- প্রচ্ছদ
- Topic
যুদ্ধবিরতি
ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব না হলেও চলমান যুদ্ধ শেষ করে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করার পথ খুঁজছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিলে এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করা গেলে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়াচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, তেহরান হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিলে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে থাকা মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের পথ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় সামরিক হুমকি তৈরি করতে না পারে, এমন নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে চূড়ান্ত পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াও যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার বিষয়ে আগ্রহী হতে পারেন ট্রাম্প। তবে সমঝোতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের শর্ত। হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে তেহরান মার্কিন অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরান থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেওয়া এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণসহ একাধিক দাবি জানিয়েছে। ইরানের এসব শর্ত মেনে নেওয়া ওয়াশিংটনের জন্য রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে কঠিন হতে পারে। এদিকে ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। এখন সংঘাত থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করাকে তিনি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তবে ইরান আবার জাহাজে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অচলাবস্থা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কেই প্রভাব ফেলছে না, এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। প্রণালিটি দিয়ে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ পরিবহন হওয়ায় সেখানে দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে তেল ও গ্যাসের দাম এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও চাপে পড়তে পারে। ফলে পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, সামরিক উপস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের অবস্থান কতটা কাছাকাছি আনা যায়, সেটিই এখন যুদ্ধবিরতিকে দীর্ঘস্থায়ী করার মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননে একটি ভবনে তল্লাশি চালানোর সময় বিস্ফোরণে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং আরও চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। জুনে কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর লেবাননে এটিই প্রথম ইসরায়েলি সেনা নিহতের ঘটনা। এর জেরে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে বিমান হামলা চালালে অন্তত একজন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দক্ষিণ লেবাননের মাজদাল জুন এলাকায় সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি শনাক্ত করতে একটি ভবনে তল্লাশি চালানোর সময় বিস্ফোরণটি ঘটে। নিহতদের পরিচয় প্রকাশ করা হলেও বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ঘটনার পর শুরুতে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন। তবে পরে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সরাসরি কোনো পক্ষকে দায়ী করা থেকে বিরত থাকেন। হিজবুল্লাহও এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিবৃতি দেয়নি। বিস্ফোরণের পর ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের কয়েকটি এলাকায় হামলা চালায়। হামলার আগে আল-মানসুরি গ্রামের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার সতর্কতা দেওয়া হয়। এক মাসের বেশি সময় পর লেবাননে এমন প্রকাশ্য সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিল ইসরায়েল। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিবনিন এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় একজন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়েছেন। আরও কয়েকটি এলাকায় গোলাবর্ষণ ও হামলার খবর পাওয়া গেছে। তবে হতাহতদের পরিচয় এবং তারা বেসামরিক নাগরিক কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি। নতুন করে সহিংসতা এমন সময়ে শুরু হলো, যখন ইসরায়েল ও লেবাননের প্রতিনিধিরা রোমে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। বিস্ফোরণ ও পাল্টা হামলার পর আলোচনা নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হলেও পরে আবার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় জুনে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী, ইসরায়েলের ধাপে ধাপে দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়া এবং ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ লেবাননের সেনাবাহিনীর হাতে দেওয়ার কথা। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে সমঝোতা বাস্তবায়নের সময়সীমা ও পদ্ধতি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। লেবাননের ভেতরে অনেকেই এই চুক্তিকে ইসরায়েলের প্রতি অতিরিক্ত ছাড় হিসেবে দেখছেন। হিজবুল্লাহও সমঝোতার বিরোধিতা করেছে এবং আলোচনার অংশ ছিল না। অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে, হিজবুল্লাহর সম্ভাব্য হুমকি পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননে তাদের নিরাপত্তা অভিযান চলবে। চলতি বছরের মার্চে হিজবুল্লাহর রকেট হামলার পর ইসরায়েল লেবাননে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর সংঘাতে লেবাননে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইসরায়েলেরও বহু সেনা ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। বুধবারের ঘটনা যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কূটনৈতিক মহল আশঙ্কা করছে, বিস্ফোরণের জন্য দায়ী পক্ষ নিশ্চিত হওয়ার আগেই পাল্টাপাল্টি হামলা বাড়তে থাকলে সীমান্তে আবারও বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গাজায় দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও সংঘাতের অবসান ঘটাতে নতুন একটি শান্তি উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত একটি ধাপভিত্তিক রোডম্যাপে শর্তসাপেক্ষে নিরস্ত্রীকরণে সম্মতি দিয়েছে হামাস। তবে সংগঠনটি স্পষ্ট করেছে, ইসরায়েল প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করলেই কেবল তারা নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাসের আলোচক দলের সদস্য গাজি হামাদ জানিয়েছেন, নিরস্ত্রীকরণ কোনো একতরফা পদক্ষেপ হবে না। এটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে ইসরায়েল চুক্তির অধীনে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছে কি না তার ওপর। তার ভাষায়, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরুর নিশ্চয়তা মিললেই ধাপে ধাপে অস্ত্র হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার দাবি করেন, ‘বোর্ড অব পিস’ হামাস ও গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে একটি ‘ঐতিহাসিক’ সমঝোতায় পৌঁছেছে। তার দাবি, এই পরিকল্পনার আওতায় ধাপে ধাপে হামাসের অস্ত্র অপসারণ করা হবে এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলও পর্যায়ক্রমে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় থাকা পরিকল্পনায় হামাসের অস্ত্র একটি ফিলিস্তিনি জাতীয় কারিগরি কমিটির তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণের কথা রয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে এবং প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে গাজায় নতুন একটি বেসামরিক প্রশাসন গঠনেরও পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা কার্যকর হয়নি। হামাস বলছে, ইসরায়েল যদি সেনা প্রত্যাহার, মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং পুনর্গঠনের বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে, তাহলে নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হবে না। অন্যদিকে ইসরায়েল সরকারও এখন পর্যন্ত পরিকল্পনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়নি এবং এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আপত্তি রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এই পরিকল্পনা মূলত চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত একটি ১৫ দফা রোডম্যাপের ধারাবাহিকতা। সেখানে যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি, গাজার প্রশাসন একটি নিরপেক্ষ ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটির হাতে হস্তান্তর, ধাপে ধাপে নিরস্ত্রীকরণ এবং পরে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গাজার দীর্ঘ সংঘাত নিরসনের পথে বড় অগ্রগতি হতে পারে। তবে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং চুক্তির প্রতিটি ধাপ বাস্তবায়নের জটিলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে আলোচনায় অগ্রগতি হলেও বাস্তবায়নের পথ সহজ হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরকে ‘সম্পূর্ণ মূল্যহীন’ এবং ‘বিশ্বাসযোগ্যতাহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। যুক্তরাষ্ট্র বারবার সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের কর্মকাণ্ডই প্রমাণ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখা যায় না। শনিবার প্রকাশিত এক লিখিত বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ অবসানে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার লঙ্ঘন করেছে। তার ভাষায়, এসব ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর ‘সম্পূর্ণ মূল্যহীন এবং বিশ্বাসযোগ্যতাহীন’। বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জানা উচিত যে ইরানি জাতি এবং ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’ তাদের জন্য এমন শিক্ষা রেখে দিয়েছে, যা তারা ভুলতে পারবে না। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সংঘাত আরও উসকে না দেওয়ারও সতর্কবার্তা দেন। এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন গত সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার পর দুই দেশ আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু করেছে। নতুন করে সামরিক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা আরও বেড়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরানও মার্কিন স্বার্থ ও সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পাল্টা পদক্ষেপের দাবি করেছে। চলমান এই উত্তেজনার মধ্যে উভয় পক্ষের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও সংকটের মুখে পড়েছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িকভাবে সংঘাত থেকে সরে এসে আলোচনার পথে ফিরলেও সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রভাব এখনো স্পষ্ট। বিশেষ করে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে ইরানের ধারাবাহিক হামলা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বাহরাইনের ‘নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি’ নামে পরিচিত এই ঘাঁটিটি মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর হিসেবে কাজ করে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ-অভিযানের প্রধান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হওয়ায় এটি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের বাইরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকে জুন পর্যন্ত এই ঘাঁটিতে একাধিক দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও সব হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে ঘাঁটির ভেতরে আঘাত হানে। এই হামলায় ঘাঁটির মূল কমান্ড হেডকোয়ার্টারসহ এক ডজনের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত দুটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থাও আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন এখনো ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করেনি। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলা তীব্র হওয়ার আগেই অধিকাংশ সেনা ও কর্মকর্তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ফলে বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, স্থাপনা নয়, মানুষের জীবন রক্ষা করাই ছিল তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই কৌশল কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ইরান সংঘাতের সময় ৮ হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করলেও পুরো সময়জুড়ে মাত্র দুটি হামলায় মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি ঘটেছে। তবে এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে এসেছে। কারণ এতে স্পষ্ট হয়েছে, অত্যন্ত সুরক্ষিত বলে বিবেচিত ঘাঁটিও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিশেষ করে তুলনামূলক কম খরচে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে ইরান যে ধরনের ক্ষতি করতে পেরেছে, তা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত বড় ও স্থায়ী সামরিক ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, একটি স্থানে বিপুল সেনা ও সরঞ্জাম কেন্দ্রীভূত করে রাখার কৌশল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর পরিবর্তে বাহিনীকে বিভিন্ন ঘাঁটিতে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় নতুন প্রযুক্তি ও কৌশল উন্নয়নের দিকেও জোর দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির ধরনেই বড় ধরনের রূপান্তর আনতে পারে।
ইরানের মাটিতে চালানো সাম্প্রতিক মার্কিন বিমান হামলাকে 'যুদ্ধবিরতির বেপরোয়া লঙ্ঘন' বলে আখ্যায়িত করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তেহরান। এই হামলার কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, আলোচনা বা যুদ্ধবিরতির কোনো নীতিমালার প্রতিই তার ন্যূনতম দায়বদ্ধতা বা সম্মান নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন হামলার কঠোর সমালোচনা করে এই শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ইব্রাহিম আজিজি তার পোস্টে বলেন, "যুদ্ধবিরতির এই ধরনের বেপরোয়া লঙ্ঘনের কারণে তাদের (যুক্তরাষ্ট্রের) অতীতের মতোই পিছু হটতে হবে এবং এই পদক্ষেপের জন্য তাদের চরমভাবে অনুতপ্ত হতে হবে।" একই পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও স্পষ্ট করে লেখেন, "একে অপরের ওপর দোষ চাপানোর এই কূটকৌশল বা খেলা এখন আর কাজ করবে না।"
সুইজারল্যান্ডে ইরানি আলোচকদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত শান্তি আলোচনা স্থগিত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ড সফরের পরিকল্পনা বাতিল করার পর শুক্রবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা বৈঠকটি আর হচ্ছে না বলে জানিয়েছে সুইজারল্যান্ড। হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বৃহস্পতিবার রাতে এক বিবৃতিতে বলেন, আলোচনার লজিস্টিক ব্যবস্থা শুরু থেকেই জটিল ছিল এবং তা সবসময় পূর্বানুমানযোগ্য ছিল না। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলেই জেডি ভ্যান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল সফরের জন্য প্রস্তুত থাকবে। সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে বুর্গেনস্টক পাহাড়ি রিসোর্টে নির্ধারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে না। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, কাতার ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে নির্ধারিত বৈঠকও আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ড জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আলোচনার প্রয়োজন হলে তারা সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে তেহরান জানিয়েছিল, বুধবারের ১৪ দফা চুক্তির পর অন্তত ৬০ দিনের জন্য অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ করা হলে তারা খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত থাকবে। ইরানের কর্মকর্তারা আরও বলেছিলেন, আলোচনা শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষণ দেখতে চান তারা। আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভ্যান্স সফর বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার আগ পর্যন্ত ইরানের প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ডে যাবে কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আগে জানিয়েছিলেন, সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির একটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পরিকল্পনাকে অপ্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করে জানায়, দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মাধ্যমে সংঘাতের সূচনা হয়। এতে অন্তত সাত হাজার মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। যুদ্ধবিরতির পরও অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। বিশেষ করে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর থাকবে। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা প্রক্রিয়ার অংশ না হওয়ায় দেশটি নিজস্ব সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান হামলা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান মিত্রদের একাংশ কংগ্রেসে প্রশ্ন তুলেছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে গিয়ে প্রশাসন অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছে কি না। ট্রাম্প পূর্বে বলেছিলেন, ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া যুদ্ধের অবসান ঘটবে না। তবে সাম্প্রতিক সমঝোতার আওতায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে, ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ মুক্ত করা হয়েছে এবং ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক মার্কিন ছাড় দেওয়া হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প ‘হতাশার কারণে’ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনা সহজ হবে না। তিনি বলেন, “যদি মার্কিন পক্ষ অতিরিক্ত দাবি করে, আমরা তা গ্রহণ করব না।” চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আলোচকদের ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়টিও আলোচনায় রাখতে চায়। যুদ্ধের আর্থিক ব্যয়ও এখন আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের খরচ এবং অন্যান্য বিল পরিশোধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত ৮০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা, যাতে দেশটি কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন কমানো এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা সীমিত করার বিষয়ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল। তবে সমঝোতা স্বাক্ষরের সময় এসব লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। ইরান আবারও জানিয়েছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না। পাশাপাশি দেশটি সীমিত মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াকরণ এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার পরিদর্শনে সম্মত হয়েছে। তবে এসব উপাদান দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। তেলবাজার ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি ইরান জানিয়েছে, ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। একই সঙ্গে নতুন জাহাজ চলাচল ফি আরোপের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে, যদিও ৬০ দিনের আলোচনাকালীন সময়ে তা কার্যকর হবে না। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার পর সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনায় শুক্রবার আন্তর্জাতিক তেলবাজারে দাম কমেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। অন্যদিকে লেবাননে নতুন ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে। ইসরায়েল দাবি করেছে, হামলাগুলো হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে পরিচালিত হয়েছে। চুক্তিতে লেবাননে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির কথা উল্লেখ থাকলেও ইসরায়েল জানিয়েছে, তাদের সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং নতুন করে দখলকৃত অঞ্চল মানচিত্রে যুক্ত করার কথাও জানিয়েছে দেশটি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে কতটা চাপ দিতে পারবেন।
দীর্ঘদিনের সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনার অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে পৌঁছানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের উপস্থিতিতে আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক সই হতে যাচ্ছে। চুক্তি সইয়ের পর ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি আনুষ্ঠানিকভাবে এর বিস্তারিত প্রকাশ করবেন। দুই দেশের এই সমঝোতা স্মারকে মূলত সামরিক অভিযান বন্ধ, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তকরণ, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মতো চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমত, সামরিক অভিযানের সমাপ্তি ও লেবানন পরিস্থিতির বিষয়ে উভয় পক্ষই তাৎক্ষণিক এবং স্থায়ীভাবে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল জানিয়েছে, সোমবার রাত থেকেই লেবাননসহ অন্যান্য অঞ্চলে তাদের সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চুক্তির পর লেবাননে ইসরায়েলের আর কোনো হামলা হবে না এবং ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও ইসরায়েলে পাল্টা কোনো হামলা চালাবে না। তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ স্পষ্ট করেছেন যে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবানন, সিরিয়া ও গাজার দখলকৃত নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে আপাতত অবস্থান করবে। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালি ও বন্দর অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার থেকে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে। একজন ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তার মতে, স্মারক সই হওয়ার পর সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য এই আন্তর্জাতিক জলপথ খুলে দেওয়া হবে। ইরানের আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা ফারস জানিয়েছে, চুক্তির অধীনে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবে ইরান। তৃতীয়ত, পরমাণু কর্মসূচিতে লাগাম টানতে ইরান পুনরায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না। চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান তাদের সব ধরনের পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখবে এবং নতুন করে কোনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে না। এর বিনিময়ে ইরানে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু করা হবে। তবে মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তি অবশ্যই মার্কিন কংগ্রেসের মাধ্যমে পর্যালোচনা ও অনুমোদিত হতে হবে। চতুর্থত, নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও অর্থ ছাড়ের বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের ওপর নতুন করে কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে না যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরানের আটকে থাকা ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় করা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে স্পষ্ট দ্বিমত ও ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। একজন ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তার দাবি, এই নগদ অর্থ আঞ্চলিক দেশগুলোর সহযোগিতা ও ফাইন্যান্সিয়াল ক্রেডিট লাইনের মাধ্যমে ছাড় করা হবে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানকে এখনই কোনো নগদ অর্থ দেওয়া হবে না, তবে তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সম্ভাব্যভাবে প্রত্যাহার করা হতে পারে। সর্বশেষ চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে ইরানের জন্য একটি বিশেষ পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তুত করবে। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করে এই পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করা হবে। এই প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর, আগামী ৬০ দিন ধরে পরমাণু ইস্যু ও নিষেধাজ্ঞার মতো অপেক্ষাকৃত জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে নিবিড় আলোচনা চলবে।
দুই সপ্তাহ আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তির মতোই আবারও অবস্থান বদল করলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরই আগে যেমন স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন, তেমনি এবারও একই ধারা অনুসরণ করে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতির নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগে আবারও সামরিক হামলার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে কয়েক ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, আলোচনা চলমান থাকায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ানো হলেও হরমুজ প্রণালিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এখনো অমীমাংসিত রয়েছে। এর মধ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) তিনটি পণ্যবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি চালানোর পাশাপাশি দুটি জাহাজ জব্দ করার কথা জানিয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির-সাঈদ ইরাভানি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি নৌ অবরোধ তুলে নেয়, তাহলে তেহরান আবারও আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে প্রয়োজন হলে তবেই কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এরই মধ্যে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে সম্ভাব্য সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। মার্কিন প্রতিনিধি দল প্রস্তুত থাকলেও ইরানের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা না আসায় শেষ পর্যন্ত সফর বাতিল করা হয়। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের কারণেই তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। যদিও এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফুয়াদ ইজাদি। তার মতে, নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়াই এমন মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ইজাদি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্দিষ্ট সময়ের বেশি সেনা মোতায়েন রাখতে চাইলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ইরান প্রসঙ্গে সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার পথে থাকায় রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়েছেন। এদিকে হোয়াইট হাউসে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই বৈঠকে ট্রাম্প ছাড়াও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ না করলে ইরানের ওপর চাপ কিছুটা কমবে এবং আলোচনার পথ খোলা থাকবে—এমন ধারণা থেকেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান আলোচনায় ফেরার আগ্রহ দেখালে নতুন করে বৈঠকের আয়োজন করা হতে পারে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান অচলাবস্থা দুই দেশের অর্থনীতিতেই প্রভাব ফেলছে, তাই দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশা রয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো নমনীয়তার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকারের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদী জানিয়েছেন, ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণার বাস্তব কোনো গুরুত্ব নেই। তার ভাষায়, ‘পরাজিত পক্ষ কখনো শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে না’, এবং অবরোধ ও সামরিক হামলার মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। ইরান আগেই জানিয়ে দিয়েছিল, হুমকি বা চাপের মধ্যে তারা আলোচনায় বসবে না। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে আলাপে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন—নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না হলে কোনো প্রতিনিধি দল পাঠানো হবে না। অন্যদিকে, পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, নিষেধাজ্ঞা এবং হুমকিই প্রকৃত সংলাপের পথে প্রধান বাধা। তিনি দাবি করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য ও কার্যক্রমের মধ্যে অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করছে। পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ জব্দের ঘটনা। মার্কিন বাহিনী ইরানের একটি জাহাজ আটক করার পর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে আইআরজিসি দুটি বিদেশি জাহাজ জব্দ করে। এতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভও এই পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, আলোচনার নামে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তেমন অগ্রগতি নেই, এবং অতীতে এমন প্রতিশ্রুতির ফাঁদে ইরান পড়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন আন্তোনিও গুতেরেস। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট সময়জুড়ে হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখার ঘোষণা একটি ‘সঠিক পদক্ষেপ’। জাতিসংঘ মহাসচিব আরও বলেন, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের অধিকার ও স্বাধীনতার পূর্ণ পুনরুদ্ধার জরুরি এবং তা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দ্বারা সম্মানিত হওয়া উচিত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই উদ্যোগ যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান সংলাপকেও এটি আরও এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি খোলা রাখা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে এবং চলমান উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। সূত্র: বিবিসি
যুদ্ধবিরতির সময়কালে আগামী ১০ দিন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, লেবাননে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পুরো সময়জুড়ে প্রণালিটি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে। যুদ্ধবিরতির সময়কালে আগামী ১০ দিন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, লেবাননে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পুরো সময়জুড়ে প্রণালিটি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে। আরাঘচি বলেন, যুদ্ধবিরতির আওতায় ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সমন্বিত রুট অনুসরণ করে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করবে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কোনো বাধা ছাড়াই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ব্যবহার করতে পারবে। তিনি আরও জানান, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৬ এপ্রিল ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন, যা বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর থেকে কার্যকর হয়েছে। উল্লেখ্য, ৮ এপ্রিল ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও লেবাননকে তা অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে মতপার্থক্য ছিল। ইরান ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান শুরু থেকেই লেবাননকে যুদ্ধবিরতির আওতায় থাকার কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তা অস্বীকার করেছিল। পরবর্তীতে নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলে লেবাননে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে এবং তার পরপরই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত জানায় তেহরান। সূত্র: আল জাজিরা, তাসনিম নিউজ এজেন্সি
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় দেশটির পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পর্তুগাল। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউসুফ রাজ্জি তাঁর পর্তুগিজ সমকক্ষ পাওলো রাঙ্গেল-এর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা হয়। লেবাননের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। বৈঠক শেষে পাওলো রাঙ্গেল বলেন, লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পর্তুগালের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তিনি যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। রাঙ্গেলের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে টেকসই সমাধান সম্ভব হতে পারে। এতে লেবাননে স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটতে পারে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির পর লেবাননকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
স্থায়ী ও বিস্তৃত যুদ্ধবিরতি ছাড়া কোনো ধরনের সমঝোতায় রাজি নয় বলে জানিয়েছে ইরান। দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ বলেছেন, তেহরান কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি মেনে নেবে না এবং পুরো অঞ্চলে সংঘাতের স্থায়ী অবসানই তাদের লক্ষ্য। তুরস্কের আন্টালিয়া ডিপ্লোমেসি ফোরাম-এর সাইডলাইনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। খাতিবজাদেহ বলেন, যেকোনো যুদ্ধবিরতি হতে হলে তা লেবানন থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সব সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এটিকে ইরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “আমরা কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি গ্রহণ করছি না। এই সংঘাত এখন একবারেই শেষ হওয়া উচিত।” হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে এই জলপথ সব দেশের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। যদিও এটি ইরানের আঞ্চলিক পানিসীমার মধ্যে পড়ে, তবুও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে দীর্ঘদিন ধরে এখানে অবাধ চলাচল বজায় রাখা হয়েছে। এ অঞ্চলে চলমান অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে ইরানের এই কূটনীতিক বলেন, তাদের কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সূত্র: আল জাজিরা
লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন না করার সতর্কবার্তা দিয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, যদি যুদ্ধবিরতি ভাঙা হয়, তাহলে তাদের যোদ্ধারা আবার ‘ট্রিগারে আঙুল রাখবে’। হিজবুল্লাহ–নিয়ন্ত্রিত আল-মানার টেলিভিশন-এ প্রচারিত এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে এ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, সংগঠনটির মুজাহিদিনেরা প্রস্তুত রয়েছে এবং যেকোনো ‘বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা’ প্রতিহত করতে তারা তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নেবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ওপর বর্তালেও পরিস্থিতি অবনতি হলে তার জবাব দিতে প্রস্তুত রয়েছে হিজবুল্লাহ। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
লেবাননে ইসরায়েলের হামলা পুরোপুরি বন্ধ না হলে কোনো যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা হাসান ফাদলাল্লাহ এই অবস্থান তুলে ধরেছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফাদলাল্লাহ বলেন, ইসরায়েল যদি সব ধরনের শত্রুতামূলক কার্যক্রম বন্ধ না করে, তাহলে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার প্রশ্নই ওঠে না। তার ভাষায়, বাস্তব পরিস্থিতির ওপরই সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নির্ভর করছে। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাত থেকে কার্যকর হতে পারে এমন একটি স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতির বিষয়ে বৈরুতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত হিজবুল্লাহকে অবহিত করেছেন। এতে বোঝা যায়, প্রস্তাবিত এই যুদ্ধবিরতি ঘিরে আঞ্চলিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছিল। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, দুই দেশই শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তিনি আরও জানান, গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রথমবারের মতো লেবানন ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিরা সরাসরি বৈঠকে বসেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপস্থিত ছিলেন। স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান রেজিন কেইনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান ট্রাম্প। তবে হিজবুল্লাহর কঠোর অবস্থান যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ঘোষিত ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘স্বস্তির খবর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তিনি উল্লেখ করেন, চলমান সংঘাতে ইতোমধ্যেই ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য উদ্বেগজনক। উরসুলা ভন ডার লেন বলেন, ইউরোপ লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে যাবে। একই সঙ্গে দেশটির জনগণের পাশে থাকতে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সংলাপ অব্যাহত রাখা জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে তুরস্ক। দেশটি বলেছে, যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী শান্তিতে রূপ দিতে সংলাপের বিকল্প নেই এবং এ প্রক্রিয়ায় তারা সমর্থন অব্যাহত রাখবে।' আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ন্যাটো সদস্য ও ইরানের প্রতিবেশী তুরস্ক ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছে। দেশটি শুরু থেকেই যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে জানায়, চলমান যুদ্ধবিরতি ধরে রেখে তা স্থায়ী শান্তিতে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে আঙ্কারা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আলোচনায় গঠনমূলক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলমান সংলাপকে আরও এগিয়ে নিতে আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বয় বাড়ানো হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে তুরস্ক, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সপ্তাহের শেষে তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ আনতালিয়ায় একটি কূটনৈতিক ফোরামের ফাঁকে বৈঠকে বসতে পারেন। এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কাতার সফর শেষে তুরস্কে যাওয়ার কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর এই ধারাবাহিক যোগাযোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংলাপকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখা এবং তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে রূপ দিতে বহুপাক্ষিক কূটনীতি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থগিত থাকা আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার ‘প্রবল সম্ভাবনা’ দেখছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। একই সঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর জোর দিয়েছেন। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে গুতেরেস বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আইন বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে এর প্রভাব বেশি দৃশ্যমান। শক্তি প্রয়োগের নীতিমালা উপেক্ষিত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মহাসচিব বলেন, চলমান এই সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে দ্রুত আলোচনা পুনরায় শুরু করা জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি। এ সময় ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে চলমান আলোচনাকেও গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে গুতেরেস বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই ধরনের সংলাপ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের এই মন্তব্য নতুন করে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা জোরদার করছে। যুদ্ধবিরতি টেকসই রাখা এবং আলোচনার পথ খোলা রাখাই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছাড়াই আঞ্চলিক দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই আহ্বান জানিয়েছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়িদ বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদির সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপে। সোমবার অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত এবং চলমান যুদ্ধবিরতির প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আব্বাস আরাঘচি বলেন, বাইরের শক্তির ‘নেতিবাচক হস্তক্ষেপ’ ছাড়াই আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। এজন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানের ‘দায়িত্বশীল আচরণ’-এর প্রশংসা করে বলেন, যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলমান উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুতই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। এ সময় ওমানের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করে আরাঘচি বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা রক্ষায় ইরান সবসময় সহযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক সংকটে ওমান যে দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছে, তা তেহরান ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে। এর জবাবে ইরানও পাল্টা হামলা চালায়, ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়। এর ভিত্তিতেই পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠক কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। বিশ্লেষকদের মতে, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যই এই অচলাবস্থার প্রধান কারণ। ইসলামাবাদ বৈঠকে ইরান মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দাবি তোলে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এসব শর্তে সম্মত না হওয়ায় সমঝোতা সম্ভব হয়নি। বর্তমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ওমানের সঙ্গে এই কূটনৈতিক যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওমানের ভূমিকা কাজে লাগিয়ে ইরান আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদার করতে চাইছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে এবং একটি টেকসই সমঝোতায় পৌঁছাতে নেপথ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো। গত ৭ এপ্রিল কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিটি বজায় রাখতে এবং এর মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়ানোর জন্য জোর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। তবে আলোচনার পরবর্তী ভেন্যু কোথায় হবে, তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীরা তেহরান ও ওয়াশিংটনকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে নিরলস কাজ করছেন। এই প্রচেষ্টার কেন্দ্রে রয়েছে পাকিস্তান, যাদের সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক ও মিসর। আপাতত লক্ষ্য হলো আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হতে যাওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অন্তত দেড় মাস বাড়ানো। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে জানিয়েছেন, চরম উত্তেজনার মধ্যেও যুদ্ধবিরতি এখনো টিকে আছে। তিনি বলেন, "ইসলামাবাদে একটানা ২১ ঘণ্টা সরাসরি আলোচনা হয়েছে, যার সাক্ষী আমি নিজে। কিছু বাধা থাকলেও সেগুলো নিরসনের চেষ্টা চলছে।" জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে আলাপকালেও তিনি শান্তি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার বিষয়ে ইসলামাবাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। গত কয়েক সপ্তাহের সংঘাতের পর কার্যকর হওয়া এই যুদ্ধবিরতি এখন অনিশ্চয়তার মুখে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ আরোপের পরিকল্পনাকে 'যুদ্ধবিরতির চরম লঙ্ঘন' বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি না হলেও আলোচনা পুরোপুরি ভেস্তে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ-চলাচলের নিশ্চয়তা চায়। অন্যদিকে, ইরান চাইছে আন্তর্জাতিক কাঠামোর অধীনে সার্বভৌম অধিকারের স্বীকৃতি, ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য গ্যারান্টি। তেহরানের দাবি, কোনো ছাড় দেওয়ার আগে ওয়াশিংটনকে আগে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য ইরান আবারও ইসলামাবাদকে পছন্দ করছে। ভৌগোলিক নৈকট্য এবং পাকিস্তানের ওপর আস্থার কারণে তারা এখানেই ফিরতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র লজিস্টিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণে বিকল্প কোনো দেশের কথা ভাবছে। কূটনীতিকদের মতে, মূল ইস্যুগুলোতে একমত হতে পারলে ভেন্যু নিয়ে এই মতবিরোধ বড় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চীন, ব্রিটেন, তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে দফায় দফায় কথা বলেছেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এই সংলাপকে 'ভঙ্গুর' হিসেবে বর্ণনা করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শান্তি প্রক্রিয়ায় সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বর্তমানে মধ্যস্থতাকারীরা ২২ এপ্রিলের সময়সীমার আগে একটি 'টেকনিক্যাল উইন্ডো' তৈরির চেষ্টা করছেন, যাতে অন্তত ৪৫ দিনের অতিরিক্ত সময় পাওয়া যায় এবং দ্বিতীয় দফার রাজনৈতিক আলোচনার পথ প্রশস্ত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধবিরতির প্রভাব নিয়ে ইরান ও কাতারের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে। ফোনালাপে অংশ নেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, আলোচনায় দুই পক্ষই চলমান মধ্যস্থতা প্রচেষ্টায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আলোচনায় তারা মত দেন, সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ উপায়ের মাধ্যমে সংকটের মূল কারণগুলো সমাধানের পথ খোলা রাখতে হবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করেন তারা। এ সময় কাতারের প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে আন্তর্জাতিক জলপথগুলো উন্মুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই ধরনের কূটনৈতিক যোগাযোগ আঞ্চলিক পরিস্থিতি শান্ত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।