যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক শান্তিচুক্তি রোববার স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে চুক্তিতে সই করবেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের আশাবাদের পর একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ইরান বলছে, রোববার নয়, চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে।
শনিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত, সহজ এবং নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা করছেন। তিনি লিখেছেন, “আগামীকাল (আজ) চুক্তিটি সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি সই হওয়ার পরপরই হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে।”
এর আগে শনিবার বেলা ১১টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, “আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন শান্তিচুক্তির আরও কাছাকাছি অবস্থানে আছি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তির চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হতে পারে। এরপরই শান্তিচুক্তি ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সই হবে। পাকিস্তান এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর পরের সপ্তাহে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা হবে।”
তবে চুক্তি স্বাক্ষরের নির্দিষ্ট সময় নিয়ে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, স্বাক্ষরের সঠিক সময় সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তি আগামীকাল নয়, বরং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে স্বাক্ষর হতে পারে।
এদিকে এমন এক সময় এই অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যখন শনিবার ভোরেও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একাধিক ড্রোন ধ্বংস করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের কর্মকর্তারা গত শুক্রবার থেকে ধারাবাহিকভাবে চুক্তি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে আসছেন। যুদ্ধ শুরুর পর গত তিন মাসে এমন ইতিবাচক বার্তা আগে দেখা যায়নি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, “ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছেছে।”
পরে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি সতর্ক করে বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি না হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো সমঝোতা হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। তিনি আরও জানান, চুক্তিটি দূরবর্তী বা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হবে।
আরাগচির এই বক্তব্যের আগে পশ্চিমা এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও পরোক্ষভাবে সেই সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
চুক্তিতে ইরান বেশি সুবিধা পাচ্ছে বলে যে আলোচনা চলছে, তার জবাবে শুক্রবার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “ইরান যেসব শর্ত ফেক নিউজ বা ভুয়া খবর হিসেবে ফাঁস করেছে, তার সঙ্গে লিখিতভাবে যেসব শর্তে সম্মতি হয়েছে, তার কোনো সম্পর্ক নেই।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত সমঝোতা চুক্তির ধারাগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করা হতে পারে।
এ ছাড়া ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, তেহরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং দেশটির জব্দ অর্থের একটি অংশ ছাড় দেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, প্রাথমিক এই চুক্তিতে পারমাণবিক কর্মসূচি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত থাকছে না। এ বিষয়ে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আলাদা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে এখনো পার্থক্য রয়েছে। হোয়াইট হাউসের দাবি, প্রাথমিক সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরান নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি বাতিল এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা অন্যত্র স্থানান্তরে সম্মত হয়েছে।
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস করা হবে না এবং কোনো বিদেশি রাষ্ট্রেও পাঠানো হবে না। বরং দেশের ভেতরেই সংরক্ষণ করে এর সমৃদ্ধতার মাত্রা কমিয়ে আনা হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। সংঘাত শুরুর ৪০ দিন পর, গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
এরপর ১১ ও ১২ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। পরে নতুন করে দ্বিতীয় দফা আলোচনার চেষ্টা চলতে থাকে।
বর্তমানে যে সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে, তা দুই দেশের কর্মকর্তাদের সরাসরি উপস্থিতিতে নয়; বরং ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হবে বলে জানা গেছে।
সংঘাতের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির একাধিক শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতা আগামী ৪ জুলাই শুরু হবে এবং ৯ জুলাই মাশহাদ শহরে তাঁকে দাফন করা হবে।
এদিকে সম্ভাব্য চুক্তির আলোচনার মধ্যেই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত আরও কঠোর নিরাপত্তার আওতায় নিয়েছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য কোনো মার্কিন অভিযানের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম জব্দ ঠেকাতে কিছু ভূগর্ভস্থ টানেল ধ্বংস করা হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে।
বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যার সক্ষমতা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পর্যায়ে বলে ধারণা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক পরিণতির খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ জামিল লিমনের (২৭) মরদেহ উদ্ধার করা হলেও, পুলিশ ধারণা করছে নাহিদা বৃষ্টিকেও (২৭) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। অভিযুক্ত ঘাতক ও লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়ার ফ্ল্যাটে ‘প্রচুর রক্ত’ পাওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছে, বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভবত আর কখনোই সম্ভব হবে না। নিহত বৃষ্টির বড় ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘১০ টাম্পা বে নিউজ’-কে জানান, শুক্রবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারীরা বাংলাদেশে তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, লিমন ও হিশামের শেয়ার করা ফ্ল্যাটে যে পরিমাণ রক্ত পাওয়া গেছে, তা থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে বৃষ্টি আর বেঁচে নেই। পুলিশের আশঙ্কা, হত্যার পর মরদেহটি সম্ভবত ছিন্নবিচ্ছিন্ন বা টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে, যার ফলে এটি খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। গত শুক্রবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশ থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই সকাল ৯টার দিকে ইউএসএফ ক্যাম্পাসের কাছে লেক ফরেস্ট এলাকায় অভিযুক্ত হিশাম আবুগারবিয়ার বাড়িতে অভিযান চালায় হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়। পুলিশ হিশামের বাড়িতে পৌঁছালে তিনি নিজেকে ঘরের ভেতর তালাবদ্ধ করে রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ‘সোয়াট’ (SWAT) তলব করা হয়। প্রায় ২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির পর হিশাম আত্মসমর্পণ করেন। তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা এবং অবৈধভাবে মরদেহ সরানোর মতো ছয়টি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হিশাম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। তিনি লিমনের রুমমেট হিসেবে একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। অন্যদিকে, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি গবেষণারত নাহিদা বৃষ্টি গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন। লিমনের সাথে তার আগে প্রেমের সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে ছিল না বলে জানিয়েছেন বৃষ্টির পরিবার। তদন্তকারীরা লিমনের মৃত্যু নিশ্চিত করলেও বৃষ্টির নিখোঁজ রহস্য ও তাকে হত্যার নৃশংসতা এখন পুরো ফ্লোরিডা ও বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক শান্তিচুক্তি রোববার স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে চুক্তিতে সই করবেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের আশাবাদের পর একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ইরান বলছে, রোববার নয়, চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে। শনিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত, সহজ এবং নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা করছেন। তিনি লিখেছেন, “আগামীকাল (আজ) চুক্তিটি সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি সই হওয়ার পরপরই হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে।” এর আগে শনিবার বেলা ১১টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, “আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন শান্তিচুক্তির আরও কাছাকাছি অবস্থানে আছি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তির চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হতে পারে। এরপরই শান্তিচুক্তি ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সই হবে। পাকিস্তান এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর পরের সপ্তাহে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা হবে।” তবে চুক্তি স্বাক্ষরের নির্দিষ্ট সময় নিয়ে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, স্বাক্ষরের সঠিক সময় সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তি আগামীকাল নয়, বরং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে স্বাক্ষর হতে পারে। এদিকে এমন এক সময় এই অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যখন শনিবার ভোরেও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একাধিক ড্রোন ধ্বংস করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইরান। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের কর্মকর্তারা গত শুক্রবার থেকে ধারাবাহিকভাবে চুক্তি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে আসছেন। যুদ্ধ শুরুর পর গত তিন মাসে এমন ইতিবাচক বার্তা আগে দেখা যায়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, “ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছেছে।” পরে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি সতর্ক করে বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি না হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো সমঝোতা হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। তিনি আরও জানান, চুক্তিটি দূরবর্তী বা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হবে। আরাগচির এই বক্তব্যের আগে পশ্চিমা এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও পরোক্ষভাবে সেই সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। চুক্তিতে ইরান বেশি সুবিধা পাচ্ছে বলে যে আলোচনা চলছে, তার জবাবে শুক্রবার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “ইরান যেসব শর্ত ফেক নিউজ বা ভুয়া খবর হিসেবে ফাঁস করেছে, তার সঙ্গে লিখিতভাবে যেসব শর্তে সম্মতি হয়েছে, তার কোনো সম্পর্ক নেই।” যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত সমঝোতা চুক্তির ধারাগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করা হতে পারে। এ ছাড়া ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, তেহরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং দেশটির জব্দ অর্থের একটি অংশ ছাড় দেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, প্রাথমিক এই চুক্তিতে পারমাণবিক কর্মসূচি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত থাকছে না। এ বিষয়ে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আলাদা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে এখনো পার্থক্য রয়েছে। হোয়াইট হাউসের দাবি, প্রাথমিক সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরান নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি বাতিল এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা অন্যত্র স্থানান্তরে সম্মত হয়েছে। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস করা হবে না এবং কোনো বিদেশি রাষ্ট্রেও পাঠানো হবে না। বরং দেশের ভেতরেই সংরক্ষণ করে এর সমৃদ্ধতার মাত্রা কমিয়ে আনা হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। সংঘাত শুরুর ৪০ দিন পর, গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এরপর ১১ ও ১২ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। পরে নতুন করে দ্বিতীয় দফা আলোচনার চেষ্টা চলতে থাকে। বর্তমানে যে সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে, তা দুই দেশের কর্মকর্তাদের সরাসরি উপস্থিতিতে নয়; বরং ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হবে বলে জানা গেছে। সংঘাতের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির একাধিক শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতা আগামী ৪ জুলাই শুরু হবে এবং ৯ জুলাই মাশহাদ শহরে তাঁকে দাফন করা হবে। এদিকে সম্ভাব্য চুক্তির আলোচনার মধ্যেই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত আরও কঠোর নিরাপত্তার আওতায় নিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য কোনো মার্কিন অভিযানের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম জব্দ ঠেকাতে কিছু ভূগর্ভস্থ টানেল ধ্বংস করা হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে। বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যার সক্ষমতা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পর্যায়ে বলে ধারণা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও এক অদ্ভুত ও তীব্র আক্রমণাত্মক পোস্ট দিয়েছেন। ইরানকে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করার পাশাপাশি সেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধকে ইতিহাসের সবচেয়ে সফল পদক্ষেপ বলে দাবি করেছেন তিনি। একই সঙ্গে ইরানকে উপহাস করতে গিয়ে নিজের পোস্টে ‘আল্লাহর প্রশংসা’ বা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছেন। বুধবার সকালে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প মূলধারার গণমাধ্যম বা ‘ফেইক নিউজ মিডিয়া’র ওপর তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি দাবি করেন, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ নৌযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ও শক্তিশালী পদক্ষেপ। ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছেন যে, আমেরিকা না চাইলে কোনো কিছুই সেখান দিয়ে পার হতে পারবে না এবং এই অবরোধ একটি ইস্পাত কঠিন প্রাচীরের মতো কাজ করছে। এর ফলে ইরানের ব্যবসা-বাণিজ্য এখন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং তারা তাদের সামরিক বাহিনী বা অন্য কোনো বিল পরিশোধ করতে পারছে না। ইরান দ্রুত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে দাবি করে তিনি উপহাসের ছলে ‘আল্লাহর প্রশংসা’ শব্দগুচ্ছটি যুক্ত করেন। ইরানকে লক্ষ্য করে ট্রাম্পের মুখে এই ধরনের ধর্মীয় শব্দগুচ্ছ ব্যবহারের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে গত এপ্রিল মাসেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে দেওয়া এক অত্যন্ত আক্রমণাত্মক পোস্টে তিনি একইভাবে ‘আল্লাহর প্রশংসা’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। বুধবার ভোরের দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, তেহরান একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য খুব বেশি সময় নষ্ট করে ফেলেছে এবং এখন তাদের এর চড়া মূল্য দিতে হবে। সেই সাথে তিনি ইরানের সামরিক বাহিনীকে একটি সম্পূর্ণ এবং চরম বিশৃঙ্খলা হিসেবে বর্ণনা করেন। এদিকে দুই দেশের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনা দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, মঙ্গলবার মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালির ওপরে আমেরিকার একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই নতুন হামলার ঘোষণা দেন। ট্রাম্প জানান, সোমবার সন্ধ্যার ওই হামলায় হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হলেও এর দুই পাইলটকে নিরাপদ ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। মার্কিন এই হামলার জবাবে তেহরানও পাল্টা তীব্র পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা বাহরাইন, কুয়েত এবং জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে অন্তত চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং বেশ কয়েকটি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। সব মিলিয়ে অঞ্চলটিতে এখন এক চরম যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে।
য়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরবর্তী দফার শান্তি আলোচনা কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক গুঞ্জন চলছে। পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে ইরানি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো নিশ্চয়তা না পাওয়া গেলেও, কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতার ক্ষেত্র প্রস্তুত রয়েছে। বর্তমানে আলোচনার সম্ভাব্য স্থান হিসেবে দুটি শহরকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। খবর আল জাজিরার। আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হলো ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান পরবর্তী ২০ বছর সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখুক। অন্যদিকে, তেহরান পাঁচ বছরের একটি প্রস্তাব দিচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আলোচনার মাধ্যমে এই সময়ের ব্যবধান কমিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। অবরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা স্পষ্ট সংকেত দিয়েছেন, এই কৌশলগত জলপথের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা আগের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ে সৃষ্ট একটি জটিলতা নিরসনেও ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আমেরিকানদের দাবি অনুযায়ী, ইরানের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত পারমাণবিক স্থাপনায় ৪৫০ কেজির বেশি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পুঁতে রাখা হয়েছে। ইরানিদের মতে, এই ইউরেনিয়াম অপসারণ করে সেটিকে তিন শতাংশেরও কম পরিমাণে লঘু করা সম্ভব, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার উদ্বেগকে অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে। এ সব বিষয়ে বর্তমানে আলোচনার জন্য দুটি সম্ভাব্য স্থান—ইসলামাবাদ ও ইস্তাম্বুলকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। যদিও ইরানি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট স্থানের নাম নিশ্চিত করা হয়নি, তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে- বেশ কয়েকটি অমীমাংসিত বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।