ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে। সর্বশেষ জর্ডানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুই মার্কিন সেনার মৃত্যু এবং উত্তর ইরাকে আরেক সেনার নিহত হওয়ার ঘটনায় এই সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৪০০ জনের বেশি মার্কিন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন বলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বশেষ পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ নিহত দুই সেনা হলেন ২৫ বছর বয়সী ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহান এবং ১৯ বছর বয়সী প্রাইভেট ইসাবেলা গনজালেস। তারা জর্ডানের মুওয়াফাক সালতি এয়ার বেসে ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী অভিযানে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় তারা নিহত হন। হামলায় আরও কয়েকজন সেনা আহত হলেও চিকিৎসা শেষে তাদের হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর পরদিন উত্তর ইরাকে ভূপাতিত একটি ইরানি ড্রোনের অবিস্ফোরিত অংশ নিষ্ক্রিয় করার সময় বিস্ফোরণে আরও এক মার্কিন সেনার মৃত্যু হয় এবং আরেকজন আহত হন। এ ঘটনার পরই যুক্তরাষ্ট্রের মোট সামরিক প্রাণহানির সংখ্যা ১৭-তে পৌঁছায়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরু থেকে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঘটনাগুলো বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। সংঘাত শুরুর অল্প সময়ের মধ্যেই কুয়েতে একটি ইরানি ড্রোন হামলায় ছয় সেনা নিহত হন। পরে সৌদি আরবে হামলায় আহত এক সেনা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ইরাকে একটি কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ছয় সেনার মৃত্যু হয়। জুলাইয়ের শুরুতে আরব সাগরে একটি এমএইচ-৬০এস সিহক হেলিকপ্টারের দুর্ঘটনায় এক নৌবাহিনীর পাইলট নিহত হন। এরপর জর্ডানে দুই সেনা এবং উত্তর ইরাকে আরও একজন সেনার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মোট নিহতের সংখ্যা ১৭-তে পৌঁছেছে। আহতের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৪০০ জনের বেশি মার্কিন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশ বিস্ফোরণের অভিঘাতে সৃষ্ট ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরিতে (টিবিআই) আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় একাধিক সামরিক স্থাপনা, বিমান ও হেলিকপ্টারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে যে আধুনিক যুদ্ধে শুধু সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র নয়, মধ্যপ্রাচজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোও বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং আকাশপথে পরিচালিত হামলার কারণে যুদ্ধের মূল ফ্রন্টের বাইরেও মার্কিন সেনারা প্রাণঘাতী আক্রমণের মুখে পড়ছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা নতুন করে পাকিস্তানকে কঠিন কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের মুখে ফেলেছে। ইসলামাবাদ এখন একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখার চাপের মুখে, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সম্পর্কও অক্ষুণ্ন রাখতে চাইছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে পাকিস্তান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই হামলার পর পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, সৌদি আরব যদি আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক সহায়তা চায়, তাহলে দুই দেশের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কারণে ইসলামাবাদকে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। বর্তমানে সৌদি আরবে পাকিস্তানের সেনাসদস্য ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে এবং নিরাপত্তা সহযোগিতাও অব্যাহত আছে। একই সময়ে পাকিস্তান ইরানের সঙ্গেও প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত ভাগাভাগি করে। সীমান্তবর্তী বেলুচিস্তান অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ। সংঘাত বিস্তৃত হলে সীমান্তে অনুপ্রবেশ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, অস্ত্র ও মাদক পাচার এবং নতুন করে শরণার্থী সংকটের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। এতে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। পাকিস্তানের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ অর্থনীতি। দেশটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি আমদানি করে। হরমুজ প্রণালি কিংবা লোহিত সাগরের নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। এতে পাকিস্তানের আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইরান ইতোমধ্যে হুথিদের লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হামলার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। কূটনৈতিক পর্যায়ে পাকিস্তান এখনো সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করছে। দেশটি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছে এবং উভয় পক্ষকে আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে আসছে। ইসলামাবাদ জানিয়েছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং যুদ্ধ বিস্তার রোধ করাই তাদের অগ্রাধিকার। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয় এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে পাকিস্তানের সামনে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা ইসলামাবাদকে অত্যন্ত জটিল কূটনৈতিক সমীকরণের মধ্যে ফেলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান যুদ্ধ এড়াতে চাইলেও আঞ্চলিক বাস্তবতা দেশটিকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন হুমকির পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। সোমবার ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি বলেন, এটি ইরানের সার্বভৌম জলসীমা এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ইরানের জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর। আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, “আপনি হুমকি দেন; আমরা পদক্ষেপ নেই।” তিনি আরও বলেন, “হরমুজ প্রণালি আপনার ব্যক্তিগত ক্যাসিনো নয়, কিংবা আধুনিক দিনের জলদস্যুদের পেছনের উঠানও নয়; এটি ইরানের সার্বভৌম জলসীমা।” এর আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নেবে এবং প্রয়োজনে ওই অঞ্চল দখল করা হবে। তিনি বলেন, ইরান যদি চুক্তিতে না আসে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে টোল আদায় করতেও পিছপা হবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পর হরমুজ প্রণালিতে কার্যত আরোপিত অবরোধ শিথিল করা হয়েছিল। তবে লেবাননে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ইরানের বিপ্লবী গার্ডস আবারও প্রণালিটি বন্ধের ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে। তিনি বলেন, “তোমাদের দেশের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না” এবং প্রয়োজনে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হবে। তিনি আরও মন্তব্য করেন, আলোচনার সময় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বিষয়ে অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় তিনি কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। এদিকে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলমান রয়েছে। তবে আলোচনা শুরুর পর্যায়কে দুই পক্ষই জটিল হিসেবে বর্ণনা করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার প্রেক্ষাপটে চার দিনের কূটনৈতিক সফরে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কে গেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। বুধবার শুরু হওয়া এই সফর শনিবার পর্যন্ত চলবে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, সফরকালে সৌদি আরব ও কাতারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি। অন্যদিকে তুরস্ক সফরে আন্তর্জাতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ফোরামে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে বলে জানা গেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারিকে প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে এই মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চলমান আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করাই এই সফরের মূল উদ্দেশ্য। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সমর্থন নিশ্চিত করাকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, সম্ভাব্য আলোচনার স্থান নির্ধারণ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। ইসলামাবাদ ও জেনেভা—এই দুটি শহরের নাম আলোচনার সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যদিও এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও সম্প্রতি বলেছেন, নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, দীর্ঘদিনের জটিল এই সংকটের সমাধান এক ধাপে সম্ভব নয়; ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমেই স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে পাকিস্তান নিজেকে আঞ্চলিক কূটনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার সুযোগও খুঁজছে ইসলামাবাদ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা নিরসনে আলোচনার প্রেক্ষাপটে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রকে ‘কর্তৃত্ববাদী’ মনোভাব পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার (১৩ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন। পেজেশকিয়ান তাঁর পোস্টে বলেন, মার্কিন সরকার যদি তাদের কর্তৃত্ববাদী অবস্থান থেকে সরে এসে ইরানি জনগণের অধিকারকে সম্মান করে, তাহলে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর পথ তৈরি হতে পারে। এ সময় তিনি ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও আলোচনাকারী দলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ-এর প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আলোচনাকারী দলের সদস্যদের প্রচেষ্টা প্রশংসনীয় এবং তাদের জন্য শুভকামনা জানান। পেজেশকিয়ানের মতে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতেই দীর্ঘদিনের এই দ্বন্দ্বের টেকসই সমাধান সম্ভব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বর্তমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে হলে উভয় পক্ষকেই নমনীয় অবস্থান নিতে হবে। অন্যথায় উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে এবং সমঝোতার পথ কঠিন হয়ে উঠবে।
কঠোর শর্তে অচলাবস্থার কারণে যুদ্ধবিরতিতে একমত হতে পারেনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে দুই পক্ষ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শনিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে মুখোমুখি হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। টানা ২১ ঘণ্টা আলোচনা চললেও যুদ্ধ বন্ধে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেন, আমরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারিনি, এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইরানের জন্যই বেশি নেতিবাচক। তিনি জানান, পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ, সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ও সক্ষমতা অর্জন বন্ধের শর্তে রাজি হয়নি ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শর্তগুলো এতটাই কঠোর যে, তা মেনে নিলে ইরান চিকিৎসা খাতেও পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে না। ফলে তেহরানের পক্ষে এসব শর্ত মেনে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে ইরান সরকার জানায়, প্রথম বৈঠকেই কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রত্যাশা তাদের ছিল না। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেন, এক বৈঠকেই সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা স্বাভাবিক নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শর্ত নিয়েও তারা সন্তুষ্ট নয়। তিনি আরও জানান, তেহরান তার মিত্র দেশ ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবে। বৈঠকে ইরান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরে, যার মধ্যে ছিল বিদেশে জব্দকৃত সম্পদ ফেরত, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং লেবাননসহ মিত্র দেশগুলোতে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা। তবে লেবাননে হামলা বন্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েল অনড় অবস্থান নিয়েছে বলে জানা গেছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান উভয় পক্ষকে সংলাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ খুঁজে পাওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় পাকিস্তান ত্যাগ করেছে ইরানের প্রতিনিধিদল। এই দলে ছিলেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা মেহের। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইসলামাবাদ ত্যাগ করেন। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি এবং ইরান মার্কিন প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করেনি। সব মিলিয়ে, ব্যর্থ আলোচনার পর দুই পক্ষই পাকিস্তান ছেড়ে চলে গেছে। ‘ইসলামাবাদ টকস’ নামে এই বৈঠকটি শনিবার বিকেল থেকে শুরু হয়ে রবিবার পর্যন্ত চলে। আলোচনা শেষে সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স বলেন, প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে কথা হলেও কোনো চুক্তি হয়নি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থান ও সীমারেখা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছিল—কোন বিষয়ে ছাড় দেওয়া সম্ভব এবং কোথায় নয়। তবে ইরান সেই শর্তগুলো মেনে নেয়নি বলে জানান তিনি।
হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র মাইন অপসারণে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী কাজ শুরু করেছে—এমন দাবি করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। তবে এই তথ্য দ্রুতই নাকচ করেছে ইরান। শনিবার সেন্টকম জানায়, তাদের দুটি যুদ্ধজাহাজ—ইউএসএস ফ্রাঙ্ক ই. পিটারসন ও ইউএসএস মাইকেল মারফি—হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে আরব উপসাগরে প্রবেশ করেছে এবং সেখানে মাইন অপসারণসহ বিভিন্ন সামরিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। মার্কিন পক্ষের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নিরাপদ রুট তৈরি করা হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এই পদক্ষেপ অঞ্চলটির পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে এবং শিগগিরই নিরাপদ পথ বাণিজ্যিক খাতের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। তবে ইরান এই দাবিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, মার্কিন জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করেছে—এমন কোনো তথ্য সঠিক নয়। তার মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে যেকোনো জাহাজের চলাচল ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানেই ঘটে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) আরও সতর্ক করে জানিয়েছে, প্রণালিতে কোনো বিদেশি সামরিক উপস্থিতি দেখা গেলে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি সত্যিই মার্কিন জাহাজ ওই পথে চলাচল করে থাকে, তবে তা ইরানের অনুমতি ছাড়া সম্ভব নয়। কারণ, হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছিল। সেখানে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষে ছিলেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এটিকে দুই দেশের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরাসরি সংলাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর শুরু হওয়া এই আলোচনায়ও বেশ কিছু ইস্যুতে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং আঞ্চলিক সামরিক অভিযান—এসব বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন। ইরানি সূত্রগুলোর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নটিও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাথমিকভাবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালি আংশিক খোলার ইঙ্গিত দিলেও, মাইন থাকার অজুহাতে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই দাবি মানতে নারাজ তেহরান।
ইসলামাবাদে প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে টানা আলোচনা হলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। ফলে কোনো চুক্তি ছাড়াই বৈঠক শেষ করে ফিরে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এই ব্যর্থতার পর ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন তিনটি কঠিন বিকল্প দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার পথে থাকা। দ্বিতীয়ত, আবারও সামরিক সংঘাতে জড়ানো—যা ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। তৃতীয়ত, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়া। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিজেই জানাবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বর্তমানে তিনি ফ্লোরিডায় অবস্থান করছেন। অন্যদিকে, জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থান ও সীমারেখা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছে, তবে ইরান সেই শর্ত মেনে নেয়নি। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ইরানের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়ে বলেন, তাদের সহজভাবে নতি স্বীকার করা উচিত। তবে অতীত অভিজ্ঞতা ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। বারাক ওবামার সময় দুই দেশের মধ্যে বড় একটি চুক্তি করতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল, যেখানে ইরানকে সীমিত আকারে পারমাণবিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রশ্ন। ইরান বলছে, আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় নিজেদের ভূখণ্ডে এই কার্যক্রম চালানো তাদের অধিকার। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, এই প্রক্রিয়াই ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ খুলে দেয়। সাম্প্রতিক সংঘাত এই অবস্থানকে আরও কঠোর করেছে। এদিকে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২১ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা, যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে তার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। কারণ, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। ফলে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাজার অস্থিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতি তাদের অবস্থানকে দুর্বল করেনি, বরং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আরও দৃঢ় করেছে। সব মিলিয়ে, আলোচনার এই পর্যায়ে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে শক্ত মনে করছে। তাই আপাতত সমঝোতার সম্ভাবনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। সূত্র – নিউইয়র্ক টাইমস
ইসলামাবাদে টানা ২১ ঘণ্টা ধরে কয়েক দফা বৈঠক হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান আসেনি। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় আলোচনা ভেস্তে যায়। তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তারা কোনো ধরনের ছাড় দেবে না; প্রয়োজন হলে সামরিক ও কূটনৈতিক—দুই পথেই এগোবে। অন্যদিকে, নিজেদের দাবি পূরণ না হওয়ায় অসন্তুষ্ট ওয়াশিংটন। ইরানের দাবি, এত দীর্ঘ আলোচনার পরও যুক্তরাষ্ট্র কার্যত শূন্য হাতে ফিরছে। দেশটির গণমাধ্যম বলছে, ওয়াশিংটন তাদের ‘অযৌক্তিক দাবি’ থেকে সরে না এলে ভবিষ্যতে কোনো অগ্রগতি সম্ভব নয়। ঘানায় অবস্থিত ইরান দূতাবাসের এক্স পোস্টেও একই সুর শোনা গেছে। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভাইস প্রেসিডেন্টকে দূর পথ পাড়ি দিয়ে ইসলামাবাদে নিয়ে এসে দীর্ঘ আলোচনা করেছে। কিন্তু যুদ্ধে যা অর্জন করা যায়নি, তা আলোচনার টেবিলে পাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে—যা ইরান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে আলোচনা শেষ হয়েছে কোনো সমঝোতা ছাড়াই, আর মার্কিন প্রতিনিধি দল ফিরছে খালি হাতে। এদিকে, ইরানি সূত্রের বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানায়, আলোচনা ভেঙে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই অজুহাত খুঁজছিল। হরমুজ প্রণালি ও পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে মতপার্থক্যই মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ইরানের অভিযোগ, যুদ্ধক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার পথে আসে এবং সেখানে নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে এসব শর্তকে ‘অতিরঞ্জিত’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। এমনকি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিকল্পনাও আপাতত নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ইরানি প্রতিনিধি।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এখন এক অস্বাভাবিক নীরবতায় ঢেকে আছে। তবে এই নীরবতা স্বস্তির নয়, বরং চরম উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার প্রতিফলন। শহরজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সড়কে সশস্ত্র বাহিনীর টহল, যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ- কার্যত অবরুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশের উচ্চনিরাপত্তা এলাকায় অবস্থিত একটি হোটেল খালি করে দেওয়া হয়েছে এবং কয়েক দিনের জন্য সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ একটাই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ শান্তি আলোচনা। ঘটনার সূত্রপাত ২৮ ফেব্রুয়ারি। সেদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বড় ধরনের হামলা চালায়। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা নিহত হন বলে জানানো হয়। পরবর্তী পাঁচ সপ্তাহের সংঘাতে তিন হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়, যে পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দেয়, তেলের দাম বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যার মেয়াদ ২২ এপ্রিল পর্যন্ত। এখন সেই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইসলামাবাদে শুরু হচ্ছে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা। এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন দেশটির বিশেষ দূত এবং প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। দুই পক্ষের প্রস্তাবে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা। পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর দাবিও রয়েছে। অন্যদিকে ইরান চায় হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত করা, পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার বজায় রাখা এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আদায়। এই আলোচনায় পাকিস্তানের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ- ইসলামাবাদ একটি কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে। তবে সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে লেবানন ইস্যুতে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা বললেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকায় ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে আলোচনা অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। আলোচনার ধরন সরাসরি নয়। দুই পক্ষ আলাদা কক্ষে অবস্থান করবে এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মধ্যস্থতা করে বার্তা আদান-প্রদান করবেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি এবং যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়নও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে সামনে তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, আলোচনা সফল হলে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত হয়ে স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ব্যর্থ হলে ২২ এপ্রিলের পর আবারও ভয়াবহ সংঘাত শুরু হতে পারে। তৃতীয়ত, দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তা বজায় রেখে আলোচনা চলতে পারে। ইসলামাবাদে চলমান এই আলোচনার প্রতিটি সিদ্ধান্তই এখন নির্ধারণ করতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ। বিশ্বের জ্বালানি বাজার, যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের জীবন এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকনির্দেশনা—সবই এখন এই বৈঠকের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে।
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে জব্দকৃত সম্পদ ইস্যুতে। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইরানের আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে কোনো ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা হয়নি। হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ওয়াশিংটন এখনো পর্যন্ত তেহরানের সম্পদ ছাড়ের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এর আগে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স একটি প্রতিবেদনে দাবি করেছিল, আলোচনার অগ্রগতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নাকি কাতারসহ বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে জমা থাকা ইরানের অর্থ ছাড়তে সম্মত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার শর্তে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তবে এই দাবিকে সরাসরি অস্বীকার করেছে মার্কিন প্রশাসন। উল্লেখ্য, ইরানের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ২০১৮ সাল থেকে বিভিন্ন কারণে স্থগিত রয়েছে, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন সংবেদনশীল সময়ে ভিন্নমুখী তথ্য সামনে আসা আলোচনার পরিবেশকে জটিল করে তুলতে পারে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান এই সংলাপে উভয় পক্ষই একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আস্থার ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। সূত্র: আল জাজিরা
কাতারসহ বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের জব্দকৃত সম্পদের একটি অংশ ছাড়তে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র—এমন তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান শান্তি আলোচনায় এটি ‘আন্তরিকতার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত’ হিসেবে দেখছে তেহরান। শনিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্র জানান, জব্দ অর্থ অবমুক্ত করার বিষয়টি হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌ-চলাচলের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কত অর্থ ছাড়তে রাজি হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি। তবে আরেকটি ইরানি সূত্রের দাবি, কাতারে আটকে থাকা প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের তহবিল ছাড়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে ওয়াশিংটন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এই তহবিলের ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। ২০১৮ সালে ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর দক্ষিণ কোরিয়ায় ইরানের তেল বিক্রির অর্থ আটকে যায়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বন্দি বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে অর্থ ছাড়ের পরিকল্পনা করা হলেও, একই বছরের অক্টোবরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাড়ায় তা আবার স্থগিত করা হয়। এরপর দোহায় মধ্যস্থতার মাধ্যমে বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় অর্থটি কাতারের ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র জানায়, এই অর্থ শুধুমাত্র মানবিক খাতে—যেমন খাদ্য, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনায়—ব্যবহার করা যাবে এবং তা ট্রেজারি বিভাগের তত্ত্বাবধানে থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জব্দ তহবিল ছাড়ার সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত বর্তমান আলোচনায় আস্থা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত একটি ইস্যু।
যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের জনগণের ন্যায্য অধিকার স্বীকৃতি দেয় এবং আন্তরিকভাবে চুক্তির পথে এগোয়, তাহলে তেহরানও একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে প্রস্তুত—এমনটাই জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনার প্রেক্ষাপটে ইরানের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। কালিবাফ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনার মধ্যেই ইরানের ওপর একাধিকবার হামলা চালানো হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। তিনি অভিযোগ করেন, এসব ঘটনায় বহু যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের বরাতে তিনি বলেন, তেহরানের উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থার ঘাটতি এখনো কাটেনি। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, যদি ওয়াশিংটন এই আলোচনাকে কেবল শক্তি প্রদর্শন বা কৌশলগত প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে ইরান নিজস্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে জনগণের অধিকার রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেবে। কালিবাফ আরও বলেন, ইরান তার জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করবে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য এই আলোচনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়ছে কূটনৈতিক চাপ ও প্রত্যাশা। তবে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস কাটিয়ে একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনায় ‘চরম অবিশ্বাস’ নিয়ে অংশ নিচ্ছে ইরান—এমনটাই জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়েডফুলের সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপে তিনি তেহরানের অবস্থান স্পষ্ট করেন। ইরানি সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা যায়, অতীতে ওয়াশিংটনের বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং কূটনৈতিক আচরণে অসঙ্গতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন আরাগচি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা’ এবং শিষ্টাচার লঙ্ঘনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এ কারণে চলমান আলোচনায় ইরান অত্যন্ত সতর্ক ও সন্দিহান অবস্থানে রয়েছে। তবে দেশের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় তারা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে বলেও জানান তিনি। এদিকে, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। আলোচনার আগেই ইরানের পক্ষ থেকে এমন কঠোর বার্তা আসায় কূটনৈতিক মহলে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আরাগচির এই বক্তব্য একদিকে যেমন বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন, তেমনি আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশলও হতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসই শান্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই পরিস্থিতিতে আলোচনা কতটা এগোতে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের টানটান উত্তেজনার মধ্যে হঠাৎ করে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নতুন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা শুধু সংঘাত থামানোর উদ্যোগ নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘প্রস্থান কৌশল’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে সম্ভাব্য ভয়াবহ হামলার ইঙ্গিত দিলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতায় রাজি হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার টেবিলে এবার তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে তেহরান। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের অবস্থান। বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সমঝোতায় সরাসরি অংশ না থাকায় কার্যত ‘দর্শক’ হয়ে পড়েছেন। যদিও তিনি শুরু থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক অবস্থানের পক্ষে ছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ইসলামাবাদ-এ। তবে এই আলোচনায় ইসরায়েল বা উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুপস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—যুক্তরাষ্ট্র কি তার ঐতিহ্যগত মিত্রদের পাশ কাটিয়ে নতুন কৌশলে এগোচ্ছে? এদিকে ইরান যুদ্ধের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি-এর ওপর নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে তেহরান এখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির ফলে সাময়িকভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধাক্কা থেকে রক্ষা পেলেও মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলসহ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে তাদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান। উপসাগরীয় দেশগুলোও এই পরিস্থিতিতে নতুন করে কৌশল নির্ধারণে বাধ্য হচ্ছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কায় তারা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করবে, আবার অন্যদিকে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় নতুন সমীকরণ খুঁজবে। সব মিলিয়ে বর্তমান যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। বরং এটি একটি পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্রদের সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে উঠতে পারে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বস্তির পাশাপাশি নতুন করে বিভ্রান্তি ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর ইরানের রাজধানী তেহরানে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদযাপনের খবর পাওয়া গেছে। এই সাময়িক বিরতি মূলত দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। তবে এই যুদ্ধবিরতির আওতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান সামনে এসেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, এই চুক্তি লেবাননের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দাবি করেছেন, লেবাননসহ সব ক্ষেত্রেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে আদায় করা ফি ইরান দেশের পুনর্গঠনে ব্যবহার করতে পারে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরাকভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাকও দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি মেনে চলার ঘোষণা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উত্তেজনা কমেনি। ডেমোক্র্যাট দলের আইনপ্রণেতারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতি ও বক্তব্যের সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন এবং তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাদের অভিযোগ, ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক সংলাপ শুরু হতে যাচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আগামী শুক্রবার এই আলোচনা শুরু হবে, যেখানে তেহরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা পরিকল্পনাকেই ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে। বুধবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরান নিশ্চিত করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তারা সম্মত হয়েছে। তবে এ সংলাপে অংশ নিলেও ওয়াশিংটনের প্রতি তাদের ‘পূর্ণ অবিশ্বাস’ রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের হুমকি থেকে সরে এসে দুই সপ্তাহের জন্য হামলা স্থগিতের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে হলে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য ‘সম্পূর্ণ, নিরাপদ ও অবিলম্বে’ খুলে দিতে হবে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালির আংশিক অবরোধের কারণে ইতিমধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব পড়েছে। তেল সরবরাহে বিঘ্ন এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বন্ধ থাকলে ইরানও তাদের প্রতিরক্ষামূলক সামরিক কার্যক্রম স্থগিত রাখবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা পরিকল্পনায় হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ এবং সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মতো শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে থাকা ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ চাওয়াও এই প্রস্তাবের অংশ। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, যুদ্ধরত পক্ষগুলো তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে এবং ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকের মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হবে।
ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের ক্রু উদ্ধারের অভিযানের পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে অভিযোগ তুলেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, এই অভিযানের আড়ালে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম চুরির চেষ্টা থাকতে পারে। সোমবার এক বক্তব্যে তিনি জানান, পুরো ঘটনাটি ঘিরে নানা প্রশ্ন ও অস্পষ্টতা রয়েছে। তার দাবি, কোহগিলুয়েহ ও বোয়ের-আহমাদ প্রদেশে মার্কিন পাইলট আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে বলা হলেও, মার্কিন বাহিনী মধ্য ইরানের আরও দূরবর্তী এলাকায় অবতরণের চেষ্টা করেছে, যা সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে। ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘এই অভিযানটি প্রতারণামূলক হতে পারে এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সংগ্রহের প্রচেষ্টা ছিল—এ সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’ গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র-এর একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করে ইরান। এতে থাকা দুই পাইলট নিখোঁজ হন। তাদের উদ্ধারে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী অভিযান চালায় মার্কিন বাহিনী। একই সময়ে ইরানও ক্রুদের খোঁজে তল্লাশি চালায়। রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, একটি ‘সাহসী অভিযানের’ মাধ্যমে দ্বিতীয় পাইলটকেও উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়—বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, সামরিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, বিশ্ব একটি নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে প্রচলিত শক্তির আধিপত্য আর নিশ্চিত নয়। ইসরায়েলের বহুস্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত সামরিক কৌশলের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। এটি দেখিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কেবল প্রতিরক্ষামূলক প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা যথেষ্ট নয়; বরং বহুমাত্রিক ও অভিযোজিত কৌশলই হয়ে উঠছে নতুন বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সংকট বর্তমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত একক অবস্থানে রয়েছে। ন্যাটো কিংবা আঞ্চলিক মিত্রদের সরাসরি সমর্থনের অভাব মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সংকটকে সামনে এনেছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো মনে করছে, তাদের ভূখণ্ডে হামলার ঝুঁকি বেড়েছে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির কারণে। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাদের প্রভাব প্রশ্নের মুখে পড়ছে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও নতুন কৌশল ইরান দীর্ঘদিন ধরে একটি বিকেন্দ্রীভূত ও প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, যা ‘মোজাইক ডকট্রিন’ নামে পরিচিত। ছোট ইউনিট, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমন্বিত হামলার মাধ্যমে এই কৌশল প্রচলিত যুদ্ধনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ইরানের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মার্কিন ঘাঁটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাপে পড়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। সংঘাতের বিস্তার ও বৈশ্বিক প্রভাব হিজবুল্লাহ, হুতি ও ইরাকি মিলিশিয়াদের সম্পৃক্ততায় সংঘাত আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক মাত্রা পাচ্ছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালি বা সাবমেরিন কেবল অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দিয়েগো গার্সিয়া: নিরাপত্তার নতুন প্রশ্ন ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা প্রদর্শনের অংশ হিসেবে দিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্য করে হামলার প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের এই ঘাঁটিকে নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপসহ বিস্তৃত অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে। ‘এসকালেশন ট্র্যাপ’-এ যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র একটি জটিল কৌশলগত ফাঁদে পড়েছে। পিছু হটলে কৌশলগত পরাজয়ের আশঙ্কা, আর এগোলে বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। এই বাস্তবতা আঞ্চলিক যুদ্ধকে বৈশ্বিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কূটনৈতিক পথ ও পাকিস্তানের উদ্যোগ এই সংকটে পাকিস্তানের উদ্যোগকে একটি প্রাথমিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। ইরানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের সক্ষমতা সংলাপের একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজন বহুপাক্ষিক উদ্যোগ। বিষয়টি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তোলা হলে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ঐকমত্য গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা একক শক্তির ওপর নির্ভরতা কমাবে। অনিশ্চয়তার নতুন বিশ্ব ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন আর শুধু একটি আঞ্চলিক ইস্যু নয়; এটি বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের সূচনা। সামরিক কৌশলের পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার উত্থান—সব মিলিয়ে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সংলাপ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক ঐক্য ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অন্যথায় বিশ্ব আরও গভীর সংকটের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে ইরান। তবে সরাসরি আলোচনায় বসার বিষয়ে এখনো অনাগ্রহ দেখিয়েছে তেহরান। বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানান, শর্ত পূরণ হলে যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী হতে পারে ইরান। তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান মানেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা নয়। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যা ইতোমধ্যে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানানো হবে। আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরান যে কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত দিয়েছে। এদিকে ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান আলোচনায় আগ্রহী হলেও তা প্রকাশ্যে বলতে ভয় পাচ্ছে। পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাবে ইরানের উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুদ অপসারণ, সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়ন বন্ধ করার মতো শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস এ প্রস্তাবের বিস্তারিত প্রকাশ না করে উল্টো হামলা জোরদারের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইসরায়েলও এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দেশটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইরান এসব শর্তে রাজি হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তিতে আগাম হামলার সুযোগ বজায় রাখতে চায় ইসরায়েল। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরে ১০ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনো শান্ত হয়নি। ইরানের ওপর বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং পাল্টা হিসেবে ইরানও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের লক্ষ্য করে। বুধবার ইসরায়েল নতুন করে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে তেহরানের একটি আবাসিক এলাকায় হামলার খবর দিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম। সংঘাতের প্রভাব বৈশ্বিক বাজারেও পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের খবর প্রকাশের পর বিশ্ব শেয়ারবাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং তেলের দাম কমেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পেন্টাগন জানিয়েছে, সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বিকল্প খোলা রাখতে নতুন করে হাজারো সেনা পাঠানো হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা থাকলেও পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত এবং যেকোনো সময় সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।