যুক্তরাজ্যে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষী হামলা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে গড়ে প্রতি পাঁচ দিনে একটি মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটছে। মুসলিমবিদ্বেষী ঘৃণা পর্যবেক্ষণে ব্রিটিশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অংশীদার ‘ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্ট’ (বিএমটি)-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির দেওয়া তথ্যমতে, গত ১২ মাসে যুক্তরাজ্যে মসজিদকেন্দ্রিক অন্তত ৭০টি হামলার ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে, যার মধ্যে শারীরিক আক্রমণ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অপরাধ রয়েছে। এসব হামলার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে লন্ডন, গ্রেটার ম্যানচেস্টার এবং ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস তালিকার একেবারে শীর্ষে অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক কিছু হামলার ধরন বেশ উদ্বেগজনক। উদাহরণস্বরূপ, গত বছরের (২০২৫) অক্টোবরে পূর্ব সাসেক্সের পিসহ্যাভেনে এক ব্যক্তি একটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে, ওই বছরের জুলাই মাসে শেফিল্ডের একটি মসজিদের বাইরে এক ব্যক্তি ইঁদুর ছেড়ে দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল। উদ্ভূত এমন পরিস্থিতির মুখে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (হোম অফিস) ‘প্রোটেক্টিভ সিকিউরিটি ফর মস্কস স্কিম’-এর আওতায় মসজিদ, মুসলিম স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারগুলোর নিরাপত্তায় ৪ কোটি (৪০ মিলিয়ন) পাউন্ড পর্যন্ত বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেয়। এই অর্থ নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, সিসিটিভি ক্যামেরা ও অ্যালার্ম স্থাপনসহ অন্যান্য নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপে ব্যয়ের কথা জানানো হয়েছিল। তবে ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্ট অভিযোগ করেছে, সরকারি এই তহবিলের অর্থ পেতে মসজিদগুলোকে আগে প্রমাণ করতে হয় যে তারা ইতিমধ্যে হামলার শিকার হয়েছে। অনেক মসজিদকে এই সহায়তা পেতে ১৮ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আবার কোনো কোনো আবেদন বিনা ব্যাখ্যাতেই সরাসরি বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। নতুন এই পরিসংখ্যানের বিষয়ে বিএমটি-এর প্রধান নির্বাহী আকিলা আহমেদ বলেন, মসজিদগুলোর নিরাপত্তায় সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত। হামলার মাত্রা যে ক্রমশ বাড়ছে, তা অনুধাবন করে এখনই যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। শুধু মসজিদ হওয়ার কারণেই এসব উপাসনালয় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি তহবিল বিতরণের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করতে এর বিকেন্দ্রীকরণের পরামর্শ দিয়েছেন। এদিকে, যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, তারা সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব আবেদন প্রক্রিয়াকরণের জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
হংকংয়ে এক ব্রিটিশ ব্যাংকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা ধর্ষণের অভিযোগ এনে ব্ল্যাকমেইল ও বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার অপরাধে ২৬ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ তরুণীকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, দণ্ডিত তরুণীর নাম ইসাবেল রোজ। দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের বাসিন্দা রোজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ভ্রমণের সময় ওই ব্রিটিশ ব্যাংকারের সঙ্গে পরিচিত হন এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালের শুরুতে তার আমন্ত্রণে হংকংয়ে যান। হংকংয়ে পৌঁছানোর পরই ওই ব্যাংকার তাকে ধর্ষণ করেছেন বলে অভিযোগ তোলেন তিনি। তবে হংকংয়ের ডিস্ট্রিক্ট জজ আদ্রিয়ানা নোয়েল সু চিং রায়ে উল্লেখ করেন যে, এই অভিযোগটি সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং অভিযুক্ত তরুণী বিচার চলাকালীন বিন্দুমাত্র অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, ধর্ষণের অভিযোগ তোলার পর ওই ব্যক্তির কাছে প্রথমে ৫ হাজার পাউন্ড এবং পরবর্তীতে ১ লাখ পাউন্ড দাবি করেন রোজ, যা পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইলের অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হয়। যদিও রোজ দাবি করেছিলেন যে, ওই অর্থ তাঁর বিমান ভাড়া, থাকা-খাওয়ার খরচ এবং চিকিৎসার ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। তবে বিচারক তা খারিজ করে বলেন যে, অভিযুক্ত ব্যাংকার তার প্রতি উদারতা দেখালেও রোজ তার সেই সুযোগ নিয়েছিলেন। বিচারক তাঁর আচরণকে ‘অশুভ’ ও ‘দুষ্টু প্রকৃতির’ বলে মন্তব্য করেন। এদিকে এই রায়ের পর নারী অধিকার কর্মীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার পর নারীদের আচরণ সবসময় একরকম হয় না এবং ট্রমার কারণে তাদের আচরণে ভিন্নতা আসতে পারে। তবে আদালতের রায়ের পর তরুণীর পরিবার ও আইনি দল পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে আইনি পরামর্শ নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। এই ঘটনার জেরে প্রায় দুই বছর হংকংকে আটকে থাকার পর অবশেষে তাকে এই সাজা ভোগ করতে হচ্ছে।
লন্ডনের একটি বিলাসবহুল হোটেলে অতিরিক্ত মাদক ও অ্যালকোহল সেবনের ফলে সৌদি আরবের রাজপুত্র আবদুল্লাহ বিন ফাহাদের মৃত্যুর ঘটনায় রায় দিয়েছে যুক্তরাজ্যের একটি আদালত। ময়নাতদন্ত ও সার্বিক তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে আদালত নিশ্চিত করেছেন যে, ২৯ বছর বয়সী যুবরাজের এই মৃত্যু কোনো আত্মহত্যা নয়, বরং একটি দুর্ঘটনা। বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত বছরের ২৫ নভেম্বর পশ্চিম লন্ডনের কেনসিংটনে অবস্থিত ম্যারিয়ট হোটেলের বাথরুমের মেঝে থেকে যুবরাজের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, মৃত্যুর আগের রাতে তিনি নিজের কক্ষেই একা ছিলেন। পরবর্তীতে টক্সিকোলজি প্রতিবেদনে তাঁর শরীরে উচ্চ মাত্রায় অ্যালকোহলের পাশাপাশি পার্টি ড্রাগ জিএইচবি, গাঁজা, জ্যানাক্স ও অন্যান্য অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি ওষুধের উপস্থিতি পাওয়া যায়। মাদক ও অ্যালকোহলের বিষাক্ত যৌথ প্রভাবে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয় বলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন। সৌদি রাজপরিবারের এই সদস্য দীর্ঘ দিন ধরে মাদক ও অ্যালকোহলের আসক্তিতে ভুগছিলেন এবং মৃত্যুর কিছুদিন আগেও লন্ডনের দুটি পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। তবে আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, এই মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা বা আত্মহত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ
যুক্তরাজ্যের এসেক্সে সমুদ্রসৈকতে জোয়ারের প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া এক শিশুকে উদ্ধার করতে গিয়ে পানিতে ডুবে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন এক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নারী ও তাঁর কিশোরী মেয়ে। গত বুধবার বিকেলে এসেক্সের ওয়েস্ট মার্সি সৈকতে হৃদয়বিদারক এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় আরও তিনজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, বুধবার বিকেলে ওয়েস্ট মার্সি সৈকতে বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ সাত বছর বয়সী এক শিশু জোয়ারের তোড়ে সাগরে ভেসে যেতে থাকে। এ সময় শিশুটিকে বাঁচাতে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পানিতে ঝাঁপ দেন মা সেলিনা রহমান এবং তাঁর ১৫ বছর বয়সী মেয়ে। কিন্তু শিশুটিকে স্রোতের মুখ থেকে উদ্ধার করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে গিয়ে একপর্যায়ে প্রবল স্রোতের টানে তারা দুজনই সাগরের পানিতে তলিয়ে যান। দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে কোস্টগার্ড, লাইফবোট, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এবং জরুরি সেবার একাধিক দল। এসেক্স পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মর্মান্তিক এই ঘটনার বিস্তারিত কারণ উদ্ঘাটনে ইতিমধ্যে একটি তদন্ত শুরু করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই দুর্ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী থেকে থাকলে অথবা কারও কাছে ঘটনার কোনো ছবি বা ভিডিও চিত্র সংরক্ষিত থাকলে তা দিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সহযোগিতা করার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বসাধারণের প্রতি বিশেষভাবে আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিদেশি নাগরিকরা কীভাবে ব্রিটিশ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন, সে বিষয়ে সাতটি প্রধান আইনি পথের তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, পারিবারিক সম্পর্ক, বসবাসের ইতিহাস ও আইনি অবস্থার ওপর ভিত্তি করে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ নির্ধারণ করা হয়। যুক্তরাজ্যের সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, ব্রিটিশ নাগরিকত্ব অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি শ্রেণিতে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব, ব্রিটিশ নাগরিকের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক, রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা এবং কিছু ঐতিহাসিক পরিস্থিতির আওতায় আবেদন। সরকারের প্রকাশিত সাতটি প্রধান পথ হলো: প্রথমত, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব। নির্দিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ হলে যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া ব্যক্তি ব্রিটিশ নাগরিকত্বের জন্য যোগ্য হতে পারেন। তবে শুধু যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণ করলেই সব ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাওয়া যায় না; বাবা-মায়ের অভিবাসন অবস্থা ও জন্মের সময়কার পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ নাগরিকের স্বামী, স্ত্রী বা সিভিল পার্টনারের মাধ্যমে আবেদন। নির্ধারিত সময় যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাস এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করলে তারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন। তৃতীয়ত, আইরিশ নাগরিকদের জন্য বিশেষ সুযোগ। নির্দিষ্ট সময় যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী কিছু আইরিশ নাগরিক ব্রিটিশ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার যোগ্য হতে পারেন। চতুর্থত, রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ বিধান। যাদের কোনো দেশের নাগরিকত্ব নেই, তারা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে নিবন্ধনের সুযোগ পেতে পারেন। পঞ্চমত, আগে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন এমন ব্যক্তিরা। যারা আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছিলেন, তারা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে পুনরায় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন। ষষ্ঠত, বিশেষ পরিস্থিতিতে আবেদন। ব্রিটিশ নাগরিকত্ব আইনের আওতায় কিছু নির্দিষ্ট অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। সপ্তমত, চাগোসিয়ান বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুযোগ। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান ওশান টেরিটরিতে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট বংশধররা বিশেষ নিয়মের অধীনে নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারেন। এ ছাড়া সাধারণভাবে ব্রিটিশ নাগরিকত্বের আবেদনকারীদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্যে বৈধ বসবাসের নির্দিষ্ট সময় পূরণ, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা, ‘লাইফ ইন দ্য ইউকে’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং ‘গুড ক্যারেক্টার’ বা ভালো নৈতিক অবস্থানের প্রমাণ দেওয়া। তবে সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। আবেদনকারীর ভিসার ধরন, যুক্তরাজ্যে থাকার ইতিহাস, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে যোগ্যতার শর্ত পরিবর্তিত হতে পারে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রিটিশ নাগরিকত্বের আবেদন একটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া। তাই আবেদন করার আগে নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শর্ত ও প্রমাণপত্র ভালোভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাজ্যের পশ্চিম লন্ডনের হেইস এলাকায় স্বামী ও তিন মাসের শিশুর পাশে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন ২৪ বছর বয়সী ভারতীয় তরুণী কিরণদীপ কৌর। বিদেশে উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি দেওয়া এই তরুণীর আকস্মিক মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে তাঁর পরিবার ও প্রবাসী ভারতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং কিরণদীপের মরদেহ নিজ জন্মভূমি ভারতে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ জুলাই সকালে পশ্চিম লন্ডনের হেইস এলাকার আক্সব্রিজ রোডের একটি বাড়িতে এ হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় কিরণদীপ তাঁর স্বামী ও তিন মাস বয়সী সন্তানের সঙ্গে ঘুমিয়ে ছিলেন। অভিযোগ, হঠাৎ এক ব্যক্তি ওই বাড়িতে ঢুকে কিরণদীপের ওপর হামলা চালায়। তাঁকে বুকে ছুরিকাঘাত করা হয়। হামলার শব্দ শুনে তাঁর স্বামী ঘুম থেকে জেগে উঠলেও ততক্ষণে হামলাকারী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। জরুরি নম্বর ৯৯৯-এ ফোন পাওয়ার পর স্বাস্থ্যকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তবে সকাল ৮টা ২৬ মিনিটে কিরণদীপকে ঘটনাস্থলেই মৃত ঘোষণা করা হয়। ঘটনার পর পুলিশ ৪৪ বছর বয়সী ড্যানিয়েল শন জেমস নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, একজনকে হত্যাচেষ্টা এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালতের প্রাথমিক শুনানিতে জানানো হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিহত পরিবারের পূর্বপরিচিত ছিলেন না এবং কিরণদীপের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না বলে তদন্তে উঠে এসেছে। কিরণদীপ ২০২৪ সালে স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। তিনি ভারতের পাঞ্জাবের তারন তারান জেলার বাসিন্দা ছিলেন। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, বিদেশে পড়াশোনা করে তিনি একটি ভালো ভবিষ্যৎ তৈরি করবেন। তাঁকে যুক্তরাজ্যে পাঠানোর জন্য দরিদ্র পরিবারটি প্রায় ২৫ লাখ রুপি খরচ করেছিল বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। কিরণদীপের মা ও ভাই স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তাঁরা মেয়েকে নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। এমন মর্মান্তিক ঘটনার কথা তাঁরা কখনো কল্পনাও করেননি। তারা শুধু ন্যায়বিচার এবং কিরণদীপের মরদেহ দ্রুত গ্রামের বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ চান। এদিকে মরদেহ ভারতে পাঠানো এবং শেষকৃত্যের খরচ বহনের জন্য যুক্তরাজ্যের সাউথহল এলাকার একটি গুরদ্বারা ও প্রবাসী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিরণদীপের মৃত্যুর ঘটনায় যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী ভারতীয় ও পাঞ্জাবি সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক শোক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশ ঘটনার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের মাধ্যমে মামলার অগ্রগতি নির্ধারিত হবে।
যুক্তরাজ্যের ওয়েলসে কয়েক দশক আগে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ শিশু যৌন নিপীড়ন ও দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় তিন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। দক্ষিণ ওয়েলসের গুয়েন্ট পুলিশ দীর্ঘ তদন্তের পর গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) যুক্তরাজ্যের নিউপোর্ট, সোয়ানসি, লন্ডন, বার্মিংহাম, ল্যাঙ্কাশায়ার, এডিনবার্গ এবং স্কটল্যান্ডের আর্গিল অ্যান্ড বিউট এলাকা থেকে এই আট ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। 'অপারেশন ওক' নামের বিশেষ এই পুলিশি অভিযানের আওতায় গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে ১৭টি ধর্ষণের ঘটনাসহ মোট ৩৪টি সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে শিশু অবস্থায় যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া বেশ কয়েকজন নারীর সাম্প্রতিক অভিযোগের ভিত্তিতে এই তদন্ত শুরু হয়। গ্রেপ্তারকৃত এই আটজনের বয়স বর্তমানে ৫৪ থেকে ৭৩ বছরের মধ্যে এবং তারা প্রত্যেকেই ব্রিটিশ নাগরিক। তবে অভিযুক্তদের পরিচয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রয়েছেন। তারা হলেন—মোহাম্মদ শেখ আব্দুল হান্নান, শেখ মোহাম্মদ তাহির উল্লাহ এবং আমিনুর রহমান চৌধুরী। এই মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর সব অপরাধের বিবরণ উঠে এসেছে। বার্মিংহামের বাসিন্দা ৫৮ বছর বয়সী শাফাক মোহাম্মদের বিরুদ্ধে ১১ বছরের কম বয়সী ও ১৬ বছরের ঊর্ধ্বের নারী ধর্ষণসহ সর্বোচ্চ ১১টি অভিযোগ আনা হয়েছে। এডিনবার্গের মোহাম্মদ শেখ আব্দুল হান্নানের (৫৪) বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও এর ষড়যন্ত্রসহ আটটি এবং ল্যাঙ্কাশায়ারের শাকিল বাবুরের (৫৮) বিরুদ্ধে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুকে শ্লীলতাহানির চারটি অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নিউপোর্টের সৈয়দ মোহাম্মদ আশান তাকভি (৬৫) ও সোয়ানসির মুরাদ আলীর (৫৭) বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ধর্ষণের অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি নিউপোর্টের শেখ মোহাম্মদ তাহির উল্লাহর (৭৩) বিরুদ্ধে দুটি, টটেনহ্যামের আমিনুর রহমান চৌধুরীর (৫৮) বিরুদ্ধে একটি এবং স্কটল্যান্ডের কেভিন লরেন্সের (৫৪) বিরুদ্ধে ধর্ষণের ষড়যন্ত্র ও পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। ওয়েলসের প্রধান ক্রাউন প্রসিকিউটর জেনি হপকিন্স জানিয়েছেন, আসামিদের বিচারের মুখোমুখি করতে এবং জনস্বার্থে অপরাধমূলক কার্যক্রমের বিচার নিশ্চিত করতে প্রসিকিউটররা যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় অভিযুক্তদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারের বিষয়টিও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। আগামী ২৪ জুলাই নিউপোর্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই আট আসামিকে হাজির করার কথা রয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি যুক্তরাজ্যের প্রবাসী কমিউনিটি ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ লন্ডনে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে ১৪ বছর বয়সি এক কিশোরের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই রোমহর্ষক পরিকল্পনার সঙ্গে চরম ডানপন্থি মতাদর্শের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। এমন ঘটনায় স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার (১৫ জুলাই) লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে ওই কিশোরের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির অভিযোগ গঠন করে। জানা যায়, গত ৯ জুলাই একটি গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে পুলিশ প্রথমে ওই কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছিল। এরপর তার বাসভবনে তল্লাশি চালিয়ে বেশ কিছু উদ্বেগজনক নথি উদ্ধার করা হয়। এই নথিগুলোর সূত্র ধরেই তদন্তে যুক্ত হয় পুলিশের সন্ত্রাসবাদবিরোধী ইউনিট। ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তদন্ত শেষে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, সাটন এলাকার দুটি মসজিদকে লক্ষ্য করে হামলার গভীর ছক কষেছিল ওই কিশোর। এর পাশাপাশি, গত ২০ জুন বা তার আগে একটি গাড়ির জানালা ভাঙার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষমূলক উদ্দেশ্যে সম্পত্তি নষ্ট করার অভিযোগও যুক্ত করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই বিশেষজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তারা সাটন এলাকার ওই দুই মসজিদের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগ করেন। তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাবিষয়ক পরামর্শ ও সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। তবে পুলিশ আশ্বস্ত করেছে যে, এই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত অন্য কাউকে বর্তমানে খোঁজা হচ্ছে না এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের কোনো অতিরিক্ত হুমকির তথ্য তাদের কাছে নেই। আদালতের নির্দেশে অভিযুক্ত কিশোরকে বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার তাকে ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। লন্ডনের সন্ত্রাসবাদবিরোধী পুলিশের প্রধান কমান্ডার হেলেন ফ্লানাগান এই ঘটনাকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এত অল্প বয়সি একজনের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কা সৃষ্টি করবে। সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট তদন্তে শিশু-কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি অভিভাবক, শিক্ষক ও পরিবারের সদস্যদের আরও বেশি সতর্ক হওয়ার এবং সন্তানদের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
লন্ডনের গণপরিবহন সংস্থা ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন (টিএফএল)-এর তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনায় দুই তরুণ হ্যাকারকে কারাদণ্ড দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের একটি আদালত। বৃহস্পতিবার উলউইচ ক্রাউন কোর্টের রায়ে পূর্ব লন্ডনের বো এলাকার ২০ বছর বয়সী থালহা জুবাইর এবং ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের ওয়ালসালের ১৯ বছর বয়সী ওউইন ফ্লাওয়ার্সকে সাড়ে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালত জানিয়েছে, ২০২৪ সালে টিএফএল-এর আইটি ব্যবস্থায় সাইবার হামলার ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। হামলার ফলে সংস্থাটির ডিজিটাল সেবায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয় এবং যাত্রীদের তথ্য ও অভ্যন্তরীণ সিস্টেমের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। মামলার তদন্তে উঠে আসে, থালহা জুবাইর টিএফএল-এর সিস্টেমে অনুপ্রবেশের ঘটনায় জড়িত ছিলেন। অন্যদিকে ওউইন ফ্লাওয়ার্স একই হামলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের দুটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সাইবার হামলার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন বলে আদালতে প্রমাণিত হয়। সাইবার অপরাধ তদন্তকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে, আধুনিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যেমন পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে চালানো হামলা এখন বিশ্বজুড়ে বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। টিএফএল লন্ডনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পরিবহন সংস্থা, যা বাস, ট্রেন, আন্ডারগ্রাউন্ডসহ শহরের বড় অংশের গণপরিবহন পরিচালনা করে। সংস্থাটির ডিজিটাল অবকাঠামোতে কোনো ধরনের হামলা হলে তা লাখো যাত্রীর সেবায় প্রভাব ফেলতে পারে। আদালতের রায়ের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে সরকারি ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় হামলার ক্ষেত্রে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
যুক্তরাজ্যে ১৬ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের রাতের বেলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সীমিত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, মধ্যরাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউবসহ জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাপগুলো ডিফল্টভাবে বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে অটো-প্লে এবং ইনফিনিট স্ক্রলের মতো ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার বিভিন্ন ফিচারও ডিফল্টভাবে নিষ্ক্রিয় রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এই কারফিউ বাধ্যতামূলক হবে না। ব্যবহারকারীরা চাইলে নিজেদের অ্যাকাউন্টের সেটিংস পরিবর্তন করে এই সীমাবদ্ধতা তুলে দিতে পারবেন। আর এই সুযোগই নতুন পরিকল্পনাকে ঘিরে বিতর্কের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশ সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানো এবং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে। সরকারের মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন কিছু নকশা বা ফিচার রয়েছে, যা ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় অনলাইনে আটকে রাখে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে সেসব ফিচারের প্রভাব কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। তবে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন সরকারের এই উদ্যোগকে পর্যাপ্ত মনে করছে না। ২০২২ সালে একটি অনলাইন চ্যালেঞ্জে অংশ নিয়ে ১৪ বছর বয়সী ছেলে জুলস সুইনির মৃত্যুর পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে আসা এলেন রুম বলেছেন, কিশোররা যেহেতু খুব সহজেই সেটিংস পরিবর্তন করে কারফিউ বন্ধ করতে পারবে, তাই এই ব্যবস্থা বাস্তবে খুব বেশি কার্যকর হবে না। বিবিসি রেডিও ফোরের 'টুডে' অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এটি এমন যেন একজন ১৭ বছরের কিশোরের সামনে মদের বোতল রেখে শুধু একটু দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে চাইলে সহজেই আবার সেটি হাতে তুলে নিতে পারবে। তার মতে, সরকার চাইলে আরও কঠোর এবং কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারত। এর আগে চলতি বছরের জুনে যুক্তরাজ্য সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। নতুন রাতের কারফিউকে সেই উদ্যোগেরই একটি সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, শিশুদের জন্য আলাদা প্ল্যাটফর্ম, বয়স যাচাই প্রযুক্তি এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও কাজ চলছে। শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা ব্যারোনেস কিডরন বলেন, লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুদের প্রযুক্তি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যেন শিশুদের জন্য ক্ষতিকর নকশা ও পণ্য তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। অনলাইন নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী কানিশকা নারায়ণ বলেছেন, রাতের কারফিউ, অটো-প্লে সীমিত করা এবং অন্যান্য পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য বিশ্বের অন্যতম কঠোর অবস্থানে থাকবে। প্রযুক্তিমন্ত্রী লিজ কেন্ডাল বলেন, পর্যাপ্ত ঘুম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মনোযোগ এবং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো একজন তরুণের সুস্থ বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন এই উদ্যোগ সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে বলে সরকার বিশ্বাস করে। তবে বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির শিক্ষা বিষয়ক মুখপাত্র লরা ট্রট সরকারের পরিকল্পনাকে "এলোমেলো ও অসংগত" বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, যদি ব্যবহারকারীরা নিজেরাই সহজে এই কারফিউ বন্ধ করে দিতে পারেন, তাহলে এর বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, শিশুদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নতুন বিধিমালা আনার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাজ্য সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য এআই সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সময় পরপর বাধ্যতামূলক বিরতির ব্যবস্থা রাখতে হবে। সরকার ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এসব প্রস্তাব পার্লামেন্টে উপস্থাপন করতে চায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বসন্ত থেকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞাসহ নতুন নিয়মগুলো ধাপে ধাপে কার্যকর হতে পারে। এদিকে মলি রোজ ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি বারোজ মনে করেন, সরকারের এই উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এটি এককভাবে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। তার মতে, আরও বিস্তৃত ও সমন্বিত নীতিমালা প্রয়োজন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের শিশুদের ডিজিটাল অধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সোনিয়া লিভিংস্টোন সতর্ক করে বলেছেন, রাতের কারফিউ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর জন্য উল্টো সমস্যা তৈরি করতে পারে। কারণ, গভীর রাতে যদি কোনো শিশু মানসিক সহায়তা বা জরুরি পরামর্শের জন্য বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে, তাহলে সেটি উদ্বেগের বিষয় হতে পারে। তবে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যেন অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন পাঠিয়ে শিশুদের জাগিয়ে না রাখে, সে ধরনের পদক্ষেপকে তিনি ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন। ইংল্যান্ডের শিশু কমিশনার ডেম র্যাচেল ডি সুজা বলেন, তরুণদের মতামতকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তার ভাষায়, বেশিরভাগ তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে চায় না, বরং ইনফিনিট স্ক্রলের মতো আসক্তিকর ফিচার থেকে সুরক্ষা চায়। তিনি নতুন কারফিউ কতটা কার্যকর হয়, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন। ভিপিএন ব্যবহার নিয়েও আলোচনা থাকলেও আপাতত এ বিষয়ে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করছে না যুক্তরাজ্য সরকার। সরকারের মতে, ভিপিএনের বৈধ ও প্রয়োজনীয় ব্যবহার রয়েছে, বিশেষ করে সাংবাদিক, হুইসেলব্লোয়ার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে। সরকারের কমিশন করা এক গবেষণায়ও বয়স যাচাই এড়াতে ব্যাপকভাবে ভিপিএন ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সরকারের প্রকাশিত এক পরীক্ষামূলক গবেষণায় ৩০০ কিশোর-কিশোরীর ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, রাতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কারফিউ তাদের ঘুমের মান উন্নত করতে সহায়ক হয়েছে। তবে বাথ স্পা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান যোগাযোগবিষয়ক অধ্যাপক পিট এচেলস মনে করেন, এই গবেষণা এককভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তার মতে, প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রভাব বুঝতে আরও বড় পরিসরে এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন। সূত্র: বিবিসি, যুক্তরাজ্য সরকার এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য বিশ্বাস করে পশুর জন্য ব্যবহৃত একটি কৃমিনাশক ওষুধ সেবনের পর যুক্তরাজ্যের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। ক্যানসারের চিকিৎসা বা প্রতিরোধে কার্যকর বলে প্রচারিত ওই ওষুধ মানুষের জন্য অনুমোদিত নয় এবং এর কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণও নেই বলে চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন। ব্রিটিশ গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ৪৫ বছর বয়সী লি রেডপাথ নামের ওই ব্যক্তি ফেনবেনডাজল (Fenbendazole) নামের একটি অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক বা পরজীবীনাশক ওষুধ টানা কয়েক সপ্তাহ সেবনের পর গুরুতর লিভার বিকল হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে গত বছরের ২৯ এপ্রিল ক্যামব্রিজের অ্যাডেনব্রুকস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তদন্তে জানা যায়, লি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও পোস্ট দেখে বিশ্বাস করেছিলেন, ফেনবেনডাজল ক্যানসার প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় উপকারী হতে পারে। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি ইউক্রেনভিত্তিক এক অনলাইন সরবরাহকারীর কাছ থেকে ওষুধটি সংগ্রহ করেন। ফেনবেনডাজল মূলত পশুর অন্ত্রের বিভিন্ন ধরনের পরজীবী ও কৃমি দূর করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি মানুষের ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত নয় এবং ক্যানসারের চিকিৎসায় এর কার্যকারিতা প্রমাণিত নয়। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের হান্টিংডনে অনুষ্ঠিত এক করোনারের তদন্তে লির দীর্ঘদিনের সঙ্গী লরেন লল সাক্ষ্য দেন। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য দেখে লি মনে করেছিলেন ওষুধটি নিরাপদ এবং যুক্তরাষ্ট্রে অনেক মানুষ এটি ব্যবহার করছেন। লরেন বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই লি ওষুধটি সেবন শুরু করেছিলেন। তার মতে, এ ধরনের ওষুধ অনলাইনে সহজলভ্য হওয়ায় অনেক মানুষ পূর্ণ তথ্য না জেনেই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তিনি আরও জানান, তার ধারণা লি মৃত্যুর আগে হয়তো প্রায় দুই বছর ধরে অনিয়মিতভাবে এই ওষুধ গ্রহণ করছিলেন। তদন্তে অ্যাডেনব্রুকস হাসপাতালের লিভার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. গুইলিম ওয়েব স্পষ্টভাবে জানান, মানুষের ক্যানসার প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় ফেনবেনডাজলের কোনো প্রমাণিত উপকারিতা নেই। তিনি বলেন, এ ধরনের দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, লিকে গত বছরের ১২ এপ্রিল গুরুতর লিভার সমস্যার লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসার সময় তিনি চিকিৎসকদের জানান যে, অনলাইনে ক্যানসারবিরোধী গুণের দাবি দেখে তিনি ফেনবেনডাজল কিনে সেবন করছিলেন। ময়নাতদন্তে দেখা যায়, লিভারের গুরুতর ক্ষতির পাশাপাশি কিডনিও অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। তদন্তে আরও উল্লেখ করা হয়, লির আগে থেকেই অ্যালকোহলজনিত লিভার সিরোসিস ছিল। তবে করোনারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফেনবেনডাজলজনিত লিভারের বিষক্রিয়াই ছিল তার মৃত্যুর প্রধান কারণ, যা শেষ পর্যন্ত লিভার ও কিডনি বিকলের দিকে নিয়ে যায়। ক্যামব্রিজশায়ার ও পিটারবরোর সহকারী করোনার ক্যারোলিন জোনস বলেন, ফেনবেনডাজল অত্যন্ত শক্তিশালী কৃমিনাশক ওষুধ এবং এটি মানুষের জন্য কখনো যে মাত্রায় বা যে সময় পর্যন্ত ব্যবহারের কথা ভাবা হয়নি, লি তার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় ও দীর্ঘ সময় ধরে এটি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আরও বলেন, লি নিজের স্বাস্থ্যের উন্নতির উদ্দেশ্যে ওষুধটি গ্রহণ করেছিলেন। তবে সেই সিদ্ধান্তের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতিতেই তার মৃত্যু হয়েছে। লরেন ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে আনুষ্ঠানিক সতর্কতামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের অনুরোধ জানালেও করোনার জানান, সে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি পাওয়া যায়নি। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, অনলাইনে এ ধরনের ওষুধ সহজে কেনাবেচার বিষয়টি উদ্বেগের। তদন্ত শেষে লির মৃত্যুকে 'মিসঅ্যাডভেঞ্চার' বা অনিচ্ছাকৃত ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ফলে সংঘটিত মৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও সেগুলোর অনেকগুলোরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকে না। কোনো ওষুধ বা বিকল্প চিকিৎসা গ্রহণের আগে অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সূত্র: দ্য সান, যুক্তরাজ্য; করোনারের তদন্তে উপস্থাপিত তথ্য
বিশ্বজুড়ে নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে নেওয়া একটি বড় আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রকল্প মাত্র দুই বছরের মাথায় বাতিল ঘোষণা করেছে ব্রিটিশ সরকার। আফ্রিকা, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রায় ১০ লাখ মেয়েকে উচ্চশিক্ষার আওতায় এনে বিদ্যালয়ে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে এই বিশেষ কর্মসূচিটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। তবে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সাহায্য বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁটের কারণে এই জনকল্যাণমূলক প্রকল্পটির দরপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 'স্ট্রেনদেনিং হায়ার এডুকেশন ফর ফিমেল এমপাওয়ারমেন্ট' বা 'শেফে' নামের এই ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রামটি দুই বছর আগে তৎকালীন কনজারভেটিভ সরকারের আমলে বেশ ধুমধামের সাথে চালু করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী সুবিধাবঞ্চিত ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে এই প্রকল্পের জন্য ৪৫ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি বিশাল বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও শিক্ষা খাতের এই বড় উদ্যোগটি পুরোপুরি ভেস্তে গেল। যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন খাতের বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বর্তমান সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা মুখে নারী অধিকার ও সুরক্ষার কথা বললেও বাস্তবে আন্তর্জাতিক সাহায্য কমিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে প্রান্তিক মেয়েদের উচ্চশিক্ষার অধিকার কেড়ে নিচ্ছেন। এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে দক্ষিণ সুদানে মেয়েদের এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার জন্য নেওয়া ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের আরেকটি বড় প্রকল্পও বাতিল করেছিল ব্রিটিশ প্রশাসন। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মেয়েরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়, তাদের বাল্যবিয়ের ঝুঁকি অন্তত ছয় গুণ কমে যায় এবং তারা পারিবারিক সহিংসতার শিকারও কম হয়। তবে কেবল প্রকল্প বাতিলই নয়, যুক্তরাজ্য সরকার সুদান, আফগানিস্তান, মিয়ানমার ও ক্যামেরুনের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন স্টুডেন্ট ভিসাও বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে নিজ দেশে শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত বহু নারী আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ বা বৃত্তির মাধ্যমে জীবন পরিবর্তনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই মূলত এই বৈদেশিক সাহায্য বা আন্তর্জাতিক অনুদানের বাজেট কমানো হয়েছে। জাতিসংঘ যেখানে প্রতিটি উন্নত দেশকে তাদের জাতীয় আয়ের অন্তত শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বৈদেশিক সাহায্যে বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রা দেয়, সেখানে যুক্তরাজ্যের এই বাজেট কমিয়ে আনাকে বৈশ্বিক শিক্ষা খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা ও চরম প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়া মানুষের স্বপ্ন থাকে একটি নিরাপদ জীবনের। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবে সব সময় পূরণ হয় না। এমনই এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থী এক পাকিস্তানি পরিবার। মুহাম্মদ নাদিম, তার স্ত্রী শামাইলা এবং তাদের চার সন্তান দুই বছর আগে পাকিস্তান ছেড়ে যুক্তরাজ্যে যান। প্রথমে তারা গ্রেটার ম্যানচেস্টারের স্টকপোর্টে বসবাস শুরু করেন। সেখানে নাদিম কর্মভিসার আওতায় উবার চালক হিসেবে কাজ করতেন। পরে তার ভিসার মেয়াদ শেষ হলে পরিবারটি আশ্রয়ের আবেদন করে। আবেদন প্রক্রিয়া চলাকালে তাদের আগের বাসা ছেড়ে একটি হোটেলে থাকতে হয়। সম্প্রতি কর্তৃপক্ষ তাদের প্রায় ৬০ মাইল দূরের শ্রপশায়ারের স্টোক হিথ গ্রামের একটি নতুন নির্মিত চার শয়নকক্ষের বাড়িতে স্থানান্তর করে। বাড়িটি এমন একটি আবাসন প্রকল্পের অংশ, যেখানে একাধিক আশ্রয়প্রার্থী পরিবারকে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু নতুন বাড়িতে ওঠার পরও স্বস্তি মেলেনি নাদিমের পরিবারের। তাদের অভিযোগ, এলাকায় যাওয়ার পর থেকেই তারা নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন। কিছু ব্যক্তি তাদের প্রতি শত্রুতাপূর্ণ আচরণ করেছে বলেও দাবি করেছেন তারা। এ কারণে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগে রয়েছেন এই দম্পতি। নাদিম জানান, পরিবারের সদস্যরা এখনো নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি। সন্তানরা বাইরে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে না। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি অনেক সময় রাতেও সতর্ক থাকেন। তার ইচ্ছা, পরিবারটিকে আবার স্টকপোর্ট এলাকায় ফিরিয়ে নেওয়া হোক, যেখানে তাদের পরিচিত পরিবেশ এবং কিছুটা সামাজিক যোগাযোগ ছিল। পরিবারটির আরেকটি অভিযোগ, নতুন এলাকায় দোকান, স্বাস্থ্যসেবা ও যাতায়াতের সুযোগ সীমিত হওয়ায় দৈনন্দিন জীবনও কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকেও তারা এখন অনেক দূরে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে, স্টোক হিথের কিছু স্থানীয় বাসিন্দাও নতুন এই আবাসন পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন। তাদের দাবি, সামাজিক আবাসনের জন্য নির্মিত বাড়িগুলো আশ্রয়প্রার্থীদের দেওয়ায় স্থানীয় অবকাঠামো ও সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় বিতর্কও তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকার বর্তমানে ব্যয়বহুল হোটেলে আশ্রয়প্রার্থীদের রাখার পরিবর্তে ধাপে ধাপে বিভিন্ন আবাসিক ভবন ও অন্যান্য স্থাপনায় স্থানান্তরের নীতি বাস্তবায়ন করছে। তবে এই নীতির বাস্তবায়নকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়দের উদ্বেগ এবং আশ্রয়প্রার্থীদের মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ—দুই বিষয়ই সামনে আসছে। নাদিমের পরিবারের গল্প সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। নিরাপদ জীবনের আশায় হাজার মাইল দূরের দেশে এলেও, তাদের ভাষায়, এখনো তারা সেই কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও নিশ্চিন্ত জীবন খুঁজে পাননি।
যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য এবার চরম দুঃসংবাদ নিয়ে আসছে ব্রিটিশ সরকার। প্রস্তাবিত নতুন ও কঠোর অভিবাসন আইন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া ব্যক্তিদের রাষ্ট্র পরিচালিত আবাসন ও থাকা-খাওয়ার খরচের অংশ হিসেবে প্রায় ১০ হাজার পাউন্ড বা ১৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ না করলে তারা দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের (সেটেলমেন্ট) অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারবেন না। মঙ্গলবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এ-সংক্রান্ত নতুন ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম বিল’ উত্থাপনের কথা রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা নতুন এই আয়ভিত্তিক পরিশোধ ব্যবস্থাকে অনেকটা শিক্ষা ঋণ ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে মানবাধিকার ও শরণার্থী সহায়তা সংস্থাগুলো এর তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, যুদ্ধ, নির্যাতন বা দুর্ভিক্ষ থেকে পালিয়ে আসা অসহায় মানুষদের ওপর এটি কার্যত এক ধরনের অতিরিক্ত কর বা বোঝা চাপানোর শামিল। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এই পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছেন, বর্তমানে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন ও সহায়তার পেছনে সরকারের বছরে প্রায় ৪০০ কোটি পাউন্ড ব্যয় হচ্ছে। তিনি বলেন, আশ্রয় পাওয়া যেমন একটি অধিকার, তেমনি এটি একটি দায়িত্বও। মানুষ যখন আয় করতে সক্ষম হবে, তখন ব্রিটিশ জনগণের উদারতার প্রতিদান হিসেবে তাদের কাছ থেকে সরকার এই আর্থিক অবদান প্রত্যাশা করে। তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারের এই উদ্যোগ আর্থিকভাবে খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরির পরিচালক ম্যাডেলিন সাম্পশন জানান, তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী পাঁচ বছর আগে শরণার্থী মর্যাদা পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশের বার্ষিক আয় ২০ হাজার পাউন্ড বা তার বেশি। তাই খুব অল্পসংখ্যক মানুষই এই অর্থ পরিশোধের মতো আয়ের স্তরে পৌঁছাতে পারবেন। উল্টো এই নিয়মের কারণে অনেকেই সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে না থেকে বিকল্প বাসস্থানের পথ খুঁজতে পারেন এবং বেশি কর দেওয়ার ভয়ে বৈধভাবে কাজ করার প্রতি নিরুৎসাহিত হতে পারেন। হোম অফিস জানিয়েছে, আয়সীমাসহ বিস্তারিত বিষয়গুলো দ্বিতীয় পর্যায়ের বিধিমালায় চূড়ান্ত করা হবে। প্রস্তাবিত এই বিলে শুধু অর্থ পরিশোধের নিয়মই নয়, বরং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের আরও কিছু কঠোর পদক্ষেপ যুক্ত করা হয়েছে। ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ৮-এর প্রয়োগ, অভিবাসীদের বয়স নির্ধারণ প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা এবং ‘আধুনিক দাসত্ব’ বা মডার্ন স্লেভারি-সংক্রান্ত আইনি কাঠামো সংশোধনের পরিকল্পনাও এই বিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতি যে আগামীতে নজিরবিহীন কঠোর হতে যাচ্ছে, তা এই নতুন বিল থেকেই স্পষ্ট।
যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ পুলিশি নিরাপত্তা না পাওয়ায় শেষ মুহূর্তে সপরিবারে ব্রিটেন সফর বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন ডিউক অব সাসেক্স প্রিন্স হ্যারি। আগামী জুলাই মাসে বার্মিংহামে অনুষ্ঠিতব্য ‘ইনভিক্টাস গেমস’-এর বিশেষ কর্মসূচিতে অংশ নিতে দীর্ঘ চার বছর পর পুরো পরিবার নিয়ে যুক্তরাজ্যে আসার পরিকল্পনা ছিল হ্যারি ও মেগান দম্পতির। কিন্তু সরকারের এই নেতিবাচক সিদ্ধান্তের কারণে তাদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। সফরটি বাতিল হওয়ায় প্রিন্স হ্যারি প্রচণ্ড মর্মাহত হয়েছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। হ্যারির মূল লক্ষ্য ছিল আগামী মাসের শুরুতে এই সফরের মাধ্যমে তার দুই সন্তান— সাত বছর বয়সী প্রিন্স আর্চি এবং পাঁচ বছর বয়সী প্রিন্সেস লিলিবেটকে তাদের দাদা রাজা চার্লসের সাথে দেখা করানো। ২০২২ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্ল্যাটিনাম জুবিলি উদযাপনের পর থেকে রাজা চার্লস তার এই ছোট নাতি-নাতনিদের সামনাসামনি দেখেননি। তবে রাজকীয় বাসভবনের বাইরে সরকারি পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়ার অনুরোধ ব্রিটিশ সরকার প্রত্যাখ্যান করায় এই পারিবারিক সফর এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। হ্যারির ঘনিষ্ঠ সূত্রটি জানায়, "একেবারে শেষ মুহূর্তে তাদের পা তলা থেকে মাটি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। হ্যারি তার সন্তানদের এমন কোনো পরিস্থিতিতে ফেলতে চান না, যেখানে বিমান থেকে নামার পর থেকেই পাপারাজ্জিরা (সাংবাদিকরা) তাদের তাড়া করবে।" হ্যারি বিকল্প উপায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আসার চেষ্টা করলেও তা কতটুকু সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এর আগে যুক্তরাজ্যে আসার সময় স্বয়ংক্রিয় পুলিশি নিরাপত্তার দাবিতে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (হোম অফিস) বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে হেরে গিয়েছিলেন প্রিন্স হ্যারি। এরপর রাজকীয় ও ভিআইপি নির্বাহী কমিটি তার নিরাপত্তার বিষয়টি মূল্যায়ন করছিল, যাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই এই সুরক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। তবে ব্রিটিশ সরকারের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর ও আনুপাতিক এবং নীতিগত কারণে এই নিরাপত্তার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ক্যালিফোর্নিয়ার মন্টেসিটোতে বসবাসকারী হ্যারি ও মেগানের এই সফর বাতিলের ফলে রাজা চার্লসের সাথে তাদের সম্পর্ক জোড়া লাগার প্রক্রিয়া আবারও বাধাগ্রস্ত হলো। গত সেপ্টেম্বর মাসে লন্ডনের ক্লারেন্স হাউসে বাবা-ছেলের শেষ দেখা হয়েছিল, যা তাদের মধ্যকার শীতল সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু নিরাপত্তার এই নতুন জটিলতা রাজপরিবারের এই পুনর্মিলনকে আবারও দূরে ঠেলে দিল।
ব্রেক্সিটের গণভোটের এক দশক পূর্ণ হলেও এর অর্থনৈতিক অভিঘাত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি যুক্তরাজ্য। ২০১৬ সালের ২৩ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার পক্ষে গণভোটের ফল প্রকাশের পর যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার শুরু হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো দেশটির প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য, মূল্যস্ফীতি ও জনসেবায় স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে এবং এর প্রভাব আগামী বছরগুলোতেও বহাল থাকতে পারে। ব্রেক্সিটের ১০ বছর পূর্তিতে জনমতেও পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দেওয়া প্রায় ২৩ শতাংশ ভোটার এখন সেই সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত। কেউ ইউরোপ সম্পর্কে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছেন, আবার কেউ মনে করেন, ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়া সঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি। অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ বলছে, ব্রেক্সিটের ফলে যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অর্থাৎ, ব্রেক্সিট না হলে দেশটির অর্থনীতি বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বড় হতে পারত। এর ফলে সরকারের কর আদায়ও কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য জনসেবার বাজেটে। লন্ডনের কিংস কলেজের অর্থনীতি ও জননীতি বিভাগের অধ্যাপক জোনাথন পোর্টেস বলেন, অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এখন প্রায় স্পষ্ট ঐকমত্য রয়েছে যে ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক পলিসি রিসার্চের গবেষকেরা দুটি পৃথক পদ্ধতিতে ব্রেক্সিটের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। প্রথম বিশ্লেষণে গত ১০ বছরের প্রবৃদ্ধিকে অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনা করা হয়। সেখানে কোভিড-১৯, ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মতো বৈশ্বিক ঘটনাগুলোর প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, ব্রেক্সিট না হলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বড় হতে পারত। দ্বিতীয় বিশ্লেষণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে ব্যবসা করা ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হয়। দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়েছে। এই বিশ্লেষণেও অর্থনীতি প্রায় ৬ শতাংশ ছোট হয়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রেক্সিটের সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে বাণিজ্যে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পর সীমান্তে নতুন কাস্টমস বিধি, অতিরিক্ত কাগজপত্র ও প্রশাসনিক জটিলতায় ব্যবসার ব্যয় এবং সময় দুটিই বেড়েছে। বিশেষ করে গাড়ি শিল্প, কৃষি ও খাদ্যপণ্য রপ্তানি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের এক শুনানিতে এক লজিস্টিকস ব্যবসায়ী জানান, ব্রেক্সিটের আগে ইউরোপে মাংস রপ্তানিতে একটি কাগজই যথেষ্ট ছিল, অথচ এখন একই পণ্য পাঠাতে প্রয়োজন হয় ২৬টি সরকারি অনুমোদনপত্র। যদিও যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে নতুন একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, যা কার্যকর হলে দুগ্ধজাত পণ্য, ডিম, মাছ ও তাজা মাংস রপ্তানি সহজ হতে পারে। তবে সেটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০২৭ সালের গ্রীষ্ম। এরই মধ্যে অতিরিক্ত ব্যয় ও জটিলতায় অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। ব্রিটেনের ফুড অ্যান্ড ড্রিংক ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে দেশটির খাদ্যপণ্য রপ্তানি প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গেছে। ব্রেক্সিটের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও স্পষ্ট। গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিতে এর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। কমলার রসের মতো কিছু নিত্যপণ্যের দাম ১৩৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি থওয়েটস বলেন, এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দারিদ্র্য বা খাদ্য ব্যাংকের ব্যবহার বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোকে শুধু ব্রেক্সিটের ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; এর পেছনে আরও নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের একমাত্র অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। বিনিয়োগের ঘাটতি, ধীর প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতার সংকট আগে থেকেই ছিল। তবে ব্রেক্সিট এসব সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। জিডিপি কমে যাওয়ার ফলে সরকারের কর রাজস্বও কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো ও অন্যান্য জনসেবায়। একই সঙ্গে কারাগার ব্যবস্থা, সড়ক অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাতেও আর্থিক চাপ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব না হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ নীতি সংস্কারের মাধ্যমে এর প্রভাব কিছুটা কমানো যেতে পারে। অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি থওয়েটসের ভাষায়, বর্তমান ক্ষতির বড় অংশ স্থায়ী হয়ে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতেও যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি একই ধরনের চাপে থাকতে পারে।
যুক্তরাজ্যে এক ব্যক্তি মদ্যপ অবস্থায় নিজের ব্যাগে থাকা ছুরির ওপর অসাবধানতাবশত অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়ে নিজের মৃত্যুকে ডেকে এনেছেন। গত বছরের ১ আগস্ট সকালে নর্থহ্যাম্পটনের একটি খালের পাশের ফুটপাতে ৫৭ বছর বয়সী রবার্ট ব্রাউনকে রক্তাক্ত অবস্থায় একটি বেঞ্চে পড়ে থাকতে দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন এটিকে একটি হত্যাকাণ্ড বলে ধরে নিয়েছিল। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে স্থানীয় পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তারও করেছিল, তবে পরবর্তীতে দীর্ঘ তদন্ত শেষে তাদের কোনো দোষ না পেয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের জন্য আয়োজিত একটি আদালত শুনানিতে তদন্তকারীরা জানান, ব্রাউন আসলে মদ্যপ অবস্থায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। অসাবধানতাবশত ঘুমের ঘোরে গড়িয়ে তিনি নিজের পিঠের ব্যাগে রাখা একটি তীক্ষ্ণ ছুরির ওপর চেপে বসেন। পাঁচ ইঞ্চি লম্বা একধারের ধারালো ব্লেডটি ব্রাউনের ব্যাগ এবং তার পরিহিত কাপড়ের তিনটি স্তর ভেদ করে সরাসরি তার বাহুতে গিয়ে আঘাত করে। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে থাকে এবং তিনি ঘুমন্ত অবস্থাতেই বেঞ্চের ওপর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বিশেষজ্ঞরা আদালতে জানান, ব্রাউন দীর্ঘদিন ধরে তীব্র অ্যালকোহল বা মদ পানের সমস্যায় ভুগছিলেন। এই ধরনের আসক্তি মানুষের শরীরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত মদ পানের কারণে তিনি যখন ছুরির আঘাত পান, তখন ব্যথার অনুভূতি তীব্র থাকা সত্ত্বেও তিনি তা টের পাননি এবং গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠতে পারেননি। ফলস্বরূপ, কোনো ধরণের প্রতিরোধ বা চিকিৎসার সুযোগ ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে রক্তক্ষরণের কারণে তার শরীর আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ঘটনার পর নর্থহ্যাম্পটনশায়ার পুলিশ দীর্ঘ ছয় মাস ধরে একটি হত্যা মামলার তদন্ত চালিয়ে আসছিল। পরবর্তীতে সব ধরণের ফরেনসিক ও পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ যাচাই করে তারা নিশ্চিত হয় যে এখানে কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। তদন্তের গতিপ্রকৃতি বিবেচনা করে পুলিশ প্রশাসন এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাদের হত্যা মামলার তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেয়। তারা এক বিবৃতিতে ঘোষণা করে যে, এই ক্ষতটি খুব সম্ভবত কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া সম্পূর্ণ নিজের মাধ্যমেই অনিচ্ছাকৃতভাবে তৈরি হয়েছিল। আদালতের শুনানির পর চলতি সপ্তাহে রবার্ট ব্রাউনের এই মর্মান্তিক মৃত্যুকে একটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হিসেবে চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়েছে। এই মামলার দায়িত্বে থাকা সিনিয়র করোনার অ্যান পেম্বার গত বৃহস্পতিবার পুরো ঘটনাটিকে একটি অত্যন্ত দুঃখজনক দুর্ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়নে এটি স্পষ্ট যে কোনো অপরাধমূলক চক্রের সাথে ব্রাউনের মৃত্যুর সম্পর্ক নেই। এটি কেবলই অসাবধানতা এবং অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে সৃষ্ট একটি চরম বিপর্যয়।
যুক্তরাজ্য ও ইউরোপজুড়ে রেকর্ড ভাঙা তীব্র দাবদাহের পর হঠাৎ বয়ে যাওয়া ভয়াবহ বজ্রঝড় ও ভারী বৃষ্টির কারণে লন্ডনের প্রধান দুটি বিমানবন্দর—হিথ্রো এবং গ্যাটউইকে বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির কারণে দুই বিমানবন্দরে যাতায়াতকারী ৬০০-এরও বেশি ফ্লাইট চরম বিলম্বের শিকার হয়েছে এবং কয়েক ডজন ফ্লাইট সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। ফলে তীব্র গরমের মধ্যে শত শত যাত্রী ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানের ভেতরেই আটকে আছেন। যুক্তরাজ্যের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ন্যাটস) জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডে আবহাওয়া পরিস্থিতি অত্যন্ত প্রতিকূল থাকায় এই অচলাবস্থা সারা দিন জুড়েই বজায় থাকতে পারে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট 'ফ্লাইটঅ্যাওয়ার'-এর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার হিথ্রো বিমানবন্দরের কমপক্ষে ৩৬৭টি এবং গ্যাটউইক বিমানবন্দরের ৩৫২টি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। অনেক যাত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, তারা সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত তীব্র গরমের মধ্যে বিমানের ভেতরেই বসে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু লন্ডনেই নয়, ইতালির ভেনিসসহ ইউরোপের অন্যান্য বিমানবন্দরেও হিথ্রো ও গ্যাটউইকগামী যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। ২৯ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ যাত্রী জানান, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) ছাড়াই ভেনিস বিমানবন্দরে তাদের অন্তত চার ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছে। এছাড়াও ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ এবং ইজিজেটের মতো বড় বড় বিমান সংস্থাগুলো প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাদের বেশ কিছু ফ্লাইট আগে থেকেই বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে এবং যাত্রীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। লন্ডনের প্রধান দুটি বিমানবন্দর ছাড়াও লিডস ব্র্যাডফোর্ড, এডিনবার্গ এবং লন্ডন সিটি এয়ারপোর্টেও এই বৈরী আবহাওয়ার কারণে বেশ কিছু ফ্লাইট বিলম্বিত ও বাতিল করা হয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিমানের এই শিডিউল বিপর্যয় ঠিক হতে আরও সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও চড়া বাড়ি ভাড়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থী নিজেদের আবাসন ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে নিজ বাড়িতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা নিজেদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও ক্যাম্পাস জীবনকে সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আর্থিক দুশ্চিন্তার কারণে তরুণদের একটি বড় অংশ ঐতিহ্যবাহী আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের নানা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত রেজোলিউশন ফাউন্ডেশনের বার্ষিক 'ইন্টারজেনারেশনাল অডিট' রিপোর্টে দেখা গেছে, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে দরিদ্র এলাকার প্রায় ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিজেদের বাড়িতে থাকার পরিকল্পনা করছেন। এর বিপরীতে ধনী এলাকার মাত্র ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থী এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওই সংস্থার প্রেসিডেন্ট ডেভিড উইলেটস জানান, এটি কোনো স্বাধীন বা স্বাভাবিক পছন্দ নয়, বরং সম্পূর্ণ আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকছেন, যা তাদের পরবর্তী জীবনের সামাজিক নেটওয়ার্ক ও সুযোগকে প্রভাবিত করছে। লন্ডন রেন্ট বা উচ্চ ভাড়ার কারণে অনেক শিক্ষার্থীই দৈনিক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্যাম্পাসে যাতায়াত করছেন। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ১৯ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী জানান, সকালে ক্লাস শেষ হলেও ক্যারিয়ার বিষয়ক নানা সেমিনার বা সামাজিক ক্লাবের অনুষ্ঠান থাকে সন্ধ্যায়, যার কারণে দীর্ঘ সময় তাঁকে ক্যাম্পাসে অপেক্ষা করতে হয়। বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় ও অর্থের অপচয় এড়াতে এই দীর্ঘ অপেক্ষার ফলে তিনি প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ফলে অনেকেই স্বতঃস্ফূর্ত আড্ডা, নেটওয়ার্কিং এবং ক্যারিয়ারের বড় বড় সুযোগগুলো হাতছাড়া করছেন। তবে এই পরিস্থিতির কিছু ইতিবাচক দিকও দেখছেন শিক্ষাবিদদের একাংশ। লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, বাড়িতে থাকার কারণে তাঁকে বাড়তি ভাড়ার টাকা জোগাতে পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম চাকরি করতে হচ্ছে না, ফলে তিনি পড়াশোনায় বেশি মনোযোগ দিতে পারছেন। হাইয়ার এডুকেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর নিক হিলম্যান বলেন, বাড়িতে থাকার অর্থ হলো কম ঋণ, পরিবারের দৃঢ় সমর্থন এবং পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া। মূল বিষয় হলো শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছেন কি না। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টস এবং সাটন ট্রাস্টের গবেষকরা অবশ্য মনে করছেন, ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের কোর্স পাওয়া যায় না, যার ফলে দরিদ্র শিক্ষার্থীরা তাঁদের পছন্দের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারছেন না। দেশটির বর্তমান অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং আবাসন সংকটের কারণে ঐতিহ্যবাহী আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জীবন এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের এই বৈষম্য দূর করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই যুগে বেকারদের জন্য আশার আলো নিয়ে এসেছে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত সুপারমার্কেট চেইন ‘লিডল’। প্রতিষ্ঠানটি এমন এক অভিনব নিয়োগ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেখানে কমপক্ষে ছয় মাস ধরে বেকার থাকা প্রার্থীরা কোনো জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি জমা দেওয়া ছাড়াই সরাসরি ইন্টারভিউয়ের সুযোগ পাবেন। আগামী এক বছর ধরে লিডল তাদের স্টোরের এন্ট্রি-লেভেলের পদ এবং ওয়্যারহাউসের প্রায় ৫০০টি পদে দীর্ঘমেয়াদি বেকারদের জন্য এই বিশেষ সুযোগটি সংরক্ষিত রাখবে। চাকরিপ্রার্থীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের প্রস্তুতিতে সহায়তা করতে যুক্তরাজ্যের কর্মসংস্থান ও পেনশন বিভাগের (ডিডব্লিউপি) সাথে যৌথভাবে কাজ করবে প্রতিষ্ঠানটি। ব্রিটেনের শ্রমবাজার যখন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই এমন একটি ইতিবাচক উদ্যোগ সামনে এলো। কনফেডারেশন অফ ব্রিটিশ ইন্ডাস্ট্রির (সিবিআই) সাম্প্রতিক সতর্কতা অনুযায়ী, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে কর্মসংস্থান পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। চলতি মাসে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানেও দেখা গেছে, দেশটিতে চাকরির শূন্যপদ গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে (৭ লাখ ৭ হাজারে) নেমে এসেছে। এমন বাস্তবতায় লিডল গ্রেট ব্রিটেনের চিফ পিপল অফিসার স্টেফানি রজার্স জানান, বেকারত্ব সারা দেশের মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং এই উদ্যোগটি মূলত তাদের জন্যই নেওয়া হয়েছে, যাদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের প্রথম ধাপটি পার হতে সবচেয়ে বেশি সংগ্রাম করতে হয়। যুক্তরাজ্যের কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী ডেম ডায়ানা জনসনও এই উদ্যোগের প্রশংসা করে একে ‘কল্যাণ থেকে কর্মসংস্থানে’ ফেরার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে অভিহিত করেছেন। নতুন এই উদ্যোগের পাশাপাশি গৃহহীনদের কর্মসংস্থানে সহায়তাকারী দাতব্য সংস্থা ‘স্ট্যান্ডিং টল’-কে ৫০ হাজার পাউন্ড অনুদান দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে লিডল। গত বছর সফল একটি পাইলট প্রকল্পের পর এই অংশীদারিত্বের পরিধি বাড়ানো হয়েছে, যেন আগামী বছরগুলোতে আরও বেশি গৃহহীন মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের আওতায় আনা যায়। উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালে যুক্তরাজ্যে যাত্রা শুরু করা লিডল বর্তমানে ১ হাজারের বেশি স্টোর পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা রিটেইল খাতে অন্যতম সর্বোচ্চ প্রারম্ভিক মজুরি পাবেন, যা দেশব্যাপী ঘণ্টায় ১৩.৪৫ পাউন্ড থেকে শুরু হবে এবং কাজের মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে তা ১৪.৪৫ পাউন্ড পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
নিজেদের যুদ্ধবিমানের বহর সচল রাখতে যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে বাতিল ও অবসরে যাওয়া ৯টি জাগুয়ার যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। তবে এই বিমানগুলো সরাসরি আকাশে ওড়ানোর জন্য নয়, বরং ভারতের নিজস্ব যুদ্ধবিমানগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও পুনঃব্যবহারযোগ্য উপাদান সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করা হবে। বর্তমানে স্কোয়াড্রন সংকট এবং খুচরা যন্ত্রাংশের তীব্র ঘাটতির মুখে থাকা ভারতীয় বিমান বাহিনীর জন্য এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে অনুমোদিত ৪২টি স্কোয়াড্রনের বিপরীতে ভারতীয় বিমান বাহিনীর সক্রিয় স্কোয়াড্রন সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৯টিতে। এর মধ্যে এখনও জাগুয়ার যুদ্ধবিমানের ৬টি স্কোয়াড্রন পরিচালনা করছে তারা। সারা বিশ্বের মধ্যে বর্তমানে ভারতীয় বিমান বাহিনীই একমাত্র সামরিক বাহিনী, যারা এখনও এই পুরোনো জাগুয়ার যুদ্ধবিমান সচল রেখেছে। এই বিমানগুলো থেকে ল্যান্ডিং গিয়ার, হাইড্রোলিক ব্যবস্থা, অ্যাভিওনিক্স এবং রোলস-রয়েস অ্যাডুর ইঞ্জিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে নিজেদের ঘাটতি মেটাবে ভারত। বিদেশ থেকে অবসরপ্রাপ্ত জাগুয়ার সংগ্রহ করার ঘটনা ভারতের জন্য এবারই প্রথম নয়। এর আগেও ফ্রান্স, ওমান এবং যুক্তরাজ্য থেকে অবসরে যাওয়া জাগুয়ার বিমান সংগ্রহ করেছিল দেশটি। ২০১৮ সালে ফ্রান্স বিনামূল্যে ৩১টি অবসরপ্রাপ্ত জাগুয়ার বিমান, ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ ভারতকে দিয়েছিল এবং ওমানের সঙ্গেও ২০টির বেশি ভালো মানের অবসরপ্রাপ্ত জাগুয়ার হস্তান্তরের চুক্তি হয়েছিল। মূলত ১৯৮০-এর দশকে প্রথম এই মডেলের যুদ্ধবিমান সংগ্রহ শুরু করেছিল ভারত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, গত এক দশকে তাদের জাগুয়ার বহরের প্রায় অর্ধেক বিমানকে আধুনিক মানের ‘ড্যারিন-৩’ (DARIN-III) প্রযুক্তিতে উন্নীত করা হয়েছে। এই আধুনিকায়নের ফলে বিমানগুলোতে উন্নত রাডার সংযোজন, একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত, ভূখণ্ডের মানচিত্র তৈরি এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে। তবে বহরের বাকি পুরোনো বিমানগুলোর পেছনে নতুন করে বিনিয়োগ করাকে উপযুক্ত মনে না করায়, সেগুলো আগামী ২০২৮ সাল থেকে ধীরে ধীরে অবসরে পাঠানো শুরু হবে। এক সময় ড্যারিন-৩ উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে মাল্টি বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের মাধ্যমে পুরোনো অ্যাডুর ইঞ্জিনের পরিবর্তে হানিওয়েল এফ-১২৫এন ইঞ্জিন বসানোর পরিকল্পনা করেছিল ভারতীয় বিমান বাহিনী। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে সেই পরিকল্পনা পরে বাতিল করা হয়। নতুন কোনো যুদ্ধবিমান বহরে যুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত সক্ষমতার ঘাটতি পূরণ করতে এবং আগামী দশকজুড়ে জাগুয়ারের সেবা নিশ্চিত করতেই ভারত এই বাতিল বিমানগুলো সংগ্রহের ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।