মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান। শনিবার এক টেলিফোন আলাপে দুই নেতা লোহিত সাগর ও আরব উপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, ফোনালাপে দুই মন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন এবং পারস্পরিক সমন্বয় ও পরামর্শ অব্যাহত রাখার ওপর বিশেষ জোর দেন। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা জোরদার করতে একটি শান্তিপূর্ণ ও গঠনমূলক সমাধানে পৌঁছানোর অংশ হিসেবে উত্তেজনা কমানো এবং আরব উপসাগর ও লোহিত সাগরে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে উভয় নেতাই একমত পোষণ করেছেন। মূলত লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে সাম্প্রতিক সময়ে হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইয়েমেনের হুথি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় একটি সৌদি বাণিজ্যিক জাহাজ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে নিন্দার ঝড় ওঠে এবং বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়। উদ্ভূত এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মাঝেই সৌদি আরব ও পাকিস্তানের শীর্ষ কূটনীতিকদের এই আলোচনা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তানের করাচির জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অনুমতি সীমার অতিরিক্ত মার্কিন ও কানাডিয়ান ডলার বহনের অপরাধে এক কানাডিয়ান নাগরিককে ৮ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। কাস্টমস, ট্যাক্সেশন অ্যান্ড অ্যান্টি-স্মাগলিং বিষয়ক বিশেষ আদালত এই রায় দেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ওই ব্যক্তির নাম রাহিল ধন্নানি। বিশেষ আদালতের বিচারক ড. শাবান ওয়াহিদ কাস্টমস আইনের বিভিন্ন ধারায় তাকে পাঁচ ও তিন বছর করে মোট আট বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি রাহিল ধন্নানি তার পরিবারসহ ব্যাংকক হয়ে করাচি থেকে কানাডার ভ্যানকুভারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সে সময় কাস্টমস কর্মকর্তারা তাকে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা সঙ্গে আছে কি না তা জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করেন। তবে তার লাগেজ তল্লাশি করে ১ লাখ ১১ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার এবং ৩১ হাজার ৪২৫ কানাডিয়ান ডলার উদ্ধার করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি নাইমাতুল্লাহ সুমরো জানান, আইনগত সীমার অতিরিক্ত এই বৈদেশিক মুদ্রা অবৈধভাবে পাচারের চেষ্টার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, অভিযুক্তকে কোনো ডিক্লেলারেশন ফর্ম দেওয়া হয়নি এবং কাস্টমস তল্লাশির চূড়ান্ত ধাপ অতিক্রম করার আগেই তাকে আটক করা হয়েছিল। তবে আদালত ডিফেন্সের এই যুক্তি খারিজ করে দেন। আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত একজন অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারী হওয়ায় কাস্টমস নিয়ম সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন। কাস্টমস কর্মকর্তার সরাসরি প্রশ্নের পরও মিথ্যা বলা এবং কোনো সন্তোষজনক বৈধ ব্যাখ্যা না দেওয়ায় এটি স্পষ্ট যে তিনি জেনেশুনে এবং সচেতনভাবে আইন লঙ্ঘন করে মুদ্রা পাচারের চেষ্টা করেছিলেন। সব তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনার পর আদালত রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে রায় দেন। সূত্র: ডন
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে একটি যৌথ নিরাপত্তা চৌকিতে ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলায় ১২ জন সেনাসদস্যসহ মোট ১৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। আফগান সীমান্তের কাছে অবস্থিত ট্যাঙ্ক জেলায় বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের মধ্যবর্তী রাতে এই প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। সামরিক বাহিনীর বিবৃতি অনুযায়ী, শুরুতে সশস্ত্র জঙ্গিরা সেনাবাহিনী ও পুলিশের ওই যৌথ নিরাপত্তা চৌকিতে অতর্কিত হামলা চালায় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের তীব্র সংঘর্ষ হয়। তবে কঠোর নিরাপত্তা বলয় ভেদ করতে ব্যর্থ হওয়ার পর, হামলাকারীরা একটি বিস্ফোরক বোঝাই গাড়ি নিয়ে চৌকির বাইরের দিকের শক্ত দেয়ালে সজোরে ধাক্কা দেয়। এই ভয়াবহ বিস্ফোরণেই বিপুল সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটে। এই আত্মঘাতী হামলায় ১২ জন সেনা সদস্যের পাশাপাশি ২ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং বন বিভাগের ১ জন সরকারি কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এক আবেগঘন বার্তায় নিহতদের 'বীর সন্তান' আখ্যা দিয়ে জানিয়েছে, তারা দেশের জন্য চূড়ান্ত আত্মত্যাগ স্বীকার করে শাহাদাত বরণ করেছেন। উল্লেখ্য, ট্যাঙ্ক জেলাসহ এই সীমান্ত এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই সশস্ত্র জঙ্গিদের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তানের এই উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে জঙ্গি তৎপরতা ও চোরাগোপ্তা হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে, ভয়াবহ এই হামলার দায় স্বীকার করেছে স্থানীয় সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, এই হামলায় তাদের চারজন আত্মঘাতী সদস্য অংশ নিয়েছিল। প্রসঙ্গত, বর্তমান সরকার উৎখাত করে দেশটিতে নিজেদের কট্টর ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০০৭ সাল থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে এই তালেবান গোষ্ঠীটি।
মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত বদলে যাওয়া নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সৌদি আরবের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক অবস্থান। একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে রিয়াদের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক সামনে আসায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি পুরোনো প্রশ্ন—ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার বিপরীতে সৌদি আরব কি ভবিষ্যতে পাকিস্তানের নিরাপত্তা ছাতার ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে পারে? সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্ভাব্য এই সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সৌদি আরবের নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা অর্জনের সম্ভাবনা। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এটি বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের অংশ হলেও, পারমাণবিক বিস্তার রোধ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করলে একটি দেশ ভবিষ্যতে পারমাণবিক কর্মসূচিকে আরও উন্নত করার সুযোগ পেতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এখন পর্যন্ত সৌদি আরবকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়েছে, এমন কোনো তথ্য নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি মূলত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতাকেন্দ্রিক। তারপরও সৌদি আরবের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে উদ্বেগের পেছনে রয়েছে আঞ্চলিক বাস্তবতা। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান অতীতে বলেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলে সৌদি আরবও নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে একই ধরনের সক্ষমতা অর্জনের কথা বিবেচনা করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। দেশটির সঙ্গে সৌদি আরবের বহু বছরের সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি এই সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে। এই চুক্তির পর থেকেই বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সৌদি আরব কি ভবিষ্যতে পাকিস্তানের কাছ থেকে কোনো ধরনের কৌশলগত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পেতে পারে? কেউ কেউ এটিকে সম্ভাব্য ‘পারমাণবিক ছাতা’ হিসেবে দেখছেন। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—সৌদি আরবকে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র সরবরাহ বা দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র ভাগাভাগির কোনো প্রকাশ্য ও নিশ্চিত চুক্তির তথ্য এখনো নেই। তবে পাকিস্তানের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু বক্তব্য এই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী এক পর্যায়ে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, প্রয়োজন হলে পাকিস্তানের কৌশলগত সক্ষমতা সৌদি আরবের জন্য ব্যবহারের সুযোগ থাকতে পারে। যদিও এই বক্তব্যের সুনির্দিষ্ট অর্থ এবং বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে পরবর্তীতে নানা ব্যাখ্যা এসেছে। এখন সৌদি আরব একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা এগিয়ে নিতে চাইছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে জোরদার করছে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানকে ঘিরে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বিশ্লেষণে একটি নতুন সমীকরণ সামনে এসেছে। একদিকে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা, অন্যদিকে ইসরায়েলের ঘোষিত ও অঘোষিত পারমাণবিক সক্ষমতা—এর মাঝখানে সৌদি আরব যদি বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তিতে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করে এবং একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও গভীর করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে সৌদি আরব এখনই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে হাঁটছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। বরং বর্তমানে যে চিত্রটি স্পষ্ট, তা হলো—রিয়াদ নিজের জ্বালানি ও নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান—দুই দেশের সঙ্গেই কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করছে। এখন দেখার বিষয়, সৌদি আরবের এই পারমাণবিক কর্মসূচি কতটা বেসামরিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে এবং ভবিষ্যতে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে রিয়াদের কৌশল কতটা বদলে যায়। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক প্রতিযোগিতা শুরু হলে তার প্রভাব শুধু সৌদি আরব, ইরান বা পাকিস্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে।
সৌদি আরবের ওপর ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে নিজেদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা ইরানকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে পাকিস্তান। একই সঙ্গে এই ধরনের উস্কানিমূলক তৎপরতাকে ইসলামাবাদের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, চলতি সপ্তাহে সৌদি আরবে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইসলামাবাদের উদ্বেগ ও ক্ষোভ চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে ইরানকে এই কঠোর বার্তা পৌঁছে দেয়। গত বছর পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, যেকোনো এক দেশের ওপর বহিরাগত আক্রমণকে উভয় দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই সমঝোতার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যেই ইয়েমেন সীমান্তবর্তী সৌদি আরবের কৌশলগত এলাকাগুলোতে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, যা তাদের সরাসরি যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। গত সোমবার হুতিদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে সৌদি বিমান হামলার অভিযোগ তুলে হুতিরা পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে চার বছরের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়। যদিও এই সহিংসতা এখন পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে আছে, তবে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি এতটা আকস্মিকভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠবে তা ইসলামাবাদের ধারণার বাইরে ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান এই সংকট পাকিস্তানের জন্য বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে লোহিত সাগরে হুতিদের সম্ভাব্য হামলার কারণে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য পথ অবরুদ্ধ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে, যার ওপর পাকিস্তানের অর্থনীতি বিশেষভাবে নির্ভরশীল। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক উত্তেজনার ফলে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় পাকিস্তানে জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়েছিল এবং জ্বালানি সাশ্রয়ে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান দ্রুত বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল। মূলত নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই পাকিস্তান গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি সম্পাদনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, গত সেপ্টেম্বরে রিয়াদ ও ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষা চুক্তিটি প্রমাণ করে যে, উপসাগরীয় আরব দেশগুলো নিরাপত্তার জন্য এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এককভাবে নির্ভর করতে পারছে না এবং তারা পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছে। পাকিস্তানের একটি দায়িত্বশীল সূত্র দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধ হওয়াই সবার জন্য মঙ্গলজনক, তবে সৌদি আরব যদি সামরিক সহায়তার জন্য আহ্বান জানায়, তবে পাকিস্তান নিশ্চিতভাবেই তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াবে। সূত্র: জিও নিউজ
পাকিস্তান ও চীনের ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের মধ্যে ৪৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের ৯টি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তিকে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের নতুন মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, পাকিস্তানে কর্মরত চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তার সরকার "কোনো ধরনের প্রচেষ্টারই কমতি রাখবে না।" শুক্রবার (১৭ জুলাই) ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান-চীন বিজনেস-টু-বিজনেস (বি-টু-বি) ফার্মাসিউটিক্যাল, স্বাস্থ্যসেবা ও বায়োটেকনোলজি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। সম্মেলনে পাকিস্তান ও চীনের সরকারি প্রতিনিধি, ওষুধ কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা, বিনিয়োগকারী এবং প্রায় ৩০০ জন চীনা প্রতিনিধি অংশ নেন। শাহবাজ শরিফ বলেন, পাকিস্তানে অবস্থানরত চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তার ভাষায়, "আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, পাকিস্তানে অবস্থানরত আমাদের চীনা ভাই-বোনদের নিরাপত্তা আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কোনো প্রচেষ্টাই বাদ দেব না।" প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানের স্থানীয় উদ্যোক্তারা দেশের ওষুধশিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাস্তবায়নের মাধ্যমে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)-এর দ্বিতীয় ধাপকে আরও গতিশীল করবে। তিনি বলেন, "আজ আমরা পাকিস্তান ও চীনের উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রায় ৪৪০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের চুক্তি স্বাক্ষরের সাক্ষী হয়েছি।" প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সম্মেলনে স্থানীয়ভাবে টিকা উৎপাদন, বায়োটেকনোলজি, ওষুধ উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, হেপাটাইটিস প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন যৌথ উদ্যোগ নিয়ে মোট ৯টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি পাকিস্তানের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে সহযোগিতা নিয়ে একটি পৃথক সমঝোতাও হয়েছে। শাহবাজ শরিফ চীনকে পাকিস্তানের "সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু" হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সব আন্তর্জাতিক ফোরামে চীন পাকিস্তানের পাশে থেকেছে এবং সিপিইসি ১.০-এর আওতায় প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পাকিস্তানের অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে একজন দূরদর্শী নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করে শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের সাফল্যের প্রশংসা করেন। বক্তব্যে সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার বিষয়েও মন্তব্য করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে এবং এ প্রচেষ্টায় চীনসহ বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সহযোগিতা পেয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, পাকিস্তান-চীন সম্পর্ক "হিমালয়ের চেয়েও উঁচু, মধুর চেয়েও মিষ্টি এবং ইস্পাতের চেয়েও শক্তিশালী।" নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কেন? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে চীনা প্রকৌশলী ও নাগরিকদের ওপর একাধিক সশস্ত্র হামলার পর নিরাপত্তা ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার এবং তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেওয়ার পর খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে সহিংসতা বেড়েছে। এসব হামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি চীনা নাগরিক ও সিপিইসি-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি পাকিস্তান সরকার জানিয়েছে, বেলুচিস্তানের সাইন্দাক তামা ও স্বর্ণখনি এলাকায় নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হচ্ছে। কারণ নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সেখানে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। খনিটি পরিচালনা করছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত মেটালার্জিক্যাল করপোরেশন অব চায়না (এমসিসি)। উল্লেখ্য, ২০২১ সালে দাসু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত চীনা প্রকৌশলীদের বহনকারী বাসে আত্মঘাতী হামলায় ১০ জন চীনা নাগরিক নিহত হন। ২০২৪ সালে খাইবার পাখতুনখাওয়ার বেসহামে আরেক আত্মঘাতী হামলায় পাঁচ চীনা প্রকৌশলীসহ ছয়জন নিহত হন। একই বছর করাচির জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে বিস্ফোরণেও দুই চীনা প্রকৌশলী নিহত হন। এসব ঘটনার পর পাকিস্তান চীনা নাগরিক ও বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা আরও জোরদার করেছে।
আরব সাগরে বিধ্বস্ত পাকিস্তানের কেটু এয়ারওয়েজের কার্গো বিমানের ব্ল্যাক বক্স উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছেন নিহত পাঁচ ক্রু সদস্যের পরিবারের সদস্যরা। তাদের দাবি, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান চালিয়ে ফ্লাইট রেকর্ডার উদ্ধার করা জরুরি। গত ৭ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে পাকিস্তানের করাচি যাওয়ার পথে বোয়িং ৭৩৭ কার্গো বিমানটি আরব সাগরে বিধ্বস্ত হয়। দুর্ঘটনার পর কিছু ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হলেও ব্ল্যাক বক্স এখনো পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনাস্থলের পানির গভীরতা প্রায় ৩ হাজার মিটার, যা উদ্ধার অভিযানকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে। বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, এত গভীর সমুদ্রে ব্ল্যাক বক্স খুঁজে বের করতে বিশেষ প্রযুক্তি, রিমোটচালিত পানির নিচের যান এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। অতীতে এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৪৭ দুর্ঘটনার তদন্তেও একই ধরনের আন্তর্জাতিক অভিযান চালানো হয়েছিল। নিহত ক্যাপ্টেন রিজওয়ান ইদরিসের ছেলে ইয়াশিব রিজওয়ান রয়টার্সকে বলেন, “অনুসন্ধান অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক—যে সম্পদই প্রয়োজন হোক, তা ব্যবহার করা উচিত। আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি স্বচ্ছ তদন্ত।” অপর ক্রু সদস্য প্রকৌশলী মুহাম্মদ আরিফ সিদ্দিকীর ছেলে আবদুর রাফায় সিদ্দিকীও প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মরদেহ উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে যাওয়ায় দুই পরিবার ইতোমধ্যে জানাজার নামাজ আদায় করেছে। দুর্ঘটনার আগে বিমানটির পাইলট নেভিগেশন ব্যবস্থায় ত্রুটির কথা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে জানিয়েছিলেন। এরপর নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে সহায়তার চেষ্টা করা হলেও মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে রাডার থেকে বিমানটির সংকেত হারিয়ে যায়। ফ্লাইটের তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত উচ্চতা হারিয়ে পরে আবার কিছুটা ওপরে উঠে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সমুদ্রে আছড়ে পড়ে। স্বজনদের দাবি, উড্ডয়নের আগে শারজাহে বিমানটির একটি ইনারশিয়াল রেফারেন্স ইউনিট (আইআরইউ) পরিবর্তন করা হয়েছিল। এই যন্ত্রটি বিমানের অবস্থান, গতি ও দিকনির্দেশনা সংক্রান্ত তথ্য ককপিটে সরবরাহ করে। তবে এই যন্ত্র পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এদিকে পাকিস্তান সরকার এক সপ্তাহ ধরে ব্ল্যাক বক্স অনুসন্ধান বা আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়ার বিষয়ে কোনো নতুন তথ্য প্রকাশ করেনি। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা সমুদ্রতল অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানও জানিয়েছে, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তাদের কাছে কোনো সহায়তার অনুরোধ আসেনি।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা নতুন করে পাকিস্তানকে কঠিন কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের মুখে ফেলেছে। ইসলামাবাদ এখন একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখার চাপের মুখে, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সম্পর্কও অক্ষুণ্ন রাখতে চাইছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে পাকিস্তান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই হামলার পর পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, সৌদি আরব যদি আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক সহায়তা চায়, তাহলে দুই দেশের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কারণে ইসলামাবাদকে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। বর্তমানে সৌদি আরবে পাকিস্তানের সেনাসদস্য ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে এবং নিরাপত্তা সহযোগিতাও অব্যাহত আছে। একই সময়ে পাকিস্তান ইরানের সঙ্গেও প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত ভাগাভাগি করে। সীমান্তবর্তী বেলুচিস্তান অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ। সংঘাত বিস্তৃত হলে সীমান্তে অনুপ্রবেশ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, অস্ত্র ও মাদক পাচার এবং নতুন করে শরণার্থী সংকটের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। এতে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। পাকিস্তানের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ অর্থনীতি। দেশটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি আমদানি করে। হরমুজ প্রণালি কিংবা লোহিত সাগরের নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। এতে পাকিস্তানের আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইরান ইতোমধ্যে হুথিদের লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হামলার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। কূটনৈতিক পর্যায়ে পাকিস্তান এখনো সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করছে। দেশটি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছে এবং উভয় পক্ষকে আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে আসছে। ইসলামাবাদ জানিয়েছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং যুদ্ধ বিস্তার রোধ করাই তাদের অগ্রাধিকার। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয় এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে পাকিস্তানের সামনে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা ইসলামাবাদকে অত্যন্ত জটিল কূটনৈতিক সমীকরণের মধ্যে ফেলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান যুদ্ধ এড়াতে চাইলেও আঞ্চলিক বাস্তবতা দেশটিকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ও ৯/১১ হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার আগে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে তার লুকিয়ে থাকার শেষ মুহূর্তের ঘটনা নিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে একাধিক পুরোনো সাক্ষ্য ও স্মৃতিচারণ। ২০১১ সালের ২ মে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী নেভি সিল টিম সিক্সের পরিচালিত ‘অপারেশন নেপচুন স্পিয়ার’-এ নিহত হওয়ার ঠিক আগে স্ত্রী আমাল আল-সাদাহকে কী বলেছিলেন, সে বর্ণনা নতুন করে প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। সানডে টাইমসকে ২০১৭ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওসামার সর্বকনিষ্ঠ স্ত্রী আমাল আল-সাদাহ জানান, গভীর রাতে হেলিকপ্টারের শব্দে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো ভবন কেঁপে ওঠে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ওসামা তার এক ছেলেকে অস্ত্র নিয়ে ওপরে আসতে বলেন এবং স্ত্রীদের নিচতলায় চলে যেতে নির্দেশ দিয়ে বলেন, “ওরা আমাকে চায়, তোমাদের নয়।” তবে আমাল দুই বছরের ছেলে হুসাইনকে নিয়ে কক্ষেই থেকে যান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা ভবনের ভেতরে প্রবেশের শব্দ শোনার পর ওসামা তার দিকে ফিরে শেষবারের মতো বলেন, “আলো জ্বালিও না।” আমালের দাবি, তিনি দরজার দিকে ছুটে গেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে পায়ে আঘাত পান। এরপরই কক্ষে প্রবেশ করে নেভি সিল সদস্যরা এবং ওসামা বিন লাদেনকে গুলি করে হত্যা করে। ওই অভিযানের মাধ্যমে প্রায় এক দশক ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আলোচিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সমাপ্তি ঘটে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অ্যাবোটাবাদের ওই বাড়িতে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন ওসামা। বাড়িটির নিরাপত্তাব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে বাইরের কেউ সহজে ভেতরে দেখতে না পারে। টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযানের সময় ওসামার পোশাকের ভেতরে কিছু অর্থ সেলাই করা ছিল এবং তার কাছে দুটি ফোনও ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেগুলোর কোনোটিই তাকে পালাতে সাহায্য করেনি। অন্যদিকে, অভিযানে অংশ নেওয়া সাবেক নেভি সিল সদস্য রবার্ট জে. ও'নিল—যিনি নিজেকে ওসামাকে লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী গুলি ছোড়া ব্যক্তি হিসেবে দাবি করেন—নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র ‘আমেরিকান ম্যানহান্ট: ওসামা বিন লাদেন’-এ সেই রাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ও'নিলের ভাষ্য অনুযায়ী, কক্ষে ঢুকে তিনি মাত্র কয়েক ফুট দূরে ওসামাকে দেখতে পান। তার দাবি, ওসামা আত্মসমর্পণের কোনো ইঙ্গিত দেননি এবং তিনি তাকে তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন। এরপর তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। তিনি আরও বলেন, অভিযানের সময় ওসামার দুই বছরের ছেলেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। শিশুটির কোনো দায় ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে অভিযানের পর ওসামার মরদেহ আরব সাগরে দাফন করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত ছিলেন না বলেও জানান। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, সম্ভাব্য কোনো সমাধিস্থলকে উগ্রপন্থীদের তীর্থস্থানে পরিণত হওয়া থেকে ঠেকাতেই সমুদ্রে দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০১১ সালের এই অভিযানের মাধ্যমে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার পর শুরু হওয়া দীর্ঘ অনুসন্ধানের অবসান ঘটে। ওই হামলায় প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন এবং এর জবাব হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান জোরদার করে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব নিহতদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়ে এই দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের প্রতি পূর্ণ সংহতি ও সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক শোকবার্তায় বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানির সংবাদ তাকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। পাকিস্তানের জনগণের পক্ষ থেকে তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। তিনি বলেন, এই কঠিন সময়ে পাকিস্তান বাংলাদেশের জনগণের পাশে রয়েছে এবং তাদের প্রতি অবিচল সংহতি প্রকাশ করছে। পৃথক এক বার্তায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারিও প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সহমর্মিতা জানান। একই সঙ্গে তিনি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দ্রুত পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের প্রচেষ্টার সফলতা কামনা করেন। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারও বাংলাদেশের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগের খবর অত্যন্ত বেদনাদায়ক। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনী, জরুরি সেবা সংস্থা, চিকিৎসাকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকদের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তা, দ্রুত পুনরুদ্ধার এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাফল্য কামনা করেন। সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ, আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ধসের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন এবং দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশে সংঘটিত এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাও শোক ও সংহতি প্রকাশ করছে। পাকিস্তানের এই বার্তা দুই দেশের জনগণের প্রতি মানবিক সহমর্মিতা এবং দুর্যোগের সময় পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্বকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
পাকিস্তানের করাচির কুলসুম বাই ভ্যালিকা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া আরও দুই শিশুর শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। এর ফলে হাসপাতালটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এইচআইভি আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ জনে। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ জানিয়েছে, নতুন শনাক্ত হওয়া দুই শিশুর একজন করাচির মেট্রোভিল এলাকার মাত্র তিন বছর বয়সী একটি শিশু। তার বাবা জানান, বুকের সংক্রমণের চিকিৎসার জন্য তাকে সিন্ধ এমপ্লয়িজ' সোশ্যাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশন (SESSI) পরিচালিত ভ্যালিকা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তার শরীরে এইচআইভি সংক্রমণ ধরা পড়ে। শিশুটির বাবা অভিযোগ করেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরও তার মেয়ের শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হয়ে আরও অবনতি হতে থাকে। চিকিৎসকদের পরামর্শে অতিরিক্ত পরীক্ষা করানোর পর এইচআইভি শনাক্ত হয়। এর আগে সিন্ধ প্রদেশের শ্রমমন্ত্রী সাঈদ ঘানি জানিয়েছিলেন, ভ্যালিকা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া অন্তত ৭৮ শিশুর শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। সর্বশেষ আরও দুই শিশুর সংক্রমণ ধরা পড়ায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮০ জনে পৌঁছেছে। ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে উল্লেখ করে সাঈদ ঘানি বলেন, কীভাবে এতসংখ্যক শিশু সংক্রমিত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। এদিকে চলতি মাসের শুরুতে সিন্ধ হাইকোর্ট প্রাদেশিক সরকারকে দুই সপ্তাহের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের ঘটনায় ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দিয়েছে। একটি রিট আবেদনের শুনানিতে আদালত এ নির্দেশ দেন। ওই আবেদনে অভিযোগ করা হয়, হাসপাতালের অবহেলার কারণে প্রায় ২০০ শিশু এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছে। আবেদনকারী পক্ষের দাবি, ২০২৫ সালে হাসপাতালটিতে দূষিত সিরিঞ্জ পুনর্ব্যবহারের কারণে এইচআইভি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে এ অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করতে সিন্ধ এমপ্লয়িজ' সোশ্যাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশন (SESSI) ২০০ কোটি পাকিস্তানি রুপি ব্যয়ে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই তহবিল থেকে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা, ওষুধ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এইচআইভি সংক্রমণের উৎস নিশ্চিত করতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধে জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের ওপরও জোর দিয়েছেন তারা।
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভয়াবহ সশস্ত্র হামলায় চার দিনে দেশটির পুলিশ, সেনাসদস্য ও বেসামরিক নাগরিকসহ অন্তত ৪২ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর জোরালো অভিযানে অন্তত ৫৪ জন সন্ত্রাসী প্রাণ হারিয়েছে। বুধবার দেশটির সামরিক বাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বেলুচিস্তানে বড় ধরনের তিনটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে আইএসপিআর মহাপরিচালক জানান, নিহত ৫৪ জন সন্ত্রাসী ভারতের মদতপুষ্ট ছিল। অন্যদিকে মাতৃভূমি রক্ষা করতে গিয়ে সামরিক-বেসামরিক নাগরিকসহ ৪২ জনকে প্রাণ দিতে হয়েছে। তিনি জানান, প্রথম হামলার ঘটনাটি ঘটে গত ৪ ও ৫ জুলাইয়ের মধ্যবর্তী রাতে হান্না উরাক এলাকায়। সেখানে ‘ফিতনা আল-খাওয়ারিজ’ নামের একটি প্রক্সি গোষ্ঠীর সন্ত্রাসীরা স্থানীয় জনগণের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে ওই সন্ত্রাসীদের পালিয়ে যেতে বাধ্য করেন। এই হামলায় চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরও ছয়জন আহত হন। দ্বিতীয় হামলার ঘটনাটি ঘটে গত ৬ জুলাই মাঙ্গি বাঁধের কাছে একটি পুলিশি তল্লাশি চৌকিতে। আইএসপিআরের তথ্যমতে, সন্ত্রাসীরা ওই চৌকিতে হামলা চালালে পুলিশ সদস্যরা সাহসিকতার সঙ্গে তা মোকাবিলা করেন এবং প্রাথমিক লড়াইয়েই ১৫ জন সন্ত্রাসীকে হত্যা করেন। তবে এই লড়াইয়ে পুলিশের ৯ সদস্যও নিহত হন। নিরাপত্তা বাহিনীর বাড়তি সদস্য ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই সন্ত্রাসীরা বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে জিম্মি করে ফেলে এবং নিজেদের ১৫ সন্ত্রাসীর মরদেহ ফেলে রেখে যায়। জিম্মি হওয়া সব পুলিশ সদস্যই বেলুচিস্তানের স্থানীয় বাসিন্দা ছিলেন বলে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। জিম্মি ঘটনার পর ৬ জুলাই থেকেই জিয়ারতের পাহাড়ি অঞ্চলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান শুরু করে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী। অভিযানের তীব্রতা টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা জিম্মি থাকা ১৮ জন পুলিশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আইএসপিআর জানায়, ওই অভিযানে আরও ১১ জন সন্ত্রাসীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে, তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে মাঙ্গি তল্লাশি চৌকিতে হামলায় ২৭ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন এবং ২৬ জন সন্ত্রাসীকে হত্যা করা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাকিস্তানের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে আইএসপিআর মহাপরিচালক স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যারা নাগরিক ও সন্তানদের ওপর হামলা করে তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করা হবে না। যেকোনো মূল্যে এই লড়াইয়ে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিজয় অর্জন করবে বলেও তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে পাকিস্তানের করাচির উদ্দেশ্যে উড্ডয়নের পর একটি বোয়িং ৭৩৭ কার্গো উড়োজাহাজের সঙ্গে হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। উড়োজাহাজটিতে পাঁচজন ক্রু সদস্য ছিলেন। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আরব সাগরে বিমানটির সন্ধানে নৌ ও আকাশপথে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। তবে সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত উড়োজাহাজটির অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পাকিস্তান বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ (পিএএ) জানায়, করাচিভিত্তিক বেসরকারি কার্গো এয়ারলাইন কেটু এয়ারওয়েজ পরিচালিত বোয়িং ৭৩৭-৪০০ উড়োজাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে করাচির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। মঙ্গলবার রাত ৯টা ১৮ মিনিটের দিকে পাইলট বিমানটির নেভিগেশন ব্যবস্থায় ত্রুটির কথা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে জানান। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা জানানোর মাত্র তিন মিনিট পর রাডারে দেখা যায়, উড়োজাহাজটি দ্রুত উচ্চতা হারাচ্ছে এবং হঠাৎ দিক পরিবর্তন করছে। এরপরই রাডার ও বেতার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সে সময় বিমানটি করাচি থেকে প্রায় ১৫৫ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২৮৭ কিলোমিটার) পশ্চিমে অবস্থান করছিল। ঘটনার পরপরই পাকিস্তান বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্র সক্রিয় করে। পাকিস্তান নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ, বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজ, নৌবাহিনীর টহল বিমান এবং জাতীয় শিপিং করপোরেশনের জাহাজসহ একাধিক সংস্থা আরব সাগরে যৌথ অনুসন্ধান অভিযান শুরু করেছে। বিশ্বব্যাপী ফ্লাইট পর্যবেক্ষণ সেবা ফ্লাইটরাডার২৪-এর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে উড়োজাহাজটি প্রথমে দ্রুত উচ্চতা হারায়, এরপর কিছুটা ওপরে ওঠে এবং তারপর আবার আকস্মিকভাবে নিচে নামতে শুরু করে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এসব তথ্য সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ইঙ্গিত দিতে পারে, তবে অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। কেটু এয়ারওয়েজ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা পাকিস্তান বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ পাঁচ ক্রু সদস্যের নিরাপদ উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে নির্মিত এই বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজটি প্রথমে যাত্রীবাহী বিমান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরে ২০১২ সালে এটিকে কার্গো পরিবহনের উপযোগী করে রূপান্তর করা হয়। ২০২৪ সালে এটি কেটু এয়ারওয়েজের বহরে যুক্ত হয় এবং বর্তমানে এটিই এয়ারলাইনটির একমাত্র উড়োজাহাজ। বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিলেও একটি উড়োজাহাজ কিছু সময় ভেসে চলতে পারে। কিন্তু এই উড়োজাহাজের হঠাৎ দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ার কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। বিষয়টি জানতে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উড়োজাহাজটির অবস্থান এবং পাঁচ আরোহীর ভাগ্য সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানে একটি দূরবর্তী পুলিশ চৌকিতে সশস্ত্র হামলায় অন্তত নয়জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। সোমবার (৬ জুলাই) গভীর রাতে জিয়ারত জেলার একটি দুর্গম এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে প্রাদেশিক পুলিশ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একদল উগ্রপন্থী বন্দুকধারী অতর্কিতে চৌকিটিতে হামলা চালায়। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের তীব্র বন্দুকযুদ্ধ হয়, যাতে ঘটনাস্থলেই কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিহত হন এবং আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হন। হামলার শুরুতে হামলাকারীরা চৌকি থেকে আটজন পুলিশ সদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তবে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তাদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। বেলুচিস্তান সরকারের মুখপাত্র শাহিদ রিন্দ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, অপহৃতদের উদ্ধারের পরপরই পুরো এলাকায় যৌথভাবে তল্লাশি ও সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা গুলিতে অন্তত ১৫ জন হামলাকারী নিহত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। শাহিদ রিন্দ আরও বলেন, বেলুচিস্তানে উগ্রপন্থী তৎপরতা দমনে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান অব্যাহত থাকবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর এ ধরনের হামলার কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। মঙ্গলবার পর্যন্ত এই হামলার দায় কোনো গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। তবে প্রশাসনের সন্দেহ, দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় নিষিদ্ধ সংগঠন বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এই হামলার পেছনে থাকতে পারে। উল্লেখ্য, এর আগেও বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহে উপকূলীয় শহর জিওয়ানির একটি নিরাপত্তা চৌকিতে আত্মঘাতী বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছিল বিএলএ। যদিও সে দাবি সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। এপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্পদসমৃদ্ধ হলেও দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কারণে বেলুচিস্তান প্রদেশটি অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক এই হামলা সেই সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মধ্যস্থতার পর এবার উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন মেটাতে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের উদ্যোগে দেশটির পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাকেন্দ্রের মধ্যে নীরবে আলোচনা চালানো হচ্ছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিবিয়ায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এই উদ্যোগ সফল হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০১১ সালে ন্যাটো সমর্থিত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকেই দেশটি কার্যত পূর্ব ও পশ্চিম—এই দুই অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে চলা এই অচলাবস্থা নিরসনে বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক মহল উদ্যোগ নিলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন এবং লিবিয়া নিয়ে ইসলামাবাদের মধ্যস্থতার বিষয়েও অবগত আছেন। একই সঙ্গে সৌদি আরবও এই শান্তি প্রচেষ্টায় সমর্থন দিচ্ছে। জানা গেছে, গত বছরের শেষদিকে লিবিয়ার দুই পক্ষই পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা চাওয়ার পর এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। প্রস্তাবিত একটি খসড়া পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, “গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল কনসেনসাস অ্যান্ড প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল” কাঠামোর অধীনে ৩৬ মাসের একটি অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থা গড়ে তোলা হতে পারে। এতে জাতিসংঘ স্বীকৃত পশ্চিমাঞ্চলীয় সরকারের প্রধান আবদুলহামিদ দ্বিবাহ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলীয় লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির ডেপুটি কমান্ডার সাদ্দাম হাফতারকে প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান করার প্রস্তাব রয়েছে। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র ও অবকাঠামোর বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে থাকায় সাদ্দাম হাফতারের পিতা এবং লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির প্রধান খলিফা হাফতারকে বাজেট ব্যবস্থাপনায় বিশেষ কর্তৃত্ব দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি কার্যকর রাখতে পাকিস্তান সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে বলেও পরিকল্পনায় উল্লেখ আছে। তবে পাকিস্তানি একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রস্তাবটি এখনো প্রাথমিক আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও সময় লাগতে পারে। গত মাসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির রাওয়ালপিন্ডিতে সাদ্দাম হাফতারের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর কয়েকদিন পর হাফতার ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, লিবিয়ার নেতাদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে ওয়াশিংটন স্বাগত জানায় এবং দেশটির একতা রক্ষায় সমর্থন অব্যাহত রাখবে। বিশ্লেষকদের মতে, লিবিয়ার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, মিশর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় শক্তিগুলোর প্রভাব বেশি হলেও পাকিস্তান একটি তুলনামূলক নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটির সঙ্গে লিবিয়ার উভয় পক্ষেরই যোগাযোগ ও সম্পর্ক থাকায় মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে এটি একটি সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করেছে। জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় বাহিনীর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং তাদের কাছে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ও সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান সরবরাহ করেছে। একই সময়ে পশ্চিমাঞ্চলীয় সরকারও পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা গেছে। পাকিস্তানের নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় সরকারের প্রধান সমর্থক তুরস্ক ও কাতারও এই মধ্যস্থতায় পাকিস্তানকে উৎসাহ দিচ্ছে। তবে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ইনফরমমির পরিচালক তারেক মেগেরিসি সতর্ক করে বলেছেন, কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেই তা দীর্ঘস্থায়ী হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তিনি উদাহরণ হিসেবে রুয়ান্ডা ও কঙ্গোর মধ্যে গত বছরের একটি চুক্তির কথা উল্লেখ করেন, যা অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে যায়। এদিকে এখনো পর্যন্ত পাকিস্তান, লিবিয়ার কোনো পক্ষ বা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অংশীদার দেশগুলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সূত্র: এনডিটিভি
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত উত্তেজনা নতুন করে সহিংস রূপ নিয়েছে। আফগানিস্তানের খাইবার সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় তালেবান সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও পাকিস্তানি সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় পাকিস্তানের তিন সীমান্তরক্ষী আহত হয়েছেন। আহতদের একজনের অবস্থা গুরুতর বলে নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে। আফগানিস্তানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম Afghanistan International-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রোববার এই সংঘর্ষের সময় উভয় পক্ষই হালকা ও ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে। কিছু সময় গোলাগুলি চলার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। আহত পাকিস্তানি সদস্যদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, খাইবার জেলার তাবাই (Tabai) সীমান্ত এলাকায় কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই তালেবান সীমান্তরক্ষীরা পাকিস্তানি সীমান্তচৌকিতে গুলি চালায়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে তালেবান প্রশাসন এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। এই সংঘর্ষ এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দুই পক্ষের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। গত ২৯ জুন পাকিস্তান আফগানিস্তানের পাকতিয়া, পাকতিকা ও কুনার প্রদেশে বিমান হামলা চালায়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় অন্তত ২৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। অন্যদিকে তালেবান প্রশাসন নিহতের সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি করে এবং হামলাকে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের ওপর আগ্রাসন হিসেবে অভিহিত করে। এরপর সীমান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তালেবান পাকিস্তানের দিকে একাধিক ড্রোন পাঠানোর দাবি করে, যদিও এসব ড্রোন হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ ও অবিশ্বাসের কারণে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক নতুন করে সংকটের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। উল্লেখ্য, সীমান্তে গোলাগুলি, বিমান হামলা ও পাল্টা সামরিক তৎপরতার ঘটনাগুলো নিয়ে উভয় দেশের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী দাবি করা হয়েছে। আহত তিন পাকিস্তানি সীমান্তরক্ষীর তথ্য পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্র এবং Afghanistan International-এর প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আবারও আলোচনায় বসতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। চলতি সপ্তাহেই দুই দেশের মধ্যে নতুন দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এবার এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আয়োজন করা হচ্ছে পাকিস্তানে। সৌদি আরবভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়ার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আগামী ১১ জুলাই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। এতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, আসন্ন বৈঠকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, জব্দকৃত সম্পদ এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত এই বিষয়গুলোই দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত। এদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও এই আলোচনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই ইরানি প্রতিনিধিদল চূড়ান্ত করা হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে গত ১৮ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে, যেখানে লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তারও আগে, ২১ জুন পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। এসব ধারাবাহিক বৈঠককে ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে আশাবাদের সুর তৈরি হয়েছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সম্প্রতি জানিয়েছেন, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এতে সমঝোতা স্মারক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, উভয় পক্ষ আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে এবং খুব শিগগিরই পরবর্তী বৈঠকের নির্দিষ্ট তারিখ চূড়ান্ত করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান এই কূটনৈতিক তৎপরতা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কিছুটা হলেও কমতে পারে। বিশেষ করে পারমাণবিক ইস্যু ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে অগ্রগতি হলে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ধাপে হওয়া আলোচনাগুলোই দুই দেশের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হয়েছে এবং নতুন এই বৈঠক সেই প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।
জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও চরম অমানবিক ঘটনার জন্ম দিয়েছেন আয়ারল্যান্ড প্রবাসী ভারতীয় লেখিকা নিবেদিতা শুক্লা। প্রবাসে ভারতীয়দের বৈষম্যের শিকার হওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্ষেপ করে একটি লম্বা পোস্ট লিখতে গিয়ে তিনি নিজেই এক পাকিস্তানি নাগরিকের প্রতি যে বর্ণবাদী আচরণ করেছেন, তা এখন নেটদুনিয়ায় তীব্র সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নিজের অমানবিক আচরণের বয়ান নিজেই দিয়ে নেটিজেনদের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন ‘দ্য মোমেন্টোস অব রুনঝ’ বইয়ের এই লেখিকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিজের ১০ ঘণ্টার ট্রানজিটের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে নিবেদিতা জানান, বিমানবন্দরে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও ক্ষুধার্ত মনে হওয়া এক ব্যক্তিকে দেখে সহানুভূতিশীল হয়ে তিনি নিজের সঙ্গে থাকা খাবার নিয়ে ওই ব্যক্তির দিকে এগিয়ে যান। হিন্দিতে কথোপকথনের একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি জানান যে তিনি ডাবলিন থেকে এসেছেন এবং তার গন্তব্য পাকিস্তানের করাচি। লেখিকার দাবি, গন্তব্য ‘পাকিস্তান’ শোনার পরই তিনি ওই ব্যক্তিকে খাবার না দিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিজের আসনে ফিরে আসেন। এখানেই শেষ নয়, চরম অমানবিকতার পরিচয় দিয়ে তিনি নিজের পোস্টে ‘যা মর’ (যাও, গিয়ে মরো) শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে পোস্টটির ইতি টানেন। নিবেদিতা শুক্লার এই পোস্ট প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ইন্টারনেটে সমালোচনার ঝড় ওঠে। আশ্চর্যজনকভাবে, প্রবাসে নিজের পাসপোর্ট বা নাগরিকত্বের কারণে বৈষম্যের আক্ষেপ করা এই লেখিকা খোদ ভারতীয় নেটিজেনদেরই তোপের মুখে পড়েন। এক ভারতীয় ব্যবহারকারী কড়া সমালোচনা করে লেখেন যে, তিন প্যারাগ্রাফ ধরে পাসপোর্টের কারণে বৈষম্যের আক্ষেপ করে পরের মুহূর্তেই একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে তার পাসপোর্ট দিয়ে বিচার করেছেন লেখিকা; যা বৈষম্যের এক নিকৃষ্ট উদাহরণ। অনেকেই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণকে দায়ী করে মন্তব্য করেছেন যে, এ ধরনের ঘৃণ্য মানসিকতার কারণেই বিশ্বজুড়ে ভারতীয়দের অবহেলা ও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কেউ কেউ বিষয়টিকে মনস্তাত্ত্বিক ‘প্রোজেকশন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, লেখিকার অভিযোগগুলো মূলত তার নিজের চরিত্রের অন্ধকার দিকেরই স্বীকারোক্তি। অন্যদিকে, পাকিস্তানি নেটিজেনরাও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন, কোনো পাকিস্তানির তরফ থেকে এমন আচরণ তারা কখনো দেখেননি বা শোনেননি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এমন সংকীর্ণ মানসিকতা পরিহার করার পরামর্শ দিয়ে অনেকেই বলেছেন, পাসপোর্ট বা নাগরিকত্বের ঊর্ধ্বে উঠে বিমানবন্দরে সবাই সমমানের যাত্রী এবং মানবিকতাই হওয়া উচিত প্রথম পরিচয়। তবে নিজের দেশের মানুষই এমন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নেটিজেনদের একাংশ। সব মিলিয়ে নিবেদিতার এই পোস্টটি বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতা, বৈষম্য ও মানবিকতা নিয়ে এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়া মানুষের স্বপ্ন থাকে একটি নিরাপদ জীবনের। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবে সব সময় পূরণ হয় না। এমনই এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থী এক পাকিস্তানি পরিবার। মুহাম্মদ নাদিম, তার স্ত্রী শামাইলা এবং তাদের চার সন্তান দুই বছর আগে পাকিস্তান ছেড়ে যুক্তরাজ্যে যান। প্রথমে তারা গ্রেটার ম্যানচেস্টারের স্টকপোর্টে বসবাস শুরু করেন। সেখানে নাদিম কর্মভিসার আওতায় উবার চালক হিসেবে কাজ করতেন। পরে তার ভিসার মেয়াদ শেষ হলে পরিবারটি আশ্রয়ের আবেদন করে। আবেদন প্রক্রিয়া চলাকালে তাদের আগের বাসা ছেড়ে একটি হোটেলে থাকতে হয়। সম্প্রতি কর্তৃপক্ষ তাদের প্রায় ৬০ মাইল দূরের শ্রপশায়ারের স্টোক হিথ গ্রামের একটি নতুন নির্মিত চার শয়নকক্ষের বাড়িতে স্থানান্তর করে। বাড়িটি এমন একটি আবাসন প্রকল্পের অংশ, যেখানে একাধিক আশ্রয়প্রার্থী পরিবারকে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু নতুন বাড়িতে ওঠার পরও স্বস্তি মেলেনি নাদিমের পরিবারের। তাদের অভিযোগ, এলাকায় যাওয়ার পর থেকেই তারা নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন। কিছু ব্যক্তি তাদের প্রতি শত্রুতাপূর্ণ আচরণ করেছে বলেও দাবি করেছেন তারা। এ কারণে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগে রয়েছেন এই দম্পতি। নাদিম জানান, পরিবারের সদস্যরা এখনো নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি। সন্তানরা বাইরে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে না। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি অনেক সময় রাতেও সতর্ক থাকেন। তার ইচ্ছা, পরিবারটিকে আবার স্টকপোর্ট এলাকায় ফিরিয়ে নেওয়া হোক, যেখানে তাদের পরিচিত পরিবেশ এবং কিছুটা সামাজিক যোগাযোগ ছিল। পরিবারটির আরেকটি অভিযোগ, নতুন এলাকায় দোকান, স্বাস্থ্যসেবা ও যাতায়াতের সুযোগ সীমিত হওয়ায় দৈনন্দিন জীবনও কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকেও তারা এখন অনেক দূরে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে, স্টোক হিথের কিছু স্থানীয় বাসিন্দাও নতুন এই আবাসন পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন। তাদের দাবি, সামাজিক আবাসনের জন্য নির্মিত বাড়িগুলো আশ্রয়প্রার্থীদের দেওয়ায় স্থানীয় অবকাঠামো ও সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় বিতর্কও তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকার বর্তমানে ব্যয়বহুল হোটেলে আশ্রয়প্রার্থীদের রাখার পরিবর্তে ধাপে ধাপে বিভিন্ন আবাসিক ভবন ও অন্যান্য স্থাপনায় স্থানান্তরের নীতি বাস্তবায়ন করছে। তবে এই নীতির বাস্তবায়নকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়দের উদ্বেগ এবং আশ্রয়প্রার্থীদের মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ—দুই বিষয়ই সামনে আসছে। নাদিমের পরিবারের গল্প সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। নিরাপদ জীবনের আশায় হাজার মাইল দূরের দেশে এলেও, তাদের ভাষায়, এখনো তারা সেই কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও নিশ্চিন্ত জীবন খুঁজে পাননি।
পাকিস্তানের লাহোরে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ১৪ জন শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার শহরের কাহনা এলাকায় একটি কোচিং সেন্টারের ছাদ ধসে এই ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও বেশ কয়েকজন শিশু, যাদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পাঞ্জাবের স্বাস্থ্যমন্ত্রী খাজা ইমরান নাজির দুর্ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, ছাদ ধসের পরপরই ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৯ জন শিশুকে উদ্ধার করে দ্রুত কাহনা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের মধ্যে ১৪ জন শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে এবং বাকি পাঁচজন বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, ধসের সময় ওই কোচিং সেন্টারের ভেতরে ৩০ জনেরও বেশি শিশু উপস্থিত ছিল। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় ভবনটির ওপরের তলায় নির্মাণকাজ চলছিল এবং ঠিক সেই সময়েই নিচতলায় শিশুদের ক্লাস চলছিল। ধারণা করা হচ্ছে, নির্মাণকাজের ত্রুটি বা অতিরিক্ত চাপের কারণেই এই ধসের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। পুলিশ ইতোমধ্যেই এই ঘটনার আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ভবনের মালিকসহ দুজনকে হেফাজতে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সিন্ধু নদ পানিবণ্টন চুক্তিকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ভারতের পানি ব্যবহারের পরিকল্পনার জবাবে পাকিস্তানের এক মন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তাদের প্রাপ্য পানির ওপর কেউ হাত বাড়ালে সেই হাত কেটে দেওয়া হবে। ভারতের কেন্দ্রীয় জলসম্পদমন্ত্রী সি আর পাতিল সম্প্রতি জানিয়েছেন, আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে ভারতের অংশের সব পানি দেশটির ভেতরেই পুরোপুরি ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পরই ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মুসাদিক মালিক অভিযোগ করেন, ভারত পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত পানিপ্রবাহ বন্ধ করতে চায়। তিনি বলেন, পাকিস্তানের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের জীবিকা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই অন্য কোনো দেশ তাদের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে—এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। মুসাদিক মালিক বলেন, “আমাদের পানির অধিকার খর্ব করার চেষ্টা হলে তার মূল্য দিতে হবে। কেউ আমাদের পানির ওপর হাত বাড়ালে সেই হাত কেটে দেওয়া হবে।” তিনি আরও দাবি করেন, আন্তর্জাতিক প্রথা অনুযায়ী উজানের কোনো দেশ ভাটির দেশের পানিপ্রবাহ একতরফাভাবে বন্ধ করতে পারে না। ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত সিন্ধু নদ পানিবণ্টন চুক্তির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের কথাও জানান পাকিস্তানের এই মন্ত্রী। একই সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেন, সিন্ধু নদ পানিবণ্টন চুক্তি আইনগতভাবে এখনো বহাল রয়েছে এবং কোনো দেশ একতরফাভাবে এটি বাতিল বা সংশোধন করতে পারে না। তিনি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সিন্ধু নদ পাকিস্তানের জন্য জীবনরেখা এবং এ বিষয়ে তাদের অবস্থান ‘রেড লাইন’। অন্যদিকে ভারতের অবস্থানও কঠোর। গত বছর জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে হামলায় ২৫ জন পর্যটকসহ ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর নয়াদিল্লি সিন্ধু নদ পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। ভারতের দাবি, পাকিস্তান তার ভূখণ্ডে সন্ত্রাসী অবকাঠামোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দৃশ্যমান প্রমাণ না দেওয়া পর্যন্ত এই চুক্তি পুনরায় কার্যকর করা হবে না। সূত্র: এনডিটিভি
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।