কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন ও রোবোটিক প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার বিশ্বজুড়ে শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে কর্মসংস্থানের ধরন বদলে যাচ্ছে, আর বহু প্রচলিত পেশা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বে কোটি কোটি চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে। বাংলাদেশও এ পরিবর্তনের বাইরে থাকছে না। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও অটোমেশনের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে। তবে একই সময়ে নতুন কর্মক্ষেত্রও তৈরি হবে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে পুনরাবৃত্তিমূলক বা রুটিনভিত্তিক কাজগুলো। বিশ্বব্যাংকের ‘সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রায় ৭ শতাংশ চাকরি সরাসরি এআইয়ের কারণে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১৫ শতাংশ চাকরিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ক্যাশিয়ার, বাস, ট্রেন ও বিমানের টিকিট বিক্রেতা, ডাটা এন্ট্রি কর্মী, প্রশাসনিক সহকারী, নির্বাহী সচিব, ব্যাংকের কাউন্টার কর্মকর্তা এবং ডাক বিভাগের কর্মীদের মতো পেশা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিজিটালাইজেশন, জেনারেটিভ এআই এবং রোবোটিক অটোমেশন দ্রুত এসব কাজের জায়গা দখল করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চালকবিহীন যানবাহন প্রযুক্তির উন্নয়নও পরিবহন খাতের কিছু চাকরিকে ভবিষ্যতের ঝুঁকির তালিকায় যুক্ত করেছে। যদিও বাংলাদেশসহ অনেক দেশ এখনো এ প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু করেনি। গবেষণায় বলা হয়েছে, কেরানি ও অফিস সহকারী ধরনের চাকরিগুলো আগামী বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে। কারণ এসব কাজের বড় অংশই তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, নথি ব্যবস্থাপনা এবং নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণভিত্তিক। এ ধরনের কাজ এআই তুলনামূলক সহজেই সম্পন্ন করতে পারে। বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো এসব কাজ হাতে-কলমে করা হয়। তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, একজন কর্মী যেখানে কয়েক ঘণ্টা সময় নিয়ে একটি কাজ সম্পন্ন করেন, সেখানে আধুনিক এআইভিত্তিক সফটওয়্যার একই কাজ অনেক কম সময়ে করতে সক্ষম। গণমাধ্যম খাতেও প্রযুক্তির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বর্তমানে এআই ব্যবহার করে দ্রুত সংবাদ সারাংশ তৈরি, অনুবাদ এবং তথ্য বিশ্লেষণের কাজ করা হচ্ছে। ফলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিনির্ভর সংবাদ, সাধারণ অনুবাদ বা নিয়মিত কনটেন্ট তৈরির কাজে নিয়োজিত কর্মীদের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং এবং তথ্য যাচাইয়ের মতো দক্ষতাভিত্তিক কাজের চাহিদা বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনজি অ্যান্ড কোম্পানির ‘জেনারেটিভ এআই অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব ওয়ার্ক ইন আমেরিকা’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, জেনারেটিভ এআই অফিসভিত্তিক বহু চাকরির কাঠামো বদলে দেবে। বিশেষ করে গ্রাহকসেবা, অ্যাকাউন্টিং সহায়তা, বেতন প্রক্রিয়াকরণ, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক সহায়তাসংক্রান্ত কাজ দ্রুত অটোমেটেড হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ম্যাককিনজির গবেষণায় বলা হয়েছে, সব চাকরি হারিয়ে যাবে এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে কাজের ধরন বদলে যাবে। যেসব পেশায় মানবিক যোগাযোগ, সৃজনশীলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জটিল বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে মানুষের চাহিদা বজায় থাকবে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ব্যবস্থাপনা এবং সৃজনশীল খাতকে তুলনামূলক নিরাপদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণাতেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। ‘দ্য ফিউচার অব অফিস অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সাপোর্ট অকুপেশনস ইন দ্য এরা অব এআই’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে ২০২৯ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১০ লাখ অফিস সহকারীর চাকরি কমে যেতে পারে। গবেষকরা জানিয়েছেন, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে ডকুমেন্টেশন, সময়সূচি নির্ধারণ, প্রতিবেদন তৈরি এবং গ্রাহক ব্যবস্থাপনার কাজে এআইভিত্তিক সফটওয়্যার ব্যবহার শুরু করেছে। একই সময়ে প্রযুক্তি খাতও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। ‘এআই ইমপ্যাক্ট অন লেবার ফোর্স অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারস’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, এআই-সহায়ক কোডিং টুল এবং স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার তৈরির প্রযুক্তি সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে শুধু কোডিং দক্ষতা যথেষ্ট হবে না। জটিল সমস্যা সমাধান, সিস্টেম ডিজাইন, বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি এবং মানবিক দক্ষতার গুরুত্ব আরও বাড়বে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং, কলসেন্টার, পোশাকশিল্প ব্যবস্থাপনা, গণমাধ্যম এবং সরকারি অফিসগুলোতেও ধীরে ধীরে অটোমেশন ও এআইভিত্তিক সফটওয়্যারের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে কম দক্ষতাভিত্তিক অফিস চাকরিগুলো ভবিষ্যতে চাপের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিবর্তনকে আতঙ্কের চোখে না দেখে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। ইতিহাস বলছে, প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব কিছু কর্মসংস্থান কমালেও নতুন ধরনের পেশা ও কাজের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে কর্মীদের খাপ খাইয়ে নেওয়া।
ইরান সংঘাতের প্রভাব এবং সৌদি আরবের ভিসা বিধিনিষেধ কঠোর হওয়ার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো কমেছে। এর ফলে চলতি বছরের প্রথমার্ধে সামগ্রিক বিদেশগামী কর্মসংস্থান কমলেও ইউরোপে বৈধভাবে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত ১৮ হাজার ২২০ জন বাংলাদেশি বৈধভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৪৪৫ জন। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ইউরোপে বৈধ অভিবাসন বেড়েছে ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগ ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ কমে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৬৭ জনে নেমেছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ১৭ হাজার ৩৪৩। ফলে বাংলাদেশের মোট বিদেশগামী কর্মসংস্থানও বছরওয়ারি হিসাবে প্রায় ২৮ শতাংশ কমেছে। বিএমইটির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ইউরোপে বৈধ অভিবাসনে বড় ধরনের পুনরুদ্ধারের ধারা চলতি বছরও অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালে ইউরোপে ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন বাংলাদেশি বৈধভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, যা ২০২৪ সালে ছিল ২২ হাজার ২৭১ জন। এর আগে ২০২৩ সালের ৪৬ হাজার ৪৫৫ জন থেকে ২০২৪ সালে ইউরোপমুখী বৈধ অভিবাসন অর্ধেকেরও বেশি কমে গিয়েছিল। বিএমইটির মতে, ইরান সংঘাত এবং সৌদি আরবের ভিসা নীতির কড়াকড়ি উপসাগরীয় শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেললেও ইউরোপে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা স্থিতিশীল রয়েছে। ইউরোপে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে ইতালিকে কেন্দ্র করে। মানবপাচার প্রতিরোধ এবং বৈধ অভিবাসন উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ও ইতালি সরকারের যৌথ উদ্যোগের পর দেশটি বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজারে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইতালি ৪ হাজার ৬৪৫ জন বাংলাদেশি কর্মী নিয়েছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৩৬৫ জন, যেখানে ২০২৪ সালে ছিল মাত্র ১ হাজার ১৬২। ইতালি মূলত কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতে মৌসুমি কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে। এ ছাড়া পর্তুগাল, সার্বিয়া, রোমানিয়া, রাশিয়া ও বেলারুশেও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ বেড়েছে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর বাইরে শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণের সরকারি প্রচেষ্টা এগোচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতালির সাফল্যের পর সরকার সার্বিয়া, গ্রিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল ও রাশিয়াসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে শ্রম অভিবাসন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পর উপসাগরীয় শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৫ এপ্রিল সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার ইউরোপে বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজে বের করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগ কমে যাওয়া এবং মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রায় দুই বছর ধরে সীমিত থাকায় ইউরোপে এই প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক। তবে বাংলাদেশের মোট বিদেশগামী কর্মসংস্থানে ইউরোপের অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে কম। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপে গেছেন ১৮ হাজার ২২০ জন বাংলাদেশি, যা মোট বিদেশগামী কর্মসংস্থানের মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি। শ্রম রপ্তানিকারকরা বলছেন, দক্ষ কর্মীর ঘাটতি, নথি জালিয়াতির কারণে ভিসা অনুমোদনের হার কমে যাওয়া এবং নিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাসের কারণে ইউরোপের বাড়তে থাকা শ্রমিক চাহিদার পুরো সুযোগ নিতে পারছে না বাংলাদেশ। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, কসোভো, আলবেনিয়া ও মন্টেনেগ্রোর মতো দেশগুলোর অনেক নিয়োগকারী বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, অনেক কর্মী গন্তব্য দেশে পৌঁছে পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপে বেশি মজুরির চাকরির উদ্দেশ্যে চলে যান। তবে পর্তুগাল, সাইপ্রাস, মলদোভা, বেলারুশ, সার্বিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মতো উদীয়মান শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে। ইউরোপে কর্মী পাঠানো প্রতিষ্ঠান ইনফিনিটি এইচসিএম লিমিটেড চলতি বছর মলদোভায় ৩৭ জন কর্মী পাঠিয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯ জন কংক্রিট শ্রমিক, ছয়জন পেভিং স্টোন ইনস্টলার এবং চারজন কৃষি শ্রমিক রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, মলদোভায় ওয়েল্ডার, মেকানিক, ভারী যন্ত্রপাতি চালক এবং নির্মাণ ও কৃষি খাতে দক্ষ ও অদক্ষ উভয় ধরনের কর্মীর চাহিদা রয়েছে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মাসিক বেতন সাধারণত ৫০০ থেকে ১ হাজার ডলারের বেশি হয়ে থাকে। ইনফিনিটি এইচসিএম লিমিটেডের চেয়ারম্যান শারমিন আফরোজ সুমি বলেন, হাতে-কলমে দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মীদেরই নিয়োগকারীরা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তবে প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীর ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, কিছু কর্মী গন্তব্য দেশে পৌঁছে অবৈধভাবে অন্য ইউরোপীয় দেশে চলে যাওয়ার চেষ্টা করায় নিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও কঠোর হয়েছে। ইউরোপে বৈধ অভিবাসনের পাশাপাশি অনিয়মিত অভিবাসনও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সমুদ্র ও স্থলপথে ২৪ হাজার ৩১৮ জন বাংলাদেশি অনিয়মিতভাবে ইউরোপে পৌঁছেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৯ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে যুক্তরাজ্যে থাকা বাংলাদেশিরা প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যদিও সেখানে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা যুক্তরাজ্যের প্রায় দ্বিগুণ। আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইউরোপে প্রায় ৯ লাখ ৪৪ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করছিলেন। এর মধ্যে ৬ লাখ ৫২ হাজার ছিলেন যুক্তরাজ্যে। অনানুষ্ঠানিক হিসাবে ইউরোপে বাংলাদেশির সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ। উপসাগরীয় দেশগুলোতে এ সংখ্যা ৬০ লাখের বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে ইউরোপ থেকে। একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবদান ছিল ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি বছরের ২৫ জুন পর্যন্ত কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়া ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫০ জন বাংলাদেশির মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশ গেছেন উপসাগরীয় দেশগুলোতে। ইউরোপে গেছেন মাত্র ৫ শতাংশ। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি, পরিবহন, আতিথেয়তা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে শ্রমিকের চাহিদা বাড়লেও দক্ষ কর্মী তৈরি এবং নিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে না পারলে বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় এই বাজারের পূর্ণ সুবিধা নিতে পারবে না। বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীমা আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, গন্তব্য দেশে পৌঁছে কিছু কর্মীর অবৈধভাবে অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঘটনায় অনেক দেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই আরও কঠোর করেছে। তিনি বলেন, অনেক কর্মী প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা ও কাজের মানে নিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন না, যা ভবিষ্যৎ নিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি আরও জানান, ইউরোপের কয়েকটি দেশের ভিসা আবেদন বাংলাদেশে নয়, ভারতে অবস্থিত দূতাবাসের মাধ্যমে প্রক্রিয়া করা হয়। ভারতের ভিসা পেতে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়াকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য তাদের শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার এবং আরও বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি অনিয়মিত কর্মীদের নিয়মিতকরণ এবং মালয়েশিয়ায় আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের দেশে ফেরানোর বিষয়ও উত্থাপন করেছেন। সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘পারদানা পুত্রা’য় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশি কর্মী, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী এবং উদ্যোক্তারা দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করছেন। তাদের অবদান আমাদের উভয় দেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য কল্যাণকর। আমি মান্যবর প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে অনুরোধ করেছি যেন আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হয় এবং যত দ্রুত সম্ভব শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা হয়।” তারেক রহমান বলেন, বৈঠকে অনিয়মিত কর্মীদের নিয়মিতকরণ এবং মালয়েশিয়ায় আটক বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসনের বিষয়গুলোও আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত এবং সাশ্রয়ী। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কর্মীদের ব্যয়ও হ্রাস পাবে। এ বিষয়ে উভয় প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছেন বলেও জানান তিনি। বৈঠকের পর দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগসংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল বিনিময় করা হয়। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এসব দলিল বিনিময় করেন। পরে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিম। প্রধানমন্ত্রী জানান, বৈঠকে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর মতবিনিময় করেছি। আজ আমরা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক জোরদারে আমাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছি। আমরা উভয় দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যৌথ কমিশন বৈঠক এবং দ্বিপাক্ষিক পরামর্শসহ বিদ্যমান ব্যবস্থার মাধ্যমে যোগাযোগ আরও বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছি।” তারেক রহমান জানান, আলোচনায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো, জনশক্তি, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের খাত স্থান পেয়েছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়কে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া ‘বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’ নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে একমত হয়েছে। বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান। রাজনৈতিক প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপি শক্তিশালী ম্যান্ডেট লাভ করেছে। তিনি বলেন, “জনগণের বিপুল সমর্থনে আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছি। আমাদের এখনকার অগ্রাধিকার হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা।” বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান তিনি। তারেক রহমান বলেন, বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ আসিয়ানের সঙ্গে আরও নিবিড় যোগাযোগ চায় এবং ‘আসিয়ান সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আরসিইপিতে যোগ দিতে আগ্রহী বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার সমর্থনের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। উভয় প্রধানমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যু নিয়ে মতবিনিময় করেন। তারেক রহমান বলেন, “আমরা জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন করায় আমি মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানাই।” দ্বিপাক্ষিক দলিল স্বাক্ষরের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। তিনি বলেন, “আমি আত্মবিশ্বাসী যে আজকের আলোচনা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় সূচনা করবে। আমরা আঞ্চলিক শান্তি এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য নিবিড়ভাবে কাজ করতে উন্মুখ।” বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মালয়েশিয়া সফরের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ওই সফর রাজনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছিল এবং দুই দেশের শ্রম সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এ ছাড়া ১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মালয়েশিয়া সফরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই সফর দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও গভীর করেছিল এবং সহযোগিতার পরিধি বাড়িয়েছিল। তারেক রহমান জানান, ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম যে কয়েকটি ফোনকল তিনি পেয়েছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ফোন। তিনি বলেন, “তিনি আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন এবং মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমি তাঁর আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পেরে সম্মানিত বোধ করছি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম বিদেশ সফরে এখানে আসতে পেরে আমি ও আমার স্ত্রী অত্যন্ত আনন্দিত।” প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও তার স্ত্রীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তারেক রহমান। মালয়েশিয়াকে বাংলাদেশের একটি বিশ্বস্ত ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দেশটির সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদ জানান। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সংবাদ সম্মেলনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, ডা. জোবায়দা রহমান এবং বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল আনোয়ার ইব্রাহিমের সরকারি বাসভবন ‘সেরি পারদানা কমপ্লেক্স’-এ রাষ্ট্রীয় মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। সেখানে মালয়েশিয়ার শিল্পীরা বাংলা ও মালয় ভাষায় গানসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন। এর আগে সকাল ৯টার দিকে প্রধানমন্ত্রী ‘পারদানা পুত্রা’য় পৌঁছালে তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। আনোয়ার ইব্রাহিম এবং তার স্ত্রী দাতুক সেরি ড. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল তাকে স্বাগত জানান। মালয়েশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। অনুষ্ঠানে দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পরে উভয় প্রধানমন্ত্রী নিজ নিজ মন্ত্রিসভার সদস্য ও কর্মকর্তাদের একে অপরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে রোববার রাতে কুয়ালালামপুর পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্মসংস্থান অনুমতি বা ওয়ার্ক পারমিট ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার চালু করেছে। দেশটির মানবসম্পদ ও আমিরাতিয়াকরণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শ্রমবাজারকে আরও গতিশীল, দক্ষ এবং প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থার আওতায় এখন থেকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রক্রিয়ায়, কোনো সহায়ক নথিপত্র জমা না দিয়েই শতভাগ কাগজবিহীন পদ্ধতিতে ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন করা যাবে। পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট পারমিটের ক্ষেত্রে তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা ৭৫ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা হয়েছে, ফলে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজ হবে। সরকারি কার্যক্রমে জটিলতা কমানোর লক্ষ্যে পরিচালিত ‘জিরো গভর্নমেন্ট ব্যুরোক্রেসি প্রোগ্রাম’-এর অংশ হিসেবে এই সংস্কার বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের মতে, নতুন পদ্ধতি কর্মসংস্থান সংক্রান্ত সেবা গ্রহণকে আরও কার্যকর করবে এবং নিয়োগকর্তা ও কর্মীদের জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করবে। ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর এই পরিবর্তনের মাধ্যমে আবেদনকারীরা দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে সক্ষম হবেন। সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মন্ত্রণালয় বর্তমানে প্রচলিত ওয়ার্ক পারমিট সেবাগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং প্রক্রিয়া আরও সহজ করার উদ্দেশ্যে আগামী ৩০ জুলাই পর্যন্ত একটি ইলেকট্রনিক গণপরামর্শ কার্যক্রম চালু করেছে। এই অনলাইন পরামর্শ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিক, সেবাগ্রহীতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের মতামত ও পরামর্শ জমা দিতে পারবেন। প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে সেবাগুলোকে আরও উন্নত ও ব্যবহারবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ডিজিটাল সেবার বিস্তৃতি বাড়াতে মন্ত্রণালয় একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিয়োগকর্তা এবং কর্মীরা ঘরে বসেই বিভিন্ন ধরনের ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবেন। মন্ত্রণালয় বলছে, এই উদ্যোগ একদিকে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই উন্নয়নকে সহায়তা করবে, অন্যদিকে কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ফলে শ্রমবাজারে দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং সেবার গতি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। নতুন নীতিমালার আওতায় বিভিন্ন খাতের প্রয়োজন বিবেচনায় মোট ১৩ ধরনের ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে দুই বছর মেয়াদি বাহিরাগত কর্মী নিয়োগ পারমিট, যার মাধ্যমে বিদেশ থেকে নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া যাবে। একইভাবে দেশটির অভ্যন্তরে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি পরিবর্তনের জন্য দুই বছর মেয়াদি ট্রান্সফার ওয়ার্ক পারমিট চালু রয়েছে। পারিবারিক স্পনসরের অধীনে থাকা অভিবাসীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে ফ্যামিলি স্পনসরড পারমিট রাখা হয়েছে। এছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের জরুরি কাজের জন্য মিশন ওয়ার্ক পারমিট এবং স্বল্পমেয়াদি কাজের জন্য টেম্পোরারি ওয়ার্ক পারমিটের ব্যবস্থাও রয়েছে। আধুনিক কর্মসংস্থানের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্রিল্যান্সার এবং খণ্ডকালীন কর্মীদের জন্যও বিশেষ সুযোগ যুক্ত করা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠানের অধীনে না থেকেও স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য ফ্রিল্যান্স ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের দক্ষ কর্মীরা মূল নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়াই একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ পাবেন পার্ট-টাইম ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে। এছাড়া শিক্ষকতা খাতে প্রাইভেট টিউটরিং পারমিট এবং গোল্ডেন ভিসাধারীদের জন্য বিশেষ ওয়ার্ক পারমিটের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম ও স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থানে সম্পৃক্ত করতে বিশেষ কয়েকটি পারমিট চালু করেছে মন্ত্রণালয়। ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে জুভেনাইল ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হবে। পাশাপাশি ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মঅভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিতে স্টুডেন্ট ট্রেইনিং অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট পারমিট চালু রয়েছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জিসিসিভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য সাধারণ কর্মসংস্থান পারমিটের পাশাপাশি স্থানীয় আমিরাতি স্নাতকদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে বিশেষ ট্রেইনি ওয়ার্ক পারমিটও চালু করা হয়েছে। নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশটির শ্রমবাজারকে আরও আধুনিক, নমনীয় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ।
স্পেনে বসবাসরত অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য বড় ধরনের সুযোগ নিয়ে আসছে দেশটির সরকার। ‘নিয়মিতকরণ প্রকল্প ২০২৬’-এর আওতায় যোগ্য অভিবাসীদের আইনিভাবে বসবাস ও কাজের সুযোগ দেওয়া হবে। সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো দেশের ভেতরে থাকা অনিয়মিত জনশক্তিকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা। প্রকল্পের আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে অভিবাসীরা বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে অভিবাসীরা বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি পাবেন। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে শ্রমবাজারে তাদের অংশগ্রহণ আরও সুসংগঠিত হবে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসবে। বৈধতা পাওয়ার পর অভিবাসীরা ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেম-এর আওতায় সরকারি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারবেন, যা সাধারণ নাগরিকদের মতোই কার্যকর হবে। এ ছাড়া বৈধতার পর শেঙেন এলাকাভুক্ত দেশগুলোতে ১৮০ দিনের মধ্যে ৯০ দিন পর্যন্ত ভ্রমণের সুযোগ মিলবে। তবে এই অনুমতি কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও থাকবে। এটি মূলত একটি জাতীয় পারমিট, যার মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য কোনো দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস বা কাজ করা যাবে না। অন্য দেশে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করলে তার ব্যয় স্পেন বহন করবে না। একইভাবে অন্য কোনো দেশে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন আইন অনুযায়ী আলাদা আবেদন করতে হবে। শ্রমবাজারের চাহিদা মেটাতে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ একই ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। ইতালি ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ অ-ইউরোপীয় নাগরিককে কাজের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে জার্মানি দক্ষ কর্মী ও কেয়ারগিভার নিয়োগে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে শ্রমবাজারে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় বিকল্প গন্তব্য খুঁজছে সরকার—এ কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (১৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে এক লিখিত জবাবে তিনি বলেন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন শ্রমবাজার খোঁজার জন্য সরকার ইতোমধ্যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। প্রধানমন্ত্রী জানান, ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের কয়েকটি দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সার্বিয়া, গ্রীস, উত্তর মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল, ব্রাজিল এবং রাশিয়া উল্লেখযোগ্য। এসব দেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং উচ্চপর্যায়ের সফরের মাধ্যমেও সম্পর্ক জোরদার করা হচ্ছে। এছাড়া, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে সম্ভাব্য শ্রমবাজার যাচাই এবং পেশাভিত্তিক চাহিদা নিরূপণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দেশে স্থানীয় বিশেষজ্ঞ বা লবিস্ট নিয়োগের কথাও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করতে কাজ চলছে এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে নতুন করে কর্মী নিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা বাড়ায় সেখানে জনবল পাঠানোর প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। জাপানি ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়ানো হয়েছে এবং দেশের ৫৩টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভাষা শিক্ষা চালু রয়েছে। পাশাপাশি রুশ, আরবি, জার্মান ও ইতালীয় ভাষার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকজন প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছ্রের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও রেস্তোরাঁ, কারখানা ও হাসপাতালগুলো নতুন কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। শুক্রবার মার্কিন শ্রম বিভাগ-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত মাসে নিয়োগকর্তারা ১ লাখ ৭৮ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি করেছেন যা পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক বেশি এবং ফেব্রুয়ারির বড় ধরনের চাকরি হ্রাসের পর একটি শক্তিশালী পুনরুদ্ধার নির্দেশ করে। মার্চে বেকারত্বের হার ৪.৪ শতাংশ থেকে কমে ৪.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে এর একটি বড় কারণ হলো প্রায় ৪ লাখ মানুষ শ্রমবাজার থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। গত ছয় মাস ধরে শ্রমবাজার মোটামুটি স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল। নিয়োগকর্তারা একদিকে নতুন কর্মী নিয়োগে সতর্ক, অন্যদিকে ছাঁটাইতেও অনিচ্ছুক ছিলেন। ২০২৬ সালের শুরুতে চিত্রটি ছিল মিশ্র—জানুয়ারিতে শক্তিশালী চাকরি বৃদ্ধি, ফেব্রুয়ারিতে বড় কাটছাঁট এবং মার্চে আবার পুনরুদ্ধার। শ্রমশক্তির আকারও প্রায় স্থবির রয়েছে। এর পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং বিপুল সংখ্যক ‘বেবি বুমার’ প্রজন্মের অবসর গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মার্চে কাজ করছেন বা কাজ খুঁজছেন এমন প্রাপ্তবয়স্কদের হার সামান্য কমেছে। এ সপ্তাহে প্রকাশিত ব্যবসায়িক অর্থনীতিবিদদের এক জরিপে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে ইরান যুদ্ধ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর করে দিতে পারে এবং বেকারত্ব বাড়াতে পারে। যুদ্ধের ফলে জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে, গ্যাসোলিনের গড় মূল্য ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালনে ৪ ডলার ছাড়িয়েছে। মাসিক চাকরির এই হিসাব মার্চের প্রথমার্ধে করা হয়েছিল, তাই যুদ্ধের পূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব এতে প্রতিফলিত নাও হতে পারে। তেলের দাম বেড়ে গেলেও তেল ও গ্যাস খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। খাতভিত্তিক চিত্রে দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবা খাত আবারও চাকরি বৃদ্ধিতে শীর্ষে ছিল এ খাতে ৭৬ হাজার নতুন চাকরি যুক্ত হয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকই ক্যালিফোর্নিয়া ও হাওয়াইয়ে আগের মাসের ধর্মঘট শেষে কাজে ফিরে আসা কর্মীদের কারণে হয়েছে। নির্মাণ খাত মার্চে ২৬ হাজার নতুন চাকরি যোগ করেছে, যা তুলনামূলকভাবে অনুকূল বসন্তের আবহাওয়ার সুবিধা নিয়েছে। অন্যদিকে, ফেডারেল সরকার কর্মী ছাঁটাই অব্যাহত রেখেছে গত মাসে ১৮ হাজার চাকরি কমানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র-এর শ্রমবাজারে। এক বছরের স্থবিরতার পর বাজারে যে সামান্য স্থিতিশীলতার আশা দেখা যাচ্ছিল, নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত তা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। ইরান ও ইসরায়েল-সংক্রান্ত উত্তেজনার জেরে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি-তে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, যা জ্বালানি ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা জোরদার করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, তেলের দাম দীর্ঘ সময় ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে তা বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। এতে ব্যবসা ও বিনিয়োগে ধীরগতি আসার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে কর্মী ছাঁটাই শুরু করতে পারে। বর্তমানে শ্রমবাজারে একটি ‘অপেক্ষমাণ’ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিয়োগ কম হলেও বড় আকারে ছাঁটাইও দেখা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন নিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত রাখছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, বছরের প্রথমার্ধে চাকরি বৃদ্ধির হার সীমিত থাকবে এবং বেকারত্ব ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মন্দার ঝুঁকিও প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ১ লাখ ১৬ হাজার, যা সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। যদিও মূল্যস্ফীতি হ্রাস, সুদের হার কমানো এবং নতুন করনীতির কারণে চলতি বছরে শ্রমবাজারে উন্নতির আশা তৈরি হয়েছিল। তবে নতুন সংঘাত সেই সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার ‘স্থিতিশীল হলেও স্থবির’ অবস্থায় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।