বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ঢাকার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় উদযাপিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস। শনিবার (৪ জুলাই) ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের উদ্যোগে এক বিশেষ সংগীতানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা, রাজনীতিক, কূটনীতিক এবং সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা। পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল উভয় দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রতিফলন। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিকগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মার্কিন স্থপতি লুই কানের নকশায় নির্মিত জাতীয় সংসদ ভবন যেমন বাংলাদেশের গর্ব, তেমনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রকৌশলী ফজলুর রহমান খান যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক স্থাপত্যে অনন্য অবদান রেখে দুই দেশের সম্পর্ককে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্কিন শিল্পী জর্জ হ্যারিসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মানবিক সহমর্মিতা ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের যে চেতনা তখন তৈরি হয়েছিল, বর্তমান আয়োজনও তারই ধারাবাহিকতা। ভবিষ্যতে বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সন্ত্রাসবাদ দমন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত তাঁর বক্তব্যে ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাইয়ের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা স্মরণ করে বলেন, আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা ‘সব মানুষ সমান’—এই নীতিকে সামনে রেখে রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন। ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসে দাঁড়িয়ে সেই আদর্শকে ধারণ করেই বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব জোরদারে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে টেকসই নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক শান্তি নিশ্চিত করাকে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সহায়তার প্রশংসা করে তিনি বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে। অন্যদিকে, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি বলেন, জাতীয় সংসদ ভবনের মতো একটি প্রতীকী স্থাপনার সামনে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন দুই দেশের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব এবং গণতান্ত্রিক চেতনার একটি উজ্জ্বল নিদর্শন। এ ধরনের আয়োজন ভবিষ্যতে উভয় দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। জমকালো এই অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিভিন্ন সংসদীয় ককাসের প্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতে তেহরানের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। েবৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকাল সাড়ে ৭টায় তিনি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তেহরানের উদ্দেশে রওনা হন। স্পিকারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জানাজা ও সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিকতায় অংশগ্রহণ শেষে আগামী ৪ জুলাই তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর তিনি দেশটির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮০ সালে স্বল্প সময়ের জন্য তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরুর পর তিনি ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে দুই দফায় ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সালে ইরানের বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ (Assembly of Experts) তাকে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জাতীয় সংসদে বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার পর ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহকে লক্ষ্য করে বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন পাঁচটি সংবাদমাধ্যমে মাত্র ৮০ ঘণ্টায় ৯৯টি কনটেন্ট প্রকাশের দাবি উঠেছে। অনুসন্ধানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ জুন সকাল ৭টা থেকে ১ জুলাই দুপুর ৩টা পর্যন্ত বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, নিউজ২৪, ডেইলি সান এবং বাংলানিউজ২৪ ডটকমে হাসনাত আব্দুল্লাহকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিকভাবে ৯৯টি নেতিবাচক কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে অনেক প্রতিবেদনই একই তথ্য, বক্তব্য বা অভিযোগকে ভিন্ন শিরোনাম ও ফরম্যাটে একাধিক মাধ্যমে পুনঃপ্রচার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সংসদে কী বলেছিলেন হাসনাত? গত ২৫ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, দুদকের মামলার অগ্রগতি, সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতা এবং সংবাদমাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে সমালোচকদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই তাদের মালিকানাধীন গণমাধ্যমে ওই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে প্রচারণা শুরু হয়। ৫ সংবাদমাধ্যমে ৯৯ কনটেন্ট দ্য ডিসেন্ট জানায়, নির্ধারিত চার দিনে প্রকাশিত ৯৯টি কনটেন্টের মধ্যে— কালের কণ্ঠ: ৭৬টি, ডেইলি সান: ৯টি, বাংলাদেশ প্রতিদিন: ৫টি, বাংলানিউজ২৪: ৫টি নিউজ২৪: ৪টি। কালের কণ্ঠেই সবচেয়ে বেশি কনটেন্ট প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ৩৫টি ভিডিও, ৩০টি ফটোকার্ড এবং ১১টি সংবাদ প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, একই বিষয়বস্তুকে ভিডিও, সংবাদ, ফটোকার্ড এবং ইংরেজি অনুবাদসহ বিভিন্ন ফরম্যাটে প্রকাশ করে কনটেন্টের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ৯টি মূল বিষয়, বারবার পুনঃপ্রচার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রকাশিত ৯৯টি কনটেন্ট মূলত মাত্র ৯টি প্রধান অভিযোগ বা বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি। এর মধ্যে ছিল— "হাসনাত আবদুল্লাহ: সাদা সাদা, কালা কালা", "মব বিতর্কে হাসনাত" "হাসনাতের দাপটে আক্রান্ত এক দিনমজুর পরিবার", মো. তারেক রহমানের বক্তব্য রাশেদ খানের বক্তব্য, এম এ আউয়াল খানের বক্তব্য, সাংবাদিকদের কণ্ঠ রুদ্ধ করার অভিযোগ, ই-টেন্ডার নিয়ে অভিযোগ, অন্যান্য দুর্নীতির অভিযোগ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই বক্তব্যকে বিভিন্ন শিরোনাম, ভিডিও ও ফটোকার্ডে রূপান্তর করে একাধিক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কালের কণ্ঠ ছিল 'প্রাথমিক উৎস'—দাবি। দ্য ডিসেন্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অধিকাংশ কনটেন্ট প্রথমে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়। পরে একই বিষয়বস্তু ডেইলি সান, বাংলাদেশ প্রতিদিন, বাংলানিউজ২৪ এবং নিউজ২৪-এ প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটির ভাষ্য, কালের কণ্ঠ কার্যত পুরো প্রচারণার মূল উৎস বা 'ফিডার' হিসেবে কাজ করেছে। তিন রাজনীতিকের বক্তব্যেই ৩৩ কনটেন্ট বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মো. তারেক রহমান, রাশেদ খান এবং বিএনপি নেতা এম এ আউয়াল খানের বক্তব্য ব্যবহার করে মোট ৩৩টি কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে— মো. তারেক রহমানের বক্তব্য নিয়ে ১৮টি, এম এ আউয়াল খানের বক্তব্য নিয়ে ৯টি, রাশেদ খানের বক্তব্য নিয়ে ৬টি কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়। অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ নিয়ে ও রয়েছে প্রশ্ন দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রকাশিত বহু প্রতিবেদনে বিভিন্ন অভিযোগ উপস্থাপন করা হলেও সেগুলোর সমর্থনে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উন্নয়ন প্রকল্প, ত্রাণের অর্থ, মসজিদ নির্মাণ, মব কালচার এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম সংক্রান্ত অভিযোগ বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন বা পূর্বপ্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে কিছু দাবির অসঙ্গতি রয়েছে। গণমাধ্যম গবেষক অধ্যাপক আ-আল মামুন বলেন, অল্প সময়ে একজন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে এত বিপুল সংখ্যক কনটেন্ট প্রকাশ করা হলে সেটিকে 'শিকারি সাংবাদিকতা' (Predatory Journalism) হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তার ভাষায়, এ ধরনের সাংবাদিকতায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে ধারাবাহিক কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা হয়, যা সাংবাদিকতার প্রচলিত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি এ ধরনের কার্যক্রমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান। দ্য ডিসেন্টের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বসুন্ধরা গ্রুপ বা সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সংবাদমাধ্যমের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি। এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের অবস্থান জানা যায়নি।
কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক ও করদাতাবান্ধব করতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেটের কয়েকটি বিষয়ে ভ্যাট কমানোর পাশাপাশি আয়কর অব্যাহতির সীমা আরও বাড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ভ্যাট কমানোর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নরমালি দাবিটা বিরোধী দল থেকে হয়ে থাকে। আমি আপাতত ফিজিক্যালি না হলেও মানসিকভাবে ওনাদের পাশে গিয়ে কথা বলতে চাই।’ তিনি জানান, প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তিগত আয়কর অব্যাহতির সীমা ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ কর বছরের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত করদাতাদের আরও স্বস্তি দিতে তিনি অর্থমন্ত্রীর কাছে এই সীমা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ কর বছরের জন্য আয়কর অব্যাহতির সীমা ৪ লাখ টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ কর বছরের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ কর বছরের জন্য ৫ লাখ টাকা করা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তিগত করদাতাদের করের চাপ কিছুটা কমিয়ে স্বস্তি দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য। প্রস্তাবিত বাজেটে স্বপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শন-সংক্রান্ত বিধান নিয়েও জনমনে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, দেশে অনেকেই জমি নিবন্ধনের সময় প্রকৃত মূল্যের পরিবর্তে মৌজা মূল্য দেখান। ফলে পরবর্তী সময়ে প্রকৃত ক্রয়মূল্য প্রমাণ করতে গিয়ে করদাতাদের নানা জটিলতায় পড়তে হয়। তিনি বলেন, করদাতাদের এই হয়রানি কমানোর উদ্দেশ্যেই বিধানটি প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে কেউ কেউ এটিকে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবিত ওই বিধান প্রত্যাহারের জন্য অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সাম্প্রতিক চুক্তি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেশকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। বুধবার (১৭ জুন) জাতীয় সংসদে গাজীপুর–৫ আসনের সংসদ সদস্য একেএম ফজলুল হক মিলনের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। স্পিকার (মেজর অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্বটি টেবিলে উপস্থাপন করা হয়। সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি 'অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড' (এআরটি) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক চুক্তির আওতায় মার্কিন তুলা ব্যবহার করে বাংলাদেশে উৎপাদিত তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে মার্কিন বাজারে শূন্য শুল্ক সুবিধা (জিরো ট্যারিফ) নিশ্চিত হয়েছে। এই চুক্তিটি বাংলাদেশে বড় ধরনের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় (গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন) বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করতে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থানমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।" তিনি আরও জানান, দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে আরও ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করতে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়াতে সরকার অর্থনৈতিক কূটনীতিকে (ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি) বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বাজার সম্প্রসারণের কৌশল নিয়ে খলিলুর রহমান বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকার মতো প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে এখন মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের উদীয়মান বাজারগুলোতে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক উপস্থিতি জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রেফারেনসিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (পিটিএ), ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এফটিএ) এবং কম্প্রেহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) সম্পাদনের আলোচনা ও প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সিইপিএ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের কার্যক্রমও অনেকদূর এগিয়েছে। একই সাথে জিসিসি ও মারকুসুরসহ (MERCOSUR) বিভিন্ন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও যোগ করেন, সরকারের কার্যকর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে দেশের কৃষিপণ্য ও অপ্রচলিত রপ্তানি খাতেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি ভিয়েতনামের বাজারে বাংলাদেশের আলু রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের আম রপ্তানির প্রক্রিয়াটিও বর্তমানে চলমান রয়েছে।
জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে আলোচনায় বাংলা ও ইংরেজি মিশিয়ে বক্তব্য দিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য জেবা আমিন খান। মঙ্গলবার (১৬ জুন) সংসদ অধিবেশনে দেওয়া তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সংসদ সূত্রে জানা যায়, ওইদিন বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিকের সমালোচনা করেন। এর জবাবে বক্তব্য দিতে গিয়ে জেবা আমিন খান মিশ্র ভাষায় বক্তব্য উপস্থাপন করেন, যা সংসদ কক্ষে যেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তেমনি পরে অনলাইনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। বক্তব্যে তিনি রংপুর-৬ আসনের এক সংসদ সদস্যের মন্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে বলেন, দেশের বহু সড়ক এখনো খারাপ অবস্থায় রয়েছে, যার জন্য তিনি পূর্ববর্তী সরকারের দুর্নীতিকে দায়ী করেন। তার ভাষায়, অতীতে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হলেও তা সাধারণ মানুষের উপকারে আসেনি; বরং ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। এ কারণেই গ্রামীণ এলাকায় এখনো কাঁচা রাস্তা রয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি। বর্তমান সরকারের সময়কাল উল্লেখ করে জেবা আমিন খান বলেন, সরকার মাত্র একশ দিনের কিছু বেশি সময় পেয়েছে, তাই কার্যকর পরিবর্তন আনতে আরও সময় প্রয়োজন। তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান, উত্তরাঞ্চলকে কৃষি হাব হিসেবে ঘোষণার মতো উদ্যোগের প্রশংসা করতে। এদিকে নির্ধারিত সময়ের বেশি বক্তব্য দেওয়ায় একপর্যায়ে স্পিকার তাকে থামিয়ে দেন। স্পিকার উল্লেখ করেন, সাধারণত সদস্যদের ছয় মিনিট সময় দেওয়া হলেও তাকে আট মিনিট বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এরপর তাকে বক্তব্য শেষ করতে আরও এক মিনিট সময় দেওয়া হয়। তবে অতিরিক্ত সময় চেয়ে জেবা আমিন খান নিজের নির্বাচনী এলাকা ঝালকাঠির শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন প্রসঙ্গ তুলে ধরতে চান। তিনি অতীত সরকারের মন্ত্রীদের ডিও লেটারের মাধ্যমে কাজ করার সংস্কৃতিরও সমালোচনা করেন। কিন্তু সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় স্পিকার তাকে বক্তব্য সমাপ্ত করতে অনুরোধ করেন এবং ভবিষ্যতে আরও সুযোগ দেওয়ার আশ্বাস দেন। সংসদের এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই মিশ্র ভাষার ব্যবহারে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ কেউ বিষয়টি হাস্যরসের সঙ্গে দেখছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, যেখানে সংসদীয় ভাষা ও উপস্থাপনার ধরন নিয়ে নানা মত উঠে আসছে।
জাতীয় সংসদে ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা জিসান মিয়া প্রধানকে ঘিরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিরোধী দল। রোববার (১৪ জুন) সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ ধারায় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিবৃতি দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জিসান মিয়ার ‘নিখোঁজ’, উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন। একইসঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে আনা গুরুতর অভিযোগের বিষয়েও সংসদকে অবহিত করেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নারীর সঙ্গে জিসানের পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে ওই নারী গর্ভবতী হলে তাকে গর্ভপাত করানোর জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং এতে জিসানের এক আত্মীয় সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বিয়ে এড়িয়ে আত্মগোপনে চলে যান জিসান এবং তার স্বজনের মাধ্যমে থানায় নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পুলিশ অনুসন্ধান চালিয়ে কুমিল্লার লাকসাম এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করে। এ ঘটনার পর ভুক্তভোগী নারী দাউদকান্দি মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। একই বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুর্নীতির মামলায় পলাতক সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদকে দুবাই থেকে গ্রেপ্তারের তথ্যও সংসদকে জানান। তবে জিসান প্রসঙ্গ সংসদে তোলার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, একটি বিতর্কিত বিষয় এভাবে সংসদে উপস্থাপন করা অনভিপ্রেত এবং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা হতে পারে। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই অংশের বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা নিজেদের আসন থেকে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান, অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও জবাব দিতে দাঁড়িয়ে থাকেন। এতে কিছু সময়ের জন্য সংসদে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল হস্তক্ষেপ করেন। তিনি জানান, ৩০০ ধারায় প্রদত্ত বিবৃতির ওপর সাধারণত প্রশ্ন বা বিতর্কের সুযোগ নেই, তবে নিয়ম মেনে স্পষ্টীকরণ চাওয়া যেতে পারে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, যদি কোনো বক্তব্য সংসদীয় রীতির পরিপন্থী প্রমাণিত হয়, তাহলে বিধি অনুযায়ী তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হবে। ডেপুটি স্পিকারের নির্দেশনার পর উভয় পক্ষ আসনে ফিরে গেলে সংসদের কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়। ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দেশে সবার অংশগ্রহণ ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত করে বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশসহ মোট ১০টি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনে দেওয়া বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই অগ্রাধিকার খাতগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরেন। সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, উন্নয়নের সুফল দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং সব অঞ্চলে সমভাবে পৌঁছে দিতে সুষম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাস্তবমুখী, দক্ষতানির্ভর ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্বাস্থ্য খাতে সবার জন্য মানসম্মত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে জীবনচক্রভিত্তিক সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা বলা হয়। এতে শিশু থেকে প্রবীণ পর্যন্ত সব বয়সী নাগরিককে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় এনে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি শক্তিশালী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। কৃষিকে উৎপাদন, জীবিকা ও জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার কৌশলগত খাত হিসেবে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সহজ করতে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ বা ডিরেগুলেশনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারি সেবায় বিলম্ব ও অপ্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া কমিয়ে স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজার সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। জ্বালানি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বলা হয়েছে, উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানিব্যবস্থার মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আইসিটি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা হবে। পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জনগণের অংশগ্রহণে বনায়ন কর্মসূচিকে সবুজ বিপ্লবে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নদ-নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার এবং খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালুর কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গড়ে তুলতে মেধাভিত্তিক, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়নের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদে জানানো হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম, বিশেষ করে ফেসবুক ও এর মূল প্রতিষ্ঠান মেটা-এর বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কোনো আইনি বিধান বর্তমানে দেশে নেই। সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, এ কারণে সরকার কেবল অনুরোধের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিতে পারে। জাতীয় সংসদ অধিবেশনে মহিলা আসন-৯ এর সংসদ সদস্য বেগম হেলেন জেরিন খানের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। লিখিত প্রশ্নে সংসদ সদস্য জেরিন খান জানতে চান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি, বট-নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চরিত্রহনন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এবং নারী হয়রানি প্রতিরোধে সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপতথ্য প্রতিরোধে বিদ্যমান সাইবার আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশোধিত আইনে এসব অপরাধের জন্য যথাযথ শাস্তির বিধান যুক্ত করা হবে এবং একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে সরাসরি আইনি জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। তিনি আরও বলেন, সরকার চায় অনুরোধ পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করুক এবং কনটেন্ট অপসারণ করুক। তবে বর্তমানে অনুরোধ করার পরও অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আরও উল্লেখ করেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতার আড়ালে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নিয়েও অপপ্রচার রয়েছে। এসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনগত সংস্কার প্রয়োজন বলে তিনি সংসদে মত দেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিধান না থাকায় সরকার বর্তমানে কেবল অনুরোধের মাধ্যমে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
দেশে চলমান বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং মোকাবিলায় জাতীয় সংসদ ভবন থেকেই বিদ্যুৎ সাশ্রয় শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তিনি এই প্রস্তাব করেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদ অধিবেশন বন্ধ না করে সংসদ ভবনের বিভিন্ন অফিসে লোডশেডিং করা যেতে পারে। এর আগে অধিবেশনে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে এবং বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এখন থেকে রাজধানীতেও পরীক্ষামূলকভাবে লোডশেডিং করা হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, শহরের মানুষ আরামে থাকবে আর গ্রামের মানুষ কষ্টে থাকবে—এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। মূলত জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, গত বুধবার দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার মেগাওয়াট, বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ১২৬ মেগাওয়াট। দৈনিক প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি থাকায় দেশজুড়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান সংকটের বড় কারণ বিগত সরকারের অব্যবস্থাপনা। কাগজে-কলমে উৎপাদন ক্ষমতা বেশি দেখানো হলেও বাস্তবে ব্যাপক গড়মিল রয়েছে। অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে অধিবেশন সচল রাখার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেন। জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা স্পষ্ট করেন যে, তিনি অধিবেশন চলাকালে নয় বরং সংসদ ভবনের প্রশাসনিক শাখাগুলোতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা বলেছেন। এর মাধ্যমে জনগণের কষ্টের অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পর প্রণীত জবাবদিহি বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেওয়া একাধিক সংস্কার বাতিল বা স্থগিত করেছে বাংলাদেশের নতুন সংসদ। এতে করে গণতান্ত্রিক অগ্রগতি থেকে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে কি না- তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও বিশ্লেষকেরা। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি-প্রধান নতুন সংসদ সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সেই অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর দায়িত্ব নিয়েছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসব অধ্যাদেশের মধ্যে ১১০টি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে- কিছু ক্ষেত্রে সংশোধনসহ। তবে অন্তত ২৩টি অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন না পাওয়ায় অকার্যকর হয়ে গেছে। এর মধ্যে মানবাধিকার, বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন ও পুলিশ সংস্কারসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধানও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, বাতিল হওয়া এসব অধ্যাদেশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিরোধী দলগুলোর দাবি, এসব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সংস্কারের মূল কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং ক্ষমতা আবার কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তবে সরকার বলছে, এটি সংস্কার বাতিল নয়; বরং আইনগুলো আরও পরিপূর্ণ ও কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা। আলোচনার মাধ্যমে সংশোধিত আইন পুনরায় আনা হবে বলেও জানিয়েছে তারা। পটভূমি: আন্দোলন থেকে সংস্কার ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্রদের নেতৃত্বে গণআন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাচারিতা, মতপ্রকাশের দমন, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলন গড়ে ওঠে। এরপর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার’ নামে একটি সংস্কার কাঠামো প্রণয়ন করে, যাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, নির্বাচনব্যবস্থা ও বিকেন্দ্রীকরণের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ সমর্থন পায় এই চার্টার। তবে সংসদ না থাকায় অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন করতে পারেনি; পরিবর্তে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অধ্যাদেশ জারি করে। সংবিধান অনুযায়ী, এসব অধ্যাদেশ নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন বা বাতিল করতে হয়। মানবাধিকার কমিশন: কী পরিবর্তন হলো বাতিল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর একটি ছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) সংক্রান্ত। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশনকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত, নির্দিষ্ট সময়সীমা, ক্ষতিপূরণ ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার বিধান ছিল। কিন্তু তা বাতিল হওয়ায় ২০০৯ সালের পুরোনো আইন পুনর্বহাল হয়েছে, যেখানে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত। সরকার বলছে, ওই অধ্যাদেশে আইনি অস্পষ্টতা ছিল। তবে সাবেক কমিশনারদের অভিযোগ, সরকারের যুক্তি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। গুমের আইনগত স্বীকৃতি: শূন্যতা তৈরি গুমের ঘটনাকে আলাদা অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার উদ্যোগও বাতিল হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কমিশন ১ হাজার ৯০০-এর বেশি অভিযোগ পায়, যার মধ্যে অন্তত ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, গুমকে স্পষ্টভাবে আইনে সংজ্ঞায়িত না করলে বিচার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দায়মুক্তির ঝুঁকি তৈরি হয়। বিচার বিভাগীয় সংস্কার বাতিল হওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন সচিবালয় গঠন এবং বিচারক নিয়োগে নতুন পদ্ধতি চালু করা। এর লক্ষ্য ছিল নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমানো। এসব প্রস্তাব বাতিল হওয়ায় আগের ব্যবস্থাই বহাল থাকছে। সরকারের অবস্থান: ‘পুনর্মূল্যায়ন, বাতিল নয়’ সরকার বলছে, স্বল্প সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করা কঠিন ছিল। তাই কিছু আইন পরে আলোচনা করে পুনরায় আনা হবে। আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধান হুইপের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আইনগুলো আরও পরিশীলিত করে পুনরায় প্রণয়ন করা হবে। বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া বিরোধী দলগুলোর মতে, এটি সংস্কারের পথ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত। তাদের দাবি, গণভোটে জনগণের যে প্রত্যাশা প্রকাশ পেয়েছিল, তা উপেক্ষা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি কেবল আইন বাতিল নয়; বরং ক্ষমতার কাঠামো পুনর্গঠনের প্রশ্ন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব পদক্ষেপ জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্য দুর্বল করতে পারে। এতে করে আগের মতোই নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে তারা এটিও মনে করেন, সরকার চাইলে আলোচনার মাধ্যমে সংস্কারগুলো আরও শক্তিশালী করে ফিরিয়ে আনার সুযোগ এখনো রয়েছে। সূত্র: আল জাজিরা
নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৫২ দিনের মাথায় ব্যাংক খাত থেকে ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, এমন তথ্য তুলে ধরে জাতীয় সংসদে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল ২০২৬) সংসদে দেওয়া বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, সরকার অতিমাত্রায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় দেশের অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ আছে কি না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। রুমিন ফারহানার সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, এই ঋণের বড় অংশই মূলত বিগত সরকারের রেখে যাওয়া দেনার ধারাবাহিকতা বা ‘ক্যারিওভার’। এটি বর্তমান সরকারের নতুন কোনো আর্থিক বোঝা নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিএনপির অর্থনৈতিক লক্ষ্য হলো স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে আনা, যার প্রতিফলন আগামী বাজেটে দেখা যাবে।
জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যম নিউএজ অনলাইনে ১৯ এপ্রিল প্রকাশিত “Sycophancy resurfaces in JS” শিরোনামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যঙ্গচিত্র ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে সংসদীয় কার্যক্রমে অতিরিক্ত প্রশংসামূলক বক্তব্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এসব কনটেন্টকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমত ও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩ তম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদীয় আলোচনায় প্রশংসামূলক বক্তব্য ও স্তুতিবাচক মন্তব্যের প্রবণতা আবারও দেখা গেছে। এতে সংসদের কার্যকর আলোচনার পরিবর্তে সময়ের একটি অংশ এ ধরনের বক্তব্যে ব্যয় হচ্ছে বলে সমালোচনা তৈরি হয়। অধিবেশনে সরকারি দলের একাধিক সংসদ সদস্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অভিনন্দন ও প্রশংসাসূচক বক্তব্য দেন। এর মধ্যে একজন মুখ্য হুইপ প্রধানমন্ত্রীর নাম উল্লেখ করে টাইম ম্যাগাজিনের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানান। তিনি এ উপলক্ষে একটি কবিতাও পাঠ করেন, তবে কবির নাম উল্লেখ করেননি। এর আগে অধিবেশনের প্রথম দিনেও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবিতা পাঠ এবং প্রশংসামূলক বক্তব্যের ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে সংসদীয় আলোচনায় মূল ইস্যুর পরিবর্তে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রশংসা বেশি স্থান পাচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকদের মত প্রকাশ পায়। অন্যদিকে, গাজীপুর-১ আসনের এক সংসদ সদস্য আলোচনায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের প্রসঙ্গ তুলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও স্বীকৃতির আহ্বান জানান তিনি। এছাড়া অতীত সংসদগুলোর মতো বর্তমান অধিবেশনেও সংসদীয় আলোচনার একটি বড় অংশ সরকার ও দলের অর্জন তুলে ধরা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনায় ব্যয় হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, একাদশ জাতীয় সংসদে সভাপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় প্রায় ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ সময় সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসায় ব্যয় করা হয়েছিল। পাশাপাশি ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ সময় সরকারের সাফল্য তুলে ধরতে ব্যবহার করা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে অনেক প্রশ্নই মূল বিষয় থেকে সরে গিয়ে প্রশংসামূলক বক্তব্যে পরিণত হয়, যা নির্ধারিত সময়ের একটি বড় অংশ দখল করে নেয়।
দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ গ্যাসের মজুত রয়েছে, তা দিয়ে আগামী প্রায় ১২ বছর সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। রোববার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এই তথ্য প্রদান করেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। মন্ত্রী জানান, দেশের মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ২৯.৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২.১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন সম্পন্ন হয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত অবশিষ্ট মজুতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭.৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে দৈনিক গড়ে ১,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে এই হারে আগামী ১২ বছর চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করেছে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন। পেট্রোবাংলার পরিকল্পনায় ১০০টি কূপ খনন কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে ২৬টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া বাপেক্স ব্লক-৭ ও ৯-এ ৩,৬০০ কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক জরিপ এবং বিজিএফসিএল হবিগঞ্জ ও বাখরাবাদ এলাকায় ৩ডি সাইসমিক জরিপ শুরু করতে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপাল’ (PayPal)-এর কার্যক্রম শুরু করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (১৫ এপ্রিল ২০২৬) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি জানান, হাই-টেক পার্ক ও আইসিটি সেন্টারগুলোর আধুনিকায়ন এবং পেপালের কার্যক্রম দ্রুত চালু করতে ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ফ্রিল্যান্সার, ই-কমার্স উদ্যোক্তা এবং আইটি খাতের পেশাজীবীদের সহজ ও দ্রুত আন্তর্জাতিক লেনদেন নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পেপালের সিঙ্গাপুরভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া টিমের সঙ্গে বাংলাদেশের আইসিটি বিভাগের ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার এই সেবাটি বাস্তবে রূপ দিতে কাজ শুরু করেছে। উল্লেখ্য, বিগত সরকারগুলোর সময় একাধিকবার পেপাল আসার গুঞ্জন শোনা গেলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। তবে এবার প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং সংসদে কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়ায় আইটি খাতে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দিয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এই উদ্যোগ মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ও ভারতের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে সংসদীয় কূটনীতির গুরুত্ব বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের বিদায়ী হাইকমিশনারপ্রণয় ভার্মার এর সৌজন্য সাক্ষাতে এ বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সোমবার (১৩ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধন, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় স্পিকার বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তি দৃঢ় হয়েছে। সে সময় ভারত সরকারের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভৌগোলিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী। এছাড়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে সভাপতি পদে মনোনয়নে ভারতের সমর্থনকে তিনি দুই দেশের আন্তরিক সম্পর্কের নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরেন। সংসদীয় কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান তিনি। অন্যদিকে প্রণয় ভার্মা বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিনিধিদল বিনিময়ের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও জোরদার হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক গভীর করার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়। এ সময় হাইকমিশনার স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানান এবং ভারতের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা স্মারক উপহার প্রদান করেন। এছাড়া ভারতীয় হাইকমিশন ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা ও দায়মুক্তি দিতে জাতীয় সংসদে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে। বুধবার (৮ এপ্রিল) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে বিলটি সর্বসম্মত কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়। সভার শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ শিরোনামের বিলটি উত্থাপন করেন। পরে আলোচনা শেষে তা পাস হয়। নতুন আইনের ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব ধরনের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ তৈরি হলো। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এসব মামলা বাতিল করা হবে বলে আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া এই অভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে নতুন করে মামলা দায়ের বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আইনি দায়মুক্তি পাবেন। একই দিনে সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী অধ্যাদেশ বিল-২০২৬’ও পাস হয়। নতুন সংশোধনের মাধ্যমে এখন থেকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পাশাপাশি কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনকেও সন্ত্রাসে সম্পৃক্ততার অভিযোগে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা সরকারের হাতে ন্যস্ত হলো। এই সংশোধনের ফলে ক্ষমতাচ্যুত দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার আইনি ভিত্তিও নিশ্চিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নিয়ে ওঠা সমালোচনার জবাবে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, বিসিবিতে কোনো ধরনের ‘বাপের দোয়া’ বা ‘মায়ের দোয়া’ ভিত্তিক কমিটি গঠন করা হয়নি। বুধবার (৮ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ কথা বলেন তিনি। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ-এর এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই মন্তব্য করেন। এর আগে সংসদে নিজের বক্তব্যে হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এখন আর আগের মতো নেই। তার ভাষায়, “বিসিবি এখন আর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নেই, এটি ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ডে’ পরিণত হয়েছে।” তিনি ওইদিন বিকেলে সংসদে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ বিল-২০২৬’ উত্থাপনের প্রস্তাবে আপত্তি জানাতে গিয়ে বিসিবির পরিচালনা কাঠামো নিয়ে এই সমালোচনা করেন। এমন প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে অভিযোগটি নাকচ করে বলেন, বোর্ড পরিচালনায় কোনো ধরনের পক্ষপাতমূলক বা অনিয়মের সুযোগ নেই এবং এ ধরনের মন্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় আজ মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে পানিসম্পদ, আইন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ৮টি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা বিলগুলো উত্থাপন করলে কোনো সংশোধনী প্রস্তাব না থাকায় কণ্ঠভোটে সেগুলো সরাসরি পাস হয়। সংসদের বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সময়ের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে আজ পাস হওয়া বিলগুলো অপরিবর্তিতভাবে গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর মধ্যে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করলে তা পাস হয়। এরপর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান পৃথকভাবে ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি আদালত, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) এবং রেজিস্ট্রেশন সংশোধন সংক্রান্ত চারটি বিল পাসের প্রস্তাব দেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) (সংশোধন) বিলটি পাসের সময় আইনমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, নতুন এই আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় ‘গুম’ (বাধ্যতামূলক নিখোঁজ)-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গুমের বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এই আইনটি সরকারের সদিচ্ছারই প্রতিফলন। এর মাধ্যমে গুমের বিচার নিয়ে ওঠা নানা প্রশ্নের অবসান ঘটবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কয়েকটি বিলও পাস হয়। মূলত নাম পরিবর্তনের লক্ষ্যে জারি করা অধ্যাদেশগুলো অনুমোদনের জন্য এই বিলগুলো আনা হয়েছিল। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) সংক্রান্ত বিল দুটি উত্থাপন করেন। পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সিলেট ও খুলনার মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ধূমপান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিলগুলো পাসের প্রস্তাব করলে সেগুলো কণ্ঠভোটে পাস হয়।
জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিল উপস্থাপনকে ঘিরে এক পর্যায়ে হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “মাননীয় স্পিকার, খুব দুঃখের ব্যাপার! এতক্ষণ তো যা বললাম, এখন আবার শেখ হাসিনা বলতে হচ্ছে।” স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত তিনটি বিল সংসদে উপস্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিলগুলো হলো ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল এবং শেখ হাসিনা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল। এর মধ্যে শেষের দুটি বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। দ্বিতীয় বিলটি উপস্থাপনের সময় বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হেসে ওই মন্তব্য করেন, যা উপস্থিত সংসদ সদস্যদের মধ্যেও হাসির রেশ তৈরি করে। পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট (সংশোধন) বিল’ পাসের প্রস্তাব করেন। বিলটি কণ্ঠভোটে অনুমোদন পায়। উল্লেখ্য, নাম পরিবর্তন-সংক্রান্ত আইন সংশোধনের অংশ হিসেবে আগে জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে বৈধতা দিতে এসব বিল সংসদে উত্থাপন ও পাস করা হয়।
জাতীয় সংসদের ইতিহাসে এক অনন্য ও জরুরি কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে সংসদ অধিবেশন দিনে দুই বেলা বা দুই সেশনে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আজ সোমবার (৬ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ১৩৩টি অধ্যাদেশকে দ্রুততম সময়ে আইনে রূপান্তরের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রক্ষায় এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা জানানো হয়। সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম জানান, বিপুল সংখ্যক বিল পাসের এই বিশাল দায়িত্ব সম্পন্ন করতে আগামীকাল মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) থেকে প্রতিদিন দুই সেশনে অধিবেশন চলবে। এর মধ্যে প্রথম সেশন শুরু হবে সকাল সাড়ে ১০টায় এবং দ্বিতীয় সেশন শুরু হবে বিকেল সাড়ে ৩টায়। সাধারণত সংসদ অধিবেশন দিনে একবার বসলেও, বিল পাসের এই জরুরি পরিস্থিতির কারণে কার্যপ্রণালীতে এই বিশেষ পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিল পাসের এই কর্মব্যস্ততার কারণে আগামী বৃহস্পতিবারের নির্ধারিত 'বেসরকারি সদস্য দিবস' বাতিল করা হয়েছে। ওই দিনও সরকারি বিল পাসের কাজ চলবে বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে আগামী শুক্রবারও সংসদ অধিবেশন চালু রাখার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। মূলত বর্তমান সরকারের আমলে জারিকৃত অধ্যাদেশগুলোকে নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে আইন হিসেবে পাস করার আইনি বাধ্যবাধকতা থেকেই এই কঠোর পরিশ্রমী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, সংসদীয় ইতিহাসে এত কম সময়ে এত বেশি সংখ্যক বিল পাসের নজির বিরল। সংসদ সচিবালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এখন এই বিলগুলো পাসের চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।