- প্রচ্ছদ
- Topic
নেপাল
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিসের দুই অধ্যাপক নিখোঁজ রয়েছেন। ২৬ আগস্ট তিব্বত সীমান্তের কাছে বন্যা আঘাত হানার সময় হানুমান্থা রাও উননাভা ও তার স্ত্রী বাসুন্ধরা ‘বাসু’ উননাভা দেশটির তিমুরে এলাকায় একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন। এরপর থেকে তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। রাও উননাভা চলতি বছরের ১ জুলাই পর্যন্ত এক দশক ইউসি ডেভিসের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি সাব্বাটিক্যালে রয়েছেন এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে ফিরবেন। তার স্ত্রী বাসু একই স্কুলের অ্যাডজাঙ্ক্ট অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং মার্কেটিং পড়ান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দম্পতি অবসর-পরবর্তী একটি ভ্রমণে নেপালে গিয়েছিলেন। তাদের পরিকল্পনায় ছিল তিব্বতের কৈলাশ পর্বত সফর এবং এরপর ভারতে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো। বন্যার খবর পাওয়ার পর তাদের মেয়ে ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু বার্তা পৌঁছায়নি। ইউসি ডেভিস জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সংকট মোকাবিলা দলের সদস্যরা নেপালের কর্তৃপক্ষ এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের সন্ধানে কাজ করছেন। নিখোঁজ দম্পতির সন্তান ও পরিবারের সদস্যরাও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থাগুলোর সহায়তা চেয়েছেন। নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে। ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেপালি কর্তৃপক্ষের হিসাবে ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ এবং মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইউসি ডেভিস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাও ও বাসুকে নিরাপদে খুঁজে পাওয়ার আশা তারা এখনও ছাড়েনি।
নেপালে প্রলয়ংকরী বন্যার জেরে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে টানা নয় দিন আটকে থাকার পর অবশেষে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন এক কর্মী। ভয়ংকর সেই অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয় সাহ জানান, বন্যার পানি যখন সুড়ঙ্গে ঢুকতে শুরু করে, তখন তিনি তার সহকর্মীদের দ্রুত ওই স্থান থেকে পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে অন্যদের নিরাপদে সরিয়ে দিতে গিয়ে নিজে বের হওয়ার আর পর্যাপ্ত সময় পাননি তিনি। নিজের কর্তব্যের প্রতি অবিচল সঞ্জয় বলেন, বিপদের মুহূর্তে সহকর্মীদের ফেলে নিজে পালিয়ে যাওয়াটা তার কাছে কোনোভাবেই সঠিক মনে হয়নি; কারণ তার প্রধান দায়িত্বই ছিল অন্যদের জীবন রক্ষা করা। সুড়ঙ্গের ঘুটঘুটে অন্ধকারে কাটানো সেই দীর্ঘ নয় দিনের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, বেঁচে ফেরার আশা জাগিয়ে রাখতে তিনি অনবরত মন্ত্র জপ করতেন। সেই চরম প্রতিকূল ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেও সুড়ঙ্গের অন্য প্রান্তে আটকে থাকা আরও তিন-চারজন কর্মীর সঙ্গে কোনোমতে যোগাযোগ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ ও শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযানের পর অবশেষে সঞ্জয় সাহকে জীবিত অবস্থায় সুড়ঙ্গ থেকে বের করে আনা হয়। তার সঙ্গে উদ্ধার পাওয়া আরেকজন ভাগ্যবান কর্মী হলেন মেকানিক্যাল সুপারভাইজার কবির মহার্জন। নেপালের এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাঝে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে তাদের এই ফিরে আসা শুধু বেঁচে ফেরার গল্প নয়, বরং চরম বিপদের মুহূর্তে দায়িত্ববোধ ও অদম্য সাহসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে ঝুঁকিপূর্ণভাবে হেলিকপ্টার উড়িয়ে মাত্র ছয় দিনে প্রায় ১০০টি উদ্ধার অভিযান চালিয়েছেন দেশটির প্রথম নারী হেলিকপ্টার ক্যাপ্টেন প্রিয়া অধিকারী। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে তিমুরে এলাকায় সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার পর আকাশপথে দুর্গতদের সরিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ৪০ বছর বয়সী প্রিয়া অধিকারী উচ্চ উচ্চতায় উদ্ধার অভিযানে অভিজ্ঞ পাইলট। গত কয়েক দিনে তিমুরে ও আশপাশের দুর্গম এলাকায় প্রায় ২০টি হেলিকপ্টার একসঙ্গে উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। একই এলাকায় একাধিক হেলিকপ্টারকে প্রায় একই সময়ে অবতরণ ও উড্ডয়ন করতে হয়েছে। এ সময় পাইলটদের রেডিওতে নিয়মিত সমন্বয় করতে হয়েছে। উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ধসে পড়া পাহাড়ি মাটি ও কাদায় তৈরি অনিরাপদ ভূমি। অনেক জায়গায় মাটি এতটাই নরম ও অস্থিতিশীল ছিল যে হেলিকপ্টার নিরাপদে অবতরণ করে ইঞ্জিন বন্ধ করাও সম্ভব হয়নি। ফলে যাত্রীদের দ্রুত তুলে নিয়ে আবার উড্ডয়ন করতে হয়েছে। প্রিয়া অধিকারী জানিয়েছেন, এবারের দুর্যোগের ভয়াবহতা তার বহু বছরের অভিজ্ঞতাকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। তিমুরে এলাকায় তিনি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন, আবার একই সঙ্গে হেলিকপ্টারের অপেক্ষায় থাকা জীবিত মানুষকেও উদ্ধার করেছেন। প্রথম দুই দিনেই তিমুরে থেকে ২০০ জনের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। অধিকারীর বিমান চালনার যাত্রা শুরু হয় কিছুটা ভিন্নভাবে। পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার পর তিনি কেবিন ক্রু হিসেবে কাজ করেন। পরে হেলিকপ্টার চালানোর প্রতি আগ্রহ তৈরি হলে ফিলিপাইনে প্রশিক্ষণ নেন। ২০১৭ সালে পূর্ণকালীন হেলিকপ্টার পাইলট হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর উচ্চ উচ্চতায় উদ্ধার অভিযানে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। তার কয়েকটি উদ্ধার অভিযান প্রায় ৬ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পরিচালিত হয়েছে। নেপালে গত ২৬ আগস্ট শুরু হওয়া ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযানে হেলিকপ্টারই হয়ে উঠেছে প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম। আজও বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকাজ চলছে। প্রিয়া অধিকারী বলেন, টানা উদ্ধার অভিযানে পাইলটরা শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াই তাদের প্রশিক্ষণের অংশ। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও জীবিত মানুষকে হেলিকপ্টারের দিকে হাত নাড়তে দেখা তাদের আবারও আকাশে উড়তে অনুপ্রাণিত করেছে।
নেপালে ভয়াবহ বন্যায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া চারতলা একটি ভবন থেকে ১০ দিন পর ৬৪ বছর বয়সী এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার নুওয়াকোট জেলার বিদুর পৌরসভার বেত্রাবতী এলাকায় তাকে উদ্ধার করে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী। উদ্ধার হওয়া নারীর নাম চান্দিকা কুমারী শ্রেষ্ঠ। সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী জানিয়েছে, চারতলা ভবনের ওপরের তলায় আটকে ছিলেন তিনি। নয় সদস্যের একটি উদ্ধারকারী দল পরিদর্শক সুমন কুমার বিকের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে তাকে উদ্ধার করে। উদ্ধারের সময় চান্দিকা অচেতন অবস্থায় ছিলেন। পরে হেলিকপ্টারে করে তাকে ত্রিশুলিতে নেপালি সেনাবাহিনীর মৈথিলি ব্যারাকে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ভোটেকোশি নদীর ভয়াবহ বন্যার পর ১১তম দিনে এই উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। বন্যায় নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। একই দিনে নেপালের আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেল থেকেও ১০ দিন পর এক চীনা নাগরিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। চান্দিকা কুমারী শ্রেষ্ঠকে উদ্ধারের খবরটি প্রথম প্রকাশ করে কাডমান্ডু পোস্ট, যা পরে আরটিভি অনলাইনও প্রকাশ করে।
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহ ধসের নয় দিন পর ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল থেকে আরও এক শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে একই দুর্যোগের পর একজন শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল। এবার দ্বিতীয় শ্রমিকেরও জীবিত ফিরে আসার ঘটনায় দীর্ঘদিনের উদ্ধার অভিযানে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। শুক্রবার নেপালি সেনাবাহিনীর উদ্ধারকারী দল আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল থেকে শ্রমিক কবির মহার্জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে। এর আগে উদ্ধার করা হয়েছিল আরেক শ্রমিককে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো আরও মানুষ আটকা থাকতে পারেন—এমন আশায় তল্লাশি অব্যাহত রেখেছেন উদ্ধারকারীরা। গত ২৬ আগস্ট ত্রিশূলী নদীর উজানে ভয়াবহ হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটে। বরফ, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে নেমে আসে উপত্যকার দিকে। এতে বিস্তীর্ণ এলাকা বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি ঘরবাড়ি, সড়ক, স্কুল ও একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্যোগের সময় বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ ঢুকে পড়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলগুলোতে। এরপর থেকেই নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধানে মরিয়া হয়ে অভিযান শুরু করেন নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল। নয় দিন ধরে টানেলের ভেতরে জীবিতদের সন্ধান চালানোর পর শুক্রবার উদ্ধারকারীরা সাফল্যের মুখ দেখেন। একটি সরু পথ দিয়ে কবির মহার্জনকে টানেল থেকে বের করে আনা হয়। পরে তাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। এর আগে উদ্ধার করা শ্রমিকের ক্ষেত্রেও একইভাবে দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার পর জীবনের সন্ধান পাওয়া যায়। ফলে একের পর এক শ্রমিক জীবিত উদ্ধারের ঘটনায় উদ্ধারকারীদের মধ্যে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। এর আগে উদ্ধার হওয়া শ্রমিক সঞ্জয় সাহ ওই প্রকল্পের যান্ত্রিক ফোরম্যান হিসেবে কাজ করতেন। দুর্ঘটনার সময় সহকর্মীদের দ্রুত নিরাপদে বেরিয়ে যেতে বললেও তিনি নিজে নিয়ন্ত্রণকক্ষে থেকে যান। অন্যদের বের হওয়ার সুযোগ করে দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনিও টানেলের ভেতরে আটকা পড়েন। দীর্ঘ সময় অন্ধকারের মধ্যে আটকে থাকা সঞ্জয় সাহ উদ্ধারকারীদের জানান, টানেলের ভেতরে তিনি প্রার্থনার মন্ত্র পাঠ করে সময় কাটিয়েছেন। তার দাবি, টানেলের আরও গভীরে কয়েকজন মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল। ফলে সেখানে এখনো কেউ জীবিত থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন উদ্ধারকারীরা। এই তথ্যের পর টানেলের ভেতরে নতুন করে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আরও গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। নেপালি সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাশাপাশি ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞরাও উদ্ধারকাজে সহায়তা করছেন। ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপাল ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো নিখোঁজ। ধ্বংসস্তূপের নিচে ঠিক কতজন আটকা পড়ে আছেন, তারও সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে দুর্যোগের নয় দিন পর একের পর এক শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করার ঘটনা উদ্ধারকারীদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সময় যতই গড়াক, ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কেউ বেঁচে থাকতে পারেন—এই আশায় অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। নয় দিনের অন্ধকার পেরিয়ে একের পর এক জীবিত মানুষ ফিরে আসার ঘটনা যেন নেপালের বিধ্বস্ত উপত্যকায় নতুন করে আশার আলো জ্বালিয়েছে।
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের নয় দিন পর রাশুয়া জেলার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের ভেতর থেকে একাধিক মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা গেছে। শুক্রবার উদ্ধারকারী দল টানেলের ভেতর থেকে সাড়া পাওয়ার পর সেখানে আটকে থাকা শ্রমিকদের জীবিত থাকার সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে। নেপালি সেনা ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা এখন টানেলের ভেতরে ঢুকে উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করেছেন। স্থানীয় কর্মকর্তা ও উদ্ধার অভিযানে যুক্ত প্রকৌশলী এবং সংসদ সদস্য শ্রী রাম নিউপানে জানিয়েছেন, উদ্ধারকারীরা ভেতর থেকে একাধিক মানুষের কণ্ঠস্বর শুনেছেন। উদ্ধারকারীরা টানেলের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য আশ্বস্ত করলে ভেতর থেকে ‘ঠিক আছে’ ধরনের সাড়া পাওয়া যায়। বিষয়টিকে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে একটি গুরুত্বপূর্ণ আশার সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২৬ আগস্ট ভোতে কোশি নদীতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর রাশুয়া ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়। পানির সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করে। এরপর থেকেই এসব প্রকল্পের ভেতরে আটকে পড়া শত শত শ্রমিকের সন্ধানে অভিযান চলছে। ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পে উদ্ধার অভিযান বিশেষভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে। টানেলের প্রবেশপথের বড় অংশ কাদা ও ধ্বংসাবশেষে আটকে আছে এবং ভেতরে পানি প্রবেশের ঝুঁকিও রয়েছে। কয়েক দিন ধরে উদ্ধারকারী দল ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পথ পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে। আগে সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, টানেলের অন্য একটি অংশ দিয়ে প্রবেশ করা সম্ভব না হওয়ায় বিকল্প পথ তৈরির চেষ্টা চলছে। নেপালের অন্যান্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেও বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৯০০ শ্রমিকের অবস্থান এখনো নিশ্চিত নয় এবং কয়েকটি টানেলে কয়েকশ শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন। উদ্ধার অভিযানে ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞ দলও সহায়তা করছে। কাদা, পাথর, পানির প্রবাহ, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে টানেলের ভেতর থেকে মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যাওয়ার খবর নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছে। টানেল বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্সও বলেছেন, ভূগর্ভস্থ টানেলের ভেতরে বিপর্যয়ের পরও মানুষ দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। তাই নেপালি উদ্ধারকারীরা এখনো অভিযানকে উদ্ধার অভিযান হিসেবেই চালিয়ে যাচ্ছেন।
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালের দেয়ালে টাঙানো শত শত ছবির সামনে ভিড় করছেন স্বজনরা। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পাশাপাশি পরিচয় শনাক্ত না হওয়া মরদেহের ছবিও সেখানে রাখা হয়েছে। গত সপ্তাহে হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় নেপালে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এখনো ৪ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্যোগের এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ায় নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালের বাইরে দেয়ালে টাঙানো এসব ছবির সামনে প্রতিদিনই ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষ। কেউ ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন স্বজনের মুখ, আবার কেউ নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে জানতে চাইছেন, তাদের নিখোঁজ আত্মীয়ের কোনো সন্ধান পাওয়া গেছে কি না। নিখোঁজ চাচাতো বোনের সন্ধানে প্রতিদিন হাসপাতালে আসছেন স্বাতী সিগদেল। তিনি বলেন, ‘তিন দিন আগে আমরা এখানে ওর ছবি লাগিয়েছি। কিন্তু এখনও কোনো খবর পাইনি।’ কিছু ছবি নিখোঁজ ব্যক্তিদের নাম, পরিচয় ও যোগাযোগের নম্বরসহ পোস্টারে লাগানো হয়েছে। আবার কোনো কোনো ছবির নিচে হাতে লেখা হয়েছে নিখোঁজ ব্যক্তির পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য। একটি ছবিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা এক দম্পতির মাথার ওপরে বড় করে ‘নিখোঁজ’ লেখা রয়েছে। অন্য একটি ছবিতে এক তরুণের ছবি দেওয়ার পাশাপাশি তার বাম হাতের ট্যাটুর ছবিও রাখা হয়েছে, যাতে সহজে তাকে শনাক্ত করা যায়। স্বপ্না নেউপানে নামের এক নারী বলেন, ‘আমরা একটি অলৌকিক ঘটনার আশায় আছি।’ তার মামার পরিবারের চার সদস্য নিখোঁজ। তিনি বলেন, ‘এই দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার ছবি দেখা খুবই কঠিন।’ এদিকে প্রায় ৯০০ মানুষ বিভিন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারী দল নিখোঁজদের সন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তবে অনেক পরিবার ইতোমধ্যে স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। কাঠমান্ডুর বাগমতী নদীর তীরে পশুপতিনাথ মন্দিরে এমন কয়েকটি পরিবার নিখোঁজ স্বজনদের প্রতিকৃতি তৈরি করে শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছে। এমনই একটি পরিবার ২১ বছর বয়সী সাবিনের প্রতিকৃতি তৈরি করে ধর্মীয় আচার পালন করে। হিন্দু পুরোহিত মন্ত্র পাঠ করার সময় পরিবারের সদস্যরা প্রতিকৃতিতে পানি ঢালেন। পরে চিতায় আগুন দেওয়া হয়। সাধারণত মৃত ব্যক্তির জন্যই এ ধরনের ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। তবে হাসপাতালের ‘ছবির দেয়ালের’ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্বাতী সিগদেল এখনো আশা হারাননি। গত সোমবার থেকে প্রতিদিন সেখানে আসছেন তিনি। সিগদেল বলেন, ‘কোনো খবর পাওয়ার আশায় আমি প্রতিদিন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের নিয়ে এখানে আসি।’ নেপালের এই ‘ছবির দেয়াল’ এখন নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে থাকা অসংখ্য পরিবারের কাছে শেষ আশ্রয় হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন নতুন ছবি যুক্ত হচ্ছে সেখানে, আর প্রতিটি ছবির সামনে দাঁড়িয়ে স্বজনরা খুঁজছেন একটি পরিচিত মুখ—হয়তো মিলবে প্রিয় মানুষটির কোনো সন্ধান।
গত ২৬ আগস্ট নেপালে ভয়াবহ বন্যার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন ১৯ বছর বয়সী তরুণ বিনোদ। রাসুয়া জেলার একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিকের কাজ করতেন তিনি। ছেলের সন্ধানে চোখেমুখে ক্লান্তি ও বিষাদ নিয়ে মাইলের পর মাইল পাহাড়ি পথ হেঁটে চলেছেন প্রায় ৫০ বছর বয়সী টালকা সদা। সমতলভূমির জেলা সপ্তরীর বাসিন্দা সদার একমাত্র ছেলে বিনোদের সঙ্গে ওই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে থাকা ১৭ থেকে ১৯ বছর বয়সী আরও চার তরুণের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়িতে শোকাহত স্ত্রীর কান্না ও নিজের বুক ফাটা হাহাকার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছেন এই বাবা। ছেলের খোঁজে বের হওয়ার জন্য চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে সদাকে। প্রতি ১০০ রুপিতে ২০ রুপি সুদের শর্তে মাত্র ২ হাজার নেপালি রুপি ধার করে ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়েছেন তিনি। প্রথমে বাসে করে ৯ ঘণ্টার দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছান রাজধানী কাঠমান্ডুতে। বন্যার পর অনেককে সেখানে বিমানে করে নেওয়া হয়েছিল বলে প্রথমে বিভিন্ন হাসপাতাল ও মর্গে বেঁচে যাওয়া মানুষ এবং লাশের তালিকায় ছেলেকে খুঁজেছেন সদা। মর্গের বাইরে রাখা বিকৃত ও শনাক্তকরণের অনুপযোগী লাশের ছবিগুলোর ভিড়েও তন্নতন্ন করে খুঁজেছেন সন্তানকে, তবে কোনো খোঁজ মেলেনি। কাঠমান্ডুতে সন্ধান না পেয়ে বিনোদের কর্মস্থলের নিকটবর্তী জেলা নুয়াকোটের দিকে হেঁটে রওনা দেন দুই ভাই। ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে টানা কয়েক ঘণ্টা হাঁটার পর ত্রিশূলী শহরে পৌঁছান তারা। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে একটি কমলা রঙের পলিথিনকে রেইনকোট হিসেবে ব্যবহার করছেন সদা। ত্রিশূলীতে একটি লজে থাকতে গিয়ে ধার করা টাকার ১ হাজার ৫০০ রুপিই খরচ হয়ে যায়, বিনিময়ে জোটে কেবল এক বাটি ভাত। ক্ষুধা ও ক্লান্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থ ফুরিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক, যা তাদের বাড়ি ফেরা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অসংখ্যবার ছেলের মুঠোফোনে কল করেও কোনো সাড়া পাননি সদা। চরম অসহায়ত্বের মাঝেও তিনি অলৌকিক কিছুর আশায় বুক বাঁধছেন, হয়তো ছেলে দৌড়ে কোথাও আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই বাস্তবতার কঠিন ধাক্কায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। অন্তত ছেলের কর্মস্থলে না পৌঁছানো পর্যন্ত হাল ছাড়তে রাজি নন এই বাবা। তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে পুনরায় রওনা দেওয়ার সময় চরম ক্ষোভ ও হতাশায় তিনি চিৎকার করে জানান, কেউ সাহায্য না করলে বা জবাব না দিলে তিনি থানায় আগুন ধরিয়ে দেবেন। এক অসহায় বাবার এই হুঁশিয়ারি মূলত সন্তান হারানোর তীব্র যন্ত্রণারই বহিঃপ্রকাশ।
নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হিমবাহ ধস ও ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। গত ২৬ আগস্ট শুরু হওয়া এই প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত এক হাজার তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৩ হাজার ৯১৬ জন। উচ্চভূমি থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, বরফশীতল পানি, পাথর ও কাদার স্রোতে মুহূর্তের মধ্যে ভেসে গেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি ও জনপদ। চারদিকে শুধু স্বজনহারা মানুষের কান্না আর ধ্বংসস্তূপের চিত্র, যা পুরো এলাকাকে এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে। বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় মৃতদেহ শনাক্ত করা এবং ধর্মীয় রীতি মেনে পৃথকভাবে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষ নিহতদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর গণকবরের মাধ্যমে দাফন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। চিতওয়ান জেলায় এরই মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের চিরায়ত দাহ ও প্রার্থনার রীতির বদলে এই গণকবরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুর্যোগের ভয়াবহতার সবচেয়ে মর্মান্তিক চিত্রটি দেখা গেছে নুয়াকোট জেলায়। সেখানে দুর্গম এলাকায় ড্রোন দিয়ে তল্লাশি চালানোর সময় পুলিশ একটি মাত্র বাড়ির ভেতর থেকেই ২৪টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। হিমালয়ঘেঁষা এই বিপর্যয়ের ভয়াবহ প্রভাব কেবল নেপালের সীমানাতেই আটকে নেই; নদীর ভাটির স্রোতে ভেসে যাওয়া অন্তত ১৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ এই ভয়াবহ দুর্যোগকে ‘অকল্পনীয় ও হৃদয়বিদারক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় উদ্ধারকাজ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে এবং উদ্ধার তৎপরতায় আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে গেছে ভারতীয় ব্যবসায়ী অশোক কুমার চৌরাসিয়ার দুই দশকের গড়ে তোলা ব্যবসা ও বসতবাড়ি। উত্তর প্রদেশের বলিয়া জেলার এই ব্যবসায়ী নুওয়াকোটের ত্রিশুলি বাজারে দীর্ঘদিন ধরে পোশাকের ব্যবসা করছিলেন। ২৬ আগস্টের আকস্মিক বন্যায় তার বাড়ি, দোকান ও গুদাম পানির স্রোতে ভেসে যায়। পরিবারের সদস্যরা কোনোভাবে উঁচু স্থানে গিয়ে প্রাণে বাঁচলেও তাদের হাতে অবশিষ্ট ছিল প্রায় শুধু পরনের কাপড়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অশোক ও তার ভাই পান্না লাল প্রায় চার দশক ধরে নেপালে পোশাকের ব্যবসা করছিলেন। ত্রিশুলি এলাকায় তাদের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল। বন্যার সময় অশোক তার মেয়েকে ফোন করে পরিস্থিতির ভয়াবহতার কথা জানান। এরপর প্রায় ২৪ ঘণ্টা তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, বন্যার পানিতে অশোকের বাড়ি, দোকান ও গুদাম ভেসে গেছে। শুধু ব্যবসা ও সম্পদ নয়, দুর্যোগের পর খাবার ও নিরাপদ পানীয় জলের মতো মৌলিক প্রয়োজনীয়তাও সংকটে পড়ে পরিবারটি। অশোকের মেয়ে জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত বাবার খোঁজ পাওয়া সম্ভব হয়। অশোকের পরিবারের আরও সদস্যও বন্যায় বিপদে পড়েন। তার ভাই পান্না লাল ও তার পরিবারও ত্রিশুলিতে বসবাস করতেন। বন্যার পর পরিবারের কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেলেও অশোকের ভাইয়ের স্ত্রী উষা দেবী এবং তার ছেলে রাহুলের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না বলে ২৯ আগস্টের প্রতিবেদনে জানানো হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টিভিকে অশোক জানিয়েছেন, ত্রিশুলি বাজারে তার সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং পরিবারের দুই সদস্য পানির স্রোতে ভেসে গেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এমনকি বন্যার পর তিনি যে পোশাকটি পরেছিলেন, সেটিও অন্যের কাছ থেকে ধার করা। প্রতিবেদনে তার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৫ কোটি ভারতীয় রুপি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই অঙ্কের স্বাধীন সরকারি যাচাই পাওয়া যায়নি। নিশ্চিতভাবে যা জানা গেছে, তা হলো কয়েক দশকের ব্যবসা, বাড়ি ও গুদাম হারিয়ে পরিবারটি এখন চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে। নেপালের এই বন্যা শুধু অবকাঠামো ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই ধ্বংস করেনি, বহু পরিবারের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও জীবিকার ভিত্তিও মুহূর্তের মধ্যে কেড়ে নিয়েছে। অশোক চৌরাসিয়ার ঘটনা সেই ক্ষয়ক্ষতিরই একটি করুণ উদাহরণ।
নেপালে চীন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আঘাত হানা ভয়াবহ হড়পা বান বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডে নিহতের সংখ্যা এরই মধ্যে ৯০০ ছাড়িয়েছে। তবে এই প্রাণহানির সংখ্যা অনায়াসেই দ্বিগুণ হতে পারত, যদি না নুয়াকোটের ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ রাজেন্দ্র দাওয়াদি সঠিক সময়ে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিতেন। তাঁর মাত্র কয়েক মিনিটের ত্বরিত পদক্ষেপে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে ওই স্কুলের প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থী। গত বুধবার (২৬ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে বন্যার বিষয়ে সতর্ক করে অধ্যক্ষ রাজেন্দ্রর কাছে পরপর চারটি ফোন আসে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে বানের আঘাত হানার মাত্র ১০ মিনিট আগে তিনি পুরো স্কুল খালি করার নির্দেশ দেন। যে বাসগুলো শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্কুলের দিকে আসছিল, সেগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে ঘুরিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আর যেসব শিশু ততক্ষণে স্কুলে পৌঁছে গিয়েছিল, তাদের দ্রুত উঁচু স্থানে দৌড়ে আশ্রয় নিতে বলেন তিনি। এক অভিভাবক এসে যখন তাঁর মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার তাগিদ দেন, তখন পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অধ্যক্ষ রাজেন্দ্র দাওয়াদির মতে, সিদ্ধান্ত নিতে সামান্য দেরি হলেই ঘটে যেত চরম বিপর্যয়। বিবিসির কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "আমরা যদি দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিতাম, যদি আর মাত্র ১০ মিনিট দেরি হতো, তবে আমি ও আমার শিক্ষার্থীরা আজ আপনাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য বেঁচে থাকতাম না।" এক শিক্ষার্থীও গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছে যে, তারা আক্ষরিক অর্থেই মাত্র ১০ সেকেন্ডের ব্যবধানে প্রাণে বেঁচে ফিরেছে। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাঝে অধ্যক্ষের এই উপস্থিত বুদ্ধি ও দায়িত্ববোধ এখন চারদিকে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।
নেপালে গত সপ্তাহে আঘাত হানা ভয়াবহ বন্যার পর ৩৯টি দেশের অন্তত ৫৯০ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। তিব্বতে গত সপ্তাহে আঘাত হানা ভয়াবহ বন্যার পর নেপালেও এর প্রভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পর থেকে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকরা ৩৯টি দেশের নাগরিক। তাদের মধ্যে মোট অন্তত ৫৯০ জনের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। বন্যার পর নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্ধার কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে কোন দেশের কতজন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন, সে বিষয়ে দেওয়া তথ্যে বিস্তারিত জানানো হয়নি। ভয়াবহ বন্যার পর নেপালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের সন্ধান এবং তাদের অবস্থান শনাক্ত করতেও কাজ চলছে।
নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ছোট এক শিশুকে তার বোনকে পিঠে নিয়ে ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। মুখে আঘাতের চিহ্ন নিয়েও ছোট বোনকে আগলে রাখার ভাইয়ের দৃশ্যটি দর্শকদের মনে করিয়ে দিচ্ছে জাপানি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘গ্রেভ অব দ্য ফায়ারফ্লাইস’-এর ভাইবোনের করুণ কাহিনি। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, বিপর্যস্ত পরিবেশের মধ্যে শিশুটি তার ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। দুই শিশুর মুখেই আঁচড় ও আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। ভাইরাল পোস্টগুলোতে দাবি করা হচ্ছে, বন্যার মধ্যে তারা বাবা-মাকে খুঁজছিল। ভিডিওটি ৩০ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আবেগ তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ছোট বোনকে রক্ষা করতে বড় ভাইয়ের নিরন্তর চেষ্টা। দুর্যোগের ভয়াবহতার মধ্যেও ভাইবোনের এই দৃশ্য অনেকের কাছে যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের মধ্যে একে অপরকে আগলে রাখা ‘গ্রেভ অব দ্য ফায়ারফ্লাইস’-এর সেতা ও সেতসুকোর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। ১৯৮৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘গ্রেভ অব দ্য ফায়ারফ্লাইস’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানে এক ভাই ও তার ছোট বোনের বেঁচে থাকার সংগ্রামের গল্প। বাবা-মাকে হারানোর পর ভাই সেতা তার ছোট বোন সেতসুকোকে আগলে রাখার চেষ্টা করে। চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকগুলোর একটি হলো, ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও ভাইয়ের বোনকে রক্ষা করার চেষ্টা। নেপালের ভাইরাল ভিডিওর ঘটনাটি অবশ্য চলচ্চিত্রটির গল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। ভিডিওতে থাকা শিশুদের পরিচয়, তাদের বাবা-মায়ের বর্তমান অবস্থা কিংবা তারা সত্যিই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল কি না, এসব তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। তবে নেপালের সাম্প্রতিক বন্যায় শিশুদের ঝুঁকির বিষয়টি বাস্তব। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগে অন্তত ১৭ হাজার শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক শিশু পরিবার বা অভিভাবকের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। শিশুদের শনাক্ত করে পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের কাজও চলছে। বন্যার পর দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ভাইরাল ভিডিওটির সত্যতা ও শিশু দুটির পরিচয় নিয়ে নিশ্চিত তথ্য না থাকলেও, ছোট বোনকে আগলে রাখা ভাইয়ের দৃশ্যটি নেপালের দুর্যোগে শিশুদের অসহায়ত্ব এবং পারস্পরিক নির্ভরতার এক গভীর প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। আর সেই কারণেই দৃশ্যটি অনেকের মনে ‘গ্রেভ অব দ্য ফায়ারফ্লাইস’-এর সেই করুণ ভাইবোনের গল্পের প্রতিধ্বনি তৈরি করেছে।
নেপালের রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ বন্যার তাণ্ডবের পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে টানা তিন দিন পর ছয় বছরের এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। সম্প্রতি ভোতে কোশি নদীর পানি উপচে জেলার তিমুরে গ্রামে আকস্মিক ও ভয়ংকর বন্যা দেখা দেয়। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে শুক্রবার সন্ধ্যায় কাদামাটি ও আবর্জনার নিচ থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করেন নেপালের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (এপিএফ) সদস্যরা। উদ্ধারকাজ পরিচালনার সময় মাটির নিচ থেকে ক্ষীণ কান্নার শব্দ শুনতে পান তারা। এরপর দ্রুত ও সতর্কতার সঙ্গে খননকাজ চালিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শিশুটিকে নিরাপদে বের করে আনা হয়। অলৌকিক এই উদ্ধারের ভিডিওটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে নেটিজেনরা উদ্ধারকর্মীদের অসীম সাহসিকতার ব্যাপক প্রশংসা করছেন। উদ্ধারের পর জানা যায়, সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরা এই শিশুটির নাম মানিশা মাগার। বর্তমানে কর্তৃপক্ষ তার পরিবার ও স্বজনদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। উদ্ধারের পরপরই তিমুরেতে এপিএফের সীমান্ত চৌকিতে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য শুক্রবার সন্ধ্যায় তাকে হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডু নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। খারাপ আবহাওয়া ও দৃষ্টিসীমা কম থাকায় সেদিন তা সম্ভব হয়নি। পরদিন শনিবার দুপুরে আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক হলে হেলিকপ্টারে করে শিশুটিকে কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছে। এদিকে, ভয়াবহ এই বন্যায় নেপালজুড়ে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। এখন পর্যন্ত বন্যার ছোবলে ৭৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ। দেশজুড়ে উদ্ধারকাজ এখনও পুরোদমে অব্যাহত রয়েছে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর দেশের সার্বিক পুনর্গঠন ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। উদ্ভূত এই বিশাল মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের জন্য ৩৬ লাখ ডলারের বেশি মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সহায়তার আওতায় বন্যাকবলিত সর্বোচ্চ ১০ হাজার পরিবারের জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এই মানবিক সহায়তার ঘোষণা দেয়। সংস্থাটি জানিয়েছে, নেপাল ও চীনে থাকা মার্কিন দূতাবাসগুলো মার্কিন নাগরিকদের সহায়তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার কার্যক্রমে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। হিমালয় অঞ্চলে বুধবার একটি হিমবাহের অংশ ধসে পড়ার পর নেপাল ও তিব্বত সীমান্তজুড়ে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। আকস্মিক এই বন্যায় সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৭৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকরাও রয়েছেন এবং তাদের মধ্যে প্রায় ১০০ জন মার্কিন নাগরিক বলে জানানো হয়েছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক। অন্যদিকে নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ২৬১ জন বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে। বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ব্যাপকভাবে উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান চলছে। প্রায় ৩ হাজার নিখোঁজ মানুষের সন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। একই সঙ্গে দুর্গত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি সহায়তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত মানবিক সহায়তার একটি অংশ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খাদ্য সহায়তায় ব্যবহার করা হবে। সর্বোচ্চ ১০ হাজার পরিবার এই জরুরি খাদ্য সহায়তার আওতায় আসবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, নেপাল ও চীনে থাকা তাদের দূতাবাসগুলো মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়তা করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কাজ করছে। হিমালয়ের হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট বন্যায় নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন এবং বিদেশি নাগরিকদেরও উদ্ধার কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। নেপালে বন্যার পর চলমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই ৩৬ লাখ ডলারের বেশি সহায়তা দুর্গত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
নেপালে হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ১ হাজার ৬৪৩ শিশুর জীবন রক্ষা করেছেন এক স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে স্কুল খালি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে শিশুদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন ৪৭ বছর বয়সী ইংরেজির শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি। বুধবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটে এক বন্ধুর কাছ থেকে ফোনে সতর্কবার্তা পান দাওয়াদি। তাকে জানানো হয়, পাহাড়ি নদীর পানি ভয়াবহ গতিতে বাড়ছে এবং গ্রামের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে নদীর স্রোতে বিলীন হয়ে গেছে। প্রথমে দাওয়াদি মনে করেছিলেন, কংক্রিটের তৈরি তিনতলা স্কুল ভবনটি নিরাপদ। ভবনটি নদীর তলদেশ থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক স্কুলে এসে জানান, পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে সব শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষ খালি করার নির্দেশ দেন তিনি। স্কুলবাসের চালকদেরও দ্রুত শিশুদের সরিয়ে নিতে বলেন। এর মধ্যে একটি বাস সেতু পার হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়। এরপর শিক্ষার্থীরা পায়ে হেঁটে উঁচু এলাকায় পালাতে শুরু করে। আতঙ্কে এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মোটরসাইকেলে করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়। অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দাওয়াদিও পেছন থেকে তাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত শিশুরা একটি বোধি গাছের নিচে আশ্রয় নেয়। এর কিছুক্ষণ পরই ভয়াবহ বন্যার স্রোতে তাদের স্কুল ভবনসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে যায়। এই ঘটনায় ১ হাজার ৬৪৩ শিশুর সবাই প্রাণে বেঁচে যায়। তবে স্কুলের দুই কর্মী প্রাণ হারান। ইতিহাসের শিক্ষক ৩২ বছর বয়সী সান্তোষ পারিয়ার সকালের নাশতা রান্না করতে নদীর পাশের ভাড়া বাসায় ফিরে গিয়ে স্রোতে ভেসে যান। স্কুলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সুলতান লামাও দরজা বন্ধ করতে ফিরে গিয়ে মারা যান। স্থানীয়রা দাওয়াদিকে বীর হিসেবে প্রশংসা করলেও তিনি নিজের ভূমিকা নিয়ে বলেন, “আমি আর কী করতে পারতাম?” এই ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত হয় লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের একটি বিশাল বরফ ও পাথরের অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে লেন্দে খোলা নদীর ওপর পড়ে যাওয়ার পর। এতে পাহাড়ি নদীগুলোতে আকস্মিকভাবে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, কাদা ও পাথরের স্রোত নেমে আসে।
নেপালে ভয়াবহ বন্যার মধ্যে ভেসে আসা একটি ব্যাংকের সেফ ভেঙে ভেতরের নগদ টাকা নেওয়ার অভিযোগে ২৯ জনকে আটক করেছে পুলিশ। ধাদিং জেলার ত্রিশূলী নদীর তীরে পাওয়া ওই সেফ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৯২ লাখ ৬৮ হাজার ৫০৫ নেপালি রুপি। পুলিশ জানিয়েছে, রাসুয়া জেলার ভোটেকোশি এলাকায় বন্যার পানিতে সেফটি ভেসে যায়। পরে সেটি ত্রিশূলী নদীর স্রোতে ভেসে ধাদিং জেলার গালছি গ্রামীণ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বেলখুখোলা এলাকায় গিয়ে আটকে পড়ে। স্থানীয় কয়েকজন সেখানে সেফটি দেখতে পেয়ে সেটি ভেঙে ভেতরের নগদ টাকা নিয়ে যান বলে অভিযোগ। ঘটনার খবর পেয়ে নেপাল পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করেন। প্রাথমিক তদন্তে ২৯ জনকে আটক করে তাদের কাছ থেকে মোট ৯২ লাখ ৬৮ হাজার ৫০৫ নেপালি রুপি উদ্ধার করা হয়। তবে সেফটিতে শুরুতে মোট কত টাকা ছিল, এর মালিক কে এবং টাকা কোন ব্যাংক থেকে এসেছিল, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। উদ্ধার হওয়া অর্থের বাইরে আরও টাকা কেউ নিয়ে গেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না, তা নিয়েও তদন্ত চলছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের বেশিরভাগই ধাদিংয়ের গালছি এলাকার বাসিন্দা। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। শনিবার পর্যন্ত দুই দেশে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্যোগের চতুর্থ দিনে উদ্ধার অভিযান চললেও বৈরী আবহাওয়ায় তা ব্যাহত হচ্ছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ৬২৬ জনে পৌঁছেছে এবং ২ হাজার ৪২৬ জনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তিব্বতে চীনা কর্তৃপক্ষ সাতজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে এবং আরও ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এদের মধ্যে বিদেশি নাগরিক, পর্যটক, শ্রমিক ও তীর্থযাত্রীও রয়েছেন। গত বুধবার হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে হিমবাহ, বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল স্তর ধসে নদীপথে নেমে আসার পর এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রবল স্রোত ও কাদামাটির ঢল নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোটসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, স্কুল, হাসপাতাল ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালের উদ্ধারকারীরা এখনো দুর্গত এলাকাগুলোতে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে কাজ করছেন। বিশেষ করে রাসুয়া জেলার আপার ত্রিশূলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি কাদায় ভরা টানেলে শতাধিক মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অতিরিক্ত কাদার স্তর ও হেলিকপ্টার অবতরণের উপযোগী জায়গার সংকটে উদ্ধারকাজ ধীরগতিতে চলছে। দুর্যোগের পর পাহাড়ি এলাকায় নতুন একটি হ্রদ তৈরি হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছিল। এ কারণে একপর্যায়ে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। পরে পানির উচ্চতা কমতে থাকায় ঝুঁকি কিছুটা কমেছে বলে কর্তৃপক্ষ জানায়। তবে পাহাড়ি হ্রদ ও নদীগুলোর পরিস্থিতি এখনো নজরদারিতে রাখা হয়েছে। নেপাল সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে বিদেশি দল পাঠানোর প্রস্তাব গ্রহণ না করলেও বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত সহায়তা চেয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিসির খানাল জানিয়েছেন, প্লাবিত টানেলে আটকে পড়াদের উদ্ধার, মরদেহ শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা এবং মরদেহ সংরক্ষণের মতো ক্ষেত্রে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা প্রয়োজন। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ উদ্ধার ও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি ধ্বংস হয়ে যাওয়া যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে ভারত ও চীনের কাছে অস্থায়ী সেতু সরবরাহের অনুরোধ করেছে নেপাল। এদিকে দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকাজের পাশাপাশি ত্রাণ ও পুনর্বাসনের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্যোগে বিপুল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারপর্ব শেষ হওয়ার পরও নেপালের সামনে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের মধ্যে একটি ভবনে আটকে পড়া বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বুধবার, ২৬ আগস্ট, ভোতে কোশি নদী এলাকায় ভয়াবহ বন্যার পর চারদিকে পানি ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়লে তারা ওই ভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। পরে উদ্ধারকারীরা তাদের নিরাপদে বের করে আনেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভবনটির চারপাশে প্রবল স্রোতে পানি ও কাদা ছুটে যাচ্ছে। আশপাশের এলাকা ভয়াবহভাবে প্লাবিত হলেও ভবনটি টিকে থাকায় ভেতরে থাকা মানুষগুলো সাময়িকভাবে নিরাপদ আশ্রয় পান। নেপালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পর দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। ২৮ আগস্ট পর্যন্ত নদী থেকে ৫৩৮টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদেশি পর্যটকসহ বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। রসুয়া জেলায় উদ্ধার অভিযান চালিয়ে বন্যায় আটকে পড়া ১ হাজার ৫৪৫ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে নেপাল পুলিশ। এর মধ্যে রসুয়া থেকে ৬৪৪ জন, নুওয়াকোট থেকে ৮৯৮ জন এবং ধাদিং থেকে তিনজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ভয়াবহ এই বন্যায় ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অনেক সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে। হেলিকপ্টারের পাশাপাশি স্থলপথে উদ্ধারকারী দলগুলো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যার ঝুঁকি এখনো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার, নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, চিকিৎসা ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ফলে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও ওই ভবনে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলোর নিরাপদে উদ্ধার হওয়ার ঘটনাটি এখন স্বস্তির একটি খবর হয়ে এসেছে।
নেপালে এক অবিশ্বাস্য উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। নিজের ধসে পড়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা ২৪ ঘণ্টা আটকে থাকার পর ১০৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধাকে জীবিত উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার এই ঘটনাকে এক সত্যিকারের অলৌকিক ঘটনা হিসেবে দেখছেন সবাই। গত ২৮ আগস্ট আলেকজান্ডার লোপেজের করা এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চোখের পলকেই ওই বৃদ্ধার বাড়িটি ধসে পড়েছিল। চারপাশের সব কিছু মাটির সঙ্গে মিশে গেলেও ধ্বংসস্তূপের নিচে একটি ছোট্ট ফাঁকা জায়গায় আটকে ছিলেন তিনি। জায়গাটি এতটাই ছোট ছিল যে সেখানে শ্বাস নেওয়াও তার জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই অবস্থায় টানা ২৪ ঘণ্টা তিনি সেখানে একেবারে নিথর হয়ে পড়ে ছিলেন। বাইরে তখন উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের এক একটি স্তর সাবধানে সরিয়ে তাকে খুঁজছিল। তারা জানতেন না যে নিচে কোনো জীবিত মানুষ আছেন নাকি কেবল একটি মৃতদেহ পাওয়া যাবে। বুকের ওপর ধসে পড়া বাড়ির বিশাল ওজন নিয়ে বৃদ্ধা কেবল অপেক্ষাই করছিলেন। তার চিৎকার করার কোনো শক্তি ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার বেঁচে থাকার আশাও ক্ষীণ হয়ে আসছিল। উদ্ধারকর্মীরা সেন্সরের মাধ্যমে ক্ষীণ প্রাণের স্পন্দন শনাক্ত করে তাদের কাজ চালিয়ে যান। বৃদ্ধার যেন কোনো আঘাত না লাগে, সে জন্য শেষ কয়েক মিটার তারা কোনো ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করে খালি হাতেই মাটি ও ইটপাথর সরানোর কাজ করেন। অবশেষে যখন ধ্বংসস্তূপের শেষ ব্লকটি সরানো হয়, তখন উদ্ধারকর্মীরা দেখতে পান যে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার করা ওই বৃদ্ধা তখনও বেঁচে আছেন এবং তার জ্ঞান রয়েছে। জীবনের ১০৫টি বছর পার করে এসে তিনি গত ২৪ ঘণ্টা মৃত্যুর যতটা কাছাকাছি ছিলেন, এর আগে হয়তো কখনোই এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি তিনি। নেপালের মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় এমন সফল উদ্ধার অভিযান মানুষের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। সূত্র: আলেকজান্ডার লোপেজের প্রতিবেদন
নেপালে এক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় তিন শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ। বিপর্যয়ের পর নিখোঁজদের যে দীর্ঘ তালিকা তৈরি হয়েছে, তাতে নাম রয়েছে প্রভাত সাজিপা (৪৮) নামের ক্যালিফোর্নিয়ার এক প্রযুক্তি কর্মীর। নেপালি কর্তৃপক্ষের প্রকাশ করা ৬৫ জন নিখোঁজ মার্কিন নাগরিকের প্রাথমিক তালিকায় তার নাম উঠে এসেছে। লিঙ্কডইন প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, সাজিপা ২০১৬ সাল থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারাভিত্তিক ডেটা স্টোরেজ কোম্পানি ‘পিওর স্টোরেজ’-এ ইঞ্জিনিয়ারিং লিডার হিসেবে কর্মরত। এর আগে তিনি বিশ্বখ্যাত সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান সিসকোতেও কাজ করেছেন। তার ভাতিজি কাব্যা কৌলাগি জয়তীর্থ বিবিসিকে জানিয়েছেন, সাজিপা দীর্ঘদিন ধরে ‘ইশা ফাউন্ডেশন’ নামের একটি অলাভজনক আধ্যাত্মিক সংস্থার সাথে যুক্ত ছিলেন। সংস্থাটির একটি দল নেপালের ওই অঞ্চলে ভ্রমণের সময় এই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। দলটির অন্তত ৮০ জন সদস্য এখনও নিখোঁজ, যাদের মধ্যে ২২ জন মার্কিন নাগরিক। ইশা ফাউন্ডেশনের প্রধান জাগ্গি বাসুদেব বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় জানান, বন্যার ঠিক আগে দলটি জিরং-এর একটি ইমিগ্রেশন ভবনে অবস্থান করছিল। জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানার মাত্র ৯ মিনিট আগে তিনি দলনেতার কাছ থেকে শেষ বার্তা পান। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১৭ হাজার ফুট উঁচু থেকে একটি হিমবাহের একাংশ ভেঙে উপত্যকায় আছড়ে পড়লে এই ভয়াবহ ‘আইস অ্যাভালাঞ্চ’ বা বরফধসের সৃষ্টি হয়। হিমবাহ ধসের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা না গেলেও এর ফলে সৃষ্ট বিশাল জলরাশি ও ধ্বংসস্তূপ নেপালের বহু বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাসিয়ে নিয়ে যায়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, বন্যার তোড়ে অন্তত ১৯টি সেতু এবং প্রায় ২৫ মাইল রাস্তা সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পাশাপাশি একাধিক গ্রাম ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে তিব্বতীয় কর্মকর্তারাও এই বিপর্যয়ে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। নেপালে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, তারা নিখোঁজ নাগরিকদের সন্ধানে স্থানীয় প্রশাসন ও ট্যুর অপারেটরদের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। বৃহস্পতিবার মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যমতে, অন্তত ৯০ জন মার্কিন নাগরিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এবং মাত্র তিনজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।