- প্রচ্ছদ
- বিজ্ঞান
বিজ্ঞান
জাপানের মিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ক্রিসপার ক্যাস৯ জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডাউন সিনড্রোম থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া মানবকোষে অতিরিক্ত ২১ নম্বর ক্রোমোজোম সরাতে সক্ষম হয়েছেন। রিয়োতারো হাশিজুমের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পিএনএএস নেক্সাস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এটি শরীরের বাইরে পরীক্ষাগারে কোষের ওপর পরিচালিত গবেষণা। কোনো মানুষের শরীরে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে ডাউন সিনড্রোমের চিকিৎসা করা হয়নি। ট্রাইসোমি ২১ অবস্থায় সাধারণ দুটি কপির পরিবর্তে কোষে ২১ নম্বর ক্রোমোজোমের তিনটি কপি থাকে। এই অতিরিক্ত জিনগত উপাদান ডাউন সিনড্রোমের সঙ্গে সম্পর্কিত বিকাশগত পার্থক্য ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণ। গবেষকেরা আলাদা কোনো জিনের পরিবর্তন করার পরিবর্তে তিনটি ক্রোমোজোমের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি কপি সরানোর পদ্ধতি পরীক্ষা করেছেন। মিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ক্রোমোজোম অপসারণের হার সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ পাওয়া গেছে। এই হার পরীক্ষাগারের কোষে পাওয়া ফলাফল। এটি মানুষের চিকিৎসায় সাফল্যের হার নয় এবং পরীক্ষার সব কোষ থেকেই অতিরিক্ত ক্রোমোজোম সরানো সম্ভব হয়নি। গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে ডাউন সিনড্রোম থাকা ব্যক্তির ত্বক থেকে নেওয়া ফাইব্রোব্লাস্ট কোষ এবং সেগুলো থেকে তৈরি আইপিএস কোষ। আইপিএস হলো পরীক্ষাগারে পুনঃপ্রোগ্রাম করা এমন স্টেম সেল, যা বিভিন্ন ধরনের কোষে পরিণত হতে পারে। গবেষকেরা জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট ক্রোমোজোম কপিকে শনাক্ত করার উপযোগী নির্দেশক তৈরি করেন। এরপর ক্রিসপার ক্যাস৯ ব্যবস্থার সাহায্যে সেই ক্রোমোজোমের একাধিক স্থানে কাটার মাধ্যমে সেটি অপসারণের চেষ্টা করেন। পদ্ধতিটির বিশেষ দিক হলো তিনটি কপির সবগুলোকে নির্বিচারে লক্ষ্য না করে নির্দিষ্ট একটি কপিকে লক্ষ্যবস্তু করা। গবেষণাপত্রে এই কৌশলকে অ্যালিল স্পেসিফিক পদ্ধতি বলা হয়েছে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, স্টেম সেলের পাশাপাশি পরিণত ফাইব্রোব্লাস্ট এবং বিভাজন না হওয়া কোষেও এই কৌশলে ক্রোমোজোম অপসারণ সম্ভব হয়েছে। অতিরিক্ত ক্রোমোজোম সরানো কোষে কিছু কার্যগত পরিবর্তনও পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব কোষে জিনের সক্রিয়তার ধরন, কোষের বৃদ্ধির গতি এবং ক্ষতিকর সক্রিয় অক্সিজেন মোকাবিলার সক্ষমতা স্বাভাবিক অবস্থার দিকে ফিরেছে। তবে কোষের এই পরিবর্তন থেকে মানুষের বিকাশগত বৈশিষ্ট্য বা স্বাস্থ্যগত জটিলতা একইভাবে বদলে যাবে, এমন সিদ্ধান্ত এই গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশোধিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, লক্ষ্য করা ক্রোমোজোমটি অপসারিত না হলে সেটিতে ডিএনএর অংশ বাদ পড়া, যুক্ত হওয়া কিংবা উল্টোভাবে বিন্যস্ত হওয়ার মতো পরিবর্তন ঘটতে পারে। ডিএনএর দুই সুতো কাটার সঙ্গে এসব ঝুঁকি সম্পর্কিত। গবেষকেরা তাই ভবিষ্যতে ক্রোমোজোম না কেটে সেটি অপসারণের আরও নিরাপদ পদ্ধতি তৈরির প্রয়োজন তুলে ধরেছেন। এই কাজকে ইতিহাসে প্রথমবার সম্পূর্ণ ক্রোমোজোম সরানোর ঘটনা বলা যথাযথ নয়। গবেষণাপত্রেই ক্রিসপার ব্যবহার করে পুরো ক্রোমোজোম অপসারণের আগের গবেষণার উল্লেখ রয়েছে। নতুন গবেষণার গুরুত্ব হলো মানব ট্রাইসোমি ২১ কোষে নির্দিষ্ট একটি ক্রোমোজোম কপিকে বেছে অপসারণের কৌশল এবং তার কার্যকারিতা দেখানো। মিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্পষ্ট করেছে, এটি কোষ পর্যায়ে একটি ধারণার কার্যকারিতা প্রমাণের গবেষণা। ফলাফল ভবিষ্যতে ডাউন সিনড্রোমের সঙ্গে সম্পর্কিত জটিলতা নিয়ে গবেষণায় সহায়তা করতে পারে। তবে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে পদ্ধতিটির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বর্তমানে এই গবেষণাকে ডাউন সিনড্রোম সারানোর চিকিৎসা হিসেবে উপস্থাপন করার ভিত্তি নেই।
পানীয়তে অ জ্ঞা তে মা দক মেশানো হয়েছে কি না, তা শনাক্ত করার জন্য বিশেষ ধরনের নেলপলিশ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের চার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। ২০১৪ সালে নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির চার শিক্ষার্থী মিলে তৈরি করা এই পরীক্ষামূলক নেলপলিশের নাম দেওয়া হয় ‘আন্ডারকভার কালার্স’। পানীয়তে নির্দিষ্ট কিছু মা দক উপস্থিত থাকলে নেলপলিশের রং বদলে যাওয়ার কথা ছিল। এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আনকেশ মাদান, স্টিফেন গ্রে, ট্যাসো ভন উইন্ডহেইম ও টাইলার কনফ্রে-ম্যালোনি। চারজনই নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের অভিজ্ঞতা থেকে তারা বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করা, যার মাধ্যমে কেউ নিজের পানীয় গ্রহণের আগে সেটিতে সম্ভাব্য ক্ষতিকর কোনো পদার্থ আছে কি না, তা সহজভাবে যাচাই করতে পারেন। পরিকল্পনাটি ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ। নেলপলিশটি আঙুলে ব্যবহার করার পর পানীয়ের সংস্পর্শে আনলে নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতিতে এর রং পরিবর্তিত হওয়ার কথা ছিল। সে সময় পরীক্ষামূলকভাবে রোহিপনল, জ্যানাক্স ও জিএইচবির মতো পদার্থ শনাক্ত করার সক্ষমতা নিয়ে কাজ চলছিল। উদ্যোগটি দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে আলোচনায় আসে। ‘আন্ডারকভার কালার্স’ শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পায়। পরে একজন বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে প্রায় ১ লাখ ডলারের বিনিয়োগও আকর্ষণ করে। এর ফলে চার শিক্ষার্থীর উদ্ভাবনটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জায়গা করে নেয়। তবে শুরু থেকেই এটি একটি পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি ছিল। ২০১৪ সালে নেলপলিশটি সাধারণ মানুষের জন্য বাজারে বিক্রির উপযোগী চূড়ান্ত পণ্য ছিল না। তখনও এর কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল। ফলে এটিকে বাজারে সহজলভ্য কোনো প্রস্তুত পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। উদ্ভাবনটি আলোচনায় আসার পাশাপাশি সমালোচনারও মুখে পড়ে। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেছিল, এ ধরনের প্রযুক্তি সম্ভাব্য ভুক্তভোগীকেই নিজের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাদের মতে, যৌ ন নি র্যা ত ন বা এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের মূল দায়িত্ব সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর নয়; অপরাধীকে প্রতিহত করা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য অবশ্য ছিল ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষকে সম্ভাব্য বিপদ শনাক্ত করার একটি উপায় দেওয়া। তাদের ধারণা ছিল, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি একটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। পরবর্তী সময়ে ‘আন্ডারকভার কালার্স’ নেলপলিশের ধারণাটি আর বাজারজাত করা হয়নি। পরে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা ‘সিপচিপ’ নামে ভিন্ন ধরনের পানীয় পরীক্ষার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো পোস্টের মাধ্যমে নেলপলিশটিকে এখনো বাজারে পাওয়া যায় বা এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে—এমন দাবি সঠিক নয়। তবে প্রায় এক দশক আগে চার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর এই উদ্যোগ পানীয়তে অ জ্ঞা তে মা দক মেশানোর ঝুঁকি এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছিল। একই সঙ্গে উদ্ভাবনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে—প্রযুক্তি সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্তে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু যৌ ন নি র্যা ত নসহ কোনো অপরাধের দায় কখনোই সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর ওপর বর্তায় না।
ডাইনোসরের যুগে পৃথিবীতে বিচরণ করা এক অদ্ভুত নতুন প্রজাতির পোকার সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ৯ কোটি ৯০ লাখ বছর আগে বেঁচে থাকা এই পতঙ্গের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে গাছের রেজিন থেকে তৈরি অ্যাম্বারের ভেতরে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, পোকার মুখের বিশেষ অঙ্গটি ছিল তার শরীরের প্রায় দ্বিগুণ লম্বা এবং অত্যন্ত নমনীয়। নতুন প্রজাতিটির বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে ক্রেটোডোরাস নুনু। তবে বিজ্ঞানীদের দেওয়া এই নামের পেছনে রয়েছে শিশুদের জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘টেলিটাবিজ’-এর একটি পরিচিত চরিত্র। অনুষ্ঠানের ভ্যাকুয়াম ক্লিনার নু-নুর লম্বা ও নমনীয় পাইপের সঙ্গে প্রাচীন পতঙ্গটির মুখের অঙ্গের মিল থাকায় তার নাম অনুসারেই নতুন প্রজাতিটির নামকরণ করা হয়েছে। ইসরায়েলের স্টেইনহার্ট মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির গবেষকেরা মিয়ানমার থেকে পাওয়া কাচিন অ্যাম্বারে সংরক্ষিত এই প্রাচীন পতঙ্গের নমুনা পরীক্ষা করে নতুন প্রজাতিটি শনাক্ত করেন। পোকাটি নিয়াজোনিইডি নামে পরিচিত প্রাচীন এক ধরনের প্ল্যান্টহপার পরিবারের সদস্য। এই পরিবারের আরও ১৩টি নমুনা একই ধরনের অ্যাম্বারে সংরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। গবেষকদের নজর কেড়েছে পোকাটির অস্বাভাবিক মুখাঙ্গ। সাধারণভাবে এ ধরনের উদ্ভিদভুক পতঙ্গের মুখের অঙ্গ অনেকটা সূচের মতো হয়। সেটি উদ্ভিদের টিস্যুতে ঢুকিয়ে তারা গাছের তরল বা রস সংগ্রহ করে। কিন্তু ক্রেটোডোরাস নুনুর মুখাঙ্গ ছিল অনেক বেশি লম্বা, নমনীয় ও জটিল। গবেষণায় দেখা গেছে, এই মুখাঙ্গের গায়ে ঘন ঘন ভাঁজ ছিল। কাঠামোটি অনেকটা বাঁকানো স্ট্র বা নমনীয় পাইপের মতো। এই ভাঁজ মুখাঙ্গটিকে নমনীয় রাখার পাশাপাশি চাপ পড়লে সেটি যাতে চুপসে না যায়, সেখানেও ভূমিকা রাখত বলে গবেষকদের ধারণা। এই বিশেষ গঠনের কারণে পোকাটি গাছের বাকলের গভীর ফাটল ও সরু খাঁজের ভেতরেও পৌঁছাতে পারত বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে থাকা উদ্ভিদের রস সংগ্রহ করাই সম্ভবত এর প্রধান খাদ্য সংগ্রহের কৌশল ছিল। শক্ত বা কম নমনীয় মুখাঙ্গের পতঙ্গ যেখানে সহজে পৌঁছাতে পারত না, সেখানে নু-নুর মতো লম্বা মুখাঙ্গ বড় সুবিধা দিতে পারে। জীবাশ্মের কয়েকটি নমুনায় মুখাঙ্গ বাঁকানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এটিও প্রমাণ করে যে পোকাটি জীবিত অবস্থায় তার মুখাঙ্গ বাঁকাতে ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভাঁজ করতে পারত। অ্যাম্বারের ভেতরে এমন অবস্থায় সংরক্ষিত হওয়ায় কোটি কোটি বছর আগের এই ক্ষুদ্র প্রাণীর শারীরিক গঠন সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ পেয়েছেন তারা। পোকাটির মুখাঙ্গের শেষ প্রান্তেও ছিল আরেকটি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। সেখানে দুটি খাঁজযুক্ত লোব বা অংশ ছিল, যা খাবার গ্রহণের সময় খুলে গিয়ে গাছের বাকলের ফাটলের দেয়ালে আটকে থাকতে সাহায্য করত বলে গবেষকেরা মনে করছেন। এটি অনেকটা কোনো গর্তের ভেতরে ঢুকে প্রসারিত হয়ে আটকে থাকা একটি দেয়াল-অ্যাঙ্করের মতো কাজ করতে পারে। বর্তমানে বেঁচে থাকা এই প্রাচীন পরিবারের আত্মীয়দের মধ্যে এমন কাঠামো দেখা যায় না। ফলে বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি ছিল একটি বিশেষ বিবর্তনীয় অভিযোজন, যা পরবর্তী সময়ে হারিয়ে গেছে। গবেষকেরা বলছেন, এই আবিষ্কার শুধু একটি নতুন পতঙ্গের সন্ধান পাওয়ার ঘটনা নয়। এর মাধ্যমে ডাইনোসরের যুগের বনভূমির পরিবেশ সম্পর্কেও নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। একই সময়ের আরও কয়েকটি সম্পর্কহীন পতঙ্গের মধ্যেও এ ধরনের ভাঁজযুক্ত ও দীর্ঘ খাদ্য সংগ্রহের অঙ্গের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ক্রিটেশাস যুগের বনভূমিতে পুরু বাকলযুক্ত গাছের উপস্থিতি এমন পতঙ্গদের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করেছিল, যারা গাছের বাকলের গভীর অংশে পৌঁছাতে পারত। অর্থাৎ, প্রায় ১০ কোটি বছর আগে বনভূমির পরিবেশ আজকের তুলনায় অনেক ভিন্ন ছিল এবং সেই পরিবেশে টিকে থাকতে পতঙ্গগুলোও নানা ধরনের বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্য গড়ে তুলেছিল। গবেষক লিওনিদাস-রোমানোস দাভরানোউগ্লোর মতে, প্রায় ৯ কোটি ৯০ লাখ বছর আগে বেঁচে থাকা নু-নুর আবিষ্কার ডাইনোসরের যুগের পতঙ্গজগতের একটি অসাধারণ চিত্র সামনে এনেছে। তার মতে, এটি শুধু বিজ্ঞানের অজানা একটি পতঙ্গের সন্ধান নয়; বরং এমন একটি বিবর্তনীয় সমাধানের প্রমাণ, যার আধুনিক যুগে প্রায় কোনো সমতুল্য নেই। বিজ্ঞানীদের মতে, অ্যাম্বারে সংরক্ষিত এমন জীবাশ্ম কোটি কোটি বছর আগের বাস্তুতন্ত্র পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোন প্রাণী কীভাবে খাবার সংগ্রহ করত, কোন পরিবেশে তারা সুবিধা পেত এবং প্রাচীন বনভূমি কীভাবে কাজ করত—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এই ধরনের আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়। আর নতুন প্রজাতিটির ‘নু-নু’ নামটি সেই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। টেলিটাবিজের পরিচিত ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতোই এই প্রাচীন পতঙ্গের মুখ ছিল লম্বা ও নমনীয়। তবে কোটি কোটি বছর আগে বেঁচে থাকা এই ক্ষুদ্র প্রাণীর সেই অদ্ভুত মুখের পেছনে ছিল টিকে থাকার এক জটিল বিবর্তনীয় কৌশল।
নোবেল পুরস্কার জয়ের সুখবর পেয়েই তা সবার আগে সন্তানদের জানালেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কার্ল ডেইসেরথ। বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার পাওয়ার আনন্দের মধ্যেও বাবার দৈনন্দিন দায়িত্ব থেকে সরে যাননি তিনি। সন্তানদের সুখবর জানানোর পর তাদের জন্য নিজ হাতেই বানিয়েছেন স্যান্ডউইচ। ২০২৬ সালের ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কার্ল ডেইসেরথ। অপটোজেনেটিকস নিয়ে পথপ্রদর্শক গবেষণার জন্য জার্মানির দুই বিজ্ঞানী পিটার হেগেমান ও জর্জ নাগেলের সঙ্গে যৌথভাবে এই পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। নোবেল জয়ের খবর ডেইসেরথ জানতে পারেন গভীর রাতে একটি ফোনকলে। এমন একটি মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই আনন্দে ভেসে যাওয়ার কথা। কিন্তু খবরটি পাওয়ার পর তার কাছে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়াটাই হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্যানফোর্ডের প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ডেইসেরথ প্রথমে তার দুই মেয়ে সোফি ও এমাকে নোবেল জয়ের খবর দেন। ১০ বছর বয়সী সোফি ও ১৩ বছর বয়সী এমা খবরটি শুনে বিস্মিত হয়ে যায়। এরপর তারা বাবাকে জড়িয়ে ধরে। সোফি উচ্ছ্বসিত হয়ে বাবাকে বলে, ‘বাবা, তুমি তো সব পুরস্কারই জিতে ফেলেছ!’ এরপর ছেলে হাডসনকেও সুখবরটি জানান ডেইসেরথ। ১৬ বছর বয়সী হাডসন প্রথমে অবাক হয়ে বলে ওঠে, ‘কী? ওহ মাই গড, কী?’ এরপরই আনন্দ প্রকাশ করে বলে, ‘দারুণ!’ বাবার নোবেল জয়ের খবর সন্তানদের কাছে যেমন আনন্দের ছিল, তেমনি মুহূর্তটি হয়ে ওঠে পরিবারের জন্য বিশেষ স্মৃতি। তবে এই আনন্দের মধ্যেও ডেইসেরথের জীবনের আরেকটি সাধারণ দৃশ্য সামনে এসেছে—সন্তানদের জন্য খাবার তৈরি করা। স্ট্যানফোর্ড জানিয়েছে, ব্যস্ত গবেষণা ও পেশাগত জীবনের মধ্যেও ডেইসেরথ প্রতিদিন তার তিন ছোট সন্তানের জন্য স্যান্ডউইচ তৈরি করার সময় বের করেন। নোবেল জয়ের দিনও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তার ছেলে হাডসনের জন্য সাধারণত র্যাঞ্চ ড্রেসিং, চেডার চিজ, সালামি ও টার্কি দিয়ে স্যান্ডউইচ তৈরি করেন তিনি। মেয়ে সোফির পছন্দ র্যাঞ্চ, চেডার ও মাংসের স্যান্ডউইচ। আর এমার জন্য কিশমিশের পাউরুটিতে আমন্ড বাটার, মধু ও দারুচিনি দিয়ে স্যান্ডউইচ বানান। নোবেল জয়ের মতো জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনের দিনেও সন্তানদের জন্য খাবার তৈরির এই ছোট্ট অভ্যাসটিই ডেইসেরথের পারিবারিক জীবনের অন্য একটি দিক সামনে এনেছে। একদিকে তিনি বিশ্বমানের বিজ্ঞানী, অন্যদিকে সন্তানদের জন্য প্রতিদিনের দায়িত্ব পালন করা একজন বাবা। ডেইসেরথ স্ট্যানফোর্ডের বায়োইঞ্জিনিয়ারিং এবং সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড বিহেভিয়ারাল সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক। পাশাপাশি তিনি একজন চিকিৎসক হিসেবেও কাজ করেন। স্ট্যানফোর্ডেই তিনি এমডি ও পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন এবং সেখানেই রেসিডেন্সি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানীর মূল গবেষণার বিষয় অপটোজেনেটিকস। সহজভাবে বললে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আলো ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বিশেষ করে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি বিজ্ঞানীদের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ডেইসেরথ নিজেই অপটোজেনেটিকস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, আলো ব্যবহার করে কোষকে চালু বা বন্ধ করা যায়। মস্তিষ্কে অসংখ্য জটিল ও পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত কোষ রয়েছে। নির্দিষ্ট কোষকে চালু বা বন্ধ করে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধারণা পরীক্ষা করতে পারেন। এ বছর ডেইসেরথের সঙ্গে নোবেল পাওয়া পিটার হেগেমান ও জর্জ নাগেলও আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল এবং অপটোজেনেটিকসের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাদের কাজের ফলে স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণায় নির্দিষ্ট কোষের কার্যক্রম সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্ট্যানফোর্ড জানিয়েছে, ডেইসেরথ বিশ্ববিদ্যালয়টির ৩৭তম নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। তার এই অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও গর্ব প্রকাশ করেছে। স্ট্যানফোর্ডের প্রেসিডেন্ট জনাথন লেভিন বলেন, ডেইসেরথ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক নন, তিনি এই প্রতিষ্ঠানেরই সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি স্ট্যানফোর্ড থেকে এমডি ও পিএইচডি করেছেন এবং এখানেই রেসিডেন্সি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি চিকিৎসক হিসেবেও রোগী দেখেন। বিজ্ঞানের জগতে বড় সাফল্য অর্জনের পরও সন্তানদের জন্য স্যান্ডউইচ বানানোর মতো সাধারণ কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখেননি ডেইসেরথ। নোবেল জয়ের সুখবর সন্তানদের জানানো এবং এরপর তাদের জন্য খাবার তৈরি করার এই দুই দৃশ্যই যেন তার জীবনের দুই পরিচয়কে একসঙ্গে সামনে এনেছে—বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী এবং সন্তানদের যত্ন নেওয়া একজন বাবা।
মানুষের মতো নরম, নমনীয় এবং ক্ষত সারাতে সক্ষম চামড়া এবার রোবটের শরীরেও ব্যবহারের পথ দেখিয়েছেন জাপানের বিজ্ঞানীরা। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শোজি তাকেউচির নেতৃত্বে গবেষকেরা মানবকোষ ও কোলাজেন দিয়ে তৈরি জীবন্ত ত্বক একটি তিন জোড়ার রোবটিক আঙুলের গায়ে সফলভাবে বসিয়েছেন। আঙুলটি বাঁকালে ত্বকও স্বাভাবিকভাবে নড়ে এবং কেটে গেলে কোলাজেন শিটের সহায়তায় প্রায় সাত দিনের মধ্যে ক্ষতস্থান জোড়া লাগতে শুরু করে। গবেষণাটি ২০২২ সালে প্রকাশিত হলেও জীবন্ত টিস্যু দিয়ে তৈরি রোবোটিক কাভারিং নিয়ে আলোচনায় এটি এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গবেষকেরা প্রথমে রোবটের আঙুলের চারপাশে কোলাজেন ও মানব ত্বকের ডার্মাল কোষ ব্যবহার করে একটি স্তর তৈরি করেন। এরপর এর ওপর কেরাটিনোসাইট যোগ করে মানুষের ত্বকের বাইরের স্তরের মতো আরেকটি স্তর গড়ে তোলা হয়। এই পদ্ধতির বিশেষত্ব হলো, ত্বকটি আলাদা করে তৈরি করে পরে রোবটের গায়ে জোড়া লাগানো হয়নি। বরং রোবটের আঙুলের চারপাশেই সরাসরি ত্বকটি গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে আঙুলের বাঁক, খাঁজ ও জোড়াগুলোর সঙ্গে ত্বকটি ঘনিষ্ঠভাবে মানিয়ে যায় এবং নড়াচড়ার সময় সহজে ছিঁড়ে যায় না। গবেষণায় ব্যবহৃত রোবটিক আঙুলটি তিনটি জোড়াসম্পন্ন। একটি মোটর ও তারের সাহায্যে এটি বাঁকানো হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, জীবন্ত ত্বক দিয়ে ঢাকার পরও আঙুলটি জোড়াগুলো নড়াতে পারছে এবং ত্বক তার সঙ্গে নমনীয়ভাবে প্রসারিত হচ্ছে। সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল ত্বকের ক্ষত সারানোর পরীক্ষা। গবেষকেরা স্ক্যালপেল দিয়ে ত্বকের ডার্মাল স্তরে একটি ক্ষত তৈরি করেন। পরে সেই জায়গায় পাতলা কোলাজেন শিট লাগিয়ে দেন। প্রায় সাত দিন কালচারের পর দেখা যায়, আশপাশের ত্বকের কোষ কোলাজেন শিটের মধ্যে প্রবেশ করেছে এবং ক্ষতস্থানের সংযোগ শক্তিশালী হয়েছে। এরপর রোবটিক আঙুলটি আবার আগের মতো বাঁকানো সম্ভব হয়। তবে এটিকে মানুষের মতো সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ক্ষত নিরাময় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। গবেষণায় ক্ষতস্থানে কোলাজেন শিট বসিয়ে দিতে হয়েছিল এবং পুরো প্রক্রিয়াটি পুষ্টিসমৃদ্ধ তরল পরিবেশে চালানো হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে এই ত্বক শরীরের মানুষের ত্বকের মতো খোলা বাতাসে দীর্ঘ সময় স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে বেঁচে থাকতে পারে না। এটাই প্রযুক্তিটির বড় সীমাবদ্ধতা। বর্তমান সংস্করণে ত্বকের ভেতরে রক্তনালি বা এমন কোনো সঞ্চালন ব্যবস্থা নেই, যা নিয়মিত পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে। ফলে জীবন্ত অবস্থায় রাখতে এটিকে বিশেষ কালচার মিডিয়ামের মধ্যে রাখতে হয়। গবেষকেরা ভবিষ্যতে ত্বকের মধ্যে পুষ্টি সরবরাহের জন্য ক্ষুদ্র চ্যানেল তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। অধ্যাপক শোজি তাকেউচির দল দীর্ঘদিন ধরে বায়োহাইব্রিড রোবোটিকস নিয়ে কাজ করছে। এই ক্ষেত্রটিতে জীবন্ত কোষ ও টিস্যুকে যান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে এমন প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা করা হয়, যা প্রচলিত রোবটের তুলনায় বেশি নমনীয় ও মানুষের শরীরের বৈশিষ্ট্যের কাছাকাছি হতে পারে। গবেষকদের লক্ষ্য শুধু রোবটকে মানুষের মতো দেখতে করা নয়। ভবিষ্যতে ত্বকের মধ্যে সংবেদনশীল কোষ, চুলের ফলিকল, ঘামগ্রন্থিসহ আরও জটিল উপাদান যুক্ত করার সম্ভাবনাও তারা দেখছেন। এতে কোনো রোবট স্পর্শ অনুভব করা, তাপমাত্রা বুঝতে পারা কিংবা নিজের বাইরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা মেরামত করার মতো সক্ষমতার দিকে এগোতে পারে। এই ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে হিউম্যানয়েড রোবট, চিকিৎসা গবেষণা, ওষুধ ও প্রসাধনী পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। বিশেষ করে মানুষের সঙ্গে সরাসরি কাজ করবে এমন রোবটের ক্ষেত্রে নরম ও নমনীয় বহিরাবরণ নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। তবে গবেষণাটি এখনো পরীক্ষাগার পর্যায়ের। মানুষের মতো পূর্ণাঙ্গ ত্বক, দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার ক্ষমতা কিংবা স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্ষত নিরাময়ের পর্যায়ে প্রযুক্তিটি পৌঁছায়নি। তারপরও মানুষের জীবন্ত কোষ দিয়ে তৈরি ত্বক একটি চলমান রোবটের গায়ে বসানো এবং ক্ষত সারানোর সক্ষমতা দেখাতে পারা ভবিষ্যতের বায়োহাইব্রিড রোবট তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বরকে ‘ডুমসডে’ বা বিপর্যয়ের দিন হিসেবে উল্লেখ করেছিল ১৯৬০ সালে সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র। সেই তারিখ সামনে আসায় গবেষণাটি আবার আলোচনায় এসেছে। তবে এটিকে ওই দিন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়। গবেষণার মূল বিষয় ছিল অতীতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকলে কী ঘটতে পারে, তার গাণিতিক হিসাব। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালের ৪ নভেম্বর। এর শিরোনাম ছিল ‘ডুমসডে: ফ্রাইডে, ১৩ নভেম্বর, এডি ২০২৬’। গবেষণার লেখক হাইঞ্জ ফন ফোরস্টার, প্যাট্রিসিয়া এম. মোরা ও লরেন্স ডব্লিউ. অ্যামিয়ট তখন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গবেষণাপত্রের শুরুতেই বলা হয়েছিল, আগের দুই হাজার বছরের মতো জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে আলোচিত তারিখে মানুষের সংখ্যা অসীমের দিকে এগোবে। এই হিসাব তৈরিতে গবেষকেরা ঐতিহাসিক জনসংখ্যার তথ্য ব্যবহার করেন। তাঁদের সমীকরণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি সময়ের সঙ্গে আরও দ্রুত হওয়ার ধারণা অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই প্রবণতাকে ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করেই ২০২৬ সালের তারিখটি পাওয়া যায়। ফলে গবেষণার সিদ্ধান্তটি নির্ভর করছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের ওপর: অতীতের বৃদ্ধির ধারা ভবিষ্যতেও একইভাবে চলতে হবে। এটি পৃথিবী ধ্বংসের কোনো ভৌত প্রক্রিয়া শনাক্ত করার গবেষণা ছিল না। কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক অ্যালান ম্যাকইচার্ন সম্প্রতি দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে গবেষণাটির দীর্ঘদিনের প্রভাব তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অস্বাভাবিক শিরোনাম এবং গাণিতিক যুক্তির কারণে গবেষণাটি সংবাদমাধ্যম ও শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক মনোযোগ পায়। টাইম ও নিউইয়র্ক টাইমসে এটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। জিনতত্ত্ব, বাস্তুসংস্থান ও জনমিতির বিভিন্ন পাঠ্যবইয়েও সমীকরণটির উল্লেখ আসে। ম্যাকইচার্নের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ওই সমীকরণ থেকে পাওয়া জনসংখ্যার পূর্বাভাস অনেক জনমিতিবিদের হিসাবের তুলনায় ভালোভাবে মিলেছিল। তবে প্রায় ১৯৯৩ সাল থেকে বাস্তব জনসংখ্যা গবেষণাটির পূর্বাভাসের তুলনায় কম হতে থাকে। তিনি উল্লেখ করেন, গবেষকেরা বৈশ্বিক জন্মহার অর্ধেকে নামানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। বর্তমানে সেই হার ১৯৬০ সালের অর্ধেকেরও কিছুটা নিচে নেমেছে। বিশ্বের জনসংখ্যা নিয়ে জাতিসংঘের পূর্বাভাসও ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টস ২০২৪’ অনুযায়ী, বৈশ্বিক জনসংখ্যা ২০২৪ সালের প্রায় ৮২০ কোটি থেকে বেড়ে ২০৮০-এর দশকের মাঝামাঝি প্রায় ১ হাজার ৩০ কোটিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এরপর শতাব্দীর শেষ নাগাদ তা কিছুটা কমে প্রায় ১ হাজার ২০ কোটিতে নামতে পারে। এই পূর্বাভাসে জনসংখ্যা অসীমের দিকে যাওয়ার কথা বলা হয়নি। সুতরাং ১৯৬০ সালের গবেষণাটি বুঝতে এর শিরোনামের পাশাপাশি হিসাবের শর্তও বিবেচনায় নিতে হবে। অতীতের তথ্য থেকে তৈরি একটি জনসংখ্যা সমীকরণকে নির্দিষ্ট দিনে পৃথিবী ধ্বংসের প্রমাণ হিসেবে দেখানোর ভিত্তি নেই। পরবর্তী দশকগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা বদলে যাওয়ায় ‘ডুমসডে’র সেই হিসাবও বাস্তব প্রবণতার সঙ্গে আর মিলছে না।
শনি গ্রহের বরফে ঢাকা উপগ্রহ এনসেলাডাসে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন গবেষণায় আশাব্যঞ্জক তথ্য পাওয়া গেছে। পরীক্ষাগারে এনসেলাডাসের সম্ভাব্য সমুদ্রের মতো পরিবেশ তৈরি করে গবেষকেরা দেখেছেন, পৃথিবীর একটি বিশেষ ধরনের অণুজীব অত্যন্ত কঠিন পরিবেশেও টিকে থাকতে এবং মিথেন তৈরি করতে পারে। তবে এনসেলাডাসে সত্যিই প্রাণ রয়েছে, এমন কোনো সরাসরি প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। ২০২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেসে’ প্রকাশিত গবেষণায় এনসেলাডাসের সমুদ্রের সম্ভাব্য রাসায়নিক পরিবেশ এবং সেখানে অণুজীবের টিকে থাকার বিষয়টি পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা পরীক্ষাগারে উপগ্রহটির সমুদ্রের সম্ভাব্য পরিবেশ তৈরি করে পৃথিবীর একটি অণুজীব সেখানে কেমন আচরণ করে, তা পর্যবেক্ষণ করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশেও অণুজীবটি বৃদ্ধি পেতে এবং মিথেন উৎপাদন করতে সক্ষম। গবেষণায় ‘মিথানোথার্মোকক্কাস ওকিনাওয়েনসিস’ নামের একটি অণুজীব ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীর গভীর সমুদ্রের উষ্ণ জলীয় উৎসের কাছাকাছি এ ধরনের অণুজীব পাওয়া যায়। এটি হাইড্রোজেন ব্যবহার করে কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে মিথেন তৈরি করতে পারে। এনসেলাডাসের সম্ভাব্য সমুদ্রের পরিবেশে একই ধরনের প্রক্রিয়া সম্ভব কি না, সেটিই পরীক্ষার অন্যতম বিষয় ছিল। গবেষকেরা পরীক্ষাগারে অত্যন্ত ক্ষারীয় পরিবেশ তৈরি করেন এবং সেখানে হাইড্রোজেনের উপস্থিতি রাখেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, অণুজীবটি এমন কঠিন পরিবেশেও বৃদ্ধি পেতে এবং মিথেন উৎপাদন করতে পারে। পরীক্ষিত পরিবেশে এটি প্রায় ১১ পিএইচ মাত্রা পর্যন্ত টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে। এই ফল এনসেলাডাসের সম্ভাব্য পরিবেশে পৃথিবীর কিছু অণুজীবের মতো জীব টিকে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন তথ্য দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এনসেলাডাসের পাথুরে অভ্যন্তর এবং পানির মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে হাইড্রোজেন তৈরি হতে পারে। এই হাইড্রোজেন যদি উপগ্রহটির সমুদ্রে পর্যাপ্ত পরিমাণে উপস্থিত থাকে, তাহলে পৃথিবীর কিছু অণুজীবের মতো জীবের জন্য সেটি শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে। নতুন গবেষণায় পরীক্ষাগারে পাওয়া ফল সেই সম্ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এনসেলাডাসকে ঘিরে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের অন্যতম কারণ এর বরফের নিচে তরল পানির সমুদ্র থাকার শক্তিশালী প্রমাণ। উপগ্রহটির দক্ষিণ মেরুর বরফের ফাটল দিয়ে পানীয় বাষ্প ও বরফের ক্ষুদ্র কণা মহাকাশে ছিটকে বেরিয়ে আসে। নাসার ক্যাসিনি মহাকাশযান এসব কণার মধ্য দিয়ে উড়ে গিয়ে সেগুলোর রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করেছিল। ক্যাসিনির সংগৃহীত তথ্য থেকে বিজ্ঞানীরা পানি, লবণ, জৈব যৌগ এবং অন্যান্য রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছেন। এসব তথ্যের কারণে বিজ্ঞানীদের ধারণা, এনসেলাডাসের বরফের নিচে শুধু তরল পানিই নয়, জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু রাসায়নিক উপাদানও থাকতে পারে। তবে এসব উপাদানের উপস্থিতি সেখানে প্রাণ থাকার সরাসরি প্রমাণ নয়। ২০২৩ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় এনসেলাডাস থেকে বেরিয়ে আসা বরফকণায় ফসফেট শনাক্ত করা হয়। ফসফরাস জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ওই গবেষণার ফল ইঙ্গিত দেয়, এনসেলাডাসের সমুদ্রে প্রাণের রাসায়নিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ফসফরাসের উপস্থিতি থাকতে পারে। এই তথ্যও উপগ্রহটির সমুদ্রকে প্রাণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ২০২৫ সালে নাসার গবেষকেরা ক্যাসিনির সংগ্রহ করা তথ্য নতুনভাবে বিশ্লেষণ করে এনসেলাডাসের সমুদ্র থেকে সরাসরি বেরিয়ে আসা বরফকণায় আগে শনাক্ত না হওয়া বেশ কিছু জৈব যৌগের সন্ধান পান। এসব জৈব যৌগকে প্রাণের প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তবে এগুলোর উপস্থিতি এনসেলাডাসের ভেতরে জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া চলার সম্ভাবনা তুলে ধরে। ২০২৬ সালের নতুন গবেষণাগুলোতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। এনসেলাডাসের সমুদ্র থেকে বেরিয়ে আসা পানির কণা বরফে পরিণত হওয়ার সময় বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান একে অন্যের থেকে আলাদা হয়ে যেতে পারে। এর ফলে কিছু বরফকণায় জৈব পদার্থ বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান তুলনামূলক বেশি ঘন হয়ে থাকতে পারে। এই বিষয়টি ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এনসেলাডাসের বরফের নিচে থাকা সমুদ্রে সরাসরি পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু দক্ষিণ মেরুর ফাটল দিয়ে যে বরফকণা ও বাষ্প মহাকাশে বেরিয়ে আসে, সেগুলো সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেই ভেতরের সমুদ্রের রাসায়নিক পরিবেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া কোনো তথ্যকেই এনসেলাডাসে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। পরীক্ষাগারে পৃথিবীর একটি অণুজীব এনসেলাডাসের মতো পরিবেশে টিকে থাকতে পারা শুধু এটিই দেখায় যে ওই ধরনের পরিবেশে জীবনের কিছু ধরন টিকে থাকার সম্ভাবনা থাকতে পারে। বাস্তবে এনসেলাডাসের সমুদ্রে এমন কোনো জীব রয়েছে কি না, সেটি এখনো অজানা। বিজ্ঞানীদের পরবর্তী লক্ষ্য এনসেলাডাস থেকে বেরিয়ে আসা বরফ ও বাষ্পের মধ্যে এমন রাসায়নিক বা জৈব চিহ্ন খুঁজে বের করা, যা সরাসরি জীবনের অস্তিত্বের দিকে ইঙ্গিত করতে পারে। ভবিষ্যতের কোনো মহাকাশ অভিযানে সেখানে জীবকোষ, নির্দিষ্ট জৈব অণু কিংবা শক্তিশালী জীবচিহ্ন শনাক্ত করা সম্ভব হলে পৃথিবীর বাইরে জীবনের সন্ধানে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত হবে। এখন পর্যন্ত এনসেলাডাসে কোনো প্রাণ পাওয়া যায়নি। তবে বরফের নিচে তরল পানির সমুদ্র, রাসায়নিক শক্তির সম্ভাব্য উৎস, ফসফরাস, জৈব যৌগ এবং পরীক্ষাগারে পৃথিবীর অণুজীবের এমন পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা শনির এই বরফময় উপগ্রহকে প্রাণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। নতুন গবেষণার ফল সেই অনুসন্ধানে আরও একটি তথ্য যোগ করেছে।
মাত্র নয় মাসে ২০০টির বেশি গবেষণাপত্র। একই বছরে তার নামে প্রকাশিত বা প্রকাশের তালিকায় থাকা বইয়ের সংখ্যা ১৪। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের এমন অস্বাভাবিক গবেষণা উৎপাদন নিয়ে এখন একাডেমিক জগতে প্রশ্ন উঠেছে - কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাকে দ্রুত করছে, নাকি গবেষণার মান ও স্বচ্ছতার সামনে নতুন সংকট তৈরি করছে? আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বুথ স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক নিকোলাস পলসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিনি রবার্ট ল জুনিয়র প্রফেসর অব ইকোনোমেট্রিক্স অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকস এবং দীর্ঘদিন ধরে বেইজিয়ান পরিসংখ্যান, ফাইন্যান্সিয়াল ইকোনোমেট্রিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা করছেন। আগস্টের শেষ দিকে অর্থনীতিবিদ জেরেমি হরপেডাল পলসনের এসএসআরএন প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে জানান, শুধু ২০২৬ সালেই তার নামে ২৫৮টি ওয়ার্কিং পেপার পোস্ট হয়েছিল। আগস্ট মাসেই পোস্ট হয়েছিল ১০৪টি। এমনকি ২৬ আগস্ট এক দিনেই ছয়টি পেপার পোস্ট হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। অনেক গবেষণাপত্র ছিল ২৭ থেকে ৫৮ পৃষ্ঠার। গবেষণাগুলোর বেশির ভাগ উন্নত পরিসংখ্যান ও গণিতকেন্দ্রিক হলেও বিষয়বস্তুর পরিধিও নজর কেড়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আর্থিক চাপ, দাবা খেলোয়াড়দের কৌশলগত দক্ষতা এবং টিকটকের সুপারিশব্যবস্থার মতো বিষয়েও পলসনের নামে গবেষণাপত্র ছিল। তার শতাধিক গবেষণাপত্রে নিয়মিত সহলেখক হিসেবে ছিলেন সিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ভাদিম সোকোলভ। এরপরই বিষয়টি আরও বড় মোড় নেয়। গবেষণাপত্র প্রকাশের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এসএসআরএন পলসনের লেখা বা সহলেখক হিসেবে থাকা ২৫৭টি কাজ সরিয়ে দেয় এবং যেসব অ্যাকাউন্ট থেকে সেগুলো আপলোড হয়েছিল সেগুলো স্থগিত করে। এত অস্বাভাবিক সংখ্যায় গবেষণাপত্র জমা পড়ার বিষয়টি তাদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ ছিল। পলসন অবশ্য এআই ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেননি। তিনি নিশ্চিত করেন, গবেষণার কাজে তিনি এআই ব্যবহার করেছেন। তার বক্তব্য, এআই গবেষণার সময়সাপেক্ষ অনেক কাজ সহজ করে দিয়েছে এবং একজন উৎপাদনশীল গবেষককে আরও বেশি কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে। তবে প্রতিটি গবেষণাপত্রে এআই ব্যবহারের বিষয়টি তিনি প্রকাশ করেছিলেন কি না, সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেননি। এখানে বিতর্কের মূল বিষয় গবেষণার অস্বাভাবিক গতি, এআই ব্যবহারে স্বচ্ছতা এবং এত বিপুল সংখ্যক গবেষণাপত্রের মান যথাযথভাবে যাচাই করা সম্ভব কি না। বিতর্ক আরও বেড়েছে তার নামে থাকা বইয়ের সংখ্যা নিয়ে। অনুসন্ধানে অ্যামাজনের তালিকায় ২০২৬ সালে পলসনের নামে ১৪টি বই প্রকাশিত এবং আরও দুটি পরবর্তী মাসগুলোতে প্রকাশের জন্য নির্ধারিত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। তবে পলসন ওই সব বই সত্যিই তার কি না, তা নিশ্চিত করার অনুরোধে জবাব দেননি। অধিকাংশ বইয়ে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় অথবা পরিচিত গবেষণা-সহযোগীদের নাম ছিল। ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে এলো, যখন একাডেমিক গবেষণায় এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। গবেষকেরা সাহিত্য পর্যালোচনা, তথ্য অনুসন্ধান, কোড লেখা ও প্রাথমিক ডেটা বিশ্লেষণের মতো কাজে এআই ব্যবহার করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে ভুল তথ্য, অস্তিত্বহীন সূত্র, পুনরাবৃত্ত গবেষণা এবং বিশ্লেষণের ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। তাই নিকোলাস পলসনের ঘটনা শুধু একজন অধ্যাপক কীভাবে নয় মাসে শত শত গবেষণাপত্র তৈরি করলেন, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি সামনে এনেছে আরও বড় প্রশ্ন - এআই যদি একজন গবেষকের কয়েক বছরের কাজ কয়েক মাসে নামিয়ে আনতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে গবেষণার মূল্যায়ন হবে সংখ্যায়, নাকি মান, মৌলিকত্ব ও যাচাইযোগ্যতায়? সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো বুথ স্কুল অব বিজনেস
পৃথিবীর কক্ষপথে স্যাটেলাইটের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় রাতের আকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরির (ইএসও) নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে কক্ষপথে ১৪ হাজারের বেশি স্যাটেলাইট রয়েছে। এর বড় অংশই স্পেসএক্সের স্টারলিংক নেটওয়ার্কের স্যাটেলাইট। নতুন প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা ১৭ লাখের বেশি হতে পারে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য গুরুতর সংকট তৈরি করতে পারে। ১ জুলাই প্রকাশিত গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, কক্ষপথে অতিরিক্ত সংখ্যক ও উজ্জ্বল স্যাটেলাইট যুক্ত হলে রাতের আকাশ শুধু আলোকিতই হবে না, দূরবীক্ষণযন্ত্রে মহাকাশ পর্যবেক্ষণও কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে ছবি তোলার ক্ষেত্রে স্যাটেলাইটের আলো উজ্জ্বল রেখা তৈরি করে গুরুত্বপূর্ণ মহাজাগতিক বস্তুর ছবি ঢেকে দিতে পারে। গবেষণার অন্যতম লেখক ও ইএসওর জ্যোতির্বিজ্ঞানী অলিভিয়ে হাইনো বলেন, সূর্যের আলোয় আলোকিত স্যাটেলাইট দূরবর্তী গ্যালাক্সির তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল হতে পারে। ফলে কোনো স্যাটেলাইট দূরবীক্ষণযন্ত্রের দৃষ্টিসীমার মধ্য দিয়ে গেলে ছবিতে উজ্জ্বল দাগ তৈরি হয় এবং তার পেছনে থাকা মহাজাগতিক বস্তুর পর্যবেক্ষণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ইএসওর হিসাব অনুযায়ী, স্পেসএক্সের প্রস্তাবিত বিশাল স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক বাস্তবায়িত হলে চিলিতে অবস্থিত ইএসওর ভেরি লার্জ টেলিস্কোপে রাতের নির্দিষ্ট সময়ে তোলা প্রতিটি ছবিতে কয়েক ডজন পর্যন্ত স্যাটেলাইটের রেখা দেখা যেতে পারে। এতে একটি ছবির পর্যবেক্ষণযোগ্য এলাকার সর্বোচ্চ ২৮ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু স্যাটেলাইটের রেখাই সমস্যা নয়। বিপুলসংখ্যক স্যাটেলাইট থেকে ছড়িয়ে পড়া আলো পুরো রাতের আকাশকে উজ্জ্বল করে তুলতে পারে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশেষ করে খুব উজ্জ্বল স্যাটেলাইটের বিশাল বহর থাকলে আকাশের সামগ্রিক উজ্জ্বলতা কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে দূরবর্তী গ্যালাক্সি, অন্য নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা সম্ভাব্য পৃথিবীর মতো গ্রহ এবং পৃথিবীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ গ্রহাণু পর্যবেক্ষণেও। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু রাতের আকাশের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মহাবিশ্ব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সক্ষমতাও এতে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ইএসওর গবেষণায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা ধরে রাখতে পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা মোট স্যাটেলাইটের সংখ্যা ১ লাখের মধ্যে রাখা এবং সেগুলোকে খালি চোখে দেখা যায় না এমন মাত্রায় ম্লান রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। তবে ১ লাখকে কোনো কঠোর সীমা হিসেবে দেখছেন না গবেষকরা। উজ্জ্বল স্যাটেলাইটের সংখ্যা বাড়লে গ্রহণযোগ্য সীমা আরও কমতে পারে। এদিকে স্পেসএক্স ও যুক্তরাষ্ট্রের স্টার্টআপ রিফ্লেক্ট অরবিটাল নতুন বড় স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক স্থাপনের অনুমতির জন্য মার্কিন ফেডারেল যোগাযোগ কমিশনের কাছে আবেদন করেছে। ইএসও জানিয়েছে, এসব প্রস্তাব নিয়ে সংস্থাটিও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে মতামত দিয়েছে। মহাকাশভিত্তিক ইন্টারনেট ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত সুবিধার জন্য নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথের ব্যবহার বাড়লেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নিয়ম ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা জরুরি। কারণ পৃথিবীর কক্ষপথ যেমন আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গবেষক জ্যাকব কক্সন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক থেকে পদত্যাগের পর সতর্ক করে বলেছেন, ক্রমেই শক্তিশালী এআই তৈরির প্রতিযোগিতা একসময় মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। চ্যাটজিপিটির প্রতিদ্বন্দ্বী এআই ‘ক্লড’-এর নির্মাতা অ্যানথ্রপিক এআই নিরাপত্তা ও অ্যালাইনমেন্টের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার জন্য পরিচিত। মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ধারাবাহিক পোস্টে কক্সন জানান, গত তিন বছর তিনি অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই উভয় প্রতিষ্ঠানে এআই প্রিট্রেনিং নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠানগুলো ‘স্ব-উন্নয়নশীল সুপারইন্টেলিজেন্স’ তৈরির দিকে ছুটছে এবং এর মাধ্যমে মানুষের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে। কক্সনের মতে, ভবিষ্যতের অতিমানবীয় এআই যেকোনো কিছু হ্যাক করার পাশাপাশি বাস্তব ক্ষমতা ও সম্পদ অর্জনে সক্ষম হতে পারে। তিনি দাবি করেন, প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে অনেক এআই নির্বাহী ও গবেষকের মধ্যেই ব্যক্তিগতভাবে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁর ভাষায়, এআই তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সত্যিকার অর্থেই বিশ্বাস করেন, এই দশকের শেষ নাগাদ এআই মানবজাতির সবাইকে হত্যা করতে পারে। অ্যানথ্রপিকের অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্স লিড ইভান হাবিঙ্গারও প্রকাশ্যে কক্সনের বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, "কিছু গবেষক সত্যিই বিশ্বাস করেন যে উন্নত এআই মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।" হাবিঙ্গার নিজে মনে করেন, আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান এআই মডেলগুলো তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর মূল উদ্বেগ ভবিষ্যতে এমন সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই ব্যবস্থার আবির্ভাব নিয়ে, যা নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা বারবার উন্নত করতে পারবে অর্থাৎ ‘রিকরসিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’-এর মাধ্যমে নিজেই নিজের সক্ষমতা বাড়াতে থাকবে। এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ে অ্যানথ্রপিকও এর আগে এআই নিরাপত্তা ও ঝুঁকি সংক্রান্ত আলোচনায় সতর্ক করেছে।
প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বিশাল শিকারি ডাইনোসর টাইরানোসরাস রেক্স বা টি-রেক্সের শেষ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রহস্যের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ‘স্কটি’ নামে পরিচিত সবচেয়ে বড় আবিষ্কৃত টি-রেক্সের একটি পাঁজরের হাড়ে পাওয়া আঘাত ও সংরক্ষিত রক্তনালির চিহ্ন বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ধারণা করছেন, অন্য একটি ডাইনোসরের সঙ্গে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হওয়ার পর পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। স্কটির জীবাশ্ম ১৯৯১ সালে কানাডার সাসকাচেওয়ানের ফ্রেঞ্চম্যান রিভার ভ্যালিতে আবিষ্কৃত হয়। রয়্যাল সাসকাচেওয়ান মিউজিয়ামের গবেষকেরা সেখানে এর কঙ্কালের সন্ধান পান। জীবদ্দশায় স্কটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৪৩ ফুট এবং ওজন আনুমানিক ১৯ হাজার ৫০০ পাউন্ড বা প্রায় ৮ হাজার ৮০০ কেজি। এই বিশাল আকারের কারণে স্কটিকে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় টি-রেক্স কঙ্কাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে স্কটির গুরুত্ব শুধু আকারে নয়। এর একটি পাঁজরের হাড়ে এমন নরম টিস্যুর অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে, যা কোটি কোটি বছর টিকে থাকার পরও গবেষণার উপযোগী অবস্থায় ছিল। বিশেষ করে সেখানে খনিজে পরিণত হয়ে যাওয়া রক্তনালির একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের চিহ্ন পাওয়া গেছে। জীবাশ্মে এ ধরনের রক্তনালির কাঠামো সংরক্ষিত থাকা অত্যন্ত বিরল। এই অস্বাভাবিক সংরক্ষণই গবেষকদের স্কটির জীবনের শেষ অধ্যায় সম্পর্কে নতুন তথ্য দিয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজাইনার পদার্থবিজ্ঞানীরা। দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাউরিসিও বারবি এবং পিএইচডি গবেষক জেরিট মিচেল। জীবাশ্মের ভেতরের গঠন না কেটে বা ক্ষতিগ্রস্ত না করে দেখার জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে অবস্থিত মার্কিন জ্বালানি বিভাগের ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে নিউট্রন ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে স্কটির পাঁজরের ভেতরের গঠন ত্রিমাত্রিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। সাধারণ এক্স-রে যেখানে মূলত ঘন হাড়ের গঠন দেখাতে কার্যকর, সেখানে নিউট্রন বিভিন্ন হালকা মৌল, বিশেষ করে হাইড্রোজেনের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে। ফলে জীবাশ্মের ভেতরে থাকা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ক্ষীণ টিস্যুর চিহ্নও আলাদা করে দেখা সম্ভব হয়েছে।, গবেষকদের ধারণা, স্কটির পাঁজরটি জীবদ্দশায় ভেঙে গিয়েছিল। আঘাতের পর শরীর স্বাভাবিকভাবে হাড়টি সারিয়ে তোলার চেষ্টা শুরু করে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশে আয়রনসমৃদ্ধ রক্ত পৌঁছায় এবং সেখানে নতুন রক্তনালির একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। সেই রক্তনালির খনিজায়িত চিহ্নই কয়েক কোটি বছর পর গবেষকদের সামনে স্কটির আঘাতের প্রমাণ হিসেবে ধরা দেয়। কীভাবে পাঁজরটি ভেঙেছিল, সে বিষয়ে গবেষকেরা একটি সম্ভাবনার কথা বলছেন। ধারণা করা হচ্ছে, শিকার বা সংঘর্ষের সময় অন্য কোনো ডাইনোসরের সঙ্গে লড়াইয়ে স্কটি আঘাত পেয়ে থাকতে পারে। তবে ঠিক কোন প্রাণীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছিল বা ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল, তা জীবাশ্ম থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাঁজরের হাড়ে সেরে ওঠার চিহ্ন পাওয়া গেলেও সেটি পুরোপুরি জোড়া লাগেনি। অর্থাৎ আঘাতের পর কিছু সময় স্কটি বেঁচে ছিল এবং তার শরীর ক্ষত সারানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়। তাই পাঁজরের আঘাতটি তার মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করলেও, এটিই মৃত্যুর একমাত্র কারণ ছিল বলে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। স্কটির মৃত্যুর পর তার দেহ কীভাবে এত সূক্ষ্ম টিস্যু সংরক্ষণ করতে পেরেছিল, সেটিও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিজ্ঞানীদের মতে, সে একটি লবণাক্ত জলাভূমিতে মারা গিয়ে থাকতে পারে। এমন পরিবেশে অক্সিজেনের প্রবেশ সীমিত থাকায় পচন প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। এর ফলে সাধারণত দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা এমন নরম টিস্যুর কিছু অংশ দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। স্কটির পাঁজরে সংরক্ষিত রক্তনালির আবিষ্কারের সূত্রপাত অবশ্য আরও কয়েক বছর আগে। ২০২০ সালে তৎকালীন স্নাতক শিক্ষার্থী জেরিট মিচেল স্কটির পাঁজর নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এক্স-রে ভিত্তিক মাইক্রো-সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে অস্বাভাবিক কাঠামো শনাক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে কানাডিয়ান লাইট সোর্সে আরও উন্নত এক্স-রে প্রযুক্তি ও অণুবীক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে সেই কাঠামো নিয়ে গবেষণা করা হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে গবেষক দল ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে গিয়ে নিউট্রনভিত্তিক দুটি যন্ত্র ব্যবহার করে স্কটির পাঁজর পরীক্ষা করে। এর মধ্যে একটি পদ্ধতিতে বড় হাড়ের ভেতরের গঠন অক্ষত রেখেই পরীক্ষা করা হয়। নিউট্রন পরীক্ষার ফল আগের এক্স-রে গবেষণার সঙ্গে মিলে যায় এবং রক্তনালির অস্তিত্ব সম্পর্কে পাওয়া তথ্যকে আরও শক্তিশালী করে। ইউনিভার্সিটি অব রেজাইনার অধ্যাপক মাউরিসিও বারবি এই আবিষ্কারকে লটারি জেতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ কোটি কোটি বছর পুরোনো একটি ডাইনোসরের হাড়ের ভেতরে এত বিস্তৃত রক্তনালির কাঠামো সংরক্ষিত থাকা গবেষকদের জন্য অত্যন্ত বিরল সুযোগ। গবেষণায় যুক্ত পিএইচডি গবেষক জেরিট মিচেলের মতে, প্রতিটি জীবাশ্ম অতীতের একটি ছোট্ট মুহূর্তের ছবি। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেই ছবির ভেতরের আরও সূক্ষ্ম তথ্য বের করে আনা সম্ভব হচ্ছে। ফলে শুধু ডাইনোসরের আকার বা কঙ্কালের গঠন নয়, তারা কীভাবে আহত হতো এবং তাদের শরীর কীভাবে সেই আঘাত সারানোর চেষ্টা করত, সে বিষয়েও ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। গবেষকদের কাছে এই কাজের আরেকটি বড় গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বহু পুরোনো জীবাশ্ম সংরক্ষিত রয়েছে। সেগুলোর অনেকগুলোর ভেতরেও হয়তো এমন অদৃশ্য তথ্য লুকিয়ে আছে, যা প্রচলিত পদ্ধতিতে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নিউট্রন ইমেজিং ও উন্নত এক্স-রে প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার ভবিষ্যতে সেই তথ্য সামনে আনার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে মারা যাওয়া স্কটির কঙ্কাল আজও বিজ্ঞানীদের কাছে শুধু একটি বিশাল টি-রেক্সের নিদর্শন নয়। এর ভাঙা পাঁজর, ক্ষত সারানোর চেষ্টা এবং সংরক্ষিত রক্তনালির চিহ্ন সেই প্রাণীর জীবনের শেষ সময় সম্পর্কে এমন তথ্য দিচ্ছে, যা এত দিন জীবাশ্মের ভেতরেই অদৃশ্য ছিল। সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি, ইউনিভার্সিটি অব রেজাইনা, কানাডিয়ান লাইট সোর্স, এনডিটিভি
একই ধরনের অটিজম-সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য থাকা মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব তুলনামূলক বেশি ঘনিষ্ঠ ও স্বস্তিদায়ক হতে পারে বলে একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, একইভাবে পৃথিবীকে উপলব্ধি ও সামাজিক পরিস্থিতি সামলানোর মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া সহজ হতে পারে। ২০২১ সালে Social Cognitive and Affective Neuroscience জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১৪৪ জন নিউরোটাইপিক্যাল প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে ৭২টি বন্ধুত্বের জুটি বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকরা দেখতে পান, দুই বন্ধুর অটিজম-সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য যত বেশি কাছাকাছি, তাদের বন্ধুত্বের মানও তত বেশি হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। কাছাকাছি বৈশিষ্ট্যের জুটিগুলোতে ঘনিষ্ঠতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাত্রাও বেশি ছিল। এখানে অটিজম বৈশিষ্ট্য বলতে শুধু সামাজিক যোগাযোগের বিষয় নয়; বিভিন্ন ব্যক্তির মনোযোগের ধরন, আগ্রহ, যোগাযোগের পদ্ধতি এবং অন্যদের সঙ্গে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার ধরনও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। আরও সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ৫৯২ জন কলেজ শিক্ষার্থীর সামাজিক নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অটিস্টিক শিক্ষার্থীদের বন্ধুদের মধ্যে অটিস্টিক বা নিউরোডাইভার্জেন্ট মানুষের অনুপাত তুলনামূলক বেশি। গবেষকরা এটিকে ‘অটিস্টিক হোমোফিলি’ - অর্থাৎ একই ধরনের নিউরোটাইপের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবণতা - হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে গবেষণাটি একই সঙ্গে দেখেছে, অটিস্টিক ও নন-অটিস্টিক মানুষের মধ্যেও ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব তৈরি হয়। ২০২৬ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় ১ হাজারের বেশি চীনা প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ‘অ্যাটেনশন টু ডিটেইল’ বা খুঁটিনাটির প্রতি বেশি মনোযোগের মতো কিছু অটিজম-সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য একই ধরনের আগ্রহের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। একই ধরনের আগ্রহের বন্ধুত্ব একাকিত্ব কমানোর সঙ্গেও সম্পর্কিত ছিল। এদিকে ২০২৬ সালের আরেক গুণগত গবেষণায় অটিস্টিক তরুণদের বন্ধুত্বের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বন্ধুত্বে গ্রহণযোগ্যতা, স্বতঃস্ফূর্ততা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং নিজের মতো থাকতে পারাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন। গবেষণাটি প্রচলিত সেই ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করে যে অটিস্টিক মানুষ গভীর বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী নন। তবে গবেষণাগুলো থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে অটিস্টিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষ শুধু নিজেদের মধ্যেই বন্ধুত্ব বা প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন, কিংবা এসব সম্পর্ক ঠিক তিন গুণ বেশি হয়। বরং প্রমাণগুলো ইঙ্গিত করে, একই ধরনের অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগের ধরন থাকা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং স্বস্তি অনেক ক্ষেত্রে বেশি হতে পারে। সূত্র: অক্সফোর্ড একাডেমিক
গুরুতর হৃদ্যন্ত্রের অকার্যকারিতায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে ফ্রান্সের তৈরি কৃত্রিম হৃদযন্ত্র ‘এইসন’। ফরাসি মেডিকেল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কারমাটের তৈরি এই যন্ত্রটি হৃদ্যন্ত্রের দুই ভেন্ট্রিকলের কাজ একসঙ্গে প্রতিস্থাপন করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এইসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, রোগীর শারীরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটি রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। রোগী বিশ্রামে থাকলে রক্তপ্রবাহ কমে যায়, আবার শারীরিক পরিশ্রমের সময় শরীরের বাড়তি চাহিদা অনুযায়ী প্রবাহ বাড়াতে পারে। যন্ত্রটির সেন্সর ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রোগীর শারীরবৃত্তীয় প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তপ্রবাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করে। বর্তমানে এইসন মূলত ‘ব্রিজ টু ট্রান্সপ্লান্ট’ হিসেবে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত। অর্থাৎ শেষ পর্যায়ের দুই ভেন্ট্রিকলের হৃদ্যন্ত্র বিকল হয়ে যাওয়া কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হয়, যাতে তারা উপযুক্ত দাতা হৃদ্যন্ত্রের অপেক্ষায় থাকতে পারেন। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ইউরোপে এই ব্যবহারের জন্য যন্ত্রটি সিই অনুমোদন পায়। কৃত্রিম হৃদ্যন্ত্রটি শরীরের ভেতরে বসানো হয় এবং এর দুই ভেন্ট্রিকল হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক পাম্পিংয়ের মতো রক্ত সারা শরীরে সঞ্চালন করে। তবে এটি পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। যন্ত্রটির সঙ্গে বাইরে থাকা একটি বহনযোগ্য সিস্টেম বিদ্যুৎ সরবরাহ ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের কাজ করে। কারমাটের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য আরও বড়। প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে এমন ব্যবহারের অনুমোদন পাওয়ার লক্ষ্য রাখছে, যেখানে রোগীর আর পরবর্তী সময়ে দাতা হৃদ্যন্ত্র প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হবে না। তবে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল প্রমাণ প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রে এইসনের ব্যবহারও এখনো সীমিত। কারমাটের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে যন্ত্রটি বর্তমানে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএ অনুমোদিত একটি প্রাথমিক গবেষণার কাঠামোর মধ্যেই ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ফলে এইসন এখনো সবার জন্য স্থায়ী কৃত্রিম হৃদ্যন্ত্রের বিকল্প নয়। তবে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তপ্রবাহ সামঞ্জস্য করতে সক্ষম এই প্রযুক্তি হৃদ্যন্ত্র প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় থাকা গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তিটি আরও উন্নত হলে দাতা হৃদ্যন্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথও তৈরি হতে পারে।
চীনে রোবট নিয়ে আয়োজিত প্রতিযোগিতার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই মজা করছেন। কোনো রোবট দৌড়াতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছে, কোনোটি ভারসাম্য হারাচ্ছে, আবার কোনোটি নির্দিষ্ট কাজ করতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে। কিন্তু এসব দৃশ্যের আড়ালে প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। হিউম্যানয়েড রোবট তৈরিতে চীন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এবং এই দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবধান বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বেইজিংয়ে ২২ থেকে ২৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমস। এবারের আয়োজনে ১৬টি দেশ ও অঞ্চল থেকে ৬৬৬টি দল এবং ২ হাজার ৫৬টি রোবট অংশ নেয়। পাঁচ দিনের এই আয়োজনে ছিল ৫১টি প্রতিযোগিতা এবং ১ হাজার ৩০১টি প্রতিযোগিতামূলক পর্ব। গত বছরের প্রথম আসরে যেখানে ২৮০টি দল অংশ নিয়েছিল, এবার সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই আয়োজন শুধু রোবটের দৌড় বা খেলাধুলার প্রদর্শনী ছিল না। কারখানা, হোটেল ও বাড়ির মতো বাস্তব পরিবেশে রোবট কীভাবে কাজ করতে পারে, সেটিও দেখানো হয়েছে। হোটেলের ঘর পরিষ্কার করা, অফিস পরিষ্কার, দোকানের তাক সাজানোসহ বিভিন্ন কাজে রোবটের সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। এর ফলে আয়োজকদের লক্ষ্য ছিল রোবটকে শুধু প্রদর্শনীর যন্ত্র হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের উৎপাদনশীল কর্মী হিসেবে তুলে ধরা। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ১০০ মিটার দৌড়। প্রতিযোগিতার শুরুতেই একটি চীনা হিউম্যানয়েড রোবট ৯ দশমিক ৩৯ সেকেন্ডে ১০০ মিটার দৌড় শেষ করে। সময়টি ২০০৯ সালে জ্যামাইকান কিংবদন্তি উসাইন বোল্টের করা ৯ দশমিক ৫৮ সেকেন্ডের মানব বিশ্ব রেকর্ডের চেয়ে দ্রুত। পরে একই প্রতিযোগিতায় টিয়াংগং আল্ট্রা নামে আরেকটি রোবট ৮ দশমিক ৮৬ সেকেন্ডের সময় করে। শেষ দিনে ৮ দশমিক ৬৪ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে সেটি আরও দ্রুত সময় গড়ে। তবে রোবটগুলোর এই গতি এখনো মানুষের মতো স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ বা দক্ষতার প্রমাণ নয়। দৌড় শেষ করার পর কিছু রোবট ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যায় বা সুরক্ষাবেষ্টনীতে ধাক্কা খায়। অর্থাৎ দ্রুত দৌড়াতে পারলেও হঠাৎ থামা, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মানুষের মতো পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতাই দেখাচ্ছে, হিউম্যানয়েড রোবটের বর্তমান সক্ষমতা নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনা রোবটের হার্ডওয়্যার সক্ষমতা দ্রুত বাড়লেও বাস্তব কারখানার জটিল কাজে এগুলো এখনো মানুষের বিকল্প হওয়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অনেক রোবট নির্দিষ্ট প্রদর্শনী, নাচ, কুংফু বা পূর্বনির্ধারিত কাজ ভালোভাবে করতে পারলেও পরিবেশ পরিবর্তিত হলে তাদের সমস্যা হয়। তারপরও চীনের অগ্রগতিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। দেশটি হিউম্যানয়েড রোবটকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উৎপাদন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। বয়স্ক জনসংখ্যা ও ভবিষ্যৎ শ্রমিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি উৎপাদন খাতের দক্ষতা বাড়ানোর জন্যও রোবটকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। চীনের বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো এর বিশাল উৎপাদন অবকাঠামো। রোবটের যন্ত্রাংশ তৈরি, পরীক্ষামূলক উৎপাদন, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং বড় পরিসরে নতুন মডেল বাজারে আনার ক্ষেত্রে দেশটির শিল্পভিত্তি উদ্যোক্তাদের দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ দিচ্ছে। বিশ্বের হিউম্যানয়েড রোবট বাজারেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে এজিআইবট, ইউনিট্রি রোবোটিকস, গ্যালবট, ইউবিটেকসহ বেশ কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে রয়েছে। গবেষণা ও বাজার বিশ্লেষণগুলোও দেখাচ্ছে, চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে এই শিল্পে বড় অংশ দখল করে আছে। চীনের রোবট প্রতিযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়। একটি হিউম্যানয়েড রোবট শুধু দ্রুত দৌড়াতে পারলেই বাস্তব কাজে খুব বেশি কার্যকর হবে না। তাকে পরিবেশ বুঝতে হবে, বস্তু শনাক্ত করতে হবে, নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ফলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু রোবটের শরীর বা যন্ত্রাংশের মধ্যে নয়, বরং রোবটের ‘মস্তিষ্ক’ বা সফটওয়্যার নিয়েও হবে। এ জায়গায় চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ দেশটির হিউম্যানয়েড রোবট শিল্পকে আরও এগিয়ে দিতে পারে। রোবটের হার্ডওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একসঙ্গে উন্নত হলে একই যন্ত্র ভবিষ্যতে কারখানা, গুদাম, হাসপাতাল, হোটেল কিংবা অন্যান্য সেবামূলক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও রোবোটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বড় ধরনের গবেষণা ও বিনিয়োগ করছে। তবে চীনা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণ দুই দেশের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতাকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন বিদেশে তৈরি নতুন হিউম্যানয়েড রোবট আমদানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। কর্তৃপক্ষ জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে। এ ধরনের বিধিনিষেধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও গবেষকেরা চীনে তৈরি নতুন রোবটের সঙ্গে সরাসরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ হারাতে পারেন। আবার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যুক্তি হলো, চীনা প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংযোগ ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। চীনের রোবট শিল্পও অবশ্য চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। রোবটের দাম, সফটওয়্যারের সীমাবদ্ধতা, বাস্তব পরিবেশে কাজ করার সক্ষমতা এবং বাজারে প্রকৃত চাহিদা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিপুল বিনিয়োগের কারণে অতিরিক্ত উৎপাদন ও ভবিষ্যতে বাজারে একীভূত হওয়ার ঝুঁকির কথাও বিশ্লেষকেরা বলছেন। তাই বেইজিংয়ের রোবট গেমসকে শুধু বিনোদন বা প্রযুক্তির প্রদর্শনী হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এখানে একদিকে যেমন রোবটের বর্তমান সীমাবদ্ধতা চোখে পড়েছে, অন্যদিকে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তাদের গতি ও শারীরিক সক্ষমতার বড় উন্নতিও দেখা গেছে। এক বছর আগে যে রোবট ১০০ মিটার দৌড়াতে ২১ দশমিক ৫০ সেকেন্ড সময় নিয়েছিল, এবার সেই সময় কয়েক সেকেন্ডে নেমে এসেছে। আর প্রতিযোগিতার শেষ দিনে ৮ দশমিক ৬৪ সেকেন্ডের সময় দেখিয়েছে, উন্নতির গতি কতটা দ্রুত হতে পারে। আজকের রোবট হয়তো দৌড় শেষ করে পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আগামী দিনের প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কতটা দ্রুত শিখতে পারবে এবং কতটা স্বাভাবিকভাবে মানুষের সঙ্গে কাজ করতে পারবে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রযুক্তি শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, বেইজিং মিউনিসিপ্যাল গভর্নমেন্ট ও দ্য আটলান্টিক।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বড় সতর্কবার্তা দিয়েছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তাঁর আশঙ্কা, আগামী এক দশকে এআই দ্রুত বিভিন্ন পেশার কাজ দখল করে নেওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে এই প্রযুক্তি সাইবার হামলা, প্রতারণা, ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং এমনকি প্রাণঘাতী জীবাণু তৈরির সক্ষমতাও সহজ করে দিতে পারে। ২৬ আগস্ট নিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রায় ৬ হাজার শব্দের এক দীর্ঘ প্রবন্ধে গেটস এআই যুগের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও তা মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। একই সময়ে ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও তিনি এআই নিয়ে তাঁর উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। গেটসের মতে, এআই আগের প্রযুক্তিগত বিপ্লবগুলোর মতো নয়। অতীতে প্রযুক্তি কিছু কাজের ধরন বদলে দিলেও মানুষের চিন্তাশক্তির প্রয়োজন হয় এমন নতুন কাজ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এআই সরাসরি মানুষের চিন্তা, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার একটি বড় অংশকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। ফলে চাকরি হারানো মানুষের জন্য নতুন কাজ তৈরির সুযোগ আগের তুলনায় অনেক কম হতে পারে। তিনি লিখেছেন, আইন, গ্রাহকসেবা, চিকিৎসা, সফটওয়্যার ও উৎপাদন খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই দ্রুত কাজের অংশ হয়ে উঠবে। এই পরিবর্তন কয়েক প্রজন্ম ধরে নয়, মাত্র এক দশকের মধ্যেই বড় আকারে ঘটতে পারে। নতুন কিছু চাকরি তৈরি হলেও যথাযথ নীতি না থাকলে বর্তমানে যত চাকরি রয়েছে, তার তুলনায় নতুন চাকরির সংখ্যা অনেক কম হতে পারে। বিশেষ করে প্রবেশ পর্যায়ের ও মধ্যম পর্যায়ের চাকরি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন গেটস। তাঁর মতে, তরুণরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবেন, কারণ কর্মজীবন শুরু করার সময় তাদের জন্য আগের তুলনায় কম সুযোগ থাকতে পারে। সফটওয়্যার প্রকৌশল, বিক্রয় ও গ্রাহকসেবা, আইনি সহায়তা, ঋণের আবেদন যাচাই, তথ্য বিশ্লেষণ এবং রোগীদের প্রাথমিক পর্যায়ের মূল্যায়নের মতো কাজেও এআই ক্রমেই ভূমিকা নিতে পারে। শুধু দাপ্তরিক কাজ নয়, শারীরিক শ্রমের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করেন গেটস। তাঁর ধারণা, দশকের শেষ নাগাদ উন্নত রোবট নির্মাণ ও আতিথেয়তা খাতের কিছু কাজে মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু করতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠান রোবট ও এআই ব্যবহার করে খরচ কমিয়ে পণ্যের দাম কমালে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে একই পথে যেতে বাধ্য হবে। এতে স্বয়ংক্রিয়করণের গতি আরও বাড়তে পারে। গেটসের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, এআই যখন প্রায় ভুলহীনভাবে কাজ করতে পারবে এবং মানুষের তদারকির প্রয়োজনও কমে যাবে। তখন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আরও বেশি কাজ যন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়ার শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রণোদনা থাকবে। এর ফলে কর্মসংস্থান, আয় এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রচলিত ধারণাই বদলে যেতে পারে। তিনি ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার কথাও উল্লেখ করেছেন। ১৯৩৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব প্রায় ২৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। তবে গেটস বলেন, এআইয়ের কারণে বেকারত্ব সেই পর্যায়ে পৌঁছাবে এমন পূর্বাভাস তিনি দিচ্ছেন না। তাঁর বক্তব্য হলো, এআইয়ের প্রভাব যদি ব্যাপক হয়, তা শুধু অর্থনৈতিক চক্রের পরিবর্তনের সঙ্গে শেষ হয়ে যাবে না। বরং অর্থনীতির কাঠামোর ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। এআইয়ের অপব্যবহার নিয়েও সতর্ক করেছেন গেটস। তাঁর মতে, অনলাইনে আগে থেকেই সাইবার হামলা, প্রতারণা, ক্ষতিকর সফটওয়্যার ও জৈব অস্ত্র সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। এআই এসব তথ্য ব্যবহার করা এবং বাস্তবে প্রয়োগ করার সক্ষমতা আরও সহজ করে দিতে পারে। দক্ষতা কম থাকা ব্যক্তিরাও বড় পরিসরে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারি ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর ক্ষমতা পেতে পারেন। হাসপাতাল, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং সরকারি সেবার ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা এআই-সহায়িত সাইবার হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন। জীবাণু অস্ত্রের সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়েও তাঁর উদ্বেগ রয়েছে। গেটসের মতে, এআই যেমন নতুন ওষুধ ও টিকা তৈরির কাজ দ্রুত করতে পারে, তেমনি ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে নতুন প্রাণঘাতী রোগজীবাণু তৈরির কাজও সহজ করে দিতে পারে। এ কারণেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে এমন এআই ব্যবস্থার বাধ্যতামূলক পর্যালোচনার পক্ষে তিনি মত দিয়েছেন। তবে গেটস শুধু এআইয়ের বিপদ তুলে ধরেননি। তাঁর মতে, সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এই প্রযুক্তি চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে নতুন ওষুধ ও টিকা আবিষ্কার, স্বাস্থ্যকর্মীদের সহায়তা এবং সাধারণ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দিতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এআইয়ের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে কয়েকটি পদক্ষেপের প্রস্তাবও দিয়েছেন গেটস। এর মধ্যে অন্যতম হলো কিছু নির্দিষ্ট কাজকে মানুষের জন্য সংরক্ষিত রাখা। তিনি এই ধারণার নাম দিয়েছেন ‘হিউম্যান রিজার্ভড’। বিশেষ করে এমন কাজ, যেখানে মানুষের সহানুভূতি, সম্পর্ক বোঝার ক্ষমতা ও মানবিক উপস্থিতি অপরিহার্য, সেসব ক্ষেত্রে মানুষকে সরিয়ে না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। এ ছাড়া এআই ও রোবটের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন গেটস। তাঁর যুক্তি, বর্তমানে একজন কর্মী নিয়োগ করলে প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন ধরনের শ্রম কর দিতে হয়, কিন্তু রোবট কেনার ক্ষেত্রে অনেক সময় কর সুবিধা পাওয়া যায়। ফলে করব্যবস্থা পরোক্ষভাবে মানুষকে বাদ দিয়ে যন্ত্র ব্যবহারে উৎসাহ দিতে পারে। রোবট ও এআই ব্যবহারের ওপর কর আরোপ করলে স্বয়ংক্রিয়করণের গতি কিছুটা কমানোর পাশাপাশি কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থ জোগানো সম্ভব হতে পারে বলে তাঁর মত। গেটস আরও বলেছেন, এআইয়ের প্রভাব সামলাতে শুধু একটি দেশের নীতি যথেষ্ট নয়। জাতীয় পর্যায়ে নতুন প্রতিষ্ঠান ও নীতিকাঠামো তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। এআই যেহেতু কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা, নির্বাচন, অর্থনীতি ও অবকাঠামোসহ বহু ক্ষেত্রকে একসঙ্গে প্রভাবিত করতে পারে, তাই এসব বিষয়কে আলাদা আলাদাভাবে দেখলে ঝুঁকি মোকাবিলা কঠিন হবে। এআই উন্নয়নে নেতৃত্ব দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কিছু মাত্রায় সমন্বয় দরকার বলে মনে করেন গেটস। তাঁর মতে, প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আগে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু অভিন্ন নীতি ও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির কাজ শুরু করা উচিত। এআই নিয়ে নিজের অবস্থানকে গেটস একেবারে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন না। বরং তাঁর বক্তব্য, এখনই ব্যবস্থা নেওয়া গেলে এই প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য বড় সুফল বয়ে আনতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে চাকরি হারানো, সামাজিক অস্থিরতা এবং জনআস্থার সংকট তৈরি হওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অনেক কঠিন হবে। তাঁর ভাষায়, এআইয়ের সুবিধা যেন শুধু ধনী ও প্রভাবশালী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনসহ বিভিন্ন পক্ষকে এআই নিয়ে আলোচনায় যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গেটসের এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন এআই প্রযুক্তির সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে এবং কর্মক্ষেত্রে এর ব্যবহারও বিস্তৃত হচ্ছে। তাঁর মতে, এখনই নীতি নির্ধারণ ও প্রস্তুতি শুরু করা গেলে এআইয়ের সম্ভাব্য সুফল সবার মধ্যে ভাগ করে নেওয়া সম্ভব। আর তা না হলে প্রযুক্তির অগ্রগতি অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। সংবাদসূত্র: গেটস নোটস, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, নিউইয়র্ক পোস্ট।
বিজ্ঞানীরা ল্যাবে তৈরি ক্ষুদ্র আকারের কৃত্রিম মস্তিষ্ক বা মিনি ব্রেন প্রায় ছয় বছর ধরে জীবন্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, মানুষের প্রাকৃতিক মস্তিষ্কের মতোই এসব কৃত্রিম মস্তিষ্কেও বার্ধক্যের লক্ষণ দেখা গেছে। বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচার এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে এই যুগান্তকারী সাফল্যের কথা জানানো হয়েছে। গবেষকরা স্টেম সেল থেকে মস্তিষ্কের টিস্যুর সমন্বয়ে এই ব্রেন অর্গানয়েড তৈরি করেছেন, যা মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশের প্রক্রিয়াকে অনুকরণ করতে পারে। সাধারণত এ ধরনের অর্গানয়েড বা কৃত্রিম কোষের পরীক্ষাগুলো মাত্র কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস স্থায়ী হয়। কিন্তু এবার গবেষকরা এগুলোকে কয়েক বছর ধরে টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে কোষগুলো পরিণত হয়েছে এবং একইসঙ্গে তাদের বয়সের একটি সেলুলার রেকর্ড বা কোষীয় স্মৃতি ধরে রেখেছে। গবেষকরা দেখেছেন, আসল মস্তিষ্কে যেসব সাধারণ কোষ থাকে, এই কৃত্রিম মস্তিষ্কেও ঠিক সে ধরনের কোষের বিকাশ ঘটেছে। জেনেটিক ও আণবিক পরিমাপ ব্যবহার করে তারা প্রমাণ পেয়েছেন যে, জৈব মস্তিষ্কের টিস্যুগুলো যেভাবে বিকশিত হয়, ল্যাবের এই টিস্যুগুলোও ঠিক একই পথ অনুসরণ করেছে। গবেষকরা যখন পুরনো অর্গানয়েডগুলোকে ভেঙে কাইমেরয়েডস হিসেবে নতুন করে তৈরি করেন, তখন দেখা যায় কোষগুলো তাদের আগের বয়সের স্মৃতি ধরে রেখেছে। এমনকি তারা বিকাশের এমন কিছু ধাপ এড়িয়ে গেছে যা তারা আগেই সম্পন্ন করেছিল। এই গবেষণা বিজ্ঞানীদের জন্য মস্তিষ্ক বিকাশের প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে আলঝেইমার্স এবং পারকিনসন্স এর মতো মারাত্মক স্নায়বিক রোগগুলো নিয়ে আরও বিশদ গবেষণার পথ খুলবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এই মিনি ব্রেনগুলো সত্যিকারের মানুষের মস্তিষ্কের মতো সম্পূর্ণ নয়। এগুলোতে কোনো রক্তনালী নেই। এছাড়া মানুষের মস্তিষ্ক যেভাবে শারীরিক অনুভূতি বা স্নায়বিক তথ্য গ্রহণ করতে পারে, ল্যাবে তৈরি এই মস্তিষ্কগুলোর সেই সক্ষমতা নেই। অর্থাৎ তারা অনেক ধরনের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না। ল্যাবে দীর্ঘসময় জীবন্ত মস্তিষ্ক টিকিয়ে রাখার ফলে একটি নৈতিক প্রশ্নও সামনে এসেছে। এই কৃত্রিম মস্তিষ্কের কি নিজস্ব কোনো চেতনা বা অনুভূতি তৈরি হতে পারে? বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা সায়েন্টিফিক আমেরিকান কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গবেষণাপত্রটির জ্যেষ্ঠ লেখক পাওলা আরলোটা জানিয়েছেন, এই অর্গানয়েডগুলোর সামান্যতম চেতনা থাকার সম্ভাবনাও একেবারে নেই বললেই চলে। কোনো কিছুর চেতনা আছে কি না তা নির্ধারণ করা বেশ জটিল বিষয়। তাই এই বিতর্ক দীর্ঘ সময় ধরেই চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আপাতত বিজ্ঞানীদের তৈরি এই মস্তিষ্কগুলো ল্যাবে রাখা কিছু স্নায়ুকোষের সমষ্টি মাত্র, যারা কেবল নিজেদের বয়স মনে রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।