লক্ষ্যে ইসরায়েলের বিতর্কিত নতুন আইন পাসের পদক্ষেপে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জার্মানি এই পদক্ষেপকে ‘বৈষম্যমূলক’ এবং ‘পশ্চাৎপদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মঙ্গলবার ব্রাসেলসে এক সংবাদ সম্মেলনে ইইউর মুখপাত্র আনোয়ার এল আনোউনি বলেন, "ইসরায়েলের এই মৃত্যুদণ্ড বিলটি আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইনের এই বৈষম্যমূলক প্রকৃতি স্পষ্টতই একটি পশ্চাৎপদ পদক্ষেপ।" এদিকে, ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে এই বিল পাসের সিদ্ধান্তে গভীর দুঃখ ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জার্মানি। জার্মান সরকারের এক মুখপাত্র জানান, তারা নীতিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, এই আইনটি কেবল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ফিলিস্তিনিদের ওপর একচেটিয়াভাবে প্রয়োগ করার সম্ভাবনা রয়েছে, যা চরম উদ্বেগের বিষয়। ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েল সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর অবস্থানের কথা বললেও, এমন আইন কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে বার্লিন।
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে অধিকৃত পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ভয়াবহ সংঘাত ও বর্বরতা চালাচ্ছে কট্টরপন্থী ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত এক মাসে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ‘ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্ট রেজিস্ট্যান্স কমিশন’-এর প্রধান মুয়াইয়াদ শাবান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ‘ওয়াফা’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক মাসে বসতিস্থাপনকারীরা মোট ৪৪৩টি হামলা চালিয়েছে। শাবান জানিয়েছেন, অঞ্চলের ডেমোগ্রাফিক বা জনতাত্ত্বিক চিত্র বদলে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থেকেই অশান্ত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এই হামলাগুলো চালানো হচ্ছে। গত এক মাসের ভয়াবহ কিছু চিত্র: প্রাণহানি: বসতিস্থাপনকারীদের সরাসরি হামলায় অন্তত ৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। জোরপূর্বক উচ্ছেদ: ৬টি বেদুইন সম্প্রদায়কে তাদের ভিটেমাটি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ৫৮টি পরিবারের ২৫৬ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যার মধ্যে ৭৯ জন নারী এবং ১৬৬ জন শিশু রয়েছে। অবৈধ দখলদারি: ফিলিস্তিনি ভূমিতে অন্তত ১৪টি নতুন অবৈধ বসতি স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছে কট্টরপন্থীরা। নাশকতা ও অগ্নিসংযোগ: ১৮টি অগ্নিসংযোগসহ অন্তত ১২৩টি নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড রেকর্ড করা হয়েছে। ধর্মীয় স্থাপনায় আঘাত: দুমার মুহাম্মদ ফাইয়াদ মসজিদ এবং মাজদাল বানি ফাদিল মসজিদে অগ্নিসংযোগের চেষ্টাসহ অন্তত ৩টি ধর্মীয় স্থানে হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া আল-আকসা মসজিদে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে কড়াকড়ি ও উস্কানিমূলক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মহলের নজর যখন ইরান যুদ্ধের দিকে, ঠিক তখনই পরিকল্পিতভাবে পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার এই আগ্রাসন চালানো হচ্ছে।
ইরানের মিনাব শহরে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে বর্বরোচিত হামলায় ১৭০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শজারেহ তাইয়্যেবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংঘটিত এই ভয়াবহ হামলাকে 'হৃদয়বিদারক ও বিভীষিকাময়' বলে আখ্যায়িত করেছেন তিনি। জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে দেওয়া এক বক্তব্যে তুর্ক বলেন, "এই হামলার ঘটনাটি যে কোনো মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক ও ঘৃণার সৃষ্টি করে।" তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, যারা এই হামলার পেছনে দায়ী, তাদের বিরুদ্ধেই এর সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করার দায়ভার বর্তায়। হামলার পর মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পুরো বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। ভলকার তুর্ক এই তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার এবং প্রাপ্ত ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নিরপরাধ শিশুদের ওপর চালানো এই নৃশংসতার বিচার নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।
ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি-র একটি সাম্প্রতিক ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এখন থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা সরাসরি যুদ্ধকালীন বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইআরজিসি-র তেহরান শাখার সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা রহিম নাদালি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। রহিম নাদালি জানান, ‘ফর ইরান’ নামক একটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় শিশুদের টহল দেওয়া, চেকপয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং লজিস্টিক সহায়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছে। আইআরজিসি-র দাবি, অনেক কম বয়সী কিশোররা স্বেচ্ছায় যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করায় তাদের প্রবল দাবির মুখে এই বয়সসীমা কমিয়ে ১২ বছরে আনা হয়েছে। তবে তেহরানের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে বিশ্ব সম্প্রদায়। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী শিশুদের সামরিক কাজে ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও, ইরান সেই অঙ্গীকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলো বলছে, শিশুদের এমন বিপজ্জনক কাজে ব্যবহার তাদের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে। অতীতেও ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে শিশুদের ব্যবহার এবং তাদের ওপর নির্যাতনের একাধিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। বর্তমানে ইরানে কয়েক মিলিয়ন শিশু শ্রমিক মানবেতর জীবন যাপন করছে, তার ওপর এই নতুন সামরিক ডিক্রি শিশুদের ভবিষ্যৎকে আরও অন্ধকারে ঠেলে দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বর্তমান ইরানে বারুদ আর রক্তে মিশে একাকার হয়ে গেছে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন। গত তিন সপ্তাহে তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর উপর্যুপরি বিমান হামলায় হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তু বিধ্বস্ত হয়েছে। কিন্তু এই সামরিক অভিযানের সমান্তরাল শিকার হচ্ছেন নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিক। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। কাজের মাঝেই থেমে গেল পারাশতেশের জীবন তেহরানের আপাদানা এলাকায় একটি ওষুধের দোকানে কাজ করতেন তরুণী পারাশতেশ দাহাঘিন। পাশের একটি তথ্যপ্রযুক্তি ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়লে ঘটনাস্থলেই তিনি প্রাণ হারান। তার ভাই পুরিয়া আবেগঘন এক বার্তায় জানান, বিপদের কথা জেনেও পারাশতেশ দোকান ছাড়েননি। তার শেষ কথা ছিল, "অসুস্থ আর বৃদ্ধদের জন্য আমাকে থাকতেই হবে।" আজ সেই দোকানের সামনে কেবল মোমবাতি আর ফুলের স্তূপ পড়ে আছে। ২৬ বছর বয়সী বেরিভান মোলানি ছিলেন একজন অনলাইন উদ্যোক্তা ও লাইফস্টাইল ব্লগার। নিজের শহরকে ভালোবেসে তেহরানে ফেরার একদিন পরেই ১৭ মার্চের হামলায় নিজ বিছানায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন তিনি। তার পরিবার জানতও না যে তাদের বাড়ির ঠিক উল্টোদিকেই বাস করেন ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রী। লক্ষ্যবস্তু মন্ত্রী হলেও প্রাণ দিতে হলো বেরিভান ও তার প্রতিবেশীদের। যুদ্ধের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হয়েছে মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক স্কুলে। মার্কিন হামলায় সেখানে ৪৮টি শিশু ও ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক প্রাণ হারিয়েছেন বলে মানবাধিকার সংস্থা 'হেনগাও' নিশ্চিত করেছে। এছাড়া মাত্র তিন বছর বয়সী শিশু এইলমাহ্ বিল্কিও বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পরপারে চলে গেছে। এইচআরএএনএ-র তথ্যমতে, এ পর্যন্ত নিহত ১৪০০ বেসামরিক নাগরিকের মধ্যে ১৫ শতাংশই শিশু। ভেঙে পড়া চিকিৎসা ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, অন্তত ২০টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে, যাতে ৯ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন। তেহরানের ১৭ তলা গান্ধী হাসপাতাল থেকে শুরু করে বুশেহারের শিশু হাসপাতাল—কোনোটিই রেহাই পায়নি। বুশেহারে ইনকিউবেটরে থাকা নবজাতকদের সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির প্রতিনিধি ভিনসেন্ট কাসার্ড স্পষ্ট জানিয়েছেন, "বেসামরিক অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা।" অথচ ইরানে বর্তমানে কোনো বম্ব-শেল্টার নেই, নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রী। ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকায় ভেতরের সব খবর বাইরে আসছে না, এমনকি ইরাকি ইন্টারনেট ব্যবহারের দায়ে সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে প্রাণ হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, অন্যদিকে আকাশ থেকে ঝরে পড়া মরণঘাতী বোমা—ইরানের সাধারণ মানুষের জন্য পৃথিবীটা যেন এক জীবন্ত নরক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় তথাকথিত 'যুদ্ধবিরতি' চলাকালীন সময়েও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬৮৯ জন ফিলিস্তিনি। গত অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদে গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মাঠ পর্যায়ের সংবাদকর্মীরা এই ভয়াবহ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে কেবল প্রাণহানিই ঘটেনি, বরং ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় আহত হয়েছেন আরও ১ হাজার ৮৬০ জন ফিলিস্তিনি। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও গাজার সাধারণ মানুষের ওপর এই নিরবচ্ছিন্ন হামলা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। মানবিক পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় গাজার চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতির তোয়াক্কা না করেই ফের হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। বুধবার ভোরে মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় অন্তত দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এছাড়া পৃথক এক হামলায় তিন শিশুসহ আরও চারজন আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি চিকিৎসা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা আনাদোলু এ তথ্য জানিয়েছে। চিকিৎসা সূত্রগুলো জানায়, নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে ভোরের আলো ফোটার আগেই একটি ইসরায়েলি ড্রোন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুই ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। দিনের অন্য এক ঘটনায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে চারজন গুরুতর আহত হন, যাদের মধ্যে তিনটি শিশু রয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ইসরায়েলি বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই লঙ্ঘন করছে। ১৮ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এই যুদ্ধবিরতি চলাকালীন ইসরায়েলি হামলায় ৬৭৭ জন নিহত এবং ১,৮১৩ জন আহত হয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া ইসরায়েলি আগ্রাসনে এ পর্যন্ত ৭২,০০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ১,৭২,০০০ মানুষ। দীর্ঘস্থায়ী এই হামলায় গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে, যা উপত্যকাটিকে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান এবং শান্তি প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও ইসরায়েলি বাহিনীর এমন ধারাবাহিক হামলা গাজায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে।
ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয় কাটাতে এবং ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব রক্ষায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের অর্থনৈতিক, সামরিক ও আর্থিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেস্কা আলবানিজ। মঙ্গলবার জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েলি পদক্ষেপ রুখতে 'তীব্র হস্তক্ষেপ' (massive intervention) ছাড়া গাজার মানুষকে বাঁচানো সম্ভব নয়। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মানবাধিকার বিষয়ক এই বিশেষ দূত প্রশ্ন তোলেন, "কীভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলো এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে?" তিনি মনে করিয়ে দেন যে, যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত কোনো রাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র হস্তান্তর না করা প্রতিটি দেশের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। আলবানিজ উল্লেখ করেন, গাজায় কথিত যুদ্ধবিরতি চললেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি, বরং আরও অবনতি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় আরও অন্তত ৬৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়া অসহায় মানুষদের ওপরও ক্রমাগত হামলা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, গাজায় ফিলিস্তিনিদের মুছে ফেলার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তার প্রভাব লেবানন ও ইরানেও ছড়িয়ে পড়ছে। জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে উপস্থাপিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে ফ্রান্সেস্কা আলবানিজ ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক ফিলিস্তিনিদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্দিদের প্রচণ্ড মারধর, হাড় ভেঙে দেওয়া, দীর্ঘক্ষণ চোখ বেঁধে রাখা, ঘুম ও খাবার থেকে বঞ্চিত করা এবং এমনকি যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে ১৮ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে শিশুরাও রয়েছে। বন্দি অবস্থায় প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ইসরায়েলি সমালোচনার জবাবে আলবানিজ সপাটে বলেন, "ইসরায়েল যা খুশি বলতে পারে, কিন্তু তাদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হবে। তাদের নেতাদের বিচার হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে হওয়া উচিত।" তিনি বিশ্ব নেতাদের সমালোচনা করে বলেন, অনেক দেশের সরকার ও মন্ত্রীরা নীরব থেকে কার্যত ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের 'লাইসেন্স' দিয়ে রেখেছে। গাজায় বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি 'পরিকল্পিত এবং ইচ্ছাকৃত গণহত্যা' হিসেবে অভিহিত করেন। সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড, আনাদোলু এজেন্সি।
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রানচেসকা আলবানিজ। সোমবার জেনেভায় মানবাধিকার পরিষদে তিনি একটি নতুন প্রতিবেদন পেশ করে বলেন, “ইসরায়েলকে কার্যত ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।” প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী অন্তত ১৮,৫০০ ফিলিস্তিনিকে, যার মধ্যে শিশুও রয়েছে, গ্রেপ্তার করেছে। এ সময় অন্তত ১০০ জন বন্দি হেফাজতে মারা গেছেন এবং প্রায় ৪,০০০ জন ‘জোরপূর্বক নিখোঁজ’ হয়েছেন। আলবানিজ বলেন, প্রতিবেদনটিতে ইসরায়েলের “ব্যাপক ও পদ্ধতিগত নির্যাতন এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক পরিবেশ সৃষ্টির” বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বিভিন্ন দেশের সরকার এবং মন্ত্রীরা ইসরায়েলকে এই নির্যাতন চালানোর জন্য প্ররোচনা দিচ্ছে। প্রতিবেদনটি উল্লেখ করে, হাজার হাজার ফিলিস্তিনি কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক করা হয়েছে এবং অমানবিক পরিস্থিতিতে রাখা হয়েছে। আলবানিজের দাবি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষা করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সূত্র: আল-জাজিরা
ইরানের মিনাব শহরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭০ জন স্কুলশিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু বিশ্ববিবেককে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—এই হামলা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং ছিল সুপরিকল্পিত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত এই ধ্বংসযজ্ঞের দায় মার্কিন প্রশাসন অস্বীকার করলেও খোদ ওয়াশিংটনেই এখন অস্থিরতা তুঙ্গে। ক্যাপিটল হিলের জনমত জরিপ বলছে, ৭৪ শতাংশ মার্কিনি এই যুদ্ধের বিপক্ষে, যার মধ্যে ৫২ শতাংশ রিপাবলিকানও রয়েছেন। অথচ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্থলসেনা মোতায়েন নিয়ে রহস্যজনক নীরবতা পালন করছেন। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ঘটনাকে ‘ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, আরক শহরে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নবজাতকসহ অসংখ্য বেসামরিক নাগরিক নিহতের খবর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছে। যুদ্ধের মাঝপথেই যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টার-টেররিজম সেন্টারের ডিরেক্টর জো কেন্টের পদত্যাগ ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কেন্ট সরাসরি জানিয়েছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি ছিল না; বরং ইসরায়েলের স্বার্থেই এই যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, পারস্য উপসাগরে মার্কিন উপস্থিতি উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে। এদিকে, হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ মন্দার দ্বারপ্রান্তে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালের এই সংঘাত ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। জাতিসংঘ সূত্রে জানা গেছে, এই অভিযানে এ পর্যন্ত কয়েক মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
দখলকৃত পশ্চিম তীরের হেব্রনে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তিন ফিলিস্তিনি নারী নিহত হয়েছেন। বুধবার রাতে ইরান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ সরাসরি হেব্রনের একটি বিউটি স্যালনের ওপর এসে পড়লে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা 'ওয়াফা'র তথ্যমতে, নিহতরা হলেন ১৭ বছর বয়সী কিশোরী মাইস গাজী মুসালামেহ, ৫০ বছর বয়সী সাহেরা রিজক মুসালামেহ এবং ৩৬ বছর বয়সী আমাল সুবহি আবদেল করিম মুতাওয়া। ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি ধাতব ক্যারাভানে নির্মিত স্যালনের ওপর পড়লে ভেতরে থাকা আরও ১৩ জন নারী গুরুতর আহত হন। ইসরায়েলের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সুরক্ষিত শেল্টার বা বাঙ্কার থাকলেও, পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জন্য এমন কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। ঘিঞ্জি পরিবেশ এবং অস্থায়ী বসতিতে বসবাসের কারণে আকাশপথের যেকোনো হামলায় চরম ঝুঁকিতে থাকেন এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। এই বিয়োগান্তক ঘটনাটি যুদ্ধের ডামাডোলে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের চরম নিরাপত্তাহীনতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় গত অক্টোবর মাসে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর ওপর হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল। গাজা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১১ জন ফিলিস্তিনি পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। হামাস পরিচালিত এই পুলিশ বাহিনী বর্তমানে গাজার বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করছে। ইসরায়েলের এই হামলাকে যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং গাজার বেসামরিক শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। গাজা সরকারের মিডিয়া অফিসের পরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ২ হাজার ৮০০-এর বেশি পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর থেকেও কয়েক ডজন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই হামলার মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনাটি ঘটে গত রবিবার মধ্য গাজার জাওয়াইদা এলাকায়। সেখানে একটি পুলিশ ভ্যানে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৯ জন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অবশ্য দাবি করেছে, তারা হামাসের একটি 'সশস্ত্র সেল'কে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যারা হামলার পরিকল্পনা করছিল। তবে এই দাবির সপক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেহাম ওদা বলেন, "এই হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল একটি পরিষ্কার বার্তা দিতে চায় যে, গাজায় হামাসের কোনো ধরণের নিরাপত্তা বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ তারা মেনে নেবে না। মূলত বেসামরিক শাসনব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়াই এসব হামলার লক্ষ্য।" অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই পুলিশ বাহিনীর ওপর এই আক্রমণ এক নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। হামাস চায় তাদের ১০ হাজার পুলিশ সদস্যকে নতুন প্রস্তাবিত নিরাপত্তা বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে, কিন্তু ইসরায়েল সরাসরি এর বিরোধিতা করছে। গাজার সাধারণ মানুষ এই পুলিশ বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল। গাজা সিটির একটি তাবু শিবিরের বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল-আরাইশা বলেন, "পুলিশ না থাকলে এখানে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হতো। তারা অপরাধ দমনে এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় কাজ করছে। তাদের ওপর এই হামলা মানে আমাদের নিরাপত্তার ওপর হামলা।" গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, অক্টোবর মাসের যুদ্ধবিরতির পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে ও হামলায় অন্তত ৬৭০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মহল এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতা এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
উপত্যকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক শিশুসহ অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান এবং অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। মঙ্গলবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি চলন্ত যানবাহনকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, হামলায় একটি সাদা রঙের জিপ পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ইয়াহিয়া আবু লাবদা, এহসান হামেদ আল-সামিরি এবং তামের বারাকা নামে এক শিশু নিহত হয়। এই হামলায় আরও ১২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ১০ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৬৭৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৯৯ জনই শিশু। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ যুদ্ধে মোট নিহতের সংখ্যা ৭২,২৫০ ছাড়িয়ে গেছে। গাজায় হামলার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও দমন-পীড়ন জোরদার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। সোমবার দিবাগত রাত ও মঙ্গলবার ভোরে হেবরন (আল-খলিল), রামাল্লাহ এবং নাবলুসের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়েক ডজন ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। হেবরনের আল-আরউব শরণার্থী শিবিরে হানা দিয়ে অন্তত ১৫ জন যুবককে গ্রেপ্তার করেছে ইসরায়েলি সেনারা। রামাল্লাহর আল-আমামারি শরণার্থী শিবিরে অভিযানের সময় শব্দবোমা (stun grenades) ব্যবহার করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয় এবং ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এদিকে নাবলুসের বেইতা এলাকার কাছে আল-ইয়াতমাউইতে ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়িতে হামলা চালিয়েছে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলার শিকার পরিবারগুলোর সহায়তায় আসা অ্যাম্বুলেন্স চলাচলেও বাধা দেয় তারা। এছাড়া জোসেফের সমাধির কাছেও ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করে উগ্রবাদী বসতি স্থাপনকারীরা। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, গাজা এবং পশ্চিম তীরে একই সঙ্গে সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মহলের যুদ্ধবিরতির আহ্বান সত্ত্বেও ইসরায়েলি অভিযান অব্যাহত থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।
ইরানে সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে এক ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করেছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, এই হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২০২ জন শিশু এবং ২২৩ জন নারী প্রাণ হারিয়েছেন। মর্মান্তিক এই নিহতের তালিকায় রয়েছেন তিনজন অন্তঃসত্ত্বা মা-ও। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিহত শিশুদের মধ্যে ১২ জনের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। এই বর্বরোচিত হামলায় সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় ওই অঞ্চলে বর্তমানে চরম উত্তেজনা ও শোকের ছায়া বিরাজ করছে।
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলা ও ‘গণহত্যা’ থামার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। গত শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত গাজা সিটি এবং খান ইউনিসে নতুন করে ইসরায়েলি হামলায় আরও অন্তত ৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আঞ্চলিক উত্তজনা এবং ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে গাজার মানবিক পরিস্থিতি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গাজা সিটি এবং খান ইউনিসের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় রাতভর বিমান ও স্থল হামলা চালায় ইসরায়েলি সেনারা। স্থানীয় হাসপাতাল সূত্রগুলো নিহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেছে। এছাড়া খান ইউনিসে একটি পুলিশ পোস্টে হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ১০ অক্টোবর ঘোষিত তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ ইসরায়েল শত শত বার লঙ্ঘন করেছে। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন এবং যুদ্ধবিরতির নাটক শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় মোট নিহতের সংখ্যা ৬৫৫ ছাড়িয়ে গেছে। ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যেই গাজায় আঘাত হেনেছে তীব্র ধূলিঝড়। এতে তাঁবুতে বসবাসকারী হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনির কষ্ট কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। জীর্ণ তাঁবুর ভেতরে ধুলোবালি ঢুকে পড়ায় বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। রাফাহ সীমান্ত পারাপার বন্ধ থাকায় হাজার হাজার আহত ফিলিস্তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে যেতে পারছেন না। ১২ বছর বয়সী হামদির মতো অনেক শিশু মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে পঙ্গুত্বের পথে। হামদির বাবা আমের হামাদি আল জাজিরাকে বলেন, "আমার ছেলে প্রতিদিন অন্য শিশুদের ফুটবল খেলা দেখে কাঁদে আর জিজ্ঞেস করে— বাবা, আমি কেন হাঁটতে পারি না?" চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, জরুরি অস্ত্রোপচার করা গেলে হামদি হয়তো আবার হাঁটতে পারতেন, কিন্তু সীমান্ত বন্ধ থাকায় তার জীবন এখন অনিশ্চিত। দুই সপ্তাহ আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যে শুরু হওয়া সরাসরি সংঘাত গাজা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সীমান্ত বন্ধ থাকায় খাদ্য ও জ্বালানি সংকট চরমে পৌঁছেছে। রান্নার গ্যাসের অভাবে মানুষ প্লাস্টিক ও কাঠ পুড়িয়ে রান্না করতে বাধ্য হচ্ছে, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ করেছে, গাজায় নারীদের বাঁচার ন্যূনতম পরিবেশ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এবং এটি যুদ্ধের একটি পরিকল্পিত কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরায়েল। গাজাবাসীর বর্তমান অবস্থাকে মানবিক সহায়তাকারীরা ‘নরকযন্ত্রণা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ-এর ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’ (No Quarter) এবং ‘কোনো দয়া দেখানো হবে না’ (No Mercy) মর্মে দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা। শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হেগসেথ বলেন, "আমরা চাপ অব্যাহত রাখব, আমরা এগিয়ে যাব। আমাদের শত্রুদের জন্য কোনো ছাড় নেই, কোনো দয়া নেই।" তার এই মন্তব্যের পরই বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা নেই পেন্টাগনের আন্তর্জাতিক আইন এবং হেগ কনভেনশন অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মসমর্পণকারী বা আহত শত্রুপক্ষকে ‘ছাড় দেওয়া হবে না’ বা সরাসরি হত্যা করার হুমকি দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক ম্যানুয়ালেও এ ধরনের হুমকিকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র অ্যাডভাইজার ব্রায়ান ফিনুকেন আল জাজিরাকে বলেন, "এই মন্তব্যগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি প্রশ্ন তোলে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে এই আইনহীন এবং উস্কানিমূলক বাগাড়ম্বর বাস্তবে কতটা প্রয়োগ করা হচ্ছে।" তিনি আরও যোগ করেন, আত্মসমর্পণকারী যোদ্ধাদের হত্যা করা অমানবিক এবং পাল্টা ফলদায়ক। তবে প্রতিরক্ষা সচিব হেগসেথ এসব সমালোচনাকে পাত্তা না দিয়ে জানিয়েছেন, তিনি যুদ্ধের কোনো "বোকামি ভরা নিয়ম" (Stupid rules of engagement) বা "রাজনৈতিকভাবে সঠিক যুদ্ধ" (Politically correct wars) মেনে চলবেন না। হেগসেথের এই 'সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী' (Maximum lethality) কৌশলের প্রভাবে ইরানে বেসামরিক নাগরিক নিহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সম্প্রতি দক্ষিণ ইরানে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু। সব মিলিয়ে চলমান এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ১,৪৪৪ জন ইরানি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর ওয়াশিংটন ডিরেক্টর সারাহ ইয়েগার বলেন, "আমি দুই দশক ধরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাথে কাজ করছি, কিন্তু এ ধরনের ভাষা শুনে আমি স্তব্ধ। উর্ধ্বতন নেতাদের এই বক্তব্য যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের আচরণকে প্রভাবিত করে এবং এটি বড় ধরনের নৃশংসতার পূর্বলক্ষণ।" ওয়াচডগ গ্রুপ ‘এয়ারওয়ারস’ (Airwars)-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার গতি আধুনিক ইতিহাসের যেকোনো যুদ্ধের চেয়ে বেশি। যুদ্ধের প্রথম দুই দিনেই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫.৬ বিলিয়ন ডলারের গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। এমনকি আইএস (ISIS)-এর বিরুদ্ধে ছয় মাসে যে পরিমাণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছিল, ইরানে প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই তার চেয়ে বেশি হামলা চালানো হয়েছে। সিনেটর জেফ মের্কলি এই পরিস্থিতির নিন্দা জানিয়ে হেগসেথকে একজন ‘বিপজ্জনক অপেশাদার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “তার এই ‘দ্বিধাহীন’ যুদ্ধের নিয়মনীতি একটি বেসামরিক স্কুল এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে ১৫০ জনেরও বেশি স্কুলছাত্রী ও শিক্ষক প্রাণ হারিয়েছেন।” বিশ্লেষকদের মতে, পেন্টাগনের এই আক্রমণাত্মক নীতি আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৬৫ জন শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনাটি আধুনিক যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর (AI) ব্যবহার এবং এর নির্ভুলতা নিয়ে নতুন করে বিশ্বজুড়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার প্রথম দিনেই ‘শাজারেহ তাইয়েবাহ’ নামক ওই বিদ্যালয়টি টমাহক (Tomahawk) ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে মারাত্মক ভুলের কারণে এই প্রাণহানি ঘটেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে ডাটা বা তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল, তা ছিল বহু পুরনো। বিদ্যালয় ভবনটি একসময় একটি সামরিক ঘাঁটির অংশ থাকলেও গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তা সম্পূর্ণ আলাদা একটি বেসামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)-এর কর্মকর্তাদের তৈরি করা টার্গেট কোঅর্ডিনেটগুলো এআই-চালিত বিশ্লেষণে যাচাই করা হলেও সিস্টেমটি ভবনটির বর্তমান বেসামরিক অবস্থান শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা এই হামলাকে ‘ভয়াবহ অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তারা বলছেন, এআই বা প্রযুক্তির দোহাই দিয়ে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে এই ঘটনার দায় অস্বীকার করলেও পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ তদন্তে মার্কিন বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা ও যান্ত্রিক ত্রুটির কথা উঠে এসেছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধে এআই ব্যবহার করলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি বাড়লেও এতে মানুষের মানবিক বিচারবুদ্ধি ও তাৎক্ষণিক তথ্য যাচাইয়ের অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই হামলার পর এখন প্রশ্ন উঠেছে—এআই-এর ভুলে যদি নিরপরাধ শিশুদের প্রাণ যায়, তবে তার দায়ভার কার? প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের, নাকি যে কমান্ড এটি ব্যবহার করেছে তাদের? ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই হামলাটি ঘটে। ইরান একে ‘অপ্রমাণিত ও অপরাধমূলক’ হামলা হিসেবে বর্ণনা করে আন্তর্জাতিক আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। এই ঘটনায় নিহত শিশুদের স্মরণে ইরানে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়েছে এবং তাদের জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে। বিশ্লেষকদের মতে, মিনাব শহরের এই ট্র্যাজেডি ভবিষ্যতে স্বায়ত্তশাসিত মারণাস্ত্র (Autonomous Weapons) ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে বাধ্য করতে পারে।
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় কথিত 'ইয়েলো লাইন' বা হলুদ রেখা অতিক্রম করার অভিযোগে চার ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। বৃহস্পতিবার রাতে উত্তর গাজায় এই ঘটনা ঘটে বলে বাহিনীর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, উত্তর গাজায় দায়িত্বরত তাদের সেনারা চার ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে যারা নির্ধারিত নিরাপত্তা সীমানা বা 'ইয়েলো লাইন' অতিক্রম করেছিল। এরপরই সেনারা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন। উল্লেখ্য, 'ইয়েলো লাইন' হলো গাজার ভেতরে একটি নির্দিষ্ট সীমানা, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত গাজা যুদ্ধ সমাপ্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল। এই রেখাটি ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রিত এলাকা এবং ফিলিস্তিনিদের বসবাসের এলাকার মধ্যে বিভাজন হিসেবে কাজ করে। একই দিনে উত্তর গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে এক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত এবং আরও দুইজন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি সূত্রগুলো। এছাড়াও গাজা সিটিসহ উপত্যকার মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে হামলা চালানো হয়েছে। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘ দুই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান হওয়ার কথা থাকলেও গাজায় সহিংসতার ঘটনা থামছে না। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৬৫১ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১৭০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ধ্বংস হয়ে গেছে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো। জাতিসংঘ মনে করছে, এই বিধ্বস্ত জনপদ পুনর্গঠনে প্রায় ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রয়োজন হবে। যুদ্ধবিরতি চুক্তি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বারবার এমন প্রাণঘাতী হামলা গাজায় স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনাকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি স্কুলে প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় মার্কিন সংশ্লিষ্টতার খবর সামনে আসলেও তা নিয়ে ‘অজ্ঞতা’ প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রাথমিক সামরিক তদন্তে এই ভয়াবহ হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দায় থাকার প্রমাণ মিলেছে। তবে আজ হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে ট্রাম্প সরাসরি বলেন, “আমি এই বিষয়ে কিছুই জানি না।” তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা সংক্রান্ত তথ্যের (outdated targeting data) কারণে এই ভুল ক্ষেপণাস্ত্র হামলাটি ঘটে থাকতে পারে। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন এই হামলার জন্য ইরানকেই পরোক্ষভাবে দায়ী করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নিজের প্রশাসনের পক্ষ থেকেই কেন এর পক্ষে কোনো শক্তিশালী প্রমাণ দেওয়া হচ্ছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প তখন বলেছিলেন, “আমি এ বিষয়ে যথেষ্ট জানি না।” ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত ১৬৮ জন শিশু এবং ১৪ জন শিক্ষক নিহত হয়েছেন। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্ত এখনও চলছে এবং চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ইরানের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন নিষেধাজ্ঞার কঠোর সমালোচনা করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই পদক্ষেপ কেবল ‘অযৌক্তিক’ নয়, বরং এটি ‘অনৈতিক’ এবং ‘পুরোপুরি বেআইনি’। তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কারণে ইরানকে শাস্তি দিতেই এই পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস জানান যে, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ইরানের ১৯ জন কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন এই নিষেধাজ্ঞা সদস্য রাষ্ট্রগুলো অনুমোদন করেছে। তবে ইরান এই অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে একে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।