কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বৈঠক হওয়ার যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা নাকচ করেছে তেহরান। ইরান জানিয়েছে, এ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনো কারিগরি বৈঠকের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়নি। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি এ তথ্য জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা নেই। তবে কাতারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, পারস্পরিক হামলা বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ নিরসনে মঙ্গলবার দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা বৈঠকে বসতে পারেন। প্রাথমিকভাবে এসব আলোচনা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে হওয়ার কথা থাকলেও, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে পরিস্থিতি শান্ত করাই এখন আলোচনার প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, ইরান বৈঠকের অনুরোধ করেছে এবং সেটি পরদিন দোহায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান এখনো ভিন্ন। ইরানের দাবি, সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে তারা প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকা উচিত নয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ইরান। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে কিছু অবরোধ প্রত্যাহার করে। গত সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনায় হরমুজ প্রণালিতে যোগাযোগ সমন্বয়ের জন্য একটি ‘হটলাইন’ চালুর বিষয়ে দুই পক্ষ নীতিগতভাবে একমত হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এবং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর মধ্যে এই হটলাইন চালু হওয়ার কথা ছিল। তবে গত শনিবার পর্যন্ত সেটি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আনতে এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধ নিরসনে আবারও আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি হামলা, হুমকি ও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার পর ঝুঁকির মুখে পড়া অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি সমঝোতা টিকিয়ে রাখতেই এই কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, আগামী মঙ্গলবার কাতারে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা, সামরিক উত্তেজনা কমানো এবং এর আগে হওয়া সমঝোতার বিভিন্ন কারিগরি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। গত ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিকে নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখা ছিল ওই চুক্তির প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এখানে অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। এর আগে সুইজারল্যান্ডে মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফের মধ্যে বৈঠকের পর দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর আরোপিত কয়েকটি নিষেধাজ্ঞাও শিথিল করে। তবে এই ইতিবাচক পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অল্প সময়ের মধ্যেই দুই দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলার ঘটনায় উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে যায়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানকে কড়া বার্তা দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সংযত থাকা কঠিন হয়ে যাবে। এর পরপরই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করে। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল আগের মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়া। তবে মার্কিন সূত্র জানিয়েছে, ওই হামলায় তাদের কোনো সেনা সদস্য হতাহত হয়নি এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতিও ঘটেনি। অন্যদিকে কুয়েত কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। বাহরাইনের একটি আবাসিক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটায় দেশটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের দাবি জানিয়েছে। এই উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যে লেবাননেও পড়েছে। ইসরাইল জানিয়েছে, তারা দেশটিতে হিজবুল্লাহর বিভিন্ন স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে। এ বিষয়ে ইরান বলেছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ করা জরুরি। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কাতারে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আলোচনায় অগ্রগতি হলে চলমান উত্তেজনা কমার পাশাপাশি বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কাও অনেকটাই হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরপর দুই দিন ধরে জাহাজে হামলার ঘটনাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর রাতভর সামরিক হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আগামী ৩০ দিন গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। রোববার (২৮ জুন) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন আরাঘচি। তিনি বলেন, ইরানের ওপর ‘চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ’ পরিস্থিতির সর্বশেষ অবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি ইরাকি পক্ষকে অবহিত করেছেন। আরাঘচির ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী এক মাস হরমুজ প্রণালি ইরানের পূর্ণ তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এ সময়ের মধ্যে নৌপথে থাকা সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে এর স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই প্রণালির নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে ইরানের, অন্য কোনো দেশের এতে সংশ্লিষ্টতার সুযোগ নেই। তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, সমঝোতা স্মারকের আওতায় বিষয়টি পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত রয়েছে। ফলে কোনো দেশ বা পক্ষ একতরফা হস্তক্ষেপ করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং প্রণালির স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু করতে বিলম্ব হতে পারে। এদিকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তারা দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তেহরানের ওপরই বর্তায়। ফলে ভবিষ্যতে কোনো জাহাজ নিয়ম লঙ্ঘন করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার মতো কোনো অজুহাতে শত্রুপক্ষ যদি নতুন করে আগ্রাসন চালায়, তবে তার ‘দাঁতভাঙা জবাব’ দেওয়া হবে। তাদের মতে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন সমঝোতা স্মারকের পরিপন্থি এবং এতে চলমান সব কূটনৈতিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিওও প্রকাশ করা হয়েছে, যদিও তাতে স্পষ্ট কোনো দৃশ্য দেখা যায়নি। ইরানের দাবি, সাম্প্রতিক হামলায় তাদের পাঁচটি উপকূলীয় অবস্থান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি ঘিরে এমন উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়, ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে এবং দ্রুত উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালির কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার জবাবে ইরানের অভ্যন্তরে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের অব্যাহত আগ্রাসনের সরাসরি জবাব দিতেই এই কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল নিয়ে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় পানামার পতাকাবাহী একটি ট্যাংকারে একমুখী (ওয়ান-ওয়ে) ড্রোন দিয়ে হামলা চালায় ইরান। এই ঘটনার পরপরই মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের সামরিক নজরদারি অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা কেন্দ্র, ড্রোন সংরক্ষণের গুদাম এবং মাইন স্থাপনের সক্ষমতা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা পরিচালনা করে। তবে ইরানের ঠিক কোন কোন এলাকায় এসব হামলা চালানো হয়েছে, সেন্টকমের ওই বিবৃতিতে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি।
শনিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে অত্যন্ত ধীরগতিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে দেখা গেছে। এর আগে বাহরাইনে চালানো ইরানের একটি ড্রোন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো। সংযুক্ত আরব আমিরাত এই হামলার কড়া সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে, মার্কিন ঘাঁটির অন্যতম কেন্দ্রস্থল কুয়েত একে ‘অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি’ বলে আখ্যা দিয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর ফিফথ ফ্লিটের (পঞ্চম নৌবহর) আবাসস্থল বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে তাদের ‘সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারেও অজানা প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে। এতে জাহাজটির কিছুটা ক্ষতি হলেও এর ক্রুরা সম্পূর্ণ অক্ষত আছেন। ফক্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার সকাল পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক জলপথ দিয়ে মাত্র দশটি বাণিজ্যিক জাহাজ পার হতে পেরেছে। মূলত গত বৃহস্পতিবার ওমানের উপকূলে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ ‘এম/ভি এভার লাভলি’-তে ইরানের ড্রোন হামলার পর থেকেই এই অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করে। ওই হামলার জবাবে শুক্রবার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণের স্থান এবং উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থা লক্ষ্য করে ‘শক্তিশালী পাল্টা হামলা’ চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী (সেন্টকম)। মার্কিন সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকা একটি মেরিটাইম বডি ওমান উপকূল বরাবর জাহাজের রুট সম্প্রসারণের কথা জানিয়েছে, যা তেহরানের প্রতি একটি কড়া সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী, এই প্রণালিটি ৬০ দিনের জন্য টোল-মুক্ত রাখার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্ভূত হুমকিকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানি বাহিনীর এমন অযৌক্তিক আগ্রাসন স্পষ্টতই যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন এবং এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করিডোরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এদিকে, গত সোমবার সুইজারল্যান্ডে ইরানের সাথে এক বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, "ইরান একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে এবং আমরা সেটির প্রতি সম্মান দেখিয়েছি। চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের কোনো দ্বিমত থাকলে তারা ফোনে কথা বলতে পারে।" তবে ইরানিদের এই আগ্রাসন চলতে দেওয়া হবে না জানিয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "সহিংসতার জবাব কেবল পাল্টা সহিংসতার মাধ্যমেই দেওয়া হবে।"
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। হরমুজ প্রণালির কাছে একটি সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজে হামলার অভিযোগের পর জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) ১১ হাজারের বেশি নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ইরানি প্রস্তাবও সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কাছে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী এভার লাভলি নামের একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর বিরুদ্ধে। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ওমান উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্রসদৃশ বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলার সময় কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ জাতিসংঘ-সমর্থিত নিরাপদ নৌপথ দিয়ে চলাচল করছিল। সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ড জানিয়েছে, হামলার পরও এভার লাভলি যাত্রা অব্যাহত রাখে এবং কোনো ধরনের জরুরি সহায়তা চায়নি। এই ঘটনার পর আইএমও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে। সংস্থাটি বলছে, নাবিক ও জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে কোনো উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে না। আইএমওর মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ এক বিবৃতিতে বলেন, আক্রান্ত জাহাজটি আইএমওর পরিচালিত নিরাপদ সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থার আওতায় চলাচল করছিল না। তিনি বলেন, নাবিকদের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাই পরিস্থিতি পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। বর্তমানে ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে পারস্য উপসাগর এলাকায় শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ১১ হাজারের বেশি নাবিক আটকে রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। এদিকে ইরানের পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ (পিজিএসএ) সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় সব জাহাজকে নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার করতে হবে। অনুমোদিত পথের বাইরে চলাচল করলে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হবে না এবং এর দায়ভার জাহাজের মালিক ও পরিচালকদের বহন করতে হবে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে কোনো ধরনের ফি বা টোল আদায়ের অধিকার ইরানের নেই। রুবিও বলেন, এটি একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো দেশ এখান দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে পারে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না। ইরান অবশ্য এ অর্থকে "সামুদ্রিক সেবা ফি" বা পরিবেশ সুরক্ষা ব্যয় হিসেবে উল্লেখ করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ এটিকে কার্যত টোল আদায়ের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে। এদিকে কূটনৈতিক অঙ্গনেও নতুন একটি উদ্যোগের কথা জানিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং আইআরজিসির প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এর মাধ্যমে সমুদ্রপথে নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঘটনাগুলো দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হবে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। উভয় দেশ হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা, জাহাজ চলাচলের নিয়ম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক সেবার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফা সমঝোতার ভিত্তিতে সংঘাত বন্ধে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ওই সমঝোতায় ইরান ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলে সর্বোচ্চ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে সাম্প্রতিক হামলার অভিযোগ এবং নৌপথ ব্যবহার নিয়ে নতুন বিরোধের কারণে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ যেকোনো সমঝোতা বা চুক্তিতে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি চাইছে উপসাগরীয় দেশগুলো। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ইরানের পাল্টা হামলার উল্লেখযোগ্য অংশ এসব দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে চালানো হওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে। আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর আলোচনায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। যুদ্ধ চলাকালে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রায় ২ হাজার ৮০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখোমুখি হয়েছিল বলে জানা গেছে। আমিরাত সফর শেষে রুবিওর কুয়েত সফরেরও কথা রয়েছে। সংঘাতের সময় কুয়েতের বিমানবন্দর, বাণিজ্যিক বন্দর এবং লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো হামলার শিকার হয়। কুয়েত এসব স্থাপনাকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচনা করে, কারণ দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ সুপেয় পানির জোগান আসে এসব প্ল্যান্ট থেকে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে তারা ভবিষ্যৎ যেকোনো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে চাইছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ পরিচালিত হয়। তাই ভবিষ্যৎ কোনো চুক্তিতে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে দেশগুলো। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা এড়াতে এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনায় উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা উদ্বেগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। তবে যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কতটা কঠিন হবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লেবানন ও ইসরায়েল ইস্যু, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এই সমঝোতার সামনে সবচেয়ে বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বুধবার সাংবাদিকদের, যাদের মধ্যে বিবিসিও ছিল, ১৪ অনুচ্ছেদের একটি সমঝোতা স্মারক পড়ে শোনান যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। চুক্তিটি শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা থাকলেও ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেভাগেই এতে স্বাক্ষর করেন। তেহরানও নিশ্চিত করেছে যে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান চুক্তিতে সই করেছেন। সমঝোতা অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনার পথ তৈরি হবে। উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগও রাখা হয়েছে। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ধাপে ধাপে প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু এবং ইরানের ওপর আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা শুরুর অঙ্গীকার করা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। বিনিময়ে তেহরান পুনরায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরও উভয় পক্ষ সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, এই সমঝোতা এখনও চূড়ান্ত নয় এবং এটি ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার সামরিক অভিযানে ফিরে যেতে পারে। অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের অবিশ্বাস এখনও রয়েছে এবং ইরানের “আঙুল ট্রিগারের ওপরই আছে”। লেবানন ও ইসরায়েল ইস্যু প্রাথমিক সমঝোতা ঘোষণার সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানান, উভয় পক্ষ লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার বিষয়ে একমত হয়েছে। সমঝোতা স্মারকেও লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে লেবাননের বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানালেও ইসরায়েল লেবাননে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, বুধবার ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান নাবাতিয়েহ আল-ফাওকা এলাকা ও কফর তেবনিতের উপকণ্ঠে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লেবানন যুদ্ধবিরতির কাঠামোর মধ্যে থাকলেও ইসরায়েলি বাহিনীর লেবানন থেকে প্রত্যাহার এই চুক্তির শর্ত নয়। একই সঙ্গে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার বহাল থাকবে। অন্যদিকে ইরান বলছে, লেবানন যুদ্ধের অবসান যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইরান-সমর্থিত হেজবুল্লাহও একই অবস্থান নিয়েছে। গোষ্ঠীটির দাবি, পরবর্তী আলোচনায় লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করা হবে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানিয়েছেন, দেশটির বাহিনী লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চলে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, লেবানন ইস্যুতে ইরান হামলা চালালে ইসরায়েল পূর্ণ শক্তিতে পাল্টা জবাব দেবে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এইচ. এ. হেলিয়ারের মতে, ইসরায়েলি সামরিক অভিযান কূটনৈতিক অগ্রগতির জন্য সবচেয়ে বড় একক হুমকি। তার আশঙ্কা, তেহরান সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে পারমাণবিক ইস্যুতে কার্যকর আলোচনা শুরুর আগেই পুরো প্রক্রিয়া ভেঙে পড়তে পারে। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা সমঝোতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল অংশ হলো ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পর্যন্ত ইরান প্রায় ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ প্রায় ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম মজুদ করেছিল। সাধারণভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রায় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধির প্রয়োজন হয়। তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। নতুন সমঝোতাতেও তারা পুনরায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে বিদ্যমান ইউরেনিয়াম মজুদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে যে ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধির মাত্রা কমিয়ে আনা হবে এবং এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হবে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ওই চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর ইরান তাদের কর্মসূচি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের সাবেক উপপ্রধান ডারিন সেলনিক বলেছেন, যদি ইরান আবার অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার পথে এগোয়, তাহলে ট্রাম্প পুনরায় সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনা করতে পারেন। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ সমঝোতার অন্যতম লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা। ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় অচল হয়ে থাকা এই নৌপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হতো। চুক্তি অনুযায়ী, স্বাক্ষরের পরপরই প্রণালিটি খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত বাধা, বিশেষ করে মাইন অপসারণের কাজ শেষ হলে ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হওয়ার আশা করা হচ্ছে। সমঝোতায় বলা হয়েছে, প্রথম ৬০ দিনের জন্য প্রণালিটি টোলমুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে ইরান, ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে জলপথের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করবে। তবে ভবিষ্যতে ফি আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে সেবা ফি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও সেই ফি কী ধরনের সেবার জন্য হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নৌ চলাচলের জন্য সরাসরি টোল আরোপ করা না গেলেও নির্দিষ্ট সেবার বিপরীতে ফি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, ভবিষ্যতেও প্রণালিটি কার্যত টোলমুক্ত থাকবে। তাদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো এমন কোনো ব্যবস্থা সমর্থন করবে না, যা অবাধ নৌ চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে। তবুও বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারি বলেছেন, মাইন অপসারণে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো সতর্ক অবস্থানেই থাকবে। সংকট ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইওএস রিস্ক গ্রুপের মার্টিন কেলির ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে হলে অত্যন্ত সাহসী কোনো অধিনায়ক প্রয়োজন হবে। ড. হেলিয়ারও সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান সমঝোতা কেবল একটি কাঠামোগত স্মারক, এটি কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়। তার ভাষায়, কঠিন কাজ এখনো শুরুই হয়নি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় ধরে আটকে থাকা ১১ হাজারের বেশি আন্তর্জাতিক নাবিক ও সমুদ্রকর্মীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে বৃহৎ উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা (আইএমও) আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রমের ঘোষণা দিয়েছে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) আইএমও’র মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ এক বিবৃতিতে জানান, ইরান, ওমানসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলীয় দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক শিল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে এই জটিল অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং জাহাজ চলাচলের সামগ্রিক পরিস্থিতি সতর্কভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করা যায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পরপরই ইরান নিরাপত্তার অজুহাতে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক নৌপথে শত শত পণ্যবাহী জাহাজ ও তেল ট্যাংকার আটকা পড়ে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়ে ব্যাপকভাবে। তবে সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে এবং ক্লিপলার শিপিং ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার অন্তত ৩৬টি বাণিজ্যিক জাহাজ সফলভাবে প্রণালিটি অতিক্রম করেছে—যা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ। ওমানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উদ্ধার পরিকল্পনাটি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল এবং বর্তমান ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি বিবেচনায় ধাপে ধাপে জাহাজ অপসারণ করা হবে। যুদ্ধপরবর্তী উত্তেজনা ও সীমিত চলাচলের কারণে জাহাজের সংঘর্ষের ঝুঁকি থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। এদিকে, আন্তর্জাতিক নৌপথটি পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে ইউরোপের দেশ ডেনমার্ক ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক নিরাপত্তা মিশনে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এতে করে বহুজাতিক নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত আল জাজিরার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা আগের তুলনায় ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে। ওমান ও ইরান যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্বাভাবিক করতে কার্যকর প্রক্রিয়া নির্ধারণে কাজ চলছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো চূড়ান্ত চুক্তির অধীনে ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে টোল বা কর আরোপের সুযোগ দেওয়া হবে না। তার ভাষায়, এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং এখানে কোনো দেশের এককভাবে ফি আদায়ের অধিকার নেই। তবে ইরানের শীর্ষ আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ভিন্ন সুরে বলেছেন, যোগাযোগ বজায় রাখার বিষয়ে দুই দেশ একমত হলেও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা আর আগের অবস্থায় ফিরবে না। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুরোপুরি সচল করতে আন্তর্জাতিক মহল এখনো সতর্ক অবস্থানেই রয়েছে। এরই মধ্যে আটকে থাকা নাবিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার এই উদ্যোগকে মানবিক ও কৌশলগত উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সূত্র: আল জাজিরা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে স্বাভাবিক ও সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রয়েছে বলে জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, এই কৌশলগত নৌপথ দিয়ে আগের তুলনায় আরও বেশি পরিমাণ তেল পরিবহন হচ্ছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য ইতিবাচক সংকেত। সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প জানান, হরমুজ প্রণালির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং এতে ইরান ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ এই অঞ্চলে এমন অবস্থাকে তিনি স্বস্তিদায়ক হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি “ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য” চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনা চলছে এবং তাতে কিছু অগ্রগতিও হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, কোনো পরিস্থিতিতেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে ইরানের জন্য যেকোনো অর্থ ছাড়ের বিষয়েও শর্তের কথা তুলে ধরেন ট্রাম্প। তার ভাষায়, সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় ইরানকে যে অর্থ দেওয়া হবে, তা কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের কাছ থেকে খাদ্যপণ্য কেনার কাজে ব্যবহার করা যাবে। এদিকে সতর্কবার্তা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি কোনো ‘ভুল পদক্ষেপ’ নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের আরেকটি প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প জানান, তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ঘিরে সৃষ্ট কিছু বৈশ্বিক ইস্যুর সমাধানেও কাজ করছেন। অন্যদিকে, ইরানের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় তারা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা করেনি। পাশাপাশি নতুন করে কোনো পারমাণবিক প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছে তেহরান। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এখানকার স্থিতিশীলতা বা অস্থিতিশীলতা সরাসরি প্রভাব ফেলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে। শাফাক নিউজের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সতর্ক আশাবাদ তৈরি হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো পুরোপুরি কাটেনি। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান আলোচনা কতটা কার্যকর চুক্তিতে রূপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বিষয়ে আলোচনা করতে চলতি সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং বাহরাইন সফর করবেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সোমবার (২২ জুন) মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (স্টেট ডিপার্টমেন্ট) পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই উচ্চপর্যায়ের সফরের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে জানান, আগামী ২৩ থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর এই মধ্যপ্রাচ্য সফর অনুষ্ঠিত হবে। সফরকালে তিনি ইরানের সাথে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক, হরমুজ প্রণালীতে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিষয়গুলোর ওপর বিশেষভাবে জোর দেবেন। সফরের অংশ হিসেবে বাহরাইনে অবস্থানকালে রুবিও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) প্রতিনিধিদের সাথে একটি বিশেষ বৈঠকে মিলিত হবেন। স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট আরও জানান, এই বৈঠকে উপসাগরীয় দেশগুলোর যৌথ আঞ্চলিক অগ্রাধিকার এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর প্রভাব ফেলে এমন প্রধান প্রধান নিরাপত্তা ইস্যুগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। বিগত সপ্তাহে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে এটিই হতে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ। এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে একটি ৬০ দিনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য হলো গত চার মাস ধরে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধটির স্থায়ী অবসান ঘটানো।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন হুমকির পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। সোমবার ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি বলেন, এটি ইরানের সার্বভৌম জলসীমা এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ইরানের জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর। আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, “আপনি হুমকি দেন; আমরা পদক্ষেপ নেই।” তিনি আরও বলেন, “হরমুজ প্রণালি আপনার ব্যক্তিগত ক্যাসিনো নয়, কিংবা আধুনিক দিনের জলদস্যুদের পেছনের উঠানও নয়; এটি ইরানের সার্বভৌম জলসীমা।” এর আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নেবে এবং প্রয়োজনে ওই অঞ্চল দখল করা হবে। তিনি বলেন, ইরান যদি চুক্তিতে না আসে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে টোল আদায় করতেও পিছপা হবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পর হরমুজ প্রণালিতে কার্যত আরোপিত অবরোধ শিথিল করা হয়েছিল। তবে লেবাননে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ইরানের বিপ্লবী গার্ডস আবারও প্রণালিটি বন্ধের ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে। তিনি বলেন, “তোমাদের দেশের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না” এবং প্রয়োজনে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হবে। তিনি আরও মন্তব্য করেন, আলোচনার সময় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বিষয়ে অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় তিনি কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। এদিকে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলমান রয়েছে। তবে আলোচনা শুরুর পর্যায়কে দুই পক্ষই জটিল হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা শেষ পর্যন্ত সফল হবে না বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম। তার দাবি, আলোচনা ভেস্তে গেলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেন। রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে গ্রাহাম এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে। তবে তার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন হলো, সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে শুরু হওয়া আলোচনা কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে। গ্রাহামের ভাষায়, যুদ্ধ বা চাপ প্রয়োগের মতো বিকল্প ব্যবস্থার আগে কূটনৈতিক পথকে সুযোগ দেওয়া উচিত। তবে তিনি মনে করেন, শেষ পর্যন্ত এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে একটি বিস্তৃত চুক্তির লক্ষ্যে ৬০ দিনের আলোচনা পর্ব শুরু হয়েছে। এই সময়ে উভয় পক্ষ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে গ্রাহাম বলেন, যদি এই উদ্যোগ সফল না হয়, তাহলে পরিস্থিতি নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তিনি দাবি করেন, সম্প্রতি ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে অংশ নেওয়ার পর তার ধারণা হয়েছে যে আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে গেলে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র আরও সরাসরি পদক্ষেপ নিতে পারে। বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে এ অঞ্চলে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। গ্রাহাম আরও বলেন, যদি ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো ভবিষ্যতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন সরাসরি ইরানের ভূমিকাকে বিবেচনায় নিতে পারে। এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও সম্প্রতি ইরানকে সতর্ক করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও মিত্রদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার বিষয়েও মন্তব্য করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এ জলপথকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা দেখা গেছে। ফলে সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলোও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। লিন্ডসি গ্রাহাম তার সাক্ষাৎকারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরব ও ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা আবারও জোরদার করতে পারে। তার আশা, ২০২৬ সালের মধ্যেই সৌদি আরবকে আব্রাহাম চুক্তির আওতায় আনার ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখা যেতে পারে। গ্রাহামের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে সৌদি আরব ও ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছিল। তবে ওই ঘটনার পর পুরো প্রক্রিয়া থমকে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলেও আপাতত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনাই আন্তর্জাতিক মহলের প্রধান নজরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহের অগ্রগতি অঞ্চলটির নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট, সিবিএস নিউজ
ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা শেষ পর্যন্ত সফল হবে না বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম। তার দাবি, আলোচনা ভেস্তে গেলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেন। রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে গ্রাহাম এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে। তবে তার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন হলো, সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে শুরু হওয়া আলোচনা কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে। গ্রাহামের ভাষায়, যুদ্ধ বা চাপ প্রয়োগের মতো বিকল্প ব্যবস্থার আগে কূটনৈতিক পথকে সুযোগ দেওয়া উচিত। তবে তিনি মনে করেন, শেষ পর্যন্ত এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে একটি বিস্তৃত চুক্তির লক্ষ্যে ৬০ দিনের আলোচনা পর্ব শুরু হয়েছে। এই সময়ে উভয় পক্ষ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে গ্রাহাম বলেন, যদি এই উদ্যোগ সফল না হয়, তাহলে পরিস্থিতি নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তিনি দাবি করেন, সম্প্রতি ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে অংশ নেওয়ার পর তার ধারণা হয়েছে যে আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে গেলে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র আরও সরাসরি পদক্ষেপ নিতে পারে। বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে এ অঞ্চলে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। গ্রাহাম আরও বলেন, যদি ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো ভবিষ্যতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন সরাসরি ইরানের ভূমিকাকে বিবেচনায় নিতে পারে। এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও সম্প্রতি ইরানকে সতর্ক করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও মিত্রদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার বিষয়েও মন্তব্য করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এ জলপথকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা দেখা গেছে। ফলে সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলোও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। লিন্ডসি গ্রাহাম তার সাক্ষাৎকারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরব ও ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা আবারও জোরদার করতে পারে। তার আশা, ২০২৬ সালের মধ্যেই সৌদি আরবকে আব্রাহাম চুক্তির আওতায় আনার ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখা যেতে পারে। গ্রাহামের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে সৌদি আরব ও ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছিল। তবে ওই ঘটনার পর পুরো প্রক্রিয়া থমকে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলেও আপাতত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনাই আন্তর্জাতিক মহলের প্রধান নজরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহের অগ্রগতি অঞ্চলটির নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট, সিবিএস নিউজ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর নির্ধারিত ৬০ দিনের মধ্যে স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো না হলে হরমুজ প্রণালিতে এককভাবে টোল বা শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র নিজ উদ্যোগে এই পদক্ষেপ নেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, যুদ্ধবিরতির সময়কাল বা পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে এই প্রণালিতে কোনো টোল দিতে হবে না। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে টোল আরোপ করবে। তিনি আরও বলেন, চুক্তি না হলে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র অতীতে, বর্তমানে এবং ভবিষ্যতে যে নিরাপত্তা ও সহায়তা দিয়ে আসছে, তার ব্যয় তুলতে এই টোল আরোপ করা হতে পারে। তার দাবি অনুযায়ী, এই নিরাপত্তা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সামরিক উপস্থিতি ও অভিযানের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা হচ্ছে। মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প যখন এই হুঁশিয়ারি দেন, তখন ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেন হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, লেবাননে ইসরায়েলের নতুন হামলার পর এই নৌপথ আবারও বন্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, জুনের শুরুতে একটি গোপন অভিযানের মাধ্যমে এই জলপথ দিয়ে ২০০টিরও বেশি জাহাজে প্রায় ১০ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল নিরাপদে পরিবহন করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলছে। যুদ্ধের আগের সময়ে বিশ্বের দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। পরবর্তী সময়ে এই পথ ঘিরে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো একাধিকবার আলোচনা করলেও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে এই নৌপথে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করা হয়। গত বুধবার সই হওয়া সমঝোতা স্মারকে ১৪ দফা বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা যায়। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স দাবি করেন, গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ১৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। তার মতে, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা প্রশাসনের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল এবং সেটি সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ডের পক্ষ থেকে ভিন্ন অবস্থান জানানো হয়। লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত থাকায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করার ঘোষণা দেয় তারা। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দেশটির খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে এবং জাহাজ চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত জানায়। চলমান পরিস্থিতির মধ্যে রোববার সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরুর কথা রয়েছে। আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধিত্ব করবেন পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলে থাকবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার পর সুইজারল্যান্ডে উচ্চপর্যায়ের মুখোমুখি বৈঠকে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দুই দেশের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসন এবং উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যেই এই আলোচনা শুরু হয়েছে। রোববার (২১ জুন) সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্ন এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে বৈঠক শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সূত্র অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরাও আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল পরিস্থিতি, ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানি এবং বিদেশে থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুও আলোচনায় স্থান পেয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে এবং সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। বৈঠকের অগ্রগতির ওপর ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার দিকনির্দেশনা নির্ভর করতে পারে। আন্তর্জাতিক মহলে এই আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন পক্ষের প্রত্যাশা, এই বৈঠকের মাধ্যমে কিছু মৌলিক বিষয়ে সমঝোতার পথ তৈরি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখলে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেখানে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ পর্যন্ত টোল আরোপ করতে পারে। ফক্স নিউজের সাংবাদিক ট্রে ইংস্টের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, ট্রাম্প বলেন, “তোমরা যদি এটি বন্ধ করো, তাহলে তোমাদের আর কোনো দেশ থাকবে না।” তিনি আরও বলেন, “প্রয়োজন হলে আমরা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারি। তারা যদি কোনো সমঝোতায় না আসে, তাহলে আমরা টোল আদায় করব।” ট্রাম্পের এ মন্তব্য এমন সময় এলো, যখন ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পূর্বে হওয়া সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান হরমুজ প্রণালিতে নতুন টোল ব্যবস্থা কার্যকর করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এর আগে বিভিন্ন খবরে বলা হয়েছিল, প্রণালি অতিক্রমকারী তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি আদায়ের বিষয় বিবেচনা করছে তেহরান। তবে সাম্প্রতিক অস্থায়ী শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে শনিবার ৬৭টি এবং শুক্রবার ৫৫টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, “তেল ও তেলজাত পণ্যের পরিবহন সংঘাত শুরুর আগের পর্যায়ের কাছাকাছি অবস্থায় রয়েছে।” বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সংঘাতের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হতো। প্রতিদিন ১৩০টিরও বেশি জাহাজ এ সংকীর্ণ জলপথ ব্যবহার করত। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানকে লেবাননে তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি লেখেন, “ইরানকে অবিলম্বে লেবাননে তাদের অর্থায়ন করা প্রক্সিগুলোকে সমস্যা সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখতে হবে। তা না হলে আমরা আবারও ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেব, আগেরবারের চেয়েও বেশি কঠোরভাবে।” হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের ওপর নতুন করে প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান তীব্র সামরিক সংকট নিরসন ও বিশ্ব শান্তির লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডে শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বহু প্রতীক্ষিত ও ঐতিহাসিক কারিগরি পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সংলাপ। কাতার ও পাকিস্তানের বিশেষ মধ্যস্থতায় আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নীতি-নির্ধারক ও প্রতিনিধিদের পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রভাবশালী নেতারাও অংশ নিচ্ছেন। অত্যন্ত গোপনীয় ও বিলাসবহুল পরিবেশে শুরু হওয়া এই সংলাপের ওপর পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা বহুলাংশে নির্ভর করছে। এই বৈঠকে মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, লেবাননে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন এবং হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিশেষ এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মাসুদ পেজেশকিয়ানের স্বাক্ষরিত চুক্তিটি লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত ও ভয়াবহ সামরিক হামলার কারণে নতুন করে চরম চাপের মুখে পড়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি করা হয়েছে যে, দুই দেশের মধ্যকার প্রাথমিক চুক্তির প্রথম শর্তই ছিল লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। কিন্তু ইসরায়েল এখনো লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা দুই দেশের মধ্যকার পূর্ববর্তী সমঝোতার স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই রোববার (২১ জুন) সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক শহরের লুসার্ন হ্রদের পাড়ে অবস্থিত একটি অভিজাত হোটেলে এই সংলাপের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। উচ্চপর্যায়ের এই সংলাপে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আমেরিকার নবনির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে উপস্থিত রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের প্রভাবশালী জামাতা জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে, ইরানের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং অভিজ্ঞ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে এই সংলাপে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, দেশটির প্রভাবশালী সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল থানি। সুইজারল্যান্ডে কারিগরি আলোচনা শুরু হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। তবে এর বিপরীতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম দাবি করেছে যে, আন্তর্জাতিক এই নৌপথটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও উন্মুক্ত রয়েছে এবং গত ২০ জুন পর্যন্ত সেখান দিয়ে ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে পার হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এক বিশেষ ঘোষণায় জানিয়েছেন, সাময়িক যুদ্ধবিরতির ৬০ দিন এবং এর পরবর্তী সময়েও হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কোনো জাহাজের কাছ থেকে কোনো ধরণের অতিরিক্ত টোল আদায় করা হবে না। টানা ৬০ দিন ধরে চলতে যাওয়া এই কারিগরি সংলাপে ইরান মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি রাষ্ট্রীয় সম্পদ মুক্তি এবং লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার বিশেষ উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার রোববার এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ওয়াশিংটনকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কেবল ব্যবসা ও লাভ-ক্ষতির ভাষা বোঝে। তাই তারা যদি এই চুক্তি শুধু কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বৈশ্বিক সরবরাহ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন মূল ভূখণ্ডে হু হু করে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া এবং জীবনযাত্রার চড়া ব্যয়ের কারণেই মূলত ট্রাম্প প্রশাসন তড়িঘড়ি করে ইরানের সাথে এই শান্তি সংলাপে বসতে বাধ্য হয়েছে। সূত্র: আল জাজিরা
ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ থেকে প্রায় দেড় মাস বিরতির পর আবারও অপরিশোধিত তেল লোড ও রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের পর এই কার্যক্রম পুনরায় চালু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তিনটি বড় তেলবাহী জাহাজ (ভিএলসিসি) সি আইল্যান্ড টার্মিনালে নোঙর করেছে। প্রতিটি জাহাজ প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল বহন করতে সক্ষম। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, তিনটি জাহাজের মধ্যে দুটি ইতোমধ্যে জেটিতে ভিড়েছে, আর তৃতীয়টি নিকটবর্তী এলাকায় অবস্থান করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এর আগে শুক্রবার পর্যন্ত এসব জেটি খালি ছিল। মে মাসের পর থেকে এ এলাকায় বড় জাহাজের উপস্থিতিও সীমিত ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাময়িক সমঝোতার পর মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কিছুটা কমায় ইরান দ্রুত তেল রপ্তানি কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে। এছাড়া জানা গেছে, কিছু তেলবাহী জাহাজ চাবাহার বন্দরের কাছে নোঙর করে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তার কারণে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জাহাজ হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে চলাচল করছে। তবে ইরান ধাপে ধাপে জাহাজ চলাচল আবার পারস্য উপসাগরে ফিরিয়ে আনছে। তথ্য অনুযায়ী, তেলবাহী জাহাজ স্ট্রিম, ইম্পালা এবং লরেন ২ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে উপসাগরে প্রবেশ করেছে। খারগ দ্বীপ ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যেখানে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়ে থাকে। উপসাগরের পূর্বাঞ্চলে আরও অন্তত ২০টি জাহাজ অপেক্ষমাণ রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে ইরানের তেল রপ্তানি আরও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল প্রত্যাশিত শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা প্রণালিটি বন্ধ করে দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও প্রশাসনিক সূত্র এ দাবিকে নাকচ করে বলছে, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় আলোচনার পরিবেশ জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে দেশটির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যে সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছে। একই সময় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওয়াশিংটন ছেড়েছেন। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান জানিয়েছে, রোববার থেকেই আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। এই আলোচনার অংশ হিসেবে ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার বিষয়ে আগে থেকেই সম্মত হয়েছিল দুই দেশ। তবে লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। শনিবার আইআরজিসি ঘোষণা দেয়, কৌশলগত চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, ওই অঞ্চলে প্রবেশ করা জাহাজগুলো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ভিন্ন তথ্য দিয়ে জানায়, শনিবারই অন্তত ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এসব জাহাজে করে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি তেল পরিবহন করা হচ্ছে। সেন্টকম আরও বলেছে, নৌপথে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চলাচল বজায় রাখতে তারা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি চলাকালে এবং পরবর্তী সময়েও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য কোনো টোল বা ফি নেওয়া হবে না। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ফি আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র যে ভূমিকা রাখছে, তার বিনিময়ে এমন ব্যবস্থা নেওয়া অযৌক্তিক হবে না। অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার অভিযোগ করেছেন, ১৪ দফা অন্তর্বর্তী চুক্তির প্রথম শর্ত বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই শর্তে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির কথা ছিল। তিনি বলেন, চুক্তি যদি বাস্তবে কার্যকর না হয়, তাহলে অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। লেবাননের পরিস্থিতিও এখনো অস্থির। ইসরায়েলি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। লেবাননের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল বলছে, তারা হিজবুল্লাহর হামলার জবাব দিয়েছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলকে লেবাননে অবাধভাবে চলাচল করতে দেবে না। ইসরায়েল স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া চুক্তির সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত নয়। ফলে লেবাননে দখল করা অঞ্চলগুলোতে তাদের সেনা উপস্থিতি বজায় থাকবে। যদিও দেশটির সামরিক বাহিনী বলছে, তারা যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং নিজেদের নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে থাকবে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই সুইজারল্যান্ডে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে দুই দেশ। ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তার সঙ্গে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও জ্বালানি খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অপরদিকে মার্কিন দলে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, তিনি এখনো বিশ্বাস করেন যুদ্ধবিরতি বহাল থাকবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ তার কাছে নেই। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার তারা আলোচনায় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নের ওপর জোর দেবেন। পাকিস্তান জানিয়েছে, এই আলোচনায় তাদের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির অংশ নিতে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান উত্তেজনার মধ্যেও এই আলোচনা সফল হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন না হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র টোল বা চলাচল ফি আরোপ করতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সপ্তাহান্তে ক্যাম্প ডেভিডে অবস্থানকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ-পরবর্তী প্রাথমিক সমঝোতার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ৬০ দিনের জন্য টোলমুক্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, “বর্তমান ব্যবস্থায় ৬০ দিন পর্যন্ত কোনো টোল নেই। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি চূড়ান্ত চুক্তি না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থে এবং আমাদের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবস্থার আওতায় টোল আরোপ করতে পারে।” তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। কারণ হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটগুলোর একটি। প্রতিদিন বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের শুল্ক বা অতিরিক্ত ব্যয় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন খরচে প্রভাব ফেলতে পারে। ট্রাম্প দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র যে নিরাপত্তা ব্যয় বহন করেছে, তার একটি অংশ পুনরুদ্ধারের বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছি। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সেই ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।” তবে ট্রাম্পের এই অবস্থান নিজ দেশেই সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক মহল এবং কিছু নীতিনির্ধারক প্রশ্ন তুলেছেন, হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত সাম্প্রতিক সমঝোতায় ভবিষ্যতে টোল আরোপের সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি কেন। সমালোচকদের মতে, বর্তমান সমঝোতা কেবল ৬০ দিনের জন্য টোলমুক্ত চলাচলের নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে শুল্ক বা ফি আরোপের সুযোগ উন্মুক্ত রেখেছে, যা ভবিষ্যতে নতুন বিরোধের কারণ হতে পারে। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে রপ্তানিকৃত তেলের বড় অংশ এই জলপথ দিয়েই বিশ্ববাজারে যায়। ফলে এই প্রণালিকে ঘিরে যেকোনো সিদ্ধান্ত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনার অগ্রগতি এবং সম্ভাব্য চূড়ান্ত চুক্তির দিকে নজর রাখছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী ৬০ দিনের আলোচনা শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্কের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনাও অনেকাংশে এর ওপর নির্ভর করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।