জার্মানির রাজধানী বার্লিনে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ প্রাইড উৎসব ‘ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে (সিএসডি)’ উদযাপনের সময় জনতার ওপর একটি ভ্যান তুলে দেওয়ার ঘটনায় অন্তত একজন নিহত এবং অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন। ঘটনার পরপরই আয়োজকরা পুরো অনুষ্ঠান বাতিল ঘোষণা করেন এবং পুলিশ ব্যাপক অভিযান শুরু করে। শনিবার সন্ধ্যায় বার্লিনের টিয়ারগার্টেন পার্ক এলাকায়, প্রাইড শোভাযাত্রার নির্ধারিত পথের কাছাকাছি এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি সাদা ভ্যান হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে। পরে সেটি একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বার্লিন পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পরপরই এলাকাজুড়ে জরুরি উদ্ধার অভিযান চালানো হয় এবং জনগণকে ঘটনাস্থল এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়। হামলার উদ্দেশ্য ও ঘটনার পেছনে একাধিক ব্যক্তি জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। রোববার বার্লিন পুলিশ জানায়, তারা এ ঘটনায় সন্দেহভাজন একজনকে শনাক্ত করেছে। পুলিশের দাবি, ওই ব্যক্তি ইসলামপন্থী চরমপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে পূর্ব থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন। তবে সংবাদ প্রকাশ পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি এবং তাকে ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। বার্লিনের মেয়র কাই ভেগনার এ ঘটনাকে শহরের স্বাধীনতা ও সহনশীলতার ওপর ‘নৃশংস হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। প্রতিবছরের মতো এবারও ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে উপলক্ষে বার্লিনে কয়েক লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালের যুক্তরাষ্ট্রের স্টোনওয়াল আন্দোলনের স্মরণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান ইউরোপের অন্যতম বড় এলজিবিটিকিউ+ অধিকারভিত্তিক জনসমাবেশ হিসেবে পরিচিত। তবে এবারের হামলায় উৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই শোকে পরিণত হয়।
জার্মানির থুরিঙ্গিয়া অঙ্গরাজ্যের কামসডর্ফ এলাকায় একটি ফ্ল্যাটের সমপরিমাণ মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে ১৫টি বাড়িসহ পুরো একটি গ্রাম। সম্প্রতি প্রকাশিত ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২৪ হাজার বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই সম্পত্তিটির বিক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার ইউরো। বিক্রির জন্য নির্ধারিত এই বিশাল সম্পত্তিতে ১০০ বর্গমিটার আয়তনের ১৫টি একতলা ভবনের পাশাপাশি ৩০০ বর্গমিটারের একটি বড় প্রাক্তন ক্যান্টিন ভবন রয়েছে। সম্পত্তিটির বর্তমান মালিক ফ্রানৎস এবারিশ কেবল জমি বিক্রি করতে চান না, বরং এমন একজন ক্রেতা খুঁজছেন যিনি জায়গাটিকে নতুন করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেবেন। প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৪ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তদানীন্তন পূর্ব জার্মানির শিক্ষানবিশদের আবাসন ও পরবর্তীতে অবকাশযাপন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো এই গ্রামটি। দীর্ঘকাল পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার পর ২০১৪ সালে প্রকৃতির সান্নিধ্যে একটি অনন্য আবাসিক ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এবারিশ সম্পত্তিটি কিনে নেন। তবে বর্তমানে এই পুরো প্রকল্পটি একটি বড় প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হয়েছে। স্থানীয় জার্মান কর্তৃপক্ষের নিয়মানুসারে, দীর্ঘ সময় ধরে অব্যবহৃত থাকার কারণে জায়গাটির পূর্বের আবাসিক মর্যাদা বাতিল হয়ে গেছে। ফলে সেখানে নতুন করে কোনো স্থায়ী আবাসিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিশেষ অনুমোদন কিংবা সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রয়োজন পড়বে। মূলত অর্থসংকটের কারণে স্বাস্থ্যগ্রাম, ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরির নিজস্ব পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে না পেরে এটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন এবারিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৌতুকচ্ছলে ইলেকট্রিক গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ককেও এই প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য ও সতর্কবার্তা বেড়ে যাওয়ায় জার্মানির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ হুমকির পর্যায়ে’ উন্নীত করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট বলেছেন, এখন জার্মানিতে যেকোনো সময় হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে। শনিবার জার্মান সংবাদপত্র ভেল্ট আম জোনটাগে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ডোব্রিন্ট বলেন, আগে নিরাপত্তা ঝুঁকিকে ‘বিমূর্ত’ বা সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা হলেও নতুন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি এখন আরও গুরুতর বলে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমাদের দেশের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে।” সম্ভাব্য হুমকির লক্ষ্য হতে পারে জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তি। তবে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে আসন্ন হামলার তথ্য রয়েছে কি না, কিংবা সতর্কতার মাত্রা বাড়ানোর পর সাধারণ মানুষের চলাচল ও জনসমাগমে কী ধরনের অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি। রয়টার্সের অনুরোধের পরও জার্মান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সঙ্গে সঙ্গে কোনো মন্তব্য দেয়নি। ডোব্রিন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশীয় ও বিদেশি গোয়েন্দা সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য, সম্ভাব্য নাশকতা, গুপ্তচরবৃত্তি এবং হামলার প্রস্তুতির ইঙ্গিত বিবেচনা করেই নিরাপত্তা পরিস্থিতির নতুন মূল্যায়ন করা হয়েছে। তবে এই ঘোষণা দেশে জরুরি অবস্থা জারি বা কোনো নির্দিষ্ট হামলা অনিবার্য—এমন অর্থ বহন করে না। বরং কর্তৃপক্ষকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি ও বাড়তি সতর্কতা বজায় রাখতে বলা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জার্মানিতে একাধিক প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে পূর্বাঞ্চলীয় মাগডেবুর্গ শহরের একটি ঐতিহাসিক বড়দিনের বাজারে ভাড়া করা বিএমডব্লিউ গাড়ি নিয়ে মানুষের ভিড়ে উঠে পড়েন সৌদি আরবের এক চিকিৎসক। ওই ঘটনায় ছয়জন নিহত এবং কয়েকশ মানুষ আহত হন। গত মাসে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন জার্মানির একটি আদালত। এর আগে ২০২৪ সালে পশ্চিমাঞ্চলীয় সোলিঙ্গেন শহরের একটি উৎসবে ছুরি হামলায় তিনজন নিহত এবং আরও ১০ জন আহত হন। ইসলামিক স্টেটের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হামলাটি চালানোর অভিযোগে এক সিরীয় নাগরিককে গত বছর দোষী সাব্যস্ত করেন জার্মান আদালত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন সতর্কবার্তার পর দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সরকারি প্রতিষ্ঠান, জনসমাগম এবং নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে নজরদারি আরও জোরদার হতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের জন্য নতুন কোনো বিধিনিষেধ বা বিশেষ নির্দেশনা শনিবার পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়নি।
জানালা ভেঙে কেবিনের বায়ুচাপ কমে যাওয়ায় আতঙ্ক ছড়ায় রায়ানএয়ারের ফ্লাইটে। গুরুতর আহত যাত্রী হাসপাতালে, ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখছে আন্তর্জাতিক তদন্তকারী দল। গ্রিস থেকে জার্মানিগামী রায়ানএয়ারের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে মাঝ আকাশে জানালা ভেঙে এক যাত্রী প্রায় বাইরে ছিটকে পড়ছিলেন। শেষ মুহূর্তে তাঁর পা শক্ত করে ধরে এবং অন্য দুই যাত্রীর সহায়তায় তাঁকে ভেতরে টেনে এনে প্রাণে বাঁচান তাঁর স্ত্রী। ঘটনাটি গত শুক্রবার ঘটে। ভুক্তভোগী ৬১ বছর বয়সী লিউবিসা কারোভিচ স্ত্রী স্বেতলানা গ্রকোভিচের সঙ্গে গ্রিসের থেসালোনিকি থেকে জার্মানির মেমিংগেনে যাচ্ছিলেন। গ্রিসের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইআরটির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে গ্রকোভিচ জানান, তাঁর স্বামী প্রায় দুই মিনিট বুক পর্যন্ত উড়োজাহাজের বাইরে ঝুলে ছিলেন। তিনি বলেন, “আমি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পা শক্ত করে ধরে ফেলি। তখন শুধু মনে হচ্ছিল, যদি মরতে হয়, আমরা একসঙ্গেই মরব।” স্বেতলানার ভাষ্য, তাঁর স্বামীর পাশের আসনে বসা এক নারী যাত্রীর সহায়তায় এবং আরও একজনের সহযোগিতায় তাঁরা তিনজন মিলে কারোভিচকে কেবিনের ভেতরে টেনে আনেন। এ সময় উড়োজাহাজে অক্সিজেন মাস্ক নেমে আসে এবং যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঘটনাটির সময় বিস্ফোরণের মতো বিকট শব্দ শোনা যায়। এরপর কেবিনের ভেতরের বায়ুচাপ দ্রুত কমে যায় এবং উড়োজাহাজটি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রায় ৯ হাজার ফুট নিচে নেমে আসে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, কারোভিচের সিটবেল্ট বাঁধা থাকায় তিনি পুরোপুরি উড়োজাহাজের বাইরে ছিটকে পড়েননি। তাঁর মাথা ও কাঁধ কেবিনের বাইরে চলে গেলেও সিটবেল্ট এবং অন্য যাত্রীদের সহায়তায় তাঁকে ধরে রাখা সম্ভব হয়। স্বেতলানা জানান, তাঁর স্বামীর হাত গুরুতর জখম হয়েছে, শরীরে ঘর্ষণ ও পোড়ার মতো ক্ষত রয়েছে এবং ঘটনার ধাক্কায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন, “আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তিনি বেঁচে আছেন। এখন তিনি ঠিকমতো কথা বলতে পারছেন না, এমনকি পুরো ঘটনাটিও তাঁর মনে নেই।” রায়ানএয়ার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, থেসালোনিকি থেকে মেমিংগেনগামী তাদের একটি ফ্লাইটে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর একটি জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হলে উড়োজাহাজটি নিরাপদে ফিরে আসে। পরে এটি স্বাভাবিকভাবে অবতরণ করে এবং এক আহত যাত্রীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঘটনার কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে। ভুক্তভোগী পরিবারের নিয়োগ করা এক বিশেষজ্ঞের দাবি, ডান দিকের ইঞ্জিনের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে জানালায় আঘাত করায় এটি ভেঙে যায়। তবে তদন্তকারীরা এখনো এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেননি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, উড়োজাহাজটি ছিল বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের এবং এর বয়স প্রায় ১৮ বছর। ঘটনাটি উত্তর মেসিডোনিয়ার আকাশসীমায় ঘটায় সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে। লিউবিসা কারোভিচ বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে ইতালিতে স্বপ্নের ছুটি কাটাতে গিয়ে ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হয়েছেন ৩৬ বছর বয়সি স্টেফানি নামের এক নারী। গত অক্টোবরে বন্ধুদের সঙ্গে ইউরোপ ভ্রমণে যান পেশায় করপোরেট এক্সিকিউটিভ এই পর্যটক। বন্ধুরা দেশে ফিরে গেলেও ইতালির 'এক ইউরোতে বাড়ি' বিক্রির প্রকল্প এবং সিসিলির মার্সালার কাছে লো স্তাগনোন শহরে কাইটবোর্ডিংয়ের আকর্ষণে সেখানে থেকে যান তিনি। কিন্তু এই সিদ্ধান্তই তাকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেয়, যখন মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ভিন্ন দুই ব্যক্তির হাতে দুবার অপহরণের শিকার হন তিনি। স্থানীয় একদল কাইটবোর্ডারদের সঙ্গে একটি আড্ডায় যোগ দিয়েছিলেন স্টেফানি, যা প্রাথমিকভাবে বেশ স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। আড্ডা শেষে অন্য একটি বারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এক বিদেশি প্রবাসীর গাড়িতে ওঠেন তিনি। কিন্তু গাড়িতে ওঠার পরপরই চালক তীব্র গতিতে গাড়ি চালাতে শুরু করেন। স্টেফানি জানান, চালক সরু সিসিলিয়ান রাস্তায় ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করছিলেন। তিনি ভয় পেয়ে চালককে থামাতে অনুনয়-বিনয় ও চিৎকার করলেও চালক গাড়ির গতি আরও বাড়িয়ে দেন। এমনকি গাড়ির সামনের সিটে বসা ওই চালকের বন্ধুও পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে হতবাক হয়ে যান। উপায় না দেখে স্টেফানি চুপচাপ নিজের কাইটবোর্ড প্রশিক্ষককে নিজের লোকেশন পাঠিয়ে দেন। প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পর গাড়িটি একটি দেয়ালঘেরা কম্পাউন্ডে প্রবেশ করে। চালকের অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে এবং সামনের সিটে বসা বন্ধুটির কোনো প্রতিবাদ না দেখে স্টেফানি নিজেই বাঁচার পথ খুঁজতে থাকেন। গাড়ির দরজা আনলক করা আছে বুঝতে পেরেই তিনি গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে দৌড়াতে শুরু করেন। কেউ তাকে অনুসরণ করছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত একটি নিরাপদ জায়গায় লুকিয়ে থাকেন তিনি। কয়েক কিলোমিটার হাঁটার পর একটি শান্ত শহরে পৌঁছান স্টেফানি। সেখানে সতর্কবাতি জ্বালানো একটি গাড়িতে এক নিরাপত্তাকর্মীকে দেখতে পেয়ে ফোনের ট্রান্সলেশন অ্যাপ ব্যবহার করে তাকে সব ঘটনা খুলে বলেন। ওই নিরাপত্তাকর্মী তাকে হোটেলে পৌঁছে দিতে রাজি হন এবং নিজের বসকেও বিষয়টি ফোনে জানান। স্টেফানি ভেবেছিলেন তিনি এবার নিরাপদ। কিন্তু মাঝপথে ওই রক্ষী একটি গলিতে গাড়ি থামিয়ে ট্রান্সলেশন অ্যাপে লিখে স্টেফানিকে জিজ্ঞাসা করেন, 'তোমাকে যে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি, এর বিনিময়ে তুমি আমাকে কী দেবে?' বিপদের আভাস পেয়ে আবারও গাড়ির দরজা খুলে সোজা একটি আঙুরবাগানে দৌড়ে পালিয়ে যান স্টেফানি। এরপর আর কোনো পথচারীর ওপর ভরসা না করে তিনি নিজেই হোটেলের দিকে হাঁটতে শুরু করেন। পথে দূর থেকে কোনো গাড়ির হেডলাইট দেখলেই তিনি লুকিয়ে পড়তেন। এমনকি নিজের গতিপথের প্রমাণ রাখতে রাস্তার ধারের ভেন্ডিং মেশিন থেকে পানীয়ও কেনেন তিনি। অবশেষে নিরাপদে হোটেলে ফিরে পরদিন সারা দিন কেঁদে কাটান তিনি। এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে অন্যান্য পর্যটকদের সতর্ক করলেও স্টেফানি স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রথম অপহরণকারী ইতালীয় ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন ইউরোপীয় প্রবাসী।
চলতি গ্রীষ্মের শুরু থেকে গত জুন মাসের শেষ পর্যন্ত জার্মানিতে তীব্র দাবদাহ বা হিট ওয়েভে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৫ হাজার ১২০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বার্লিনভিত্তিক দেশটির শীর্ষ জনস্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান রবার্ট কখ ইনস্টিটিউট (আরকেআই) বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের জুনের এই মৃত্যুর সংখ্যা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত জার্মানিতে প্রতি বছর গরমে গড়ে ২ হাজার ৯০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু এবার মাত্র এক মাসের ব্যবধানেই সেই গড় সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। দেশটির ফেডারেল স্ট্যাটিস্টিক্যাল অফিস এবং জার্মান আবহাওয়া দপ্তরের (ডিডব্লিউডি) মৃত্যু ও আবহাওয়ার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে আরকেআই। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, গত ২২ থেকে ২৮ জুনের মধ্যবর্তী সপ্তাহে জার্মানির ওপর দিয়ে সবচেয়ে তীব্র দাবদাহ বয়ে যায় এবং ঠিক এই এক সপ্তাহেই রেকর্ড ৪ হাজার ৩১০ জন মানুষের মৃত্যু হয়। ওই সময়ে দেশের কিছু কিছু অঞ্চলের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর আগে এপ্রিল থেকে ২১ জুন পর্যন্ত ৮১০ জনের মৃত্যুর হিসাব পাওয়া গিয়েছিল, যার প্রায় সবই জুনের ১৫ থেকে ২১ তারিখের মধ্যে ঘটে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই তীব্র গরমে বয়স্ক মানুষরাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়েছেন। গত ২৮ জুন পর্যন্ত মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৯৫০ জনের বয়স ছিল ৮৫ বছর বা তার বেশি। এছাড়া ৭৫ থেকে ৮৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১ হাজার ৩২০ জন, ৬৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৫৫০ জন এবং ৬৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৩০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জার্মান আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আবহাওয়া রেকর্ড বা ইতিহাস পর্যালোচনায় ২০২৬ সালের জুন মাসটি ছিল দেশটির ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উষ্ণ জুন মাস। এর আগে কেবল ২০১৯ সালে এর চেয়ে বেশি গরম পড়েছিল। জুনের শেষের দিকে এই তাপদাহের কারণে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছিল এবং গত ২৭ জুন দেশের ৪৬টি আবহাওয়া স্টেশনে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি রেকর্ড করা হয়েছিল।
জার্মানির মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয় ইউরোপের প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বতন্ত্র ইসলামিক ধর্মতত্ত্ব (Islamic Theology) অনুষদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরুর লক্ষ্যে বর্তমানে নির্মাণাধীন ‘ক্যাম্পাস অব রিলিজিয়নস’-এ ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের অনুষদগুলোকে একই ক্যাম্পাসে একত্রিত করা হবে। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে (DW)-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিম জার্মানির মুনস্টার শহরে ২০২১ সাল থেকে ‘ক্যাম্পাস অব রিলিজিয়নস’-এর নির্মাণকাজ চলছে। নতুন এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে একাডেমিক সহযোগিতা, গবেষণা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার পরিবেশ তৈরি করা। নবগঠিত ইসলামিক ধর্মতত্ত্ব অনুষদের প্রতিষ্ঠাতা ডিন মোহানাদ খোরশিদে বলেন, এই উদ্যোগের অংশ হতে পারা তার জন্য অত্যন্ত গর্বের। মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৫ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফল হিসেবে এই অনুষদের প্রতিষ্ঠা তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তার মতে, নতুন অনুষদে ইসলামের উদার, গবেষণাভিত্তিক এবং মুক্তচিন্তার ব্যাখ্যা নিয়ে কাজ করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এর প্রভাব শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। খোরশিদে এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইসলামিক থিওলজি-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নতুন অনুষদ প্রতিষ্ঠার ফলে ইসলামিক ধর্মতত্ত্ব বিভাগ এখন নিজস্বভাবে পিএইচডি এবং অন্যান্য উচ্চতর গবেষণা ডিগ্রি প্রদান করতে পারবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুদান ও বিভিন্ন তহবিল পাওয়ার সুযোগও আরও বাড়বে। ২০১২ সালে মাত্র ১৫ জন শিক্ষার্থী এবং তিনজন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল সেন্টার ফর ইসলামিক থিওলজি। বর্তমানে সেখানে আটজন অধ্যাপক এবং ৫০ জনের বেশি শিক্ষক-কর্মকর্তা কাজ করছেন। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। জার্মানির সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে ইসলাম ধর্ম শিক্ষা সম্প্রসারণের ফলে দক্ষ শিক্ষকের চাহিদাও দ্রুত বেড়েছে। দেশটির সবচেয়ে জনবহুল অঙ্গরাজ্য নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়া-তে প্রায় তিন হাজার ইসলাম ধর্মের শিক্ষকের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৩০ জন। ফলে নতুন অনুষদটি শিক্ষক সংকট দূর করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। খোরশিদে জানান, ২০২৭ সাল থেকে ‘ইসলাম অ্যান্ড সোশ্যাল ওয়ার্ক’ নামে একটি নতুন স্নাতকোত্তর কোর্স চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এই কোর্সের মাধ্যমে যুব উন্নয়ন, হাসপাতালভিত্তিক ধর্মীয় পরামর্শ, প্রবীণদের সেবা এবং বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক খাতে দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করা হবে। নতুন অনুষদের নীতিমালায় ইসলাম ও গণতন্ত্রের সহাবস্থান, কোরআনের সমসাময়িক ও গবেষণাভিত্তিক ব্যাখ্যা এবং আন্তধর্মীয় সংলাপকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চরমপন্থা, ইসলামবাদ এবং ইহুদিবিদ্বেষের বিরোধিতার বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। খোরশিদে বলেন, অনুষদ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা প্রকাশের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়ায় এ উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। তার মতে, বিশ্বের অনেক মানুষ ইসলামের উদার ও গবেষণানির্ভর ব্যাখ্যার প্রতি আগ্রহী। দীর্ঘমেয়াদে মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ বৈশ্বিক ইসলামিক গবেষণা ও চিন্তাচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র নরবার্ট রবার্স বলেন, একই ক্যাম্পাসে খ্রিস্টান ও ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের অনুষদ প্রতিষ্ঠা আন্তধর্মীয় বোঝাপড়া এবং সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। অন্যদিকে জার্মানির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী আনেত্তে শাভান এই উদ্যোগকে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি ইউরোপে একাডেমিক ধর্মতত্ত্ব চর্চাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
নিজেদের নৌবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে জার্মানির একটি বিখ্যাত কনসোর্টিয়ামের কাছ থেকে ১২টি অত্যাধুনিক ও উচ্চপ্রযুক্তির সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ কেনার ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ এই সামরিক চুক্তির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। এই মেগা চুক্তিটি পাওয়ার জন্য জার্মানির থিসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস এবং দক্ষিণ কোরিয়ার হানভা ওশেন কোম্পানির মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছিল। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে জার্মানির কোম্পানিটি এই বিলিয়ন ডলারের লাভজনক সরকারি চুক্তিটি হাতিয়ে নিয়েছে। কানাডার নৌবাহিনীতে বর্তমানে যে ৪টি ভিক্টোরিয়া-শ্রেণীর সাবমেরিন আছে, সেগুলো ১৯৯৮ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে পুরনো কেনা হয়েছিল। দীর্ঘদিনের পুরনো এই ৪টি সাবমেরিনের মধ্যে ৩টিই বর্তমানে মেরামতের অধীনে রয়েছে। ফলে নিজেদের জলসীমার প্রতিরক্ষার জন্য এবারই প্রথম সম্পূর্ণ নতুন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাবমেরিন কিনতে যাচ্ছে কানাডা। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আগামীতে ন্যাটোর সাথে দেশটির সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নতুন কেনা এই সাবমেরিনগুলো মূলত আধুনিক স্টিলথ প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয়েছে, যার ফলে শত্রুপক্ষ সহজে এদের অবস্থান শনাক্ত করতে পারবে না। কানাডার উত্তর মেরু তথা আর্কটিক অঞ্চলের বিশাল জলসীমায় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা জোরদার করতে এগুলো ব্যবহার করা হবে। বিশেষ করে বরফে ঢাকা নর্থওয়েস্ট প্যাসেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত নৌপথে দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারি মিশন পরিচালনা করতে এই জার্মান সাবমেরিনগুলো দারুণ কার্যকর। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার তৈরি জাহাজগুলো আকারে বড় হলেও কানাডা শেষ পর্যন্ত জার্মানিকেই বেছে নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই ১২টি সাবমেরিন কেনার মূল খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি বা ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এই মেগা চুক্তির মধ্যে আগামী প্রায় অর্ধ শতাব্দীর রক্ষণাবেক্ষণ খরচও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদী এই পুরো প্রজেক্টের মোট বাজেট শেষ পর্যন্ত ৭ হাজার কোটি বা ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন করতে ফেডারেল সরকার ও জার্মান কোম্পানির মধ্যে আরও কয়েক বছর আলোচনা চলতে পারে। কানাডার ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টি দেশের প্রতিরক্ষা বাজেট ব্যাপকভাবে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ করা। সম্প্রতি দেশটি ন্যাটোর দীর্ঘদিনের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী জিডিপির ২ শতাংশ অর্জন করেছে। আমেরিকার ওপর সামরিক নির্ভরশীলতা কিছুটা কমিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক মজবুত করতেই কানাডা এই বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এর পাশাপাশি আমেরিকার কাছ থেকে ১৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার প্রতিশ্রুতিও বহাল রেখেছে ওটাওয়া।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের কোয়ালিশন সরকার তাদের দেশের সামরিক খাতের বাজেট বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধির একটি খসড়া প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। প্রস্তাবিত নতুন বাজেট অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৯৭০ কোটি ইউরো, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৫৩০ কোটি ডলার। বর্তমান বছরের তুলনায় এই বরাদ্দ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি। সোমবার দেশটির মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত এই খসড়া বাজেটে জার্মানির মোট ফেডারেল ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৪০ কোটি ইউরো। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই বিশাল বাজেটের একটি বড় অংশই ব্যয় করা হবে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং নতুন সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের পেছনে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, মূলত ন্যাটোর প্রতিরক্ষা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমে আসার সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালে দেশটির মূল সামরিক বাজেট যেখানে ৮ হাজার ২৭০ কোটি ইউরো ছিল, তা আগামী বছর এক লাফে অনেকখানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি ২০৩০ সালের মধ্যে এই ব্যয় ১ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি ইউরোতে নিয়ে যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির। নতুন এই খসড়া বাজেটে কেবল ইউক্রেনের জন্য সামরিক সহায়তা বাবদ ১ হাজার১৬০ কোটি ইউরো বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে এই বার্ষিক সহায়তার পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে ৮৫০ কোটি ইউরো করা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতের এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বড় অঙ্কের নতুন ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। কেবল আগামী বছরের মূল ফেডারেল বাজেটেই ১১ হাজার ৮৭০ কোটি ইউরোর নতুন ঋণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই খসড়া বাজেটটি চূড়ান্ত বাস্তবায়নের জন্য দেশটির পার্লামেন্টের অনুমোদন পেতে হবে।
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক আগমুহূর্তে এক সামরিক বিশ্লেষক সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের কারণে এই সামরিক জোটের ভেতরে গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক ফাটল তৈরি হচ্ছে। জার্মান প্রবীণ সামরিক বিশ্লেষক থমাস উইগোল্ড এক সাক্ষাৎকারে জানান, ট্রাম্প প্রশাসন প্রশাসনিকভাবে ন্যাটোকে দুর্বল করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোকে খুব দ্রুত এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাহ্যিকভাবে সামরিক পর্যায়ে সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও রাজনৈতিকভাবে ন্যাটোর পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়। এমনকি সম্প্রতি গত ২ জুলাই ইউরোপে নিয়োজিত মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেলকে হঠাৎ পরিবর্তন করার ঘটনা প্রমাণ করে যে, সামরিক ক্ষেত্রেও এখন আর আগের মতো সুসম্পর্ক নেই। এবারের আঙ্কারা সম্মেলনের মূল আলোচনাই হবে—যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের গুটিয়ে নেয়, তবে ইউরোপ কীভাবে নিজেদের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করবে। এই অনিশ্চয়তার মাঝেই জার্মানি ন্যাটোর ভেতরে আরও বড় দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। আঙ্কারা সম্মেলনে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এবং অন্যান্য ইউরোপীয় নেতারা ন্যাটোকে 'আরও বেশি ইউরোপ-বান্ধব' করার ব্যাপারে জোর দেবেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি চলে গেলেও জোটটি টিকে থাকতে পারে। ইতিমধ্যে গত ১২ মাসে ইউরোপীয় মিত্ররা তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউরো বাড়িয়েছে। এর মধ্যে কেবল জার্মানিই তার সামরিক ব্যয় ২৫ বিলিয়ন ইউরো বৃদ্ধি করে মোট ১২৪ বিলিয়ন ইউরোতে নিয়ে গেছে, যা ২০২২ সালের তুলনায় দ্বিগুণ। আঙ্কারার এই ৩৬তম শীর্ষ সম্মেলনটি ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং ইউরোপ-আমেরিকার মধ্যকার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
ড্রেসডেনে অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর কারখানা চালু করল ইনফিনিয়ন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য উন্নত চিপ উৎপাদনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। জার্মানির ড্রেসডেন শহরে বিশ্বের বৃহত্তম পাওয়ার সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন কারখানার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছে জার্মান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনফিনিয়ন টেকনোলজিস। প্রায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৫ বিলিয়ন ইউরো) ব্যয়ে নির্মিত এই কারখানাটি ইউরোপের চিপ শিল্পে অন্যতম বড় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নতুন কারখানাটি চালুর মাধ্যমে ইউরোপে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং শিল্প, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত হবে। ড্রেসডেনের এই কারখানাটি অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হবে। উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং উন্নত মান নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। ফলে উৎপাদনের গতি বাড়ার পাশাপাশি পণ্যের মানও আরও উন্নত হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জ্বালানির অপচয় কমানো এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারখানাটিতে মূলত পাওয়ার সেমিকন্ডাক্টর বা বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণকারী চিপ তৈরি করা হবে। এসব চিপ বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুশক্তি প্রকল্প, শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি, দ্রুতগতির চার্জিং ব্যবস্থা, আধুনিক বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যকেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়। বিদ্যুতের অপচয় কমিয়ে দক্ষতা বাড়াতে এই ধরনের চিপের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারের ফলে উন্নত ডেটা সেন্টারের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক যানবাহনের বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এসব খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে উচ্চক্ষমতার পাওয়ার সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন কারখানাটি সেই বাড়তি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ইনফিনিয়ন জানিয়েছে, এই প্রকল্পে প্রায় এক হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক এবং দক্ষ কারিগরি কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে ড্রেসডেন অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরেই সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং চিপ সংকটের অভিজ্ঞতার পর ইউরোপ নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ড্রেসডেনের এই নতুন কারখানাকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারখানাটি নির্মাণে জার্মান সরকার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিল্প উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ইউরোপে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের কৌশলগত প্রযুক্তিতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, আধুনিক শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির ওপর। তিনি বলেন, ড্রেসডেনের এই নতুন কারখানা শুধু জার্মানির জন্য নয়, সমগ্র ইউরোপের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানের পাশাপাশি ইউরোপও নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে একের পর এক নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক চিপ শিল্পে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে উঠছে। ড্রেসডেনের নতুন কারখানা চালুর মাধ্যমে ইউরোপের প্রযুক্তি খাত আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং স্মার্ট বিদ্যুৎ অবকাঠামোর দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত পাওয়ার সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে এই কারখানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে এটি জার্মানিকে উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে এবং ইউরোপের সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
চীনের ক্রমবর্ধমান শিল্প সক্ষমতা ও কম খরচে উৎপাদনের প্রতিযোগিতায় জার্মানির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি মাঝারি আকারের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো (মিটেলস্ট্যান্ড) বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। এর ফলে বহু প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করছে, উৎপাদন ব্যয় কমাতে বিদেশে কারখানা স্থানান্তর করছে এবং নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (WSJ)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জার্মানির বহু মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন দেশীয় উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। একসময় উচ্চমানের প্রকৌশল, যন্ত্রপাতি ও শিল্প প্রযুক্তিতে বিশ্ববাজারে আধিপত্য বজায় রাখা এসব প্রতিষ্ঠান এখন চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকে তীব্র মূল্য ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মুখোমুখি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শুধু চীনের কম উৎপাদন ব্যয়ই নয়, দেশটির দ্রুত প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সরকারি সহায়তাও জার্মান কোম্পানিগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে জার্মানিতে জ্বালানি ব্যয়, শ্রম ব্যয় এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প হিসেবে পূর্ব ইউরোপ, এশিয়া কিংবা উত্তর আমেরিকায় উৎপাদন স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। জার্মানির এই মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো দেশটির অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। এসব প্রতিষ্ঠানে লাখো মানুষ কর্মরত এবং রপ্তানি আয়ের বড় অংশও আসে এ খাত থেকে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগ স্থগিত করেছে, কোথাও কোথাও কর্মসংস্থান কমানোর পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক সূচকগুলোও দেখাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানির উৎপাদনশিল্প দীর্ঘ সময় ধরে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া, উচ্চ সুদের হার এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা শিল্পখাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ জার্মানির মানুষ শুধু উন্নত প্রযুক্তি, শিল্প বা বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাণের জন্যই পরিচিত নন। তাদের আরেকটি বড় পরিচয় হলো সুশৃঙ্খল আর্থিক পরিকল্পনা এবং নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস। বিভিন্ন আর্থিক জরিপে দেখা গেছে, জার্মানির অধিকাংশ মানুষ প্রতি মাসেই আয়ের একটি অংশ ভবিষ্যতের জন্য আলাদা করে রাখেন। অনেকেই মনে করেন, জার্মানরা হয়তো অতিরিক্ত কৃপণ। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। তারা অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে অর্থ ব্যয় করেন। ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনায় এই অভ্যাস তাদের অর্থনৈতিকভাবে আরও স্থিতিশীল থাকতে সাহায্য করে। বিশেষ করে প্রবাসীদের জন্যও জার্মানদের এই জীবনধারা অনুসরণ করা কার্যকর হতে পারে। জার্মানদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রয়োজন ছাড়া বাড়তি খরচ না করা। দৈনন্দিন কেনাকাটার ক্ষেত্রে তারা ব্র্যান্ডের চেয়ে গুরুত্ব দেন পণ্যের মান ও দামের ওপর। তাই অনেকেই নিয়মিত কেনাকাটা করেন লিডল, আলডি, পেনি কিংবা নেটোর মতো ডিসকাউন্ট সুপারমার্কেটে। একই মানের পণ্য তুলনামূলক কম দামে পাওয়ায় মাস শেষে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হয়। এছাড়া বাজারে যাওয়ার আগে তালিকা তৈরি করে তারা সাধারণত সেই তালিকার বাইরে অতিরিক্ত কিছু কেনেন না। অপ্রয়োজনীয় সাবস্ক্রিপশন বাতিল করাও তাদের আর্থিক শৃঙ্খলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যবহার না করলেও মাসের পর মাস বিভিন্ন অ্যাপ, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম বা জিমের সদস্যপদের জন্য অর্থ পরিশোধ করার প্রবণতা অনেক দেশে দেখা যায়। কিন্তু জার্মানিতে মানুষ নিয়মিত ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করে যেসব সেবা ব্যবহার করছেন না, সেগুলো দ্রুত বাতিল করে দেন। এতে ছোট ছোট অপ্রয়োজনীয় খরচ জমে বড় অঙ্কে পরিণত হওয়ার সুযোগ থাকে না। বিশ্বখ্যাত বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ কিংবা অডির মতো গাড়ির দেশ হলেও অনেক জার্মান প্রতিদিনের যাতায়াতে ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার করেন। উন্নত বাস, ট্রেন ও ট্রামের নেটওয়ার্কের কারণে কম খরচে সহজে চলাচল করা সম্ভব হয়। এতে জ্বালানি, পার্কিং, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বীমার মতো ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। প্রয়োজন হলে অনেকেই গাড়ি কেনার বদলে কার-শেয়ারিং সেবা ব্যবহার করেন। সঞ্চয়ের ক্ষেত্রেও তারা একটি কার্যকর পদ্ধতি অনুসরণ করেন। মাস শেষে যা অবশিষ্ট থাকে তা জমা না রেখে, বেতন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটি নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করে সঞ্চয় বা বিনিয়োগ হিসাবে স্থানান্তর করেন। জার্মানির অনেক ব্যাংক স্থায়ী স্বয়ংক্রিয় নির্দেশনার মাধ্যমে এই অর্থ নির্দিষ্ট সঞ্চয়ী হিসাব বা বিনিয়োগ তহবিলে পাঠানোর সুবিধা দেয়। ফলে প্রথমেই সঞ্চয় নিশ্চিত হয় এবং বাকি অর্থ দিয়ে পুরো মাসের বাজেট পরিচালনা করা সহজ হয়। পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থ সাশ্রয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়ার সংস্কৃতিও জার্মানদের মধ্যে লক্ষণীয়। দেশটিতে প্লাস্টিক ও কাঁচের বোতল কেনার সময় অতিরিক্ত একটি আমানত মূল্য পরিশোধ করতে হয়, যা ব্যবহারের পর নির্দিষ্ট মেশিনে বোতল ফেরত দিলে ফেরত পাওয়া যায়। অনেকেই এসব বোতল জমিয়ে রেখে পরে রিফান্ড নিয়ে দৈনন্দিন কেনাকাটায় ব্যবহার করেন। পাশাপাশি নতুন পণ্য কেনার পরিবর্তে ভালো মানের সেকেন্ড-হ্যান্ড আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক্স বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাও জার্মানদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, আয় যতই হোক, দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত সঞ্চয়, পরিকল্পিত ব্যয় এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। জার্মানদের এই অভ্যাস শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক স্থিতিশীলতাই বাড়ায় না, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ও তাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে সহায়তা করে। বিশেষ করে বিদেশে বসবাসরত অভিবাসীদের জন্যও এই অভ্যাসগুলো কার্যকর হতে পারে। নিয়মিত সঞ্চয়, পরিকল্পিত বাজেট এবং সচেতন ব্যয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করা অনেক সহজ হয়ে ওঠে।
জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও চরম অমানবিক ঘটনার জন্ম দিয়েছেন আয়ারল্যান্ড প্রবাসী ভারতীয় লেখিকা নিবেদিতা শুক্লা। প্রবাসে ভারতীয়দের বৈষম্যের শিকার হওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্ষেপ করে একটি লম্বা পোস্ট লিখতে গিয়ে তিনি নিজেই এক পাকিস্তানি নাগরিকের প্রতি যে বর্ণবাদী আচরণ করেছেন, তা এখন নেটদুনিয়ায় তীব্র সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নিজের অমানবিক আচরণের বয়ান নিজেই দিয়ে নেটিজেনদের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন ‘দ্য মোমেন্টোস অব রুনঝ’ বইয়ের এই লেখিকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিজের ১০ ঘণ্টার ট্রানজিটের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে নিবেদিতা জানান, বিমানবন্দরে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও ক্ষুধার্ত মনে হওয়া এক ব্যক্তিকে দেখে সহানুভূতিশীল হয়ে তিনি নিজের সঙ্গে থাকা খাবার নিয়ে ওই ব্যক্তির দিকে এগিয়ে যান। হিন্দিতে কথোপকথনের একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি জানান যে তিনি ডাবলিন থেকে এসেছেন এবং তার গন্তব্য পাকিস্তানের করাচি। লেখিকার দাবি, গন্তব্য ‘পাকিস্তান’ শোনার পরই তিনি ওই ব্যক্তিকে খাবার না দিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিজের আসনে ফিরে আসেন। এখানেই শেষ নয়, চরম অমানবিকতার পরিচয় দিয়ে তিনি নিজের পোস্টে ‘যা মর’ (যাও, গিয়ে মরো) শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে পোস্টটির ইতি টানেন। নিবেদিতা শুক্লার এই পোস্ট প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ইন্টারনেটে সমালোচনার ঝড় ওঠে। আশ্চর্যজনকভাবে, প্রবাসে নিজের পাসপোর্ট বা নাগরিকত্বের কারণে বৈষম্যের আক্ষেপ করা এই লেখিকা খোদ ভারতীয় নেটিজেনদেরই তোপের মুখে পড়েন। এক ভারতীয় ব্যবহারকারী কড়া সমালোচনা করে লেখেন যে, তিন প্যারাগ্রাফ ধরে পাসপোর্টের কারণে বৈষম্যের আক্ষেপ করে পরের মুহূর্তেই একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে তার পাসপোর্ট দিয়ে বিচার করেছেন লেখিকা; যা বৈষম্যের এক নিকৃষ্ট উদাহরণ। অনেকেই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণকে দায়ী করে মন্তব্য করেছেন যে, এ ধরনের ঘৃণ্য মানসিকতার কারণেই বিশ্বজুড়ে ভারতীয়দের অবহেলা ও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কেউ কেউ বিষয়টিকে মনস্তাত্ত্বিক ‘প্রোজেকশন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, লেখিকার অভিযোগগুলো মূলত তার নিজের চরিত্রের অন্ধকার দিকেরই স্বীকারোক্তি। অন্যদিকে, পাকিস্তানি নেটিজেনরাও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন, কোনো পাকিস্তানির তরফ থেকে এমন আচরণ তারা কখনো দেখেননি বা শোনেননি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এমন সংকীর্ণ মানসিকতা পরিহার করার পরামর্শ দিয়ে অনেকেই বলেছেন, পাসপোর্ট বা নাগরিকত্বের ঊর্ধ্বে উঠে বিমানবন্দরে সবাই সমমানের যাত্রী এবং মানবিকতাই হওয়া উচিত প্রথম পরিচয়। তবে নিজের দেশের মানুষই এমন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নেটিজেনদের একাংশ। সব মিলিয়ে নিবেদিতার এই পোস্টটি বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতা, বৈষম্য ও মানবিকতা নিয়ে এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
জার্মানিতে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে নদী, হ্রদ ও বিভিন্ন জলাশয়ে সাঁতার বা গোসল করতে গিয়ে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই পুরুষ, পাশাপাশি কয়েকজন কিশোরও রয়েছে। প্রচণ্ড গরম থেকে স্বস্তি পেতে পানিতে নামার সময় এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। জার্মানির লাইফ সেভিং অ্যাসোসিয়েশন DLRG (ডিএলআরজি) জানিয়েছে, গত শুক্রবার থেকে রোববার—মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে—সাঁতার কাটতে গিয়ে অন্তত ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগের দিন বৃহস্পতিবারও পৃথক সাতটি প্রাণঘাতী ঘটনার খবর পাওয়া যায়। তাপপ্রবাহ শুরু হওয়ার আগেই সংস্থাটি জনগণকে সতর্ক করে বলেছিল, অতিরিক্ত গরমের সময় নদী বা হ্রদে সাঁতার কাটাকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। তবুও সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে অনেকেই ঝুঁকি নিচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছে তারা। রোববার নিডারজ্যাক্সেন রাজ্যের পাইনে শহরের আইক্সার হ্রদ থেকে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিনে নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যের এখৎস হ্রদ থেকে উদ্ধার করা হয় ১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোরের লাশ, যিনি শুক্রবার নৌকা থেকে পানিতে পড়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন। ডিএলআরজি জানিয়েছে, তাদের পরিসংখ্যানে শুধুমাত্র যাদের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে, তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখনও কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে এলবে নদীতে এক সাঁতারু, স্যাক্সনির পোহল জলাধারে এক ব্যক্তি এবং বাডেন-ভুর্টেমবার্গের একটি খনির হ্রদে ২৮ বছর বয়সী এক যুবকের খোঁজ চলছে। পুলিশের তথ্যমতে, ওই যুবক রোববার কয়েকবার পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার পর হঠাৎ তলিয়ে যান। তার এক বন্ধু তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। পরে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরাও তাকে খুঁজে পাননি। দুর্ঘটনাস্থলের পানির গভীরতা ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিটার। এছাড়া নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়ার নেফেল হ্রদে ৩৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, কোলনের ফ্যুলিঙ্গার হ্রদে ২১ বছর বয়সী এক সাঁতারু, ভেসেল জেলায় ডুবে যাওয়া একটি রাবার বোটের আরোহী এবং বাল্টিক সাগরের শারবয়ৎস উপকূলে এক দূরপাল্লার সাঁতারুও নিখোঁজ রয়েছেন। ডিএলআরজির সভাপতি উটে ফগ্ট বলেন, “আমরা বারবার দেখছি, বিশেষ করে পুরুষেরা নিজেদের সক্ষমতাকে অতিমূল্যায়ন করেন এবং এমন ঝুঁকি নেন, যা সহজেই এড়ানো সম্ভব।” এদিকে জার্মানির আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, কয়েক দিনের তীব্র তাপপ্রবাহের পর আপাতত তাপমাত্রা কিছুটা কমেছে। তবে ১০ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে আবারও তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইউরোপজুড়ে তাপপ্রবাহের প্রভাবও ক্রমেই বাড়ছে। স্পেনের বার্সেলোনা শহরে ৫০০টির বেশি স্থানে ‘জলবায়ু-সুরক্ষা কেন্দ্র’ চালু করা হয়েছে, যেখানে মানুষ গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে পারে। অন্যদিকে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকদের জন্য বিশেষ টেলিফোন নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছে এবং তাপপ্রবাহের সময় মদ বিক্রিতে কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা World Health Organization (ডব্লিউএইচও)-এর ইউরোপীয় আঞ্চলিক পরিচালক হান্স ক্লুগে সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ভবিষ্যতের একটি ইঙ্গিত মাত্র। তার ভাষায়, “তাপপ্রবাহ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, এটি বারবার ফিরে আসা একটি সংকটে পরিণত হয়েছে।” ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহে ইউরোপজুড়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহেই এক হাজার ৩০০ জনের বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত সপ্তাহেই দেশটিতে প্রায় এক হাজার অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বড় অংশই ৬৫ বছরের বেশি বয়সী। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়ছে। অথচ এখনো অনেক দেশ এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারেনি। আগাম সতর্কবার্তা, শীতল আশ্রয়কেন্দ্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বহু প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বকাপ ফুটবলে দীর্ঘ ২০ বছর পর নকআউট পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ইকুয়েডর। শক্তিশালী জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে এই ঐতিহাসিক গৌরব নিশ্চিত করেছে দলটি। ২৬ জুন শুক্রবার গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে এই নাটকীয় জয়ের পর পুরো দেশজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। এই অবিস্মরণীয় অর্জনকে উদ্যাপন করতে ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া পরের দিনকে দেশটিতে সাধারণ জাতীয় ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় প্রেসিডেন্ট নোবোয়া খেলোয়াড় ও কোচদের বিশেষ ধন্যবাদ জানান। তিনি লিখেছেন, যারা সমালোচনা, অপমান আর কঠিন সময়ের পরও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন এবং পুরো দেশে এই বিশাল আনন্দ এনে দিয়েছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। তিনি একই সাথে পরের দিন ছুটি ঘোষণা করে ইকুয়েডরের দীর্ঘায়ু কামনা করেন। অথচ এই ম্যাচের শুরুটা ইকুয়েডরের জন্য ছিল একেবারেই দুঃস্বপ্নের মতো, কারণ খেলার মাত্র দ্বিতীয় মিনিটে গোল করে জার্মানিকে এগিয়ে নেন লেরয় সানে। তবে জার্মানির প্রথম গোলটি নিয়ে মাঠেই তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। গোলের ঠিক আগে আলেক্সান্ডার পাভলোভিচ ইকুয়েডরের মিডফিল্ডার পেদ্রো ভিতেকে উঁচু বুট দিয়ে আঘাত করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। ইকুয়েডরের খেলোয়াড়রা ফাউলের জোরালো প্রতিবাদ করলেও রেফারি টোরি পেনসো গোল বহাল রাখেন এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর এই বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। তবে সেই ধাক্কা সামলে দ্রুতই ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ায় ইকুয়েডর এবং সাত মিনিটের মধ্যে ভিতে জার্মানির কাছ থেকে বল কেড়ে নেন। এরপর নিলসন আঙ্গুলো বক্সের বাইরে থেকে একটি চমৎকার বাঁকানো শট নেন, যা পাভলোভিচের পায়ের ফাঁক দিয়ে সরাসরি জালে জড়ায়। এটি ছিল চলতি বিশ্বকাপে ইকুয়েডরের প্রথম গোল এবং টুর্নামেন্টে তাদের ৪০তম শটে আসা প্রথম সাফল্য। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে জার্মানি পেনাল্টির দাবি তুললেও ভিএআর পর্যালোচনার পর রেফারি সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেন, কারণ বিল্ড-আপের সময় সানে নিজেই ফাউল করেছিলেন। খেলার ৬৪ মিনিটে মাঠে আসেন কেভিন রদ্রিগেজ এবং ৭৭ মিনিটে একটি কর্নার থেকে তাঁর হেড ফ্লিক পেনাল্টি এলাকার ভেতরে চলে যায়। সেখানে সবার আগে পৌঁছে পা বাড়িয়ে বলটি জালে ঠেলে দেন গনজালো প্লাতা, যার ফলে ইকুয়েডর ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। শেষ ১০ মিনিট জার্মানি সমতার জন্য একের পর এক আক্রমণ করলেও ইকুয়েডর রক্ষণ গুটিয়ে প্রতিটি আক্রমণ প্রতিহত করে নাটকীয় এই জয় নিশ্চিত করে।
মানবাধিকার সংগঠন 'অ্যালায়েন্স অ্যাগেইনস্ট ইসলামোফোবিয়া অ্যান্ড অ্যান্টি-মুসলিম হেট' (ক্লেম)-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জার্মানিতে মুসলিম বিরোধী হামলা ও বৈষম্যের ঘটনা রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে। গত বুধবার প্রকাশিত সংগঠনটির বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর দেশটিতে ৪ হাজার ৯৬টি ইসলামবিদ্বেষী ঘটনার প্রামাণ্য নথি পাওয়া গেছে। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি, অর্থাৎ বছরজুড়ে দেশটিতে প্রতিদিন গড়ে ১১টিরও বেশি মুসলিম বিরোধী ঘটনা ঘটেছে। বার্লিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে 'ক্লেম'-এর সহ-পরিচালক রিমা হানানো জানান, এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল মৌখিক হামলার অভিযোগ, যার সংখ্যা ২ হাজার ৩৭৯টি (৬১ শতাংশ)। এরপরই রয়েছে ৮৪০টি বৈষম্যমূলক ঘটনা (২১.৫ শতাংশ) এবং শারীরিক নির্যাতন ও সম্পত্তি ধ্বংসের মতো ৬৮৯টি ক্ষতিকর আচরণের (১৭.৪ শতাংশ) ঘটনা। প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশটিতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের মাত্রাও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে দুটি হত্যাকাণ্ড, গুরুতর জখম বা হত্যাচেষ্টাসহ ২১৪টি শারীরিক আঘাতের ঘটনা এবং অন্তত পাঁচটি অগ্নিসংযোগের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রিমা হানানো বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেন, এসব বর্ণবাদী হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন মূলত নারীরা, যা মোট একক ভুক্তভোগীদের প্রায় ৬৪.৫ শতাংশ। এই সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবেলায় জার্মান সরকারকে ইসলামবিদ্বেষী বর্ণবাদের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি। একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, জার্মানিতে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ের এই সমস্যা সমাধানে দেশের রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছার ওপর আর বিন্দুমাত্র 'আস্থা নেই'। প্রায় সাড়ে ৮ কোটি জনসংখ্যার দেশ জার্মানিতে বর্তমানে প্রায় ৫৫ লাখ মুসলিম বসবাস করেন, যা ফ্রান্সের পর পশ্চিম ইউরোপে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে 'অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি' (এএফডি)-এর মতো কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন উগ্রবাদী আন্দোলনের প্রভাবে দেশটিতে মুসলিম বিরোধী বর্ণবাদ ও সহিংসতার মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জার্মানির বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যার ভবিষ্যৎ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০৯০-এর দশকের শুরুর দিকে অবসরের বয়সসীমা ধাপে ধাপে ৭০ বছর করার একটি নতুন সুপারিশে সমর্থন দিয়েছেন দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ। জার্মান পেনশন ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিশন মঙ্গলবার তাদের ৩৩ দফা সুপারিশ পেশ করার পর চ্যান্সেলর এই ঘোষণা দেন। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের ভঙ্গুর পেনশন ব্যবস্থাকে ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করা এবং তরুণ প্রজন্মের ওপর থেকে বিপুল আর্থিক চাপ কমিয়ে আনা। বর্তমানে জার্মানির নিয়ম অনুযায়ী ২০৩০-এর দশকের শুরুতে যারা অবসরে যাবেন, তাদের বয়সসীমা নির্ধারণ করা আছে ৬৭ বছর। তবে বিশেষজ্ঞ প্যানেল জানিয়েছে, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই বয়সসীমা পর্যায়ক্রমে বাড়াতে হবে, যা ২০৯০-এর দশকের মধ্যে ৭০ বছরে গিয়ে ঠেকবে। চ্যান্সেলর মের্জ আশ্বস্ত করে বলেছেন, "কোনো নাগরিকেরই উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।" এই সংস্কারের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক চুক্তি আরও জোরালো হবে এবং তরুণরা ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হতে পারবে। কমিশনের অন্যতম প্রধান সুপারিশ হলো—শ্রমিক ও নিয়োগকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবদানের অর্থ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা, যাতে তহবিলটির আর্থিক মূল্য সুরক্ষিত থাকে এবং বৃদ্ধি পায়। এছাড়া সিভিল সারভেন্ট বা সরকারি আমলা এবং স্বনির্ভর পেশাজীবীদেরও এই বাধ্যতামূলক পেনশন অবদানের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি, যারা একটানা ৪৫ বছর কাজ করার পর ৬৩ বছর বয়সে কোনো পেনশন কর্তন ছাড়াই আগাম অবসরের সুবিধা পেতেন, সেই বিশেষ সুযোগটি পুরোপুরি বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া জনসংখ্যার দেশগুলোর মধ্যে জার্মানি অন্যতম। বর্তমানে দেশটিতে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা কমছে, অন্যদিকে দীর্ঘজীবী অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তবে এই সংস্কারের কিছু প্রস্তাব নিয়ে ইতিমধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন এবং বামপন্থী জোটের সদস্যদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, আগাম অবসর বাতিলের সিদ্ধান্তটি নির্মাণ শ্রমিক বা কেয়ারারদের মতো কঠোর পরিশ্রমী ও স্বল্প আয়ের মানুষদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এছাড়া শেয়ার বাজারের ওপর পেনশনের নির্ভরতা জার্মানির সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ ভীতির কারণে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে তারা মনে করছেন। উল্লেখ্য, ১৮৮৯ সালে চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্কের হাত ধরে জার্মানিতে বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্রীয় পেনশন ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। সে সময় অবসরের বয়স ৭০ বছরই নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা তৎকালীন গড় আয়ুর তুলনায় অনেক বেশি ছিল। প্রায় দুই শতাব্দী পর, ২০২১ সালের পর জন্ম নেওয়া জার্মান নাগরিকদের জন্য অবসরের বয়স আবারও সেই ৭০ বছরেই ফিরে যেতে চলেছে। চ্যান্সেলর মের্জ আগামী মাসের সংসদীয় ছুটির আগেই এই ঐতিহাসিক সংস্কার বিলটি সংসদে পাস করার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনাদের স্থায়ী উপস্থিতির তীব্র বিরোধিতা করেছে জার্মানি। দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে না বলে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের দেওয়া এক বক্তব্যের পর সোমবার (২২ জুন) বার্লিন এই কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়। জার্মান সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, লেবাননের সার্বভৌমত্ব (স্বাধীন রাষ্ট্রীয় অধিকার) ক্ষুণ্ন করে সেখানে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। বার্লিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মার্টিন গিসে বলেন, "এ বিষয়ে ফেডারেল সরকারের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। আমরা লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনাদের স্থায়ী উপস্থিতির সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করছি। এর পাশাপাশি যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া লেবাননের বেসামরিক জনগণকে তাদের নিজস্ব ঘরবাড়িতে ফিরে যেতে বাধা দেওয়া যাবে না।" পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্যকে সমর্থন করে জার্মান সরকারের প্রধান মুখপাত্র স্টেফান কর্নেলিয়াস লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি বার্লিনের দৃঢ় সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এর আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছিলেন যে, লেবাননে সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর ‘কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা’ বা বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি বলেন, "প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং আমি আগেই স্পষ্ট করেছি যে, লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চল থেকে ইসরায়েল তার সেনা প্রত্যাহার করবে না।" মূলত গত শুক্র ও শনিবার দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননজুড়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ২০০টিরও বেশি বিমান হামলা চালানোর পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই বিতর্কিত মন্তব্য করেন। ইসরায়েলের এমন আগ্রাসী অবস্থানের মুখে জার্মানির এই বিবৃতি আন্তর্জাতিক মহলে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ীভাবে যুদ্ধবিরতি ও বৈরিতা অবসানের আহ্বান জানানো হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে লেবাননের অভ্যন্তরে ইসরায়েলি সেনা রেখে দেওয়ার এই জেদ আন্তর্জাতিক শান্তি প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে দুটি জাহাজ লোহিত সাগরের দিকে মোতায়েন করছে জার্মানি। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ন্যাটো সদস্যদেশগুলোর প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বৈঠক চলাকালীন জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ওয়াশিংটন ও তেহরানের সমঝোতার পর জলপথটিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার তোড়জোড় শুরু হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি নৌপরিবহন ও বীমা শিল্পের শীর্ষ কর্মকর্তারা হরমুজ প্রণালিতে জরুরি ভিত্তিতে মাইন অপসারণকারী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের জোরালো আহ্বান জানান। এই প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের মাইনসুইপার ‘ফুলদা’ এবং অন্য একটি জাহাজ ‘মোজেল’ সুয়েজ খাল অতিক্রম করে লোহিত সাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে এই সামরিক মিশন সফল করতে এবং মাইন অপসারণ অভিযানে সরাসরি অংশগ্রহণের আগে ইরান ও ওমানের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন হবে বলে তিনি জানান। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস জাহাজ মোতায়েনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা উল্লেখ করেননি। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এ ধরনের যেকোনো মিশনের ভবিষ্যৎ মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান দ্বিপাক্ষিক আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে। নৌপরিবহন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রণালিটি সম্পূর্ণভাবে মাইনমুক্ত করা সম্ভব না হলে ওই অঞ্চলে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় জার্মানি এই বিশেষ মিশনের জন্য পানির নিচে নিখুঁতভাবে পরিচালিত ড্রোন, মাইন অপসারণে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নৌবাহিনীর ডুবুরি এবং শক্তিশালী জাহাজ সুরক্ষা দলও পাঠাচ্ছে। এদিকে জলপথটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করতে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য যৌথভাবে একটি বহুজাতিক নৌ-মিশনের পরিকল্পনা করছে। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, ইরান এই জলপথে যেকোনো ধরনের বিদেশি সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে বরাবরই দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে আসছে। অন্যদিকে মাইন অপসারণ কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে নিজেদের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে গ্রিস সরকার। তবে দেশটির সরকারি মুখপাত্র পাভলোস মারিনাকিস বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানান, এই সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণের বিষয়ে গ্রিস প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সূত্র: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন কৌশলগত তৎপরতা শুরু হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে লোহিত সাগরে নৌবাহিনীর দুটি জাহাজ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জার্মানি। সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা অভিযানে দ্রুত অংশগ্রহণের প্রস্তুতি হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অবস্থানরত জার্মান নৌবাহিনীর মাইন অপসারণকারী জাহাজ ‘ফুলদা’ এবং সরবরাহকারী জাহাজ ‘মোজেল’ ইতোমধ্যে সুয়েজ খাল অতিক্রম করে লোহিত সাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, এটি মূলত একটি আগাম প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক কোনো অভিযান শুরু হলে যাতে জার্মানি দ্রুত সাড়া দিতে পারে, সে লক্ষ্যেই জাহাজ দুটি কৌশলগতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বরিস পিস্টোরিয়াস বলেন, “প্রয়োজন দেখা দিলে এবং আন্তর্জাতিকভাবে কোনো অভিযান শুরু হলে আমরা দ্রুত অংশ নিতে প্রস্তুত থাকব। আমাদের লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য সবচেয়ে কম সময়ে হরমুজ প্রণালিতে পৌঁছানোর সক্ষমতা নিশ্চিত করা।” বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে এই নৌপথের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। তবে যেকোনো সামরিক বা নৌ অভিযান পরিচালনার আগে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো এবং জার্মান পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। তিনি জানান, সম্ভাব্য কোনো আন্তর্জাতিক মিশনে অংশ নিতে হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমঝোতা হতে হবে। এরপর জাতিসংঘ বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেট জারি করা হলে জার্মান সরকার পার্লামেন্টে আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের আবেদন করবে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে বিভিন্ন দেশ বিকল্প নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, জার্মানির এই পদক্ষেপ শুধু সামরিক প্রস্তুতির অংশ নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বৃহত্তর কৌশলেরও অংশ। কারণ হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দামে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে। জার্মান সরকারের এই সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে বাড়তি উদ্বেগেরও ইঙ্গিত বহন করছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো সামরিক অভিযান শুরু হয়নি, তবুও সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে বার্লিন। এদিকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষায় সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। সেই বাস্তবতায় জার্মানির এই পদক্ষেপকে একটি কৌশলগত প্রস্তুতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।