মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক ১৫ দিনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার এবং ১৭টি নজরদারি ও অপারেশনাল ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। তবে এ দাবির পক্ষে এখনো কোনো স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্রও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। শনিবার (২৫ জুলাই) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেবি বলেন, ৮ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত চলা ১৫ দিনের লড়াইয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থানরত এসব যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, ধ্বংস হওয়া সামরিক সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে ১৭টি নজরদারি ও অপারেশনাল ড্রোন, যার মধ্যে ৮টি ছিল এখনো মোতায়েন না করা নতুন ড্রোন। এছাড়া একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, একটি পি-৮ সামুদ্রিক টহল বিমান, একটি সি-১৭ সামরিক পরিবহন বিমান এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ৮টি ট্যাংকার বিমানও ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে এসব সরঞ্জাম কোথায় এবং কীভাবে ধ্বংস হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। আইআরজিসির মুখপাত্র আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক হামলায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বিভিন্ন রাডার ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম, জ্বালানি সংরক্ষণাগার, ড্রোন হ্যাঙ্গার, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং অন্যান্য সামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এসব দাবিরও স্বাধীনভাবে কোনো যাচাই সম্ভব হয়নি। এদিকে সংঘাতের ধারাবাহিকতায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর নিশ্চিত হলেও, আইআরজিসির সর্বশেষ ক্ষয়ক্ষতির দাবির সঙ্গে মিলিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ইরানের দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে আসছে। এর প্রভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতি এখনো উত্তেজনাপূর্ণ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সংঘাতে উভয় পক্ষের দাবি ও পাল্টা দাবির মধ্যে নিরপেক্ষ তথ্য যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সামরিক ক্ষয়ক্ষতির মতো বিষয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সরকারি বক্তব্যের পাশাপাশি স্বাধীন উৎস থেকে নিশ্চিত হওয়ার আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মার্কিন সেনা ও সিআইএর স্থাপনাগুলো যেভাবে লক্ষ্যবস্তু হয়েছে, তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা মহলে। মার্কিন কর্মকর্তারা এখন তদন্ত করছেন, এসব হামলায় রাশিয়া লক্ষ্য নির্ধারণে তথ্য বা উন্নত প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছিল কি না। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলে সিআইএর একাধিক স্থাপনায় ইরানের ড্রোন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য রুশ সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট চারজন সূত্র জানিয়েছেন, হামলার অস্বাভাবিক নির্ভুলতা এবং ইরানকে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত সহায়তা এই সন্দেহের অন্যতম কারণ। তবে তদন্ত এখনও চলমান এবং রাশিয়ার সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগেও স্বীকার করেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক অভিযানে রাশিয়া কিছু ধরনের সহায়তা দিয়েছে। তবে সিআইএর নির্দিষ্ট স্থাপনাগুলোতে হামলার ক্ষেত্রে সেই সহায়তার মাত্রা কতটা ছিল, সেটিই এখন তদন্তের মূল বিষয়। এদিকে নিউইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল হয়ে উঠেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ভেতরে এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে যে, রাশিয়ার পাশাপাশি চীনও কোনো না কোনোভাবে ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করছে। তবে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। সাম্প্রতিক সংঘাতে জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় মার্কিন সেনা নিহত ও আহত হওয়ার পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর প্রতিটি হামলার জবাব দেওয়া হবে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযানও অব্যাহত রয়েছে। এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার ওপর এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি প্রকাশিত একটি ভিডিওকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ভিডিওতে একটি শাহেদ ড্রোনের গায়ে স্পেনের তরুণ ফুটবল তারকা লামিন ইয়ামালের একটি ছবি সংযুক্ত অবস্থায় দেখা যায়। ছবিতে ইয়ামালকে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশের পর বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ড্রোনে ছবিটি কেন লাগানো হয়েছিল বা এর উদ্দেশ্য কী ছিল, সে বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। প্রেস টিভির টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত একটি শাহেদ ড্রোনের সামনের অংশে ইয়ামালের ছবি লাগানো রয়েছে। ভিডিওতে ড্রোনটির লক্ষ্যবস্তু বা হামলার স্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। একইভাবে স্বাধীন কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাও ভিডিওটির প্রতীকী বার্তা বা প্রেক্ষাপট সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করেনি। ভিডিওতে ব্যবহৃত ছবিটি চলতি বছরের মে মাসে বার্সেলোনার লা লিগা শিরোপা উদ্যাপনের সময় তোলা বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। সে সময় লামিন ইয়ামালকে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে দেখা যায় এবং ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায়ও স্থান পায়। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ইয়ামালের ওই অবস্থানের সমালোচনা করেছিলেন। অন্যদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে ইয়ামালের অধিকারকে সমর্থন জানান। গাজা যুদ্ধের পর থেকে স্পেন ও ইসরায়েলের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই এই বিতর্ক আরও আলোচনায় আসে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার সময় প্রতীকী ছবি বা বার্তা ব্যবহার করে বিভিন্ন পক্ষ জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করে থাকে। তবে এই নির্দিষ্ট ভিডিওতে ব্যবহৃত ইয়ামালের ছবির উদ্দেশ্য বা এর সঙ্গে কোনো সামরিক সিদ্ধান্তের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে এমন দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এদিকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে শাহেদ ড্রোন ব্যবহারের একাধিক ভিডিও ইরানি রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্র-সমর্থিত গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব ভিডিওর অনেক ক্ষেত্রেই অবস্থান, সময় কিংবা নির্দিষ্ট সামরিক দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো উল্লেখ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের সময় সামরিক শক্তির পাশাপাশি প্রতীকী ও প্রচারমূলক বার্তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এ ধরনের ভিডিওর ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট ও উৎস যাচাই করে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় নিহত তৃতীয় মার্কিন সেনার পরিচয় প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। নিহত সেনা হলেন ২৮ বছর বয়সী সার্জেন্ট অ্যাঞ্জেল এস. র্যাম্পারসাড, নিউইয়র্কের ওজোন পার্কের বাসিন্দা। জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরে সেনাবাহিনী জানায়, তাকে মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে চলমান সংঘাতে ইরানের হামলায় নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে পৌঁছেছে। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, র্যাম্পারসাড জার্মানিভিত্তিক ১০ম আর্মি এয়ার অ্যান্ড মিসাইল ডিফেন্স কমান্ডের অধীনে কর্মরত ছিলেন। একই ইউনিটে দায়িত্ব পালন করতেন নিহত আরেক সেনা প্রাইভেট ইসাবেলা গনজালেসও। এর আগে পেন্টাগন জর্ডানের ওই হামলায় নিহত আরও দুই সেনার পরিচয় প্রকাশ করেছিল। তারা হলেন ২৫ বছর বয়সী ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহান এবং ১৯ বছর বয়সী প্রাইভেট ইসাবেলা গনজালেস। দুজনই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় নিহত হন। এদিকে একই সপ্তাহান্তে ইরাকের এরবিল বিমানঘাঁটিতে ভূপাতিত একটি ইরানি ড্রোনের অবিস্ফোরিত অংশ নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করার সময় আরও এক মার্কিন সেনা, সার্জেন্ট মাইকেল ইমানুয়েল সুইন্টন নিহত হন। ওই ঘটনায় আরেক সেনা সামান্য আহত হন। সুইন্টনের মৃত্যুর ঘটনাটি আলাদা একটি সামরিক অভিযানে ঘটলেও সেটিও একই সপ্তাহান্তের সংঘাতের অংশ হিসেবে নিশ্চিত করেছে পেন্টাগন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জর্ডানে মোতায়েন সেনারা ইসলামিক স্টেটবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্য সেখানে অবস্থান করছিলেন। হামলার পর ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতেই র্যাম্পারসাডকে নিহত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর ওপর একাধিক হামলা হয়েছে। পেন্টাগনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় প্রায় ১০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন, যদিও তাদের অধিকাংশ চিকিৎসা শেষে আবার দায়িত্বে ফিরে গেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে নতুন করে ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। দেশটির সেনাবাহিনীর ভাষ্য, চলমান ‘সায়েকেহ’ অভিযানের নতুন ধাপে জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর এফ-১৮ যুদ্ধবিমান, আবাসন এলাকা এবং সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে সেনাবাহিনী দাবি করেছে, আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে এটি তাদের দ্বিতীয় হামলা। তেহরানের দাবি, এই অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের অংশ। ইরানের পক্ষ থেকে হামলার দাবি করা হলেও এতে কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, অথবা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এদিকে এ হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম), জর্ডানের সরকার কিংবা দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে ইরানের দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। চলমান সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘাঁটি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সামরিক ও নজরদারি অভিযান পরিচালিত হয়। ফলে সেখানে হামলার দাবি সত্য হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এ ধরনের সামরিক দাবির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ না পাওয়া পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি বা হামলার ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘায়িত সংঘাতের অবসান ঘটাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো কার্যকর কোনো কৌশল খুঁজে পাননি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে হরমুজ প্রণালি নিয়ে তার অবস্থানের নাটকীয় পরিবর্তন সেই মূল্যায়নকেই আরও জোরালো করেছে। বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সামরিক চাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের সমন্বয়ে যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টা করলেও বাস্তবে ওয়াশিংটনের সামনে এখনো কোনো সুস্পষ্ট সমাধানের পথ তৈরি হয়নি। মঙ্গলবার ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা দেন, ইরানি নৌপরিবহনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ আবারও কার্যকর করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি প্রস্তাব দেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজ, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর জাহাজকেও ২০ শতাংশ ফি দিতে হবে। তার যুক্তি ছিল, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র যে বিপুল ব্যয় বহন করছে, সেই খরচের একটি অংশ এভাবেই আদায় করা হবে। তবে ওই ঘোষণার মাত্র একদিন পরই ট্রাম্প ভিন্ন অবস্থান নেন। নতুন প্রস্তাবে তিনি জানান, উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগভিত্তিক সহযোগিতা বাড়ানোর দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হবে। অর্থাৎ হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচলের বিনিময়ে ফি আদায়ের পরিবর্তে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার ইঙ্গিত দেন তিনি। এই অবস্থান পরিবর্তন এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত চার মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে। এক মাস আগে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই সমঝোতার মাধ্যমে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পরবর্তী সময়ে তা সংঘাত বন্ধ রাখতে পারেনি। বরং যুদ্ধবিরতির মধ্যেও দফায় দফায় হামলা ও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প বড় পরিসরে যুদ্ধ সম্প্রসারণে অনাগ্রহী। এর অন্যতম কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন সীমিত। পাশাপাশি সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনা ও মিত্রদের ওপর ইরানের হামলার ঝুঁকিও বাড়বে। আবার কোনো নতুন সমঝোতা ছাড়াই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানোও ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে সহজ নয়। কারণ তিনি এমন একটি চুক্তি করতে চান, যা ২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের করা ইরান পারমাণবিক চুক্তির চেয়ে ভালো বলে উপস্থাপন করা যাবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কর্মসূচির পরিচালক রোজমেরি কেলানিক মনে করেন, এই সংঘাতের দ্রুত সমাপ্তির সম্ভাবনা খুবই কম। তার ভাষায়, সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী অমীমাংসিত সংঘাতে পরিণত হবে, যার সুস্পষ্ট শেষ দেখা যাচ্ছে না। ট্রাম্পের নৌ অবরোধের ঘোষণার পরই ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় নতুন করে মার্কিন হামলা শুরু হয়। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ এবং বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের তৎপরতা বেড়ে যায়। ফলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল আবারও ব্যাহত হতে শুরু করে। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কিছু সামরিক স্থাপনা, নৌ সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা অবকাঠামো দুর্বল করতে সক্ষম হয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো সামনে আসেনি। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরান এখনো হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি এ অঞ্চলে আরও বড় সামরিক অভিযান না চালায়, তাহলে তেহরানকে সেই পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখা কঠিন হতে পারে। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ শতাংশ ফি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতির ব্যয়কে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার একটি প্রচেষ্টা। তবে এটি সম্পূর্ণ নতুন ধারণা নয়। চলমান সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায়েও তিনি অনুরূপ প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মজার বিষয় হলো, মাত্র এক মাস আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের সম্ভাব্য ফি আরোপের পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশ টোল বা ফি আরোপ করতে পারে না এবং আন্তর্জাতিক আইনও সে সুযোগ দেয় না। সমঝোতা স্মারকটিতে ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য বেশ কিছু বিষয় খোলা রাখা হয়েছিল। সেখানে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের ভূমিকার কথাও উল্লেখ ছিল। একই সঙ্গে ইরানে কয়েকশ' কোটি ডলারের বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল। ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও সম্ভাব্য পরিণতির সতর্কবার্তা মিলিয়ে তেহরানকে হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত চাপ হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখা যাবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি সেই হিসাবের সঙ্গে মিলছে না। বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের বারবার অবস্থান পরিবর্তন থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, ইরান যুদ্ধের একটি গ্রহণযোগ্য ও টেকসই সমাপ্তি কীভাবে হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো ওয়াশিংটনের হাতে নেই।
ইরান আলোচনার টেবিলে না ফিরলে আগামী সপ্তাহ থেকে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়ে যাবে এবং প্রয়োজনে হামলার পরিধি আরও বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, "আজ রাত, আগামী রাত এবং তার পরের রাতেও আমরা জোরালো হামলা চালাব। আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতি তাদের জন্য আরও কঠিন হবে। তখন বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পরে সেতুগুলো লক্ষ্যবস্তু হবে।" ট্রাম্প আরও বলেন, ইরান যদি আলোচনায় না আসে, তাহলে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামো ও সেতুগুলো ধ্বংস করার পরিকল্পনা রয়েছে। তার ভাষায়, "তারা যদি আলোচনার টেবিলে না আসে, তাহলে আমরা তাদের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সব সেতু অচল করে দেব।" তিনি আরও জানান, জ্বালানি-সংক্রান্ত অন্যান্য স্থাপনাগুলোকে আপাতত শেষ পর্যায়ের লক্ষ্য হিসেবে রাখা হয়েছে। এই মন্তব্য এমন সময় এলো, যখন টানা চতুর্থ দিনের মতো ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান চলেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে ইরানি জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো তেহরানের ওপর চাপ বাড়িয়ে একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানো এবং সেই চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য করা। সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি আনতে সামরিক শক্তিই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তার দাবি, "এই মানুষের সঙ্গে শক্তির মাধ্যমেই আলোচনা করা যায়, আর সেই শক্তি হলো সামরিক শক্তি।" ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিকে একজন বক্সারের সঙ্গে তুলনা করে ট্রাম্প বলেন, প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি নতি স্বীকার করাতে আরও চাপ প্রয়োজন। তার ভাষায়, ইরানের এখনও কিছুটা সক্ষমতা রয়েছে, তবে সেটি দ্রুত কমে আসছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, তেহরানের ভেতরে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সমঝোতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। সাক্ষাৎকারে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। জবাবে ট্রাম্প বলেন, আপাতত এমন পরিকল্পনার সম্ভাবনা কম হলেও প্রয়োজনে সেই বিকল্প পুরোপুরি বাদ দেওয়া হচ্ছে না। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, বর্তমানে ওই ধরনের কোনো অভিযানের জন্য মার্কিন স্থলবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই। তার মতে, প্রয়োজন হলে মিত্র দেশগুলোর বাহিনী স্থল অভিযানে ভূমিকা রাখতে পারে। এদিকে চলমান সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হওয়ায় সেখানে সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সিস্তান ও বেলুচেস্তান প্রদেশের ইরানশাহর শহরের একটি বিমানবন্দর স্থাপনায় মার্কিন হামলায় একজন দমকলকর্মী নিহত হয়েছেন। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোরে বিমানবন্দরে হামলার পর দায়িত্ব পালনকালে ওই দমকলকর্মীর মৃত্যু হয়। তুরস্কভিত্তিক বার্তা সংস্থা আনাদোলু এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানশাহর কাউন্টির গভর্নর সেলিম কাদখোদা বলেন, বিমানবন্দর স্থাপনায় হামলার পর ঘটনাস্থলে কাজ করার সময় ওই দমকলকর্মী নিহত হন। এর আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এবং মেহর নিউজ এজেন্সি ইরানশাহর বিমানবন্দরে বিস্ফোরণের খবর প্রচার করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার গভীর রাতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে মার্কিন হামলার খবর প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার ভোরে ইরানশাহর বিমানবন্দরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে ওই অঞ্চলের আরও কয়েকটি এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। এদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা এবং অবাধ নৌচলাচলে হুমকি সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা আরও দুর্বল করতেই এই অতিরিক্ত হামলা চালানো হয়েছে। সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাবে এসব অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আবারও বেড়েছে। মার্কিন বাহিনী দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। তবে ইরানশাহর বিমানবন্দরে হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। নিহত দমকলকর্মীর পরিচয়ও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে চলমান সংঘর্ষে চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। সীমান্তবর্তী এলাকায় এখনো তীব্র লড়াই অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ৪০১তম ব্রিগেডের ৫২তম ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডর গেদালিয়া বেন সিমহোন (৩২)। দক্ষিণ লেবাননে পরিচালিত সামরিক অভিযানের সময় তিনি নিহত হন। একই ঘটনায় আরও তিন ইসরায়েলি সেনার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সেনাবাহিনী। তবে তাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ইসরায়েলি সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহত বাকি তিন সেনার নাম পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। দক্ষিণ লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনী ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। চলমান লড়াইয়ে উভয় পক্ষেই হতাহতের ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে। এদিকে সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও সীমান্ত অঞ্চলে সামরিক অভিযান ও সংঘর্ষ থামেনি। ফলে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
সুইজারল্যান্ডে ইরানি আলোচকদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত শান্তি আলোচনা স্থগিত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ড সফরের পরিকল্পনা বাতিল করার পর শুক্রবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা বৈঠকটি আর হচ্ছে না বলে জানিয়েছে সুইজারল্যান্ড। হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বৃহস্পতিবার রাতে এক বিবৃতিতে বলেন, আলোচনার লজিস্টিক ব্যবস্থা শুরু থেকেই জটিল ছিল এবং তা সবসময় পূর্বানুমানযোগ্য ছিল না। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলেই জেডি ভ্যান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল সফরের জন্য প্রস্তুত থাকবে। সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে বুর্গেনস্টক পাহাড়ি রিসোর্টে নির্ধারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে না। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, কাতার ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে নির্ধারিত বৈঠকও আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ড জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আলোচনার প্রয়োজন হলে তারা সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে তেহরান জানিয়েছিল, বুধবারের ১৪ দফা চুক্তির পর অন্তত ৬০ দিনের জন্য অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ করা হলে তারা খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত থাকবে। ইরানের কর্মকর্তারা আরও বলেছিলেন, আলোচনা শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষণ দেখতে চান তারা। আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভ্যান্স সফর বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার আগ পর্যন্ত ইরানের প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ডে যাবে কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আগে জানিয়েছিলেন, সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির একটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পরিকল্পনাকে অপ্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করে জানায়, দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মাধ্যমে সংঘাতের সূচনা হয়। এতে অন্তত সাত হাজার মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। যুদ্ধবিরতির পরও অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। বিশেষ করে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর থাকবে। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা প্রক্রিয়ার অংশ না হওয়ায় দেশটি নিজস্ব সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান হামলা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান মিত্রদের একাংশ কংগ্রেসে প্রশ্ন তুলেছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে গিয়ে প্রশাসন অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছে কি না। ট্রাম্প পূর্বে বলেছিলেন, ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া যুদ্ধের অবসান ঘটবে না। তবে সাম্প্রতিক সমঝোতার আওতায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে, ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ মুক্ত করা হয়েছে এবং ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক মার্কিন ছাড় দেওয়া হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প ‘হতাশার কারণে’ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনা সহজ হবে না। তিনি বলেন, “যদি মার্কিন পক্ষ অতিরিক্ত দাবি করে, আমরা তা গ্রহণ করব না।” চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আলোচকদের ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়টিও আলোচনায় রাখতে চায়। যুদ্ধের আর্থিক ব্যয়ও এখন আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের খরচ এবং অন্যান্য বিল পরিশোধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত ৮০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা, যাতে দেশটি কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন কমানো এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা সীমিত করার বিষয়ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল। তবে সমঝোতা স্বাক্ষরের সময় এসব লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। ইরান আবারও জানিয়েছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না। পাশাপাশি দেশটি সীমিত মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াকরণ এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার পরিদর্শনে সম্মত হয়েছে। তবে এসব উপাদান দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। তেলবাজার ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি ইরান জানিয়েছে, ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। একই সঙ্গে নতুন জাহাজ চলাচল ফি আরোপের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে, যদিও ৬০ দিনের আলোচনাকালীন সময়ে তা কার্যকর হবে না। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার পর সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনায় শুক্রবার আন্তর্জাতিক তেলবাজারে দাম কমেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। অন্যদিকে লেবাননে নতুন ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে। ইসরায়েল দাবি করেছে, হামলাগুলো হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে পরিচালিত হয়েছে। চুক্তিতে লেবাননে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির কথা উল্লেখ থাকলেও ইসরায়েল জানিয়েছে, তাদের সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং নতুন করে দখলকৃত অঞ্চল মানচিত্রে যুক্ত করার কথাও জানিয়েছে দেশটি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে কতটা চাপ দিতে পারবেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক শান্তিচুক্তি রোববার স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে চুক্তিতে সই করবেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের আশাবাদের পর একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ইরান বলছে, রোববার নয়, চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে। শনিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত, সহজ এবং নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা করছেন। তিনি লিখেছেন, “আগামীকাল (আজ) চুক্তিটি সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি সই হওয়ার পরপরই হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে।” এর আগে শনিবার বেলা ১১টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, “আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন শান্তিচুক্তির আরও কাছাকাছি অবস্থানে আছি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তির চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হতে পারে। এরপরই শান্তিচুক্তি ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সই হবে। পাকিস্তান এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর পরের সপ্তাহে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা হবে।” তবে চুক্তি স্বাক্ষরের নির্দিষ্ট সময় নিয়ে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, স্বাক্ষরের সঠিক সময় সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তি আগামীকাল নয়, বরং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে স্বাক্ষর হতে পারে। এদিকে এমন এক সময় এই অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যখন শনিবার ভোরেও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একাধিক ড্রোন ধ্বংস করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইরান। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের কর্মকর্তারা গত শুক্রবার থেকে ধারাবাহিকভাবে চুক্তি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে আসছেন। যুদ্ধ শুরুর পর গত তিন মাসে এমন ইতিবাচক বার্তা আগে দেখা যায়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, “ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছেছে।” পরে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি সতর্ক করে বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি না হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো সমঝোতা হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। তিনি আরও জানান, চুক্তিটি দূরবর্তী বা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হবে। আরাগচির এই বক্তব্যের আগে পশ্চিমা এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও পরোক্ষভাবে সেই সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। চুক্তিতে ইরান বেশি সুবিধা পাচ্ছে বলে যে আলোচনা চলছে, তার জবাবে শুক্রবার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “ইরান যেসব শর্ত ফেক নিউজ বা ভুয়া খবর হিসেবে ফাঁস করেছে, তার সঙ্গে লিখিতভাবে যেসব শর্তে সম্মতি হয়েছে, তার কোনো সম্পর্ক নেই।” যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত সমঝোতা চুক্তির ধারাগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করা হতে পারে। এ ছাড়া ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, তেহরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং দেশটির জব্দ অর্থের একটি অংশ ছাড় দেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, প্রাথমিক এই চুক্তিতে পারমাণবিক কর্মসূচি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত থাকছে না। এ বিষয়ে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আলাদা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে এখনো পার্থক্য রয়েছে। হোয়াইট হাউসের দাবি, প্রাথমিক সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরান নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি বাতিল এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা অন্যত্র স্থানান্তরে সম্মত হয়েছে। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস করা হবে না এবং কোনো বিদেশি রাষ্ট্রেও পাঠানো হবে না। বরং দেশের ভেতরেই সংরক্ষণ করে এর সমৃদ্ধতার মাত্রা কমিয়ে আনা হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। সংঘাত শুরুর ৪০ দিন পর, গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এরপর ১১ ও ১২ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। পরে নতুন করে দ্বিতীয় দফা আলোচনার চেষ্টা চলতে থাকে। বর্তমানে যে সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে, তা দুই দেশের কর্মকর্তাদের সরাসরি উপস্থিতিতে নয়; বরং ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হবে বলে জানা গেছে। সংঘাতের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির একাধিক শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতা আগামী ৪ জুলাই শুরু হবে এবং ৯ জুলাই মাশহাদ শহরে তাঁকে দাফন করা হবে। এদিকে সম্ভাব্য চুক্তির আলোচনার মধ্যেই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত আরও কঠোর নিরাপত্তার আওতায় নিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য কোনো মার্কিন অভিযানের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম জব্দ ঠেকাতে কিছু ভূগর্ভস্থ টানেল ধ্বংস করা হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে। বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যার সক্ষমতা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পর্যায়ে বলে ধারণা করা হয়।
স্থায়ী ও বিস্তৃত যুদ্ধবিরতি ছাড়া কোনো ধরনের সমঝোতায় রাজি নয় বলে জানিয়েছে ইরান। দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ বলেছেন, তেহরান কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি মেনে নেবে না এবং পুরো অঞ্চলে সংঘাতের স্থায়ী অবসানই তাদের লক্ষ্য। তুরস্কের আন্টালিয়া ডিপ্লোমেসি ফোরাম-এর সাইডলাইনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। খাতিবজাদেহ বলেন, যেকোনো যুদ্ধবিরতি হতে হলে তা লেবানন থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সব সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এটিকে ইরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “আমরা কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি গ্রহণ করছি না। এই সংঘাত এখন একবারেই শেষ হওয়া উচিত।” হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে এই জলপথ সব দেশের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। যদিও এটি ইরানের আঞ্চলিক পানিসীমার মধ্যে পড়ে, তবুও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে দীর্ঘদিন ধরে এখানে অবাধ চলাচল বজায় রাখা হয়েছে। এ অঞ্চলে চলমান অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে ইরানের এই কূটনীতিক বলেন, তাদের কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সূত্র: আল জাজিরা
অবশেষে সকল পরীক্ষা নীরিক্ষার ধাপ পেরিয়ে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন লাইসেন্স অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বিএইআরএ) প্রধান শাখা নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি ইনফ্রাস্ট্রাকচারের প্রকল্প পরিচালক ড. মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, আমাদের দিক থেকে আর কোনো সমস্যা নেই। জ্বালানী লোডিং এর কমিশনিং লাইসেন্স দিয়ে দিছি। এখন সরকার জ্বালানী লোডিং উদ্বোধনের তারিখ ঠিক করবেন। সে অনুযায়ী জ্বালানী লোডিং শুরু হবে। এতে করে চলতি এপ্রিলের শেষের দিকে রূপপুর পারমাণবিকের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং উদ্বোধন হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বলেন, এর আগে গত ৭ এপ্রিল উদ্বোধনের জন্য মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিলেও কিছু ক্রিটিক্যাল ইস্যু সামনে আসে। সেগুলো সমাধানের জন্য সময় দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য-আমরা সততার সঙ্গে জোরালো চেষ্টা করছি। এখন পজিশন ভালো। সেই জন্য প্রথম ইউনিটে ফুয়েল লোডিংয়ের (কমিশনিং) বিষয়ে আমরা এখন সবাই একমত হওয়ায় লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল) কে পরিচালনার জন্য অপারেটর হিসেবে অথারাইজেশন দেওয়া হয়েছে। এজন্য এনপিসিবিএল-এর ৫৯ জনকে পার্সোনাল লাইসেন্সও প্রদান করার কথা জানান তিনি। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জ্বালানী লোডিং এর লাইসেন্স প্রাপ্তি, এনপিসিবিএল-কে অপারেটর হিসেবে নিযুক্তি এবং ৫৯ জনকে পার্সোনাল লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বৃহস্পতিবার রাতে জানান, ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিমূলক কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অগ্নি নিরাপত্তা সংক্রান্ত এনওসি (অনাপত্তিপত্র) পাওয়া গেছে। নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও সেফগার্ডকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ তথা জ্বালানি লোডিংয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ডিসেম্বরের মধ্যে ধাপে ধাপে রূপপুরে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। প্রসংগত: এর আগে লাইসেন্স না পাওয়ায় নির্ধারিত চলতি মাসের ৭ এপ্রিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর প্রথম ইউনিটে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। চলতি বছরের ১৫ মার্চ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক পত্রে ৭ এপ্রিল প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের উদ্বোধন করার কথা জানানো হয়েছিল। দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এ প্রকল্পটি দীর্ঘ সময়ের নানা জটিলতা পেরিয়ে এখন দৃশ্যমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর আগেও একাধিকবার উৎপাদন শুরুর সময় পিছিয়েছে। প্রায় দুই বছর আগে রাশিয়া থেকে প্রথম ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়াম জ্বালানি দেশে আনা হলেও তা এখনো ব্যবহার করা যায়নি। জ্বালানি লোডিংয়ের আগে আন্তর্জাতিক পরমানু শক্তি সংস্থা এর তত্বাবধানে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ থেকে লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। প্রসঙ্গত, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে নির্মাণ করা হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া প্রকল্পটিতে অর্থায়ন এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে। ২০১৭ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। মূল প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১২.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে এবং দ্বিতীয় ইউনিটের ৭০ শতাংশের বেশি কাজ শেষ হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ২০২২ সালে কমিশনিংয়ের কথা থাকলেও তা তিন বছর পিছিয়ে গেছে। গত বছর বাংলাদেশ ও রাশিয়া ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ দুটি ইউনিটের কাজ শেষ করার জন্য সময়সীমা বাড়াতে সম্মত হয়। প্রকল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজ আগামী বছরের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সবমিলিয়ে, পুরো প্রকল্পের কাজ ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই অনুযায়ী, আগামী বছরের শুরুর দিকে রূপপুর থেকে প্রথম ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা। ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ আরও ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের কথা রয়েছে।
লেবানন সরকারের ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় যাওয়ার সিদ্ধান্তকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন দেশটির প্রভাবশালী সংগঠন হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য হুসেইন হাজ্জ হাসান। তিনি এই উদ্যোগকে ‘গুরুতর ভুল’ ও ‘দেশের স্বার্থবিরোধী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসান বলেন, ‘শত্রুর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা একটি গুরুতর পাপ ও গুরুতর ভুল। এটি দেশের কোনো স্বার্থই পূরণ করে না।’ তিনি মনে করেন, এ ধরনের সংলাপ লেবাননের জাতীয় স্বার্থকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সংসদীয় কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি লেবানন সরকারের প্রতি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘অপ্রয়োজনীয় ছাড়’ দেওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, বর্তমান নীতি দেশের জন্য কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনছে না এবং এ অবস্থান থেকে সরে আসা প্রয়োজন। প্রসঙ্গত, ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের চলমান সংঘাত নিরসনে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে কূটনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে লেবানন যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক সংকট মোকাবিলার ওপর গুরুত্বারোপ করে। অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা হিজবুল্লাহসহ অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করতে চায়। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমনে সংলাপ অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণায় দুই দেশের মধ্যে আরও একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা চলমান সংঘাত নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাশিয়ায় চলমান যুদ্ধের জন্য এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু করছে ক্রেমলিন, যেখানে ড্রোন বাহিনীতে যোগ দিতে তাদের ওপর তৈরি করা হচ্ছে নজিরবিহীন মানসিক চাপ। মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো বড় শহরগুলোর নামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন যুদ্ধের প্রচারণামূলক পোস্টার এবং ড্রোন পরিচালনার ভিডিও গেমিং বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে পুরো শিক্ষাঙ্গন। শিক্ষার্থীদের প্রলুব্ধ করতে মাত্র এক বছরের চুক্তি, সম্মুখ সমর থেকে দূরে থাকা এবং উচ্চ বেতনের পাশাপাশি বিশাল অংকের আর্থিক বোনাসের লোভ দেখানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা সতর্ক করেছেন যে, এই চুক্তিগুলো আসলে এক ধরণের ফাঁদ এবং একবার সই করলে অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধে আটকে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। রাশিয়ার বর্তমান আইন অনুযায়ী আংশিক সংহতির ডিক্রি বহাল থাকায় এক বছরের চুক্তির প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হওয়ার কোনো আইনি গ্যারান্টি নেই বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় ঘাটতি রয়েছে বা যারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার ঝুঁকিতে আছে, তাদের বহিষ্কারের ভয় দেখিয়ে যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। ভিডিও গেমারদের ড্রোন চালক হিসেবে গড়ে তোলার এই কৌশলী প্রচারণা তরুণ প্রজন্মের কাছে যুদ্ধের ভয়াবহতাকে আড়াল করে একটি অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে ক্রেমলিন। অনেক শিক্ষার্থী সরাসরি জানিয়েছেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা এখন নিয়মিত সভা করে তাদের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন যা সাধারণ শিক্ষার পরিবেশকে চরমভাবে ব্যাহত করছে। সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেট ইউনিভার্সিটির মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন সরাসরি সামরিক চুক্তি প্রচার করছে যা রাশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সরকারের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণেরই স্পষ্ট প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর অনুসন্ধান বলছে যে, বিশাল অংকের অর্থের প্রলোভন সত্ত্বেও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী এই প্রচারণা নিয়ে সন্দিহান এবং তারা একে এক ধরণের মরণফাঁদ হিসেবেই দেখছে। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ, রুশ শিক্ষার্থী নিয়োগ, ড্রোন বাহিনী প্রচারণা, ক্রেমলিন সামরিক নীতি, আন্তর্জাতিক সংবাদ।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে ইরানের অন্তত ২৭০ বিলিয়ন ডলার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান। একই সঙ্গে হামলায় সহযোগিতার অভিযোগ তুলে পাঁচটি আরব দেশের কাছে ক্ষতিপূরণও চেয়েছে দেশটি। রুশ বার্তা সংস্থা রিয়া নভোস্তিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমাহ মোহাজেরানি বলেন, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। তিনি জানান, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে ধাপে ধাপে মূল্যায়ন করা হবে। মোহাজেরানির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে অবকাঠামো ও স্থাপনার ক্ষতি নিরূপণ করা হবে। এরপর বাজেট ঘাটতি, শিল্পকারখানা বন্ধ থাকা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার প্রভাব বিশ্লেষণ করা হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি স্কুলে হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ওই ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে এবং এর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এদিকে, ইরানি সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডানের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে ইরান। অভিযোগ করা হয়েছে, এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার লঙ্ঘন করেছে। ফলে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য তাদের দায়ী করা উচিত। সংঘাত শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ইরান পাল্টা হামলা চালায় ইসরায়েলসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে। এরই মধ্যে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও তা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। প্রায় ২১ ঘণ্টার ওই বৈঠকে মতপার্থক্য কাটেনি, তবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে দুই দেশ আবারও আলোচনায় বসতে পারে। যদিও এখনো নির্দিষ্ট তারিখ চূড়ান্ত হয়নি, তবুও উভয় পক্ষ আলোচনার পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতের অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা উভয় পক্ষকেই আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করছে।
ইরানের বন্দরগুলোতে সম্ভাব্য মার্কিন অবরোধের ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সপ্তাহের শুরুতেই লেনদেনে এ প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ২৪ ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দামও ৭ শতাংশ বেড়ে বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ২৯ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান–সংকট শুরুর আগে তেলের দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার। সংঘাতের প্রভাবে তা বিভিন্ন সময়ে ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়। তবে পাকিস্তানে সম্ভাব্য সমঝোতা বৈঠকের খবরের পর গত শুক্রবার জুন মাসের সরবরাহের জন্য তেলের দাম কিছুটা কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ দশমিক ২০ ডলারে নেমেছিল। জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজার আবারও অস্থিরতার দিকে ফিরে গেছে। এমএসটি মার্কির জ্বালানি গবেষণা বিভাগের প্রধান সল কাভোনিক বলেন, যুদ্ধবিরতির আগের উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় বাজার ফিরে এসেছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরান–সংশ্লিষ্ট দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেলের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে দামের ওপর আরও চাপ তৈরি হবে। এর আগে রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, খুব শিগগিরই হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ কার্যকর করা হতে পারে। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পরও যুদ্ধবিরতির কোনো স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত তেল ও পেট্রোলের দাম উচ্চ পর্যায়েই থাকতে পারে। একই সঙ্গে ইরান–সংকটকে ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাবের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। এদিকে সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপের মধ্যে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা পূর্ব–পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহের পূর্ণ সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের অবরোধ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিরতি আলোচনা আজ শনিবার রাজধানী ইসলামাবাদে শুরু হচ্ছে। চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এ বৈঠককে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে, ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে আছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। এতে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বসহ বহু মানুষ নিহত হন। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুই পক্ষ, যার মেয়াদ ২২ এপ্রিল পর্যন্ত। সেই প্রেক্ষাপটেই শুরু হচ্ছে এই আলোচনা। আলোচনার মূল বিষয়গুলো এই বৈঠকে উভয় পক্ষ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অবস্থান তুলে ধরবে। যুক্তরাষ্ট্র চায়— ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সীমিত করা হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা অন্যদিকে, ইরানের দাবির মধ্যে রয়েছে— আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো আঞ্চলিক সংঘাত বন্ধ করা হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি এছাড়া লেবাননে চলমান সংঘাতও আলোচনার অন্যতম বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। ইরান বলছে, সেখানে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ না হলে কার্যকর কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়। আলোচনার ধরন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আলোচনার প্রথম ধাপে দুই পক্ষ আলাদা কক্ষে বসবে এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা বার্তা আদান-প্রদান করবেন। পরবর্তীতে সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে। নিরাপত্তার কারণে ইসলামাবাদে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ‘রেড জোন’ সিল করে দেওয়া হয়েছে এবং সম্ভাব্য বৈঠকের স্থান হিসেবে একটি পাঁচতারকা হোটেলকে কেন্দ্র করে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। ফলাফল কী হতে পারে বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিক কোনো চূড়ান্ত সমাধান আসার সম্ভাবনা কম। দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস এখনো বড় বাধা হয়ে আছে। তবে সীমিত পর্যায়ে কিছু অগ্রগতি হতে পারে, যেমন— যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো আস্থাবর্ধক পদক্ষেপ গ্রহণ হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে খুলে দেওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, লেবানন ইস্যু এবং ইসরায়েলের ভূমিকা এই আলোচনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইসরায়েল আলোচনায় সরাসরি অংশ না নেওয়ায় ভবিষ্যতে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। কূটনৈতিক গুরুত্ব এই বৈঠককে একটি ‘সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্ত’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, চরম উত্তেজনার মধ্যেও দুই পক্ষের আলোচনায় বসা নিজেই একটি বড় অগ্রগতি। পাকিস্তানও এই উদ্যোগকে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছে। দেশটি আশা করছে, এই আলোচনার মাধ্যমে অন্তত একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি হবে।
পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য বহুল আলোচিত শান্তি বৈঠকের আগে ইতিবাচক তবে সতর্ক বার্তা দিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এয়ার ফোর্স টু-তে ওঠার আগে সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান, ইরান যদি "সৎ উদ্দেশ্যে" আলোচনায় অংশ নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। জেডি ভ্যান্স বলেন, "আমরা এই আলোচনা নিয়ে আশাবাদী। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমাকে আলোচনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।" তবে তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন যে, ইরান যদি আলোচনার টেবিলে "প্রতারণার চেষ্টা" করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাতে মোটেও সাড়া দেবে না। আগামী শনিবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে এই মেগা বৈঠক শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট নিশ্চিত করেছেন যে, ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের সঙ্গে এই বিশেষ প্রতিনিধিদলে আরও থাকছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। এদিকে, ইসলামাবাদে বৈঠকের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও পাকিস্তানি সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, দেশটির সরকার এখনও ইরানি প্রতিনিধিদলের আগমনের প্রতীক্ষায় রয়েছে। এই আলোচনার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তজনা নিরসন এবং একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ।
মাত্র ৪০ দিনের যুদ্ধেই ইরানজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এতে দেশটির বেসামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্টের বরাতে আল-আরাবিয়া জানিয়েছে, এই যুদ্ধে ইরানের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪০ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ লক্ষ কোটি টাকার সমান। ইরানের রেডক্রস সোসাইটির প্রধান পিরহোসেন কোলিভান্ড জানিয়েছেন, যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ২৫ হাজার ৬৩০টি বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ আবাসিক বাড়ি রয়েছে। এছাড়া ২৩ হাজার ৫০০টি বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং ৩৩৯টি হাসপাতাল, ফার্মেসি ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র হামলার শিকার হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩২টি বিশ্ববিদ্যালয় ও ৮৫৭টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি ইরানের সামরিক শক্তির ওপরও বড় আঘাত এসেছে। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের চারটি প্রধান ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎপাদন কেন্দ্র—খোজির, পারচিন, হাকিমিয়েহ এবং শারাউদ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই সঙ্গে ২৯টি মিসাইল উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং ৫টি জ্বালানি সংরক্ষণাগারেও হামলা চালানো হয়েছে। এই যুদ্ধের ফলে অনেক ইরানি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন এবং দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিমানবন্দর ও ব্রিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে। সূত্র: আল-আরাবিয়া, ওয়াশিংটন পোস্ট
লেবাননে ভয়াবহ মানবিক সংকটের আশঙ্কা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির খাদ্য সহায়তা বিভাগ ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, চলমান সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। গত দুই দিনে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এই সময়ের মধ্যে শত শত মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৮ এপ্রিল) দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৩০৩ জন নিহত এবং প্রায় ১,১৫০ জন আহত হয়েছেন। পরদিন বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) প্রকাশিত প্রাথমিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে আসে। ডব্লিউএফপি-এর লেবানন প্রতিনিধি অ্যালিসন ও’মাহোনি লাউ জানান, সংঘাত শুরুর পর থেকেই তারা মাঠপর্যায়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং বিপুল সংখ্যক মানুষকে খাদ্য ও নগদ সহায়তা দিচ্ছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, নিরাপদ চলাচলের সুযোগ না থাকলে জরুরি সহায়তা ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে না। তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তাহীনতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই এখন মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সূত্র: আল জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।