মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় টালমাটাল বিশ্ব তেলের বাজার। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) প্রধান ফাতিহ বিরল গত বুধবার এক চাঞ্চল্যকর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার প্রকৃত প্রভাব এপ্রিলে আরও তীব্র হবে। বিশেষ করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় বড় ধরনের ধাক্কা খেতে যাচ্ছে ইউরোপীয় অর্থনীতি। ফাতিহ বিরল জানান, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজার থেকে ইতোমধ্যে ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি তেলের সরবরাহ কমে গেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা এবং সমুদ্রপথে বিধিনিষেধ আরোপের ফলেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। 'ইন গুড কোম্পানি' পডকাস্টে তিনি বলেন, “মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে তেল ও এলএনজি (LNG) সরবরাহে ঘাটতির পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে; বাড়বে মুদ্রাস্ফীতি এবং থমকে যাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।” তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, মার্চ মাসে যেসব তেলের চালান পৌঁছেছিল, সেগুলোর চুক্তি হয়েছিল যুদ্ধ শুরুর আগে। ফলে বর্তমান যুদ্ধের প্রকৃত প্রভাব চলতি মাস থেকেই প্রকটভাবে দৃশ্যমান হবে। বিশেষ করে জেট ফুয়েল এবং ডিজেলের তীব্র ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। ইতোমধ্যে এশিয়ার বেশ কিছু দেশে এই সংকটের আঁচ পাওয়া গেছে, যা দ্রুতই ইউরোপের বাজারে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। বুধবার (১ এপ্রিল) এক বিবৃতিতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কোনোভাবেই শত্রুদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে না। আইআরজিসি মার্কিন প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ডকে 'হাস্যকর কার্যকলাপ' হিসেবে অভিহিত করে স্পষ্ট করেছে যে, বর্তমানে এই প্রণালির ওপর তাদের দৃঢ় ও দাপুটে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আইআরজিসির এই হুঁশিয়ারির কিছুক্ষণ আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চাঞ্চল্যকর দাবি উত্থাপন করেন। ট্রাম্প জানান, ইরানের রাষ্ট্রপতি তার কাছে যুদ্ধবিরতির জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে এই প্রস্তাব বিবেচনার ক্ষেত্রে তিনি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি যখন পুরোপুরি "উন্মুক্ত, বাধামুক্ত ও নিরাপদ” হবে, কেবল তখনই তিনি যুদ্ধবিরতি নিয়ে ভাববেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানকে তেহরান সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। দুই দেশের এমন বিপরীতমুখী অবস্থানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একদিকে ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব ও সামরিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার অঙ্গীকার করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই জলপথকে কেন্দ্র করে তেহরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের ফলে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সূত্র: আলজাজিরা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতি ঘোষণা করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তেহরান প্রয়োজনে অন্তত আগামী ছয় মাস বা তার বেশি সময় ধরে এই যুদ্ধ ও পাল্টা সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে সক্ষম। বুধবার (১ এপ্রিল, ২০২৬) তেহরানে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন। আরাগচি স্পষ্টভাবে জানান, শত্রুপক্ষ কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করে দিলেও ইরান তা গ্রাহ্য করবে না। তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিরক্ষা কার্যক্রম কতদিন চলবে তা আমরাই নির্ধারণ করব। ইরান অন্তত ছয় মাস বা তার বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত এবং আমাদের বাহিনীর সেই সক্ষমতা রয়েছে।” ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আলোচনার যে দাবি করা হচ্ছে, তাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় দুই দেশের মুখোমুখি বসে সমঝোতায় পৌঁছানোকে ‘আলোচনা’ বলে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তেমন কোনো পরিস্থিতি নেই।” তবে তিনি স্বীকার করেন যে, বন্ধুরাষ্ট্র বা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় বার্তার আদান-প্রদান চলছে, যা কোনোভাবেই আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়। তিনি আরও যোগ করেন, মার্কিন প্রশাসনের ওপর ইরানের আস্থার হার বর্তমানে ‘শূন্য’। আরাগচি জানান, ইরান কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান চায়। তার মতে, যুদ্ধের অবসানে ইরানের শর্তগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট: ১. ইরানসহ পুরো অঞ্চলে (লেবানন, ইরাক, ইয়েমেন) যুদ্ধের অবসান। ২. আগ্রাসন আর ঘটবে না—এমন গ্যারান্টি প্রদান। ৩. ইরানি জনগণের ওপর হওয়া ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ। হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি ইরান ও ওমানের অভ্যন্তরীণ জলসীমার অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে এটি উন্মুক্ত থাকলেও যেসব দেশ ইরানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত, তাদের জাহাজের জন্য এই পথ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর নিরাপদ যাতায়াতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি আরও সতর্ক করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আঞ্চলিক দেশগুলোর মাটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালায়, তবে ইরান ওইসব দেশের ভেতরে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রচারণাকে নাকচ করে আরাগচি বলেন, ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও হামলা চালানোর ক্ষমতা অটুট রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, মাত্র দুই দিন আগেই ইরানের একটি স্বল্পমূল্যের ড্রোনের আঘাতে মার্কিন 'অ্যাওয়াকস' (AWACS) নজরদারি বিমান ধ্বংস হয়েছে। সবশেষে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানকে হুমকি বা আল্টিমেটাম দিয়ে কোনো লাভ হবে না। ইরান যুদ্ধের জন্য উস্কানি দেয়নি, কিন্তু আত্মরক্ষার প্রয়োজনে যেকোনো সীমা পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত।
ইরান যুদ্ধের অবসান নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জল্পনা তুঙ্গে, তখন এক নতুন এবং কঠিন শর্ত জুড়ে দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ উন্মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কোনো যুদ্ধবিরতির কথা ভাববে না। ফ্লোরিডায় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তার এই অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য এবং এতে কোনো বাধা বরদাশত করা হবে না। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প মনে করেন ইরান যদি আন্তর্জাতিক নৌপথ অবরোধ করে রাখে, তবে আলোচনার কোনো পরিবেশ তৈরি হতে পারে না। এই প্রণালীটি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়, যা বর্তমানে উত্তেজনার কারণে স্থবির হয়ে আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে আবারও নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন যে, এই শর্তের ফলে যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়বে। এদিকে তেহরানের পক্ষ থেকে এখনও এই শর্তের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে ইরানি সামরিক কমান্ডাররা আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, তাদের ওপর হামলা বন্ধ না হলে হরমুজ প্রণালীতে কোনো বিদেশি জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। ইউরোপীয় মিত্ররা ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থানকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন কারণ জ্বালানি সংকটে তারা সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্রাসেলস ও লন্ডন থেকে ওয়াশিংটনের ওপর অনবরত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে যেন তারা শর্ত শিথিল করে দ্রুত আলোচনায় বসে। ট্রাম্পের এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন পাকিস্তান ও চীন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে পাঁচ দফা শান্তি প্রস্তাব পেশ করেছে। কিন্তু ট্রাম্পের নতুন শর্ত সেই শান্তি প্রক্রিয়ার পথে একটি বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। পেন্টাগনের একটি সূত্র জানিয়েছে যে, মার্কিন নৌবাহিনী ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালীতে তাদের উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে। তারা যেকোনো মূল্যে এই বাণিজ্যিক রুটটি দখলমুক্ত রাখতে প্রস্তুত এবং প্রয়োজনে আরও বড় ধরনের সামরিক শক্তি প্রয়োগের চূড়ান্ত পরিকল্পনা নিয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকার সাধারণ নাগরিকরা তেলের আকাশচুম্বী দাম নিয়ে প্রবল অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। ট্রাম্পের এই শর্ত যদি যুদ্ধের মেয়াদ আরও বাড়িয়ে দেয়, তবে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দলকে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমেরিকা শান্তি চায় তবে তা অবশ্যই তাদের জাতীয় স্বার্থ এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার শর্ত মেনে হতে হবে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখে ইরান যে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তার কাছে ওয়াশিংটন নতি স্বীকার করবে না বলেও জানানো হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও এখন চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে কারণ এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ধসে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ তেলের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই অনিশ্চয়তা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শান্তির যে ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল, ট্রাম্পের এই মন্তব্যে তা আবারও মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। এখন দেখার বিষয়, ইরান আন্তর্জাতিক চাপ মেনে নিয়ে নৌপথ উন্মুক্ত করে দেয় নাকি এই সংঘাত আরও ভয়াবহ ও চরম রূপ ধারণ করে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ৪৮ ঘণ্টা বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই সময়ের মধ্যেই জানা যাবে সমঝোতার কোনো পথ খোলা আছে কি না। পুরো বিশ্ব এখন এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে ইতিহাস।
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনী হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট অচলাবস্থা কাটাতে এবার সরাসরি হস্তক্ষেপে নামছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার ঘোষণা করেছেন, এই রুটে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপারের নেতৃত্বে লন্ডনে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি অবরুদ্ধ করে রাখায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় হু হু করে বাড়ছে জ্বালানির দাম, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে। প্রধানমন্ত্রী স্টারমার স্পষ্ট জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সরাসরি কোনো সামরিক সংঘাতে জড়ানোর ইচ্ছা যুক্তরাজ্যের নেই। বরং কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে ১০ ডাউনিং স্ট্রিট। তিনি বলেন, "জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয় কমানোর একমাত্র উপায় হলো উত্তেজনা প্রশমন করা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য চলাচল স্বাভাবিক নিশ্চিত করা।" এই সংকট নিরসনে সম্ভাব্য সকল ধরনের কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
দীর্ঘ উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের অনুমতি পেয়েছে বাংলাদেশের ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ। বুধবার (১ এপ্রিল) রাজধানীর ইরান দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন ইরানি রাষ্ট্রদূত জলিল রহীমি জাহানাবাদী। রাষ্ট্রদূত জানান, ইরানের নিরাপত্তা কাউন্সিল জাহাজগুলোকে নিরাপদে গন্তব্যে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। বর্তমানে ঢাকা ও তেহরান জাহাজগুলোর নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিতে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত দুই দেশের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করলেও যুদ্ধের বিষয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে ইরানের অসন্তোষের কথা লুকাননি। তিনি বলেন, "বাংলাদেশ ইরানের ভাই। দুর্দিনে এক ভাই আরেক ভাইয়ের পাশে দাঁড়াবে—এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি আমরা নিন্দারও প্রত্যাশা করি।" তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল ইরানের বিরুদ্ধে নয়, বরং মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করেন। জলিল রহীমি জাহানাবাদী আমেরিকার কড়া সমালোচনা করে বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের উসকানিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনার সময়েই এই আগ্রাসন শুরু করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, "আমেরিকা এখন পালানোর পথ খুঁজছে।" সাধারণ জনগণের ওপর হামলা, স্কুল-কলেজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বোমা বর্ষণকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, "মসজিদ কি উগ্রবাদের আখড়া? শিশুরা কি তাদের জন্য হুমকি ছিল?" ইরানি রাষ্ট্রদূত দাবি করেন, তারা কোনো প্রতিবেশী দেশকে লক্ষ্যবস্তু করছেন না, বরং আমেরিকান ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, আমেরিকা ইরানের প্রযুক্তি বা ইউরেনিয়াম ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়ে এখন পারমাণবিক হামলার হুমকি দিচ্ছে, যাতে ইরান মোটেও ভীত নয়। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, "জাতিসংঘ এখন শক্তিশালী দেশগুলোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিপদে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকা বৃথা।"
ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করছেন, ইরান-এর সঙ্গে চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে এবং দ্রুতই এর সমাপ্তি ঘটতে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম The New York Post-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপে ইরানের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর দীর্ঘ সময় অবস্থান করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। ট্রাম্পের ভাষ্য, “আমরা সেখানে আর খুব বেশিদিন থাকব না।” তবে তিনি স্বীকার করেন, ইরানের অবশিষ্ট সামরিক শক্তি মোকাবিলায় এখনো কিছু কার্যক্রম বাকি রয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনাও দেখছেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, এই নৌপথ ব্যবহারকারী দেশগুলো চাইলে নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে এটি সচল করতে পারে। তিনি আরও মন্তব্য করেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রণালিটি “স্বয়ংক্রিয়ভাবে” খুলে যেতে পারে। তার দাবি, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ায় তারা আর আগের মতো নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারছে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো জটিল এবং সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের দাবি ও বাস্তব চিত্রের মধ্যে অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হলেও, পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরছে। হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে এই প্রণালি দিয়ে আগের তুলনায় বেশি জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। একই সুরে কথা বলেন পিট হেগসেথ। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্যোগের ফলে জাহাজ চলাচল বেড়েছে। এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান এই পথ দিয়ে অতিরিক্ত ২০টি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। তবে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম MarineTraffic-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাস্তবে পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। আজ মাত্র তিনটি জাহাজ ট্র্যাকার চালু রেখে প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে দুটি ছিল সাধারণ মালবাহী জাহাজ এবং অন্যটি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত তেলবাহী ট্যাংকার ‘লুইজা’। আরও কয়েকটি জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া বিশ্লেষণ সংস্থা Kpler জানিয়েছে, গত কয়েক দিনেও জাহাজ চলাচলের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত। সোমবার চারটি, রোববার ছয়টি এবং গত এক সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৩টি জাহাজ এই পথ অতিক্রম করেছে। অথচ সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘সিগন্যাল জ্যামিং’ বা সংকেত বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। অনেক জাহাজ নিরাপত্তার কারণে তাদের ট্র্যাকার বন্ধ রাখছে, ফলে প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। এমন পরিস্থিতিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলেও এটিকে ‘কূটনৈতিক সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে হোয়াইট হাউস। তবে কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে উত্তেজনার পারদ আরও চড়িয়ে দুবাই বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত একটি বিশাল জ্বালানি তেলবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। সোমবার (৩০ মার্চ) দিবাগত রাতে সংঘটিত এই হামলায় কুয়েতি মালিকানাধীন ‘আল-সালমি’ নামক জাহাজটির মূল কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এতে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। দুবাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোর নাগাদ কয়েক ঘণ্টার আপ্রাণ চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে জাহাজটি থেকে সাগরে বিপুল পরিমাণ তেল ছড়িয়ে পড়ার (Oil Spill) আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি কঠোর হুঁশিয়ারির মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই এই হামলার ঘটনা ঘটল। ট্রাম্প সোমবার স্পষ্ট সতর্কবার্তায় বলেছিলেন, ইরান যদি অবিলম্বে বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ‘হরমুজ প্রণালি’ জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং তেলের খনিগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে। ট্রাম্পের এই চরম আল্টিমেটামের জবাবেই ইরান দুবাই উপকূলে এই ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে একযোগে হামলা শুরু করার পর থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর আক্রমণের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। মাসব্যাপী চলা এই যুদ্ধে ইতিমধ্যেই কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এক চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। দুবাইয়ের এই সর্বশেষ হামলা প্রমাণ করে যে, কূটনৈতিক আলোচনার গুঞ্জন থাকলেও মাঠ পর্যায়ে সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ নেই, বরং এটি একটি সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে।
ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এক মাস পার হওয়ার পর এবার নতুন এক মোড় নিতে শুরু করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন যুদ্ধের একটি টেকসই সমাধানের পথ খুঁজছেন। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’কে ঘিরে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে ট্রাম্প প্রশাসন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের পেতে রাখা মাইন এবং তেহরানের পক্ষ থেকে টোল আদায়ের ঘোষণার ফলে এই নৌপথটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। পেন্টাগন এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে আলোচনার পর ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত হোক বা না হোক, তিনি যুদ্ধের তীব্রতা কমিয়ে একটি আলোচনার টেবিলে বসার সম্ভাবনা যাচাই করছেন। ট্রাম্পের মতে, দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত আমেরিকার স্বার্থের পরিপন্থী এবং তিনি চান মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সাথে নিয়ে একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে। ইতিমধ্যেই তিনি অন্যান্য দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে এই প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ না পড়ে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই ‘বিকল্প পথ’ খোঁজার অর্থ হতে পারে ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ বজায় রেখে একটি সমঝোতায় আসা। একদিকে যখন ব্রিটেন আন্ডারওয়াটার ড্রোন মোতায়েন করে মাইন সরানোর কাজ করছে, অন্যদিকে ট্রাম্প কূটনৈতিক চ্যানেলে তেহরানের সাথে একটি অনানুষ্ঠানিক আলোচনার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছেন। তবে ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের অস্থিরতা এই শান্তি প্রক্রিয়াকে কতটা সফল হতে দেবে, তা নিয়ে এখনও গভীর সংশয় রয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই বিষয়ে বড় ধরনের কোনো ঘোষণা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা শুরুর পরপরই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয় ইরান। এরপর থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প এটি পুনরুদ্ধারে সফল হননি। তবে এখন তিনি বিষয়টি নিয়ে আর আগের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। সোমবার (৩০ মার্চ) ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের জানিয়েছেন যে তিনি দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত চালিয়ে যেতে অনিচ্ছুক—এমনকি হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলেও। তবে তার এই অবস্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলো। তাদের মতে, প্রণালি বন্ধ রেখেই পরিস্থিতি ছেড়ে দেওয়া মানে কার্যত পরাজয় স্বীকার করা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা—প্রণালিটি পুনরায় চালু করতে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করলে তা নির্ধারিত সময়সীমা (চার থেকে ছয় সপ্তাহ) ছাড়িয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাতে জড়াতে চান না ট্রাম্প। প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের নৌ ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করার মতো প্রধান লক্ষ্য অনেকটাই অর্জিত হয়েছে। তাই এখন সংঘাত ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার দিকেই ঝুঁকছে ওয়াশিংটন। পরবর্তী ধাপে কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে তেহরানকে প্রণালি খুলতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হবে। প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে ইউরোপ ও উপসাগরীয় মিত্রদেরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাপ দেওয়া হতে পারে। বর্তমান উত্তেজনায় হরমুজ প্রণালি একটি কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। মাইন পাতা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে ইরান এই পথটি কার্যত অচল করে রেখেছে। অথচ বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রণালি বন্ধ থাকায় গত এক মাসে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ট্রাম্প একাধিকবার ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, ৬ এপ্রিলের মধ্যে পথটি খুলে না দিলে জ্বালানি ও পানি অবকাঠামোতে হামলা চালানো হতে পারে। অন্যদিকে, ইরান এসব আহ্বান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপেক্ষা করেছে। বরং গত এক মাসে হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী কয়েকটি তেলবাহী জাহাজেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য পূরণের কাজ শিগগিরই শেষ হবে। এরপর হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ কী দাঁড়ায় এবং এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে কতটা পড়ে—সেদিকেই এখন নজর সবার।
উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও হরমুজ প্রণালি নির্বিঘ্নে অতিক্রম করেছে চীনের দুটি অতিবৃহৎ কনটেইনার জাহাজ। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ট্র্যাকার মেরিনট্রাফিক এ তথ্য জানিয়েছে। মেরিনট্রাফিকের তথ্যমতে, জাহাজ দুটি চীনের শিপিং কোম্পানি কসকোর মালিকানাধীন। এর আগে শুক্রবার প্রথমবার প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করেও তা বাতিল করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে তারা সফলভাবে প্রণালিটি অতিক্রম করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যপথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যেও এই যাত্রা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরানে চলমান সামরিক অভিযান ও কৌশলগত হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিয়ে আল জাজিরাকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে চূড়ান্ত বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সোমবার (৩০ মার্চ) তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শেষ হওয়ার পর যেকোনো মূল্যে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। রুবিও জোর দিয়ে বলেন, এটি হয় ইরানের সম্মতিতে হবে, অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সামরিক জোটের শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, ইরানে ওয়াশিংটনের সামরিক লক্ষ্যগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং সেগুলো অর্জনে মাসের পর মাস নয়, মাত্র কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অভিযান শেষেও যদি ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়, তবে দেশটিকে এর ‘ভয়াবহ পরিণাম’ ভোগ করতে হবে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এই প্রণালি সচল করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বাইডেন-ট্রাম্পের উত্তরসূরি প্রশাসন। সাক্ষাৎকারে রুবিও আরও ইঙ্গিত দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল এককভাবে নয় বরং আন্তর্জাতিক মিত্রদের নিয়ে একটি শক্তিশালী জোট গঠনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। তেহরানের প্রতি এই কঠোর হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। সূত্র: আল জাজিরা
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে চ্যালেঞ্জ জানানো ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রভাবশালী কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরি নিহত হয়েছেন। সোমবার (৩০ মার্চ) আইআরজিসি এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, গুরুতর আঘাতের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দাবি করেছেন, বন্দর আব্বাসে তাদের বাহিনীর একটি ‘নির্ভুল ও প্রাণঘাতী অভিযানে’ তাংসিরি ও আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। কমান্ডার তাংসিরির মৃত্যু এমন এক সময়ে ঘটল যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য এক মাসব্যাপী যুদ্ধের পর সরাসরি স্থল অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও মার্কিন বাহিনী যেকোনো মুহূর্তে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে বলে জানা গেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হামলা শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ইরানের রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করতে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ চালাবে এবং এরপর বিমান হামলা চালিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করার চেষ্টা করবে। এই যুদ্ধের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে শীর্ষ তালিকায় রয়েছে খারগ দ্বীপ, যেখান থেকে ইরান তার ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি করে। এছাড়া কেশম দ্বীপ এবং আবু মুসা দ্বীপও মার্কিন নিশানায় রয়েছে। তবে সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, পারস্য উপসাগরীয় এই দ্বীপগুলো দখল করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সেখানে যাতায়াত সহজ হলেও মার্কিন সেনারা ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সূত্র: সিএনবিসি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে যুদ্ধের অবসানে সরাসরি চুক্তিতে আসার জন্য কঠোর আল্টিমেটাম দিয়েছেন। সোমবার (৩০ মার্চ) নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, ইরানের একটি ‘নতুন এবং আরও যুক্তিবাদী’ গোষ্ঠীর সঙ্গে বর্তমানে আলোচনা চলছে। তবে যদি দ্রুত কোনো সমঝোতা না হয় এবং হরমুজ প্রণালি ব্যবসার জন্য খুলে দেওয়া না হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের সমস্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, তেলকূপ এবং কৌশলগত খারগ দ্বীপ উড়িয়ে দিয়ে দেশটিকে 'নিশ্চিহ্ন' করে দেবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উল্লেখ করেন, এর আগে ইরানকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল, যে কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু স্থানে আঘাত করা থেকে বিরত রয়েছে। তিনি দাবি করেন, গত ৪৭ বছরের ‘সন্ত্রাসের রাজত্বে’ মার্কিন সেনা ও নাগরিকদের হত্যার প্রতিশোধ নিতেই এই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার জন্য তেহরানের হাতে মাত্র ১০ দিন সময় আছে। উল্লেখ্য, এই প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। উত্তেজনাকর এই পরিস্থিতির মধ্যেই প্রায় সাড়ে তিন হাজার মার্কিন নৌসেনা ইউএসএস ত্রিপোলিতে চড়ে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছেন। এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মার্কিন এই হুঁশিয়ারিকে গুরুত্ব না দিয়ে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, আমেরিকা আলোচনার কথা বললেও গোপনে স্থল হামলার পরিকল্পনা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় মুহূর্তে মিসর, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। সূত্র: নিউ ইয়র্ক পোস্ট
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিস্ফোরক দাবিতে জানিয়েছেন, ইরান 'সম্মানের নিদর্শন' হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে ২০টি বিশাল তেলবাহী জাহাজ পাঠাচ্ছে। স্থানীয় সময় রোববার (২৯ মার্চ) ওয়াশিংটন ডিসির উদ্দেশে এয়ার ফোর্স ওয়ানে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই তথ্য দেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, সোমবার (৩০ মার্চ) সকাল থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে এই তেলের বহর যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে। এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্প বলেন, “আজ তারা আমাদের একটি উপহার দিয়েছে। ঠিক কীভাবে এটি সংজ্ঞায়িত করব জানি না, তবে সম্মানের নিদর্শন হিসেবে ২০টি বড় তেলের জাহাজ পাঠাচ্ছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইরানের বর্তমান 'নতুন নেতৃত্ব' অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত আচরণ করছে এবং তাদের সঙ্গে আমেরিকার আলোচনা বেশ ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। ট্রাম্পের বিশ্বাস, দুই দেশের মধ্যে খুব দ্রুতই একটি বড় ধরনের চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে। যদিও এর আগে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৫ দফা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল, তবে ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী তেহরান এখন প্রস্তাবের বেশিরভাগ পয়েন্ট মেনে নিয়েছে। নিজের আন্তরিকতা প্রমাণের জন্যই ইরান এই বিশাল তেলের চালান পাঠাচ্ছে বলে মনে করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে এই নাটকীয় বক্তব্যের বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
এক মাস ধরে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের ভয়াবহ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে মধ্যপ্রাচ্যের চার শক্তিধর মুসলিম দেশ একজোট হয়েছে। রোববার (২৯ মার্চ) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে তুরস্ক, সৌদি আরব, মিসর ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠক শুরু হয়েছে। দুই দিনব্যাপী এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো ওয়াশিংটন ও তেহরানকে সরাসরি আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা এবং বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’কে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ করা। বৈঠক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি বর্তমান যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সমন্বিত আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চার দেশ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে যাতে করে যুদ্ধের দাবানল পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে না পড়ে। প্রথম দিনের আলোচনা শেষে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সংবাদমাধ্যমকে জানান, আঞ্চলিক শক্তিগুলো যুদ্ধের একটি দ্রুত ও স্থায়ী সমাধানের উপায় খুঁজছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংলাপের পরিবেশ তৈরি করা এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। কূটনৈতিক এই তৎপরতার গুরুত্ব বোঝা যায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যকার নিবিড় যোগাযোগে। বৈঠকের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে দুই দেশের শীর্ষ নেতা প্রায় ৯০ মিনিট ফোনালাপ করেন, যা গত পাঁচ দিনের মধ্যে তাদের দ্বিতীয় দফার কথা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসলামাবাদে শুরু হওয়া এই চতুর্পক্ষীয় বৈঠক যদি সফল হয়, তবে তা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা কমাতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পেতে রাখা মাইন শনাক্ত ও ধ্বংস করতে ‘আন্ডারওয়াটার ড্রোন’ মোতায়েন করছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনী (রয়্যাল নেভি) জানিয়েছে, ইরান ও পশ্চিমের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই কৌশলগত জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে যে, রণকৌশল হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালির বিভিন্ন পয়েন্টে মাইন পেতেছে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যের মোতায়েন করা এই বিশেষ ড্রোনগুলো পানির নিচে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মাইন শনাক্ত করতে সক্ষম। এগুলো সরাসরি যুদ্ধজাহাজ থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে এবং মাইন পাওয়া গেলে তা নিরাপদে বিস্ফোরণ বা অপসারণ করবে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়, তাই এই পথটি মাইনমুক্ত রাখা বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। তেহরানের পক্ষ থেকে জলপথে টোল আদায়ের ঘোষণার পর এই মাইন পাতার বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপ ইরানের নৌ-আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে। যদিও তেহরান দাবি করেছে যে তারা কেবল নিজেদের জলসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা একে ‘নৌ-সন্ত্রাস’ হিসেবে অভিহিত করেছে। হরমুজ প্রণালিতে বর্তমানে ব্রিটিশ ও মার্কিন যুদ্ধজাহাজের টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই আন্ডারওয়াটার ড্রোন মোতায়েন করার ফলে ওই অঞ্চলে ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি আরও বেড়ে গেল বলে মনে করছেন সমর বিশেষজ্ঞরা।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম, বিশেষ করে ব্রেন্ট ক্রুড, মাত্র এক মাসে প্রায় ৫৯ শতাংশ বেড়েছে—যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্স–কে বাজার বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর এত স্বল্প সময়ে তেলের দামে এমন বড় উল্লম্ফন আর দেখা যায়নি। তবে তাদের মতে, সরাসরি তেলের ঘাটতি নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়াই এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ। আরব সাগর ও পারস্য উপসাগরকে সংযুক্ত করা হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিশ্বে যে পরিমাণ তেল ও তরল গ্যাস পরিবহন হয়, তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। এ কারণেই অনেক সময় এটিকে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার বলা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর ইরান এই প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করে। দেশটির সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, যুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের সহযোগী দেশগুলোর জাহাজ এই পথে চলাচল করতে পারবে না। এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো—সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ওমান—বিপাকে পড়ে। কারণ এসব দেশের অনেক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র–এর সামরিক উপস্থিতি রয়েছে, যা তাদের সংঘাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তুলেছে। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি গত এক মাসে এসব দেশের তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। বিশ্ববাজারে তেলের বড় জোগানদাতা সৌদি আরব বিকল্প পথ হিসেবে হরমুজের পরিবর্তে নিজেদের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ সংস্থা কেপলার–এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে এই বন্দর থেকেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি করা হচ্ছে। এদিকে বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মর্গান–এর বিশ্লেষক নাতাশা কানেভা সতর্ক করে বলেছেন, প্রথমে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, তা এখন লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। এই ঝুঁকি আরও বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তথ্যসূত্র: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালির পর ওমান উপসাগরেও নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে ইরান। দেশটির নৌবাহিনীর এক কমান্ডার জানিয়েছেন, এই অঞ্চলে ইরানের সামরিক উপস্থিতি এখন শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং সেখানে মোতায়েন থাকা যুক্তরাষ্ট্র–এর বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কমান্ডার দাবি করেছেন—মার্কিন বাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মধ্যে এলেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে। উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত আঘাত হানার সক্ষমতাও রয়েছে বলে তিনি সতর্ক করেন। তিনি আরও জানান, ইরানের সামরিক মহড়া ও ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রমের কারণে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন (CVN-72) ইরানের জলসীমা থেকে অনেক দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। ওই কমান্ডারের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির পূর্বাঞ্চল এবং ওমান উপসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানে ইরানের নৌবাহিনীর কার্যকর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কেন হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ? হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বড় একটি অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশ—সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত—এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ভৌগোলিকভাবে প্রণালিটি অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থানে অবস্থিত। এক পাশে ইরান এবং অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এর সবচেয়ে সরু অংশ প্রায় ২১ মাইল প্রশস্ত, যা সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলক সহজ। বিশ্ব অর্থনীতির দিক থেকেও এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কোনো কারণে এই পথ দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
ইরানের নৌবাহিনীর এক সিনিয়র কমান্ডার দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগর বর্তমানে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ওই অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন বাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় এলে “কঠোর প্রতিক্রিয়া” হতে পারে। ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, কমান্ডার বলেন, ইরানের সামরিক মহড়ার কারণে মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ইরানি জলসীমা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। তিনি আরও জানান, হরমুজ প্রণালির পূর্বাঞ্চল ও ওমান উপসাগর নৌবাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, যা আন্তর্জাতিক তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। এর এক পাশে ইরান এবং অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অবস্থিত। প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ২১ মাইল, যা সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যদি এই নৌপথ দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ রাখে, তা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এই হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ানোর সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।