যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাস শহরতলিতে মুসলিম পরিবারগুলোর জন্য ঈদুল আজহা উদযাপনে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে। দুই বছর আগে আমিনাহ নাইট নামে এক উদ্যোক্তা ইনডোর ওয়াটার পার্কে মুসলিম পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ ঈদ উৎসবের আয়োজনের পরিকল্পনা করেন।
শুরুতে তিনি একটি স্থানীয় মসজিদের সঙ্গে যৌথভাবে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করতে চাইলেও মসজিদ কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে। তাদের আপত্তির মূল কারণ ছিল, ঈদ উপলক্ষে সাঁতারভিত্তিক বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ধর্মীয় উদযাপনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তারা মনে করেছিলেন।
তবে সেই সিদ্ধান্তে থেমে না থেকে আমিনাহ নাইট নিজ উদ্যোগে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেন। এতে মুসলিম পরিবার, শিশু-কিশোর এবং তরুণদের ব্যাপক সাড়া মেলে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ ও আনন্দঘন পরিবেশে একত্রিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
আয়োজকরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা মুসলিম শিশু ও তরুণদের জন্য এমন সামাজিক ও পারিবারিক আয়োজন সম্প্রদায়ের বন্ধন আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। অংশগ্রহণকারীরা জানান, ধর্মীয় মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখেই আধুনিক পরিবেশে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার এটি একটি নতুন অভিজ্ঞতা।
পরবর্তীতে এই উদ্যোগ স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায় এবং প্রতি বছর আরও বেশি পরিবার এতে অংশ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
আয়োজকদের আশা, ভবিষ্যতে এ ধরনের পারিবারিক অনুষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাস শহরতলিতে মুসলিম পরিবারগুলোর জন্য ঈদুল আজহা উদযাপনে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে। দুই বছর আগে আমিনাহ নাইট নামে এক উদ্যোক্তা ইনডোর ওয়াটার পার্কে মুসলিম পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ ঈদ উৎসবের আয়োজনের পরিকল্পনা করেন। শুরুতে তিনি একটি স্থানীয় মসজিদের সঙ্গে যৌথভাবে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করতে চাইলেও মসজিদ কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে। তাদের আপত্তির মূল কারণ ছিল, ঈদ উপলক্ষে সাঁতারভিত্তিক বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ধর্মীয় উদযাপনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তারা মনে করেছিলেন। তবে সেই সিদ্ধান্তে থেমে না থেকে আমিনাহ নাইট নিজ উদ্যোগে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেন। এতে মুসলিম পরিবার, শিশু-কিশোর এবং তরুণদের ব্যাপক সাড়া মেলে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ ও আনন্দঘন পরিবেশে একত্রিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আয়োজকরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা মুসলিম শিশু ও তরুণদের জন্য এমন সামাজিক ও পারিবারিক আয়োজন সম্প্রদায়ের বন্ধন আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। অংশগ্রহণকারীরা জানান, ধর্মীয় মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখেই আধুনিক পরিবেশে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার এটি একটি নতুন অভিজ্ঞতা। পরবর্তীতে এই উদ্যোগ স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায় এবং প্রতি বছর আরও বেশি পরিবার এতে অংশ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আয়োজকদের আশা, ভবিষ্যতে এ ধরনের পারিবারিক অনুষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়বে।
ফুটবল, সাম্বা, আমাজনের বিস্তীর্ণ অরণ্য এবং মনোমুগ্ধকর সমুদ্রসৈকতের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত ব্রাজিল। দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম দেশটির পরিচিতি সাধারণত এসব বিষয় ঘিরেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে এই পরিচিত চিত্রের আড়ালে দেশটিতে নীরবে বিস্তার লাভ করছে ইসলাম, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষক ও ধর্মীয় পর্যবেক্ষকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করছে। খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ এই লাতিন আমেরিকান দেশে মুসলিম সম্প্রদায় এখন আর কেবল অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অভিবাসনের পাশাপাশি স্থানীয় ব্রাজিলীয়দের মধ্যেও ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে, যা দেশটির ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ব্রাজিলের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা আইবিজিই এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৬৭ হাজার থেকে ১৫ লাখের মধ্যে রয়েছে। যদিও বিভিন্ন গবেষণায় সংখ্যাগত কিছু পার্থক্য দেখা যায়, ইসলামিক সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী বর্তমানে ব্রাজিলে প্রায় ১৫ লাখ সক্রিয় মুসলিম বসবাস করছেন। এটি দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় শূন্য দশমিক সাত শতাংশ। গবেষকদের মতে, সরকারি আদমশুমারিতে ধর্ম পরিবর্তনের তথ্য অনেক সময় দ্রুত হালনাগাদ না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। ব্রাজিলে মুসলিমদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিভিন্ন মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার। ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশজুড়ে প্রায় ১৫১টি সক্রিয় মসজিদ রয়েছে। এর পাশাপাশি শতাধিক নামাজকেন্দ্র এবং ইসলামিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে সাও পাওলো, পারানা, রিও ডি জেনেইরো, ব্রাসিলিয়া, কুরিতিবা এবং ফোজ দো ইগুয়াসু অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা এবং মসজিদের ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলে ইসলামের প্রসারের পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমটি হলো অভিবাসন। গত শতাব্দীতে সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন থেকে বিপুল সংখ্যক আরব মুসলিম ব্রাজিলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও মুসলিম অভিবাসীরা সেখানে আসেন। দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে স্থানীয় ব্রাজিলীয়দের ইসলাম গ্রহণের প্রবণতাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কারণে অনেক ব্রাজিলীয় ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হচ্ছেন। ফেডারেশন অব মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনস ইন ব্রাজিলের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশটিতে ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি স্থানীয় ব্রাজিলীয় ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলে সংগঠনটির দাবি। ব্রাজিলের ইসলামি ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো সাও পাওলোর মেসকিতা ব্রাজিল। ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদকে শুধু ব্রাজিল নয়, সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম এবং সবচেয়ে পুরোনো মসজিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি দেশটিতে ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া ফোজ দো ইগুয়াসু শহরের ওমর ইবনুল খাত্তাব মসজিদও মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম পরিচিত স্থাপনা। ১৯৮৩ সালে নির্মিত এই মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী এবং বিশাল মিনার দেশি-বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পারানা অঙ্গরাজ্যের রাজধানী কুরিতিবায় অবস্থিত ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব মসজিদ এবং রাজধানী ব্রাসিলিয়ার ইসলামিক সেন্টারও মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রাজিলের প্রায় সব মুসলিমই নগরাঞ্চলে বসবাস করেন। সাও পাওলো, রিও ডি জেনেইরো, ব্রাসিলিয়া, ফোজ দো ইগুয়াসু, কুরিতিবা এবং বেলো হরিজন্তে শহরগুলো মুসলিম জনসংখ্যার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের অন্যতম বড় হালাল মাংস রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও ব্রাজিলের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। দেশটির বিশাল হালাল খাদ্যশিল্প শুধু স্থানীয় মুসলিমদের প্রয়োজন মেটাচ্ছে না, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ব্রাজিলে ইসলাম এখন আর শুধুমাত্র অভিবাসীদের ধর্ম হিসেবে বিবেচিত হয় না। স্থানীয় সমাজে মুসলিমদের অংশগ্রহণ, ধর্মীয় স্বাধীনতা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইসলামের প্রতি আগ্রহ দেশটিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে। ফুটবলপ্রেমী এই লাতিন আমেরিকান দেশে মুসলিমরা এখন একটি ছোট কিন্তু ক্রমবর্ধমান সম্প্রদায় হিসেবে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলেছেন। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোতে ব্রাজিলে ইসলামের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
রাশিয়ায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে একাধিক মুসলিম ধর্মীয় নেতা, মুফতি এবং মুসলিম কমিউনিটির প্রতিনিধিদের গ্রেফতার ও আটক করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটির মুসলিম সমাজে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী, বিশ্লেষক এবং কিছু স্বাধীন গণমাধ্যমের মতে, এসব ঘটনা শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; বরং এর সঙ্গে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের পরিচয়গত অবস্থানের প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে। বিবিসি মনিটরিংয়ের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মে মাসে রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী অন্তত আটজন মুসলিম আলেম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিকে আটক করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রশাসনিক অবাধ্যতা থেকে শুরু করে নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মতো বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে সমালোচকদের একটি অংশের দাবি, এসব অভিযোগের পেছনে রাজনৈতিক ও আদর্শিক কারণও থাকতে পারে। আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন কারেলিয়ার সাবেক মুফতি উইসাম বার্দভিল। রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের তথ্য অনুযায়ী, মস্কোর শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরে পুলিশের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগে তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া মর্দোভিয়া প্রজাতন্ত্রের মুফতি রয়াল আসেনভকেও ঘুষ দাবির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে জানানো হয়। রুশ গণমাধ্যম কোমেরসান্তের প্রতিবেদনে আরও কয়েকজন মুসলিম ধর্মীয় নেতার নাম উঠে এসেছে, যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। কিছু মামলায় অভিযুক্তদের সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত মুসলিম ব্রাদারহুডের সম্পর্ক থাকার অভিযোগও আনা হয়েছে। রাশিয়া ২০০৩ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তবে গ্রেফতারগুলোর পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট সামনে এসেছে। মে মাসের শুরুতে রাশিয়ার স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস (ডিইউএম)-এর প্রধান রাভিল গাইনুতদিন প্রেসিডেন্ট Vladimir Putin-এর কাছে একটি খোলা চিঠি পাঠান। সেখানে তিনি আবাসিক ভবনে ধর্মীয় সমাবেশ ও জামাতবদ্ধ নামাজ কার্যত নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবিত আইনের বিরোধিতা করেন। চিঠিতে তিনি সতর্ক করে বলেন, আইনটি কার্যকর হলে মুসলমানদের সাংবিধানিক ধর্মীয় অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমনকি আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুদের বাড়িতে একসঙ্গে নামাজ আদায় করাও আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশে পর্যাপ্ত মসজিদ ও উপাসনালয় না থাকা সত্ত্বেও নতুন স্থাপনা নির্মাণে কর্তৃপক্ষ অনীহা দেখাচ্ছে। এর কিছুদিন পরই মুসলিম আলেমদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান শুরু হওয়ায় অনেক পর্যবেক্ষক দুই ঘটনার মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে রাশিয়ার সরকার বা নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। এদিকে রাশিয়ার কট্টর জাতীয়তাবাদী ও উগ্র-ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলো এসব গ্রেফতারকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন চ্যানেলে তারা মুসলিম নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবি তুলেছে। কিছু চ্যানেল এমনকি ডিইউএমকে ‘চরমপন্থি’ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করার আহ্বানও জানিয়েছে। বিতর্ক আরও তীব্র হয় ডিইউএম-এর উপপ্রধান দামির মুখেতদিনভকে ঘিরে। তার কার্যালয়ে ১২২৩ সালের কালকা যুদ্ধের একটি চিত্রকর্ম প্রদর্শন নিয়ে রুশ জাতীয়তাবাদীদের একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করে। সমালোচকদের দাবি ছিল, ওই চিত্রকর্ম রাশিয়ার ঐতিহাসিক বর্ণনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পরে মুখেতদিনভ চিত্রকর্মটি সরিয়ে ফেলেন এবং এর জায়গায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি চিত্রকর্ম স্থাপনের ঘোষণা দেন। ডিইউএম শুরুতে এসব গ্রেফতার নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি প্রতিক্রিয়া না জানালেও পরে সংগঠনটির প্রধান রাভিল গাইনুতদিন একটি বিবৃতিতে বলেন, ডিইউএমকে চরমপন্থা, বিদেশি প্রভাব বা উগ্রবাদের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা ভিত্তিহীন। তিনি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এ ধরনের প্রচারণা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ায় বর্তমানে দুই ধরনের প্রবণতা একসঙ্গে কাজ করছে। একদিকে সরকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। অন্যদিকে যুদ্ধকালীন জাতীয়তাবাদী আবহে ইসলামবিদ্বেষী ও অভিবাসীবিরোধী বক্তব্যও আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। রাশিয়ায় বর্তমানে দুই কোটিরও বেশি মুসলিম বসবাস করে, যা ইউরোপের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যাগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের নীতির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক গ্রেফতার অভিযান নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে, সেই আনুগত্য এখনো কি রাজনৈতিক সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট? পর্যবেক্ষকদের মতে, মুসলিম নেতাদের বিরুদ্ধে চলমান এই অভিযান শুধু কয়েকজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের ভবিষ্যৎ নয়, বরং রাশিয়ায় ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সামাজিক নীতির দিকনির্দেশনা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করতে পারে।