মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের নজরদারি ড্রোনে অনুপ্রবেশের দাবি করেছে ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠী ‘হান্দালা’। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে চলমান ফিফা বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা হুমকিও দিয়েছে তারা। তবে গোষ্ঠীটির দাবির পক্ষে উপস্থাপিত কিছু তথ্যে অসঙ্গতি পাওয়ার কথা জানিয়েছে অনলাইন পর্যবেক্ষণ সংস্থা সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে হান্দালা দাবি করেছে যে তারা কয়েক মাস ধরে এফবিআইয়ের ব্যবহৃত ফার্স্ট-পার্সন ভিউ (এফপিভি) ড্রোনের সংগৃহীত ছবি, ভিডিও ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তথ্যের ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছে। গোষ্ঠীটির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ড্রোনে মুখ শনাক্তকরণ এবং গাড়ির নম্বরপ্লেট বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
বিবৃতিতে বিশ্বকাপের নিরাপত্তা নিয়ে সরাসরি হুমকিও দেওয়া হয়। হান্দালা দাবি করে, টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া কয়েকটি দলকে তারা পছন্দ করে না এবং নিরাপত্তা আরও জোরদার করা উচিত। তারা আরও ইঙ্গিত দেয় যে ড্রোন ব্যবহার করে বিভিন্ন দলের চলাচল বা পরিবহনের ওপর নজরদারি চালানো সম্ভব।
বিশ্বকাপ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেডিয়াম ও সংশ্লিষ্ট আয়োজনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এফবিআই ড্রোন মোতায়েন করেছে। একই সঙ্গে স্টেডিয়ামের আকাশসীমা ও আশপাশের এলাকায় বেসরকারি বা অননুমোদিত ড্রোন উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ ড্রোনকে বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছে এবং তা মোকাবিলায় বিশেষ প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে।
তবে হান্দালার দাবি নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। গোষ্ঠীটি যে ছবি ও ভিডিওকে হ্যাকিংয়ের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে, তার অন্তত একটি ভিডিও প্রকৃতপক্ষে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের একটি বাণিজ্যিক প্রচারমূলক ভিডিও বলে শনাক্ত করেছে সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ। ওই ভিডিওটি একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের তৈরি, যা টর্নেডো-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নে মার্কিন পুলিশের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রচারণার অংশ ছিল। ফলে হান্দালার উপস্থাপিত তথ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বেড়েছে। এর আগে মার্কিন বিচার বিভাগও ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের সম্ভাব্য সাইবার হামলা নিয়ে সতর্ক করেছিল।
হান্দালা এর আগেও আলোচনায় আসে। চলতি বছরের মার্চে তারা এফবিআই পরিচালক Kash Patel-এর ব্যক্তিগত ইমেইল অ্যাকাউন্টে প্রবেশের দাবি করে এবং কিছু ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করে। মার্কিন কর্মকর্তারা তখনও গোষ্ঠীটির কিছু দাবি অতিরঞ্জিত বলে মন্তব্য করেছিলেন।
হান্দালা গোষ্ঠীকে মার্কিন কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই নজরদারিতে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর গোষ্ঠীটির সদস্যদের শনাক্তকরণ বা গ্রেপ্তারে সহায়তাকারী তথ্যের জন্য এক কোটি ডলার পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণাও করেছে।
বিশ্বকাপে কয়েক মিলিয়ন দর্শক এবং শতাধিক ম্যাচের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ও স্থানীয় সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ড্রোন, সাইবার হামলা ও সম্ভাব্য সন্ত্রাসী ঝুঁকিকে এবারের টুর্নামেন্টের প্রধান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক পরিণতির খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ জামিল লিমনের (২৭) মরদেহ উদ্ধার করা হলেও, পুলিশ ধারণা করছে নাহিদা বৃষ্টিকেও (২৭) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। অভিযুক্ত ঘাতক ও লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়ার ফ্ল্যাটে ‘প্রচুর রক্ত’ পাওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছে, বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভবত আর কখনোই সম্ভব হবে না। নিহত বৃষ্টির বড় ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘১০ টাম্পা বে নিউজ’-কে জানান, শুক্রবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারীরা বাংলাদেশে তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, লিমন ও হিশামের শেয়ার করা ফ্ল্যাটে যে পরিমাণ রক্ত পাওয়া গেছে, তা থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে বৃষ্টি আর বেঁচে নেই। পুলিশের আশঙ্কা, হত্যার পর মরদেহটি সম্ভবত ছিন্নবিচ্ছিন্ন বা টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে, যার ফলে এটি খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। গত শুক্রবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশ থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই সকাল ৯টার দিকে ইউএসএফ ক্যাম্পাসের কাছে লেক ফরেস্ট এলাকায় অভিযুক্ত হিশাম আবুগারবিয়ার বাড়িতে অভিযান চালায় হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়। পুলিশ হিশামের বাড়িতে পৌঁছালে তিনি নিজেকে ঘরের ভেতর তালাবদ্ধ করে রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ‘সোয়াট’ (SWAT) তলব করা হয়। প্রায় ২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির পর হিশাম আত্মসমর্পণ করেন। তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা এবং অবৈধভাবে মরদেহ সরানোর মতো ছয়টি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হিশাম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। তিনি লিমনের রুমমেট হিসেবে একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। অন্যদিকে, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি গবেষণারত নাহিদা বৃষ্টি গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন। লিমনের সাথে তার আগে প্রেমের সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে ছিল না বলে জানিয়েছেন বৃষ্টির পরিবার। তদন্তকারীরা লিমনের মৃত্যু নিশ্চিত করলেও বৃষ্টির নিখোঁজ রহস্য ও তাকে হত্যার নৃশংসতা এখন পুরো ফ্লোরিডা ও বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া ফেলেছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা আলোচনার মধ্যেই নতুন একটি জটিলতার খবর সামনে এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের গোপন মজুতাগারগুলো আরও সুরক্ষিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কিছু ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে এবং প্রবেশপথগুলোকে এমনভাবে সুরক্ষিত করা হচ্ছে, যাতে সেখানে পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে যে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, তার একটি বড় অংশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী পর্যায়ের কাছাকাছি বলে পশ্চিমা দেশগুলোর ধারণা। এই মজুতের পরিমাণ প্রায় আধা টন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক সপ্তাহ আগেও এই ভান্ডারগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বর্তমান অবস্থার মতো ছিল না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। সে সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপায়ে ওই ইউরেনিয়াম জব্দ করার বিষয় বিবেচনা করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সর্বশেষ পদক্ষেপ সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কারণ আলোচনায় থাকা প্রস্তাবগুলোর অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া, ধ্বংস করা অথবা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা। এদিকে জাতিসংঘে ইরানের স্থায়ী মিশন এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। একইভাবে হোয়াইট হাউসও প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র বারবার ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুতকে আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। শুক্রবার মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, দুই দেশ একটি সম্ভাব্য চুক্তির খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। তার দাবি, চুক্তি সম্পন্ন হলে ইরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে এবং তা অপসারণ বা নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়াও শুরু হবে। তবে সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত নিয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও দেখা যাচ্ছে ভিন্নতা। এর মধ্যেই ইরানের একটি আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমে কথিত চুক্তির একটি খসড়া প্রকাশিত হওয়ার পর নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি প্রতিবেদনে বর্ণিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে ওই ইউরেনিয়াম উদ্ধার বা স্থানান্তর করা আরও জটিল হয়ে উঠবে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সাবেক কর্মকর্তা স্কট রোকার সিএনএনকে বলেন, এমন পরিস্থিতি বাস্তব হলে মজুত উপাদান যাচাই ও অপসারণের কাজ আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে কোনো চুক্তির অংশ হিসেবে যদি ইরানকে পুরো মজুতের হিসাব দিতে হয়, তাহলে সব উপাদান উদ্ধার করা সম্ভব কি না, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে। তার মতে, কোনো অংশ যদি অপ্রাপ্য বলে দাবি করা হয়, তাহলে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সন্দেহ থেকেই যাবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ মধ্য ইরানের Isfahan Nuclear Technology Center এলাকায় সংরক্ষিত থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে এই উপাদান জব্দ করার একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করেছিল। তবে সম্ভাব্য ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি হওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে যদি কোনো সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তাহলেও বাস্তবায়নের পর্যায়ে দীর্ঘ কারিগরি আলোচনা প্রয়োজন হবে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম শনাক্ত, যাচাই, অপসারণ এবং নিরাপদভাবে স্থানান্তরের মতো কাজ সম্পন্ন করতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন হবে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা হলেও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতে আরও সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পর, নিজেদের রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে ধনী এই উপসাগরীয় দেশটি। সব ধরনের হামলা বন্ধ রাখার শর্তে ইরানের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড় করতে সম্মত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া চারটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যমতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে চলমান বৃহত্তর দরকষাকষির চূড়ান্ত পর্বে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এল। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের তেল বিক্রির বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড়ের বিষয়ে যখন আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই আমিরাতের পক্ষ থেকে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ হস্তান্তরের বিষয়টি প্রকাশ্যে এল। আঞ্চলিক সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের জন্য মোট ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন (১ হাজার থেকে ২ হাজার কোটি) ডলার ছাড় করতে রাজি হয়েছে আবুধাবি। এরই মধ্যে প্রথম কিস্তির ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ তেহরানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। তবে এই বিশাল অঙ্কের অর্থের সুনির্দিষ্ট উৎস কী—তা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে দেওয়া হচ্ছে, নাকি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘদিন ধরে আমিরাতি ব্যাংকিং সিস্টেমে আটকে থাকা ইরানেরই কোনো বৈধ অ্যাকাউন্ট থেকে অবমুক্ত করা হচ্ছে, সে বিষয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। এদিকে খবরটি জানাজানি হওয়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে পুরো তথ্যটিকে সম্পূর্ণ 'ভিত্তিহীন ও বানোয়াট' বলে দাবি করেছে। তবে এর আগে দেশটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছিলেন, তারা যেকোনো মূল্যে অঞ্চলে উত্তেজনা কমিয়ে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে চরম বৈরিতা ও প্রকাশ্য শত্রুতার পর দুই দেশের এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে দুবাইয়ের পর্যটন খাত এবং নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে আমিরাতের বৈশ্বিক বাণিজ্যিক সুনাম চরমভাবে ধাক্কা খেয়েছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এই সমঝোতা মার্কিন-ইরান সংঘাত নিরসনের ক্ষেত্রে এমন এক অভিনব উপায় তৈরি করেছে, যেখানে কোনো পক্ষকেই নিজেদের রেডলাইন পার হতে হচ্ছে না। এর মাধ্যমে ইরান যেমন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবি করতে পারবে, তেমনি ওয়াশিংটনও দায় এড়াতে পারবে। অন্যদিকে আবুধাবি নিজেদের নিরাপত্তা ও দুবাইয়ের বাণিজ্যিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে। এই চুক্তির আওতায় কেবল হামলা বন্ধই নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করা হবে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে ইরান একই ধরনের সমঝোতার জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও অন্তত দুটি আরব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সমঝোতার পেছনে দুবাইয়ের আর্থিক ব্যবস্থার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে। দুবাইয়ের ব্যাংকগুলোতে ইরান-সংশ্লিষ্ট বিপুল পরিমাণ আমানত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আটকে থাকলেও, পর্দার আড়ালের এই আলোচনা পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। কদিন আগেই ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আবুধাবিতে এসে আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শেখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করার পরই এই আলোচনার গতি নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। ওয়াশিংটনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তেহরান তাদের প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি পালন করলেই কেবল অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো পাবে। ওমান উপসাগরের ফুজাইরাহ বন্দরে ইরানের সর্বশেষ সরাসরি হামলার পর গত এক মাসে পরিস্থিতি শান্ত থাকা মূলত এই সুদূরপ্রসারী গোপন সমঝোতারই ফল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় আরাগচি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত স্থায়ীভাবে অবসানের লক্ষ্যে আলোচিত চুক্তি এখন বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। তার এই মন্তব্যকে তেহরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ইতিবাচক ও স্পষ্ট সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে একই দিনে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি স্পষ্ট করে বলেন, এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। তার ভাষায়, আলোচনা অগ্রসর হলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আরাগচি জানান, আলোচনায় থাকা সম্ভাব্য চুক্তিটি মূলত দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হবে। এই পর্যায়ে ইসরায়েল ও লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে চলমান সামরিক অভিযান, হামলা ও পাল্টা হামলা বন্ধের বিষয়ে পারস্পরিক অঙ্গীকার থাকবে। একই সঙ্গে পুনরায় সংঘাত শুরু না করার প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে তিনি জানান। দ্বিতীয় ধাপে আরও জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে অবরুদ্ধ ইরানি সম্পদ ও তহবিল মুক্ত করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। তবে ভবিষ্যতে এর প্রশাসনিক কাঠামো অতীতের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে এবং এ বিষয়ে পরবর্তী আলোচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয়ে আশাবাদী হলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অনাস্থার কথাও তুলে ধরেন আরাগচি। তিনি বলেন, চলমান পারমাণবিক আলোচনার মধ্যেই অতীতে একাধিকবার সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সে কারণে তেহরান এখনো খসড়া সমঝোতা স্মারকের প্রতিটি অংশ সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করছে। এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও আলোচনাকারী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা দিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে, তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো অজুহাত বা শর্তের সুযোগ নেই। সামনে যে চুক্তি রয়েছে, তার বিকল্প নেই।” ওয়াশিংটন থেকেও সমঝোতা আলোচনার অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, চুক্তিটি এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি, তবে উভয় পক্ষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইরানের বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না। ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রস্তাবিত সমঝোতার আওতায় ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট পারমাণবিক উপকরণ আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে হস্তান্তর করতে হবে। এর বিনিময়ে তেহরান ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সুযোগ পেতে পারে এবং বিদেশে আটকে থাকা কিছু সম্পদ ফেরত পাওয়ার পথ খুলতে পারে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে ইরান কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে না। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কিংবা অবরুদ্ধ তহবিল মুক্ত করার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ইরানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সম্প্রতি একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোনো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলেই ইরানের ফ্রিজ করা সম্পদ অবিলম্বে ছেড়ে দেওয়া হবে না। এদিকে চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা একটি প্রতিবেদনে দাবি করেছিল, আলোচনায় থাকা সমঝোতায় তেহরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি কিংবা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নতুন কোনো ছাড় দেয়নি। একই সঙ্গে কিছু অবরুদ্ধ সম্পদ দ্রুত মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, আলোচনার কিছু গোপন বিষয় নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় ওয়াশিংটন উদ্বিগ্ন। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হয়, তবে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কেই নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের মতো বহু বছরের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সমাধানের পথে এগোতে পারে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষই সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে। ফলে কূটনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকি। সূত্র: আল জাজিরা, প্রেস টিভি, ইরনা