- প্রচ্ছদ
- Topic
ফিলিস্তিনি
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় বিদ্যুতের সংকট, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের অভাব আর পরিবারের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছাড়েননি তরুণ শিক্ষার্থী কারিম আয়াদ আলখোদারি। রাতে একটি ছোট সৌরশক্তিচালিত বাতির আলোয় বসে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ পড়েন তিনি। পড়ার উপকরণ পর্যালোচনা করা, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা এবং নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই এখন তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। নিজের জীবনের এমন মুহূর্তগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন কারিম। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গাজার প্রতিকূল পরিবেশে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার সংগ্রামকে সামনে এনেছে। কারিমের নিজের ভাষ্যে, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন তাঁর কাছে কেবল পেশাগত লক্ষ্য নয়, বরং কঠিন সময়েও এগিয়ে চলার প্রেরণা। যুদ্ধের মধ্যে কখনো মোমবাতির আলোয়, কখনো হাতের কাছে পাওয়া সামান্য আলোর সাহায্যে পড়াশোনা করেছেন তিনি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠের পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা ও প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করেছেন বলে জানিয়েছেন। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান তিনি, বিশেষ করে এমন মানুষদের, যাঁরা প্রয়োজনের সময় যথাযথ চিকিৎসা পান না। কারিমের পরিবারের সংকটও তাঁর পড়াশোনাকে কঠিন করে তুলেছে। তাঁর প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর তাঁদের পারিবারিক বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায়। বাড়িটি তাঁর বাবা প্রায় ৩৮ বছর ধরে নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন। এখন পরিবারের সাত সদস্যকে একটি ছোট ভাড়া করা ঘরে থাকতে হচ্ছে। খাবার, বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ আশ্রয় এবং চিকিৎসার খরচ জোগাড় করাও তাঁদের জন্য প্রতিদিনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পড়াশোনার জন্য নির্দিষ্ট একটি জায়গা তৈরি করে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন কারিম। সীমিত আলো ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের মধ্যেই বইপত্র নিয়ে বসেন তিনি, যাতে পড়ার ধারাবাহিকতা নষ্ট না হয়। যুদ্ধের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন এবং বিদ্যুতের অভাব গাজার বহু শিক্ষার্থীর জন্য বড় বাধা হয়ে উঠেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো বিষয়, যেখানে নিয়মিত অধ্যয়ন ও অনুশীলন জরুরি, সেখানে এসব সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। গাজায় শিক্ষাজীবন ধরে রাখার লড়াই কারিমের একার নয়। ২০২৪ সালে বিএমজে গ্লোবাল হেলথের একটি লেখায় গাজার আরেক চিকিৎসাশিক্ষার্থী যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, ক্ষুধা এবং বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন। ২০২৬ সালেও গাজায় শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প শিক্ষার পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কারিমের অভিজ্ঞতা দেখায়, এমন উদ্যোগের পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে নানা সংকট মোকাবিলা করে নিজেদের পড়াশোনা এগিয়ে নিতে হচ্ছে। কারিমের লক্ষ্য একদিন চিকিৎসক হয়ে গাজার মানুষের সেবা করা। তাঁর পরিবারের আর্থিক সংকট ও পড়াশোনার খরচ মেটাতে অনলাইনে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। নিজের বিবরণে তিনি জানিয়েছেন, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান এবং ভবিষ্যতে চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে অন্যদের সহায়তা করতে চান। সীমিত আলোয় বইয়ের পাতায় চোখ রেখে তাঁর এই চেষ্টা গাজায় যুদ্ধের মধ্যে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ধরে রাখার এক ব্যক্তিগত উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সূত্র: কারিম আয়াদ আলখোদারির ব্যক্তিগত বিবরণ ও বিএমজে গ্লোবাল হেলথ।
ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে মেক্সিকো। দেশটির প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমের সরকার ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনকে দুটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে। মেক্সিকো সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য উভয় রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে আলোচনা প্রয়োজন। দেশটির এই অবস্থান নতুন নয়, বরং দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট শেইনবাউম ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জানান, তাঁর সরকারের সময়ই ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নাদিয়া রাশিদের পরিচয়পত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এর আগে মেক্সিকোতে ফিলিস্তিনের কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থাকলেও পূর্ণ রাষ্ট্রদূত হিসেবে স্বীকৃতির ক্ষেত্রে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। শেইনবাউম বলেন, ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল উভয় রাষ্ট্রের স্বীকৃতি এবং বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা বন্ধ করা তাঁর সরকারের অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মেক্সিকোর পররাষ্ট্রনীতিতে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। দেশটির সরকার মনে করে, ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয় পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করে আলোচনা এগিয়ে নিতে হবে। এ অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যায় গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েও মেক্সিকোর বক্তব্যে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাজার জন্য প্রস্তাবিত শান্তি পর্ষদে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেলেও মেক্সিকো পূর্ণ সদস্য না হয়ে পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তার বিষয়ে মেক্সিকোর অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার যেকোনো উদ্যোগে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। মেক্সিকো সরকার বহুপক্ষীয় আলোচনা ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে সংকট সমাধানের পক্ষে রয়েছে। দেশটির এই অবস্থান ফিলিস্তিন প্রশ্নে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি তাদের দীর্ঘদিনের সমর্থনকে আবারও সামনে এনেছে। সূত্র: মেক্সিকো সরকারের প্রেসিডেন্সি দপ্তর, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ইসরায়েলি কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি নারীদের জোর করে হিজাব খুলিয়ে চুল তল্লাশি, মারধর ও গ্যাস প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিষয়ে তথ্য প্রকাশকারী প্রিজনার্স মিডিয়া অফিসের বরাতে ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭ ও ৮ অক্টোবরের এসব ঘটনায় কয়েকজন নারী অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীও রয়েছেন। ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যম সাফার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর একজন ইসরায়েলি কারা কর্মকর্তা নারী বন্দিদের চুল পরীক্ষা করতে হিজাব খুলতে বাধ্য করেন। এরপর ১৭ জন নারীকে প্রায় তিন ঘণ্টা ১৩ নম্বর সেলে আটকে রেখে তাঁদের চুলের বেণি খুলতে বলা হয়। একই অভিযোগ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিবরণের কিছু পার্থক্য রয়েছে। ফিলিস্তিন ইনফরমেশন সেন্টার জানিয়েছে, ১৭ নারীকে আইসোলেশন সেলে রাখা হয়েছিল। তবে সাফার বিস্তারিত বিবরণে তাঁদের একটি সেলে একসঙ্গে আটকে রাখার কথা বলা হয়েছে। ফলে প্রত্যেককে পৃথকভাবে নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। প্রিজনার্স মিডিয়া অফিসের অভিযোগ, নারী বন্দিদের সেল ও গোসলের জায়গায় কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া বয়স্ক নারীসহ ১৫ জন বন্দি থাকা একটি কক্ষে পেপার স্প্রে ছোড়া হলে কয়েকজন বমি করেন। এসব ঘটনার মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে চিকিৎসার জন্য নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সাফা। এর আগে ১৪ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সরকারি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছিল, দামন কারাগারে আটক দুই নারী আইনজীবীর কাছে তাঁদের সেলে বারবার অভিযান এবং ৭ অক্টোবর কাঁদানে গ্যাস ও শব্দবোমা ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় তাঁদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। প্রিজনার্স মিডিয়া অফিস নারী বন্দিদের সুরক্ষা, অসুস্থ ও অন্তঃসত্ত্বাদের চিকিৎসা এবং আটক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। পর্যালোচিত প্রতিবেদনগুলোতে এসব নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
পশ্চিম তীরের অধিকৃত এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের অভিজ্ঞ আলোকচিত্রী হেইডি লেভিন। হামলার ঘটনাকে ‘কথিত’ হিসেবে উল্লেখ করায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লেভিন বলেন, হামলার প্রমাণ সামনে থাকার পরও এমন মন্তব্যে তিনি বিস্মিত ও অপমানিত বোধ করেছেন। গুরুতর আঘাত পেয়েও কাজে ফেরার প্রত্যয় জানিয়েছেন কয়েক দশক ধরে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ঘটনা নথিবদ্ধ করে আসা এই সাংবাদিক। গত শুক্রবার পশ্চিম তীরের আবু ফালাহ গ্রামে ফিলিস্তিনিদের জলপাই সংগ্রহের ঘটনা কাভার করতে গিয়ে হামলার শিকার হন লেভিন। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখোশধারী একদল ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী জলপাই সংগ্রহ করতে আসা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালায়। ওই সময় সাংবাদিক পরিচয় স্পষ্ট করে লেখা সুরক্ষাবর্ম ও হেলমেট পরা লেভিনকেও মাটিতে ফেলে লাথি মারা হয় এবং তাঁর ক্যামেরা ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। হামলায় তাঁর চারটি মেরুদণ্ডের হাড় ও একটি পাঁজর ভেঙেছে বলে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত ছাড়াও তাঁর একটি হাতের আঙুলে গুরুতর আঘাত লাগে। লেভিন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, হামলাকারীরা প্রায় ১০ মিনিট ধরে তাঁকে মারধর করে। তিনি নিজের ক্যামেরা ও ব্যাগ আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন। তাঁর ভাষ্য, হেলমেট ও ‘প্রেস’ লেখা সুরক্ষাবর্ম তাঁকে আরও গুরুতর আঘাত থেকে বাঁচিয়ে থাকতে পারে। চিকিৎসার জন্য প্রথমে তাঁকে রামাল্লার হাসপাতালে নেওয়া হয়, পরে ইসরায়েলের একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। হামলার ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য তিনি পাননি বলেও জানিয়েছেন। হামলার বিষয়ে নেতানিয়াহু বলেছেন, ঘটনার প্রকৃত তথ্য এখনো স্পষ্ট নয় এবং বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। তবে লেভিনের বক্তব্য, ঘটনার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও একে ‘কথিত’ হামলা হিসেবে বর্ণনা করা তাঁকে অপমানিত করেছে। তাঁর অভিযোগ, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অনেক ক্ষেত্রে হুমকির মুখে থাকা ফিলিস্তিনিদের তুলনায় বসতি স্থাপনকারীদের সুরক্ষায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলে কাজ করা লেভিন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি যতটা খারাপ হতে দেখছেন, আগে কখনো তেমন দেখেননি। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ হাসপাতালে লেভিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। লেভিন তাঁর প্রতিক্রিয়াকে আন্তরিক বলে বর্ণনা করেন। হামলার নিন্দা জানিয়ে ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালন, সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান তামির পার্দো এবং সাবেক নিরাপত্তা সংস্থাপ্রধান আমি আয়ালনসহ এক ডজনের বেশি সাবেক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। চিঠিতে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা, তাঁদের সহায়তাকারীদের ওপর আক্রমণ এবং এসব ঘটনা নথিবদ্ধ করা সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনায় লজ্জা প্রকাশ করা হয়। তাঁদের মতে, এ ধরনের সহিংসতা ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ক্ষতি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলবিষয়ক রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও লেভিনের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি ঘটনাটিকে মুখোশধারী হামলাকারীদের চালানো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে উল্লেখ করে দোষীদের দীর্ঘ কারাদণ্ডের দাবি জানান। এদিকে, পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহের মৌসুম ঘিরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা এবং জলপাইগাছ ধ্বংসের ঘটনা বেড়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ের মধ্যে পশ্চিম তীরের একটি খ্রিষ্টান গ্রামে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ ও নিন্দা বাড়ছে। লেভিন বলেছেন, তিনি চান না তাঁর ওপর হামলাই মূল সংবাদ হয়ে উঠুক; বরং দীর্ঘদিন ধরে যেসব ফিলিস্তিনির জীবন ও দুর্ভোগ তিনি নথিবদ্ধ করছেন, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া হোক। তাঁর মতে, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ক্রমেই বাড়ছে এবং আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। পশ্চিম তীরে এ ধরনের হামলার ঘটনায় অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও মানবাধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলছেন। গুরুতর আহত হলেও পেশায় ফেরার সিদ্ধান্তে অটল লেভিনের বক্তব্য, তাঁর হাড় ভেঙেছে, কিন্তু মনোবল ভাঙেনি। সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, রয়টার্স।
ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় ফিলিস্তিনিদের জমি হারানো ও বাস্তুচ্যুতি নিয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর এক্সে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, পূর্বপুরুষের ভূমিতে ইহুদিরা বিদেশি দখলদার নয়। দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইংরেজিতে দেওয়া ভিডিওবার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, নিজেদের ঐতিহাসিক মাতৃভূমিতে ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার আপসযোগ্য নয়। ইসরায়েলের ইতিহাসকে ঔপনিবেশিক প্রকল্প হিসেবে দেখার বিরোধিতা করে তিনি দাবি করেন, তাঁদের ভূমি চুরি করা নয়। এর আগে মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে এক অনুষ্ঠানে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে কথা বলেন ওবামা। তাঁর বক্তব্যে ইহুদিদের ওপর দীর্ঘদিনের নিপীড়নের ইতিহাস এবং ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি, দুটি বিষয়ই উঠে আসে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওবামা বলেন, হাজার হাজার বছর ধরে ইহুদিরা নিপীড়ন, বৈষম্য ও হত্যার শিকার হয়েছেন। ফলে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এমন একটি স্থানে তাঁদের আশ্রয় খোঁজা বোধগম্য। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে অন্য মানুষের জমি নেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। সেই মানুষদের নিজেদের প্রতি অবিচার হয়েছে বলে মনে করা এবং জমি ফেরত চাওয়াও বোধগম্য। বেলফাস্টের ওই আলোচনায় ওবামা সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তির ওপর নির্ভর করে কোনো ছাড় না দেওয়ার নীতিরও সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, শক্তির জোরে যা প্রয়োজন তা করা এবং যা চাই তা নেওয়ার অবস্থান স্বল্প মেয়াদে কার্যকর হতে পারে। তবে এমন অবস্থান নিলে ইসরায়েল তার নৈতিক ভিত্তি হারায়। জবাবে নেতানিয়াহু দাবি করেন, শান্তির পথে বাধা ইসরায়েল নয়। তাঁর ভাষ্য, যেকোনো সীমানার মধ্যে ইহুদিদের নিজস্ব রাষ্ট্র থাকার অধিকার মেনে নিতে প্রতিপক্ষের অস্বীকৃতিই মূল বাধা। ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার অস্বীকারকারীদের সন্তুষ্ট করতে দেশের টিকে থাকা নিয়ে ঝুঁকি নেবেন না বলেও জানান তিনি।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের আবু ফালাহ গ্রামে ফিলিস্তিনি কৃষকদের জলপাই সংগ্রহের ঘটনা কাভার করতে গিয়ে মুখোশধারী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হা মলার শিকার হয়েছেন মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের অভিজ্ঞ আলোকচিত্রী হেইডি লেভিন। শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, হা মলায় তিনি গুরুতর আ হ ত হন। তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হা মলার সময় তাঁর পোশাকে সাংবাদিক পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও ভিডিওতে দেখা যায়, হা মলাকারীরা তাঁকে মাটিতে ফেলে মা রধর করে এবং তাঁর ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। হেইডি লেভিনের ভাষ্য অনুযায়ী, মুখোশধারী কয়েক ডজন ব্যক্তি তাঁদের ওপর হা মলা চালায়। তাঁকে মাটিতে ফেলে বারবার লাথি মারা হয়। হা মলায় তাঁর পাঁজরের একটি হাড় ও মেরুদণ্ডের চারটি কশেরুকা ভেঙে যায় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তিনি কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন সং ঘা তপূর্ণ অঞ্চলে সাংবাদিকতা ও আলোকচিত্রের কাজ করছেন। এ ঘটনায় ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি হা মলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি হা মলাকে নিন্দনীয় আখ্যা দিয়ে দায়ীদের গ্রে প্তা র, বিচার এবং কারাদণ্ডের আহ্বান জানান। ওয়াশিংটন পোস্ট কর্তৃপক্ষও হা মলার নিন্দা জানিয়ে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি এখনো তদন্তাধীন। ইসরায়েলি পুলিশ ও সামরিক কর্তৃপক্ষও তদন্তের কথা জানিয়েছে। তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে হা মলাকারীদের কাউকে গ্রে প্তা রের নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনি কৃষক ও তাঁদের সহায়তায় আসা ব্যক্তিদের ওপর হা মলার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হা মলায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবিও জোরালো হচ্ছে।
ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে মুখোশধারী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার শিকার হয়েছেন ইউরোপের একদল কূটনীতিক। শনিবার, ১৭ অক্টোবর, খ্রিষ্টান-অধ্যুষিত তাইবেহ গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো জানান, হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন বেলজিয়ামের কনসাল জেনারেল, ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের কূটনীতিক এবং ক্যাথলিক প্রতিনিধিরা। এ সময় ফ্রান্সের এক মেয়রও হামলার শিকার হন এবং বেলজিয়ামের একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে বেলজিয়ামের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা নিরাপদে আছেন বলে জানিয়েছেন প্রেভো। জলপাই সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি সাংবাদিক ও বিদেশি প্রতিনিধিদের ওপর ধারাবাহিক হামলার মধ্যে সর্বশেষ এ ঘটনা ঘটল। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুতে জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকে হামলায় অন্তত চারজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১০০ জনের বেশি। অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ঠেকাতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এসব ঘটনায় গুলতি থেকে শুরু করে আগ্নেয়াস্ত্র পর্যন্ত ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রেভো এ হামলার জন্য ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণ নীতিকে দায়ী করেছেন। তাঁর ভাষায়, সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের দায়মুক্তির অবসান হওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও জানান, হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য বেলজিয়াম কাজ চালিয়ে যাবে। ফিলিস্তিনিদের জমি থেকে জোর করে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং বসতি সম্প্রসারণেরও নিন্দা জানান তিনি। ঘটনাস্থলে থাকা অ্যামিত ওরফালি নামে এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ভিডিও প্রকাশ করেন। একটি ভিডিওতে ফ্রান্সের মেয়রকে ধুলোমাখা মাটিতে বসে একটি গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁর পরনে ছিল ফ্রান্সের জাতীয় পতাকার রঙের ফিতা। অন্য ভিডিওতে মুখোশ পরা কয়েকজন তরুণকে গাড়ির চালকের পাশের জানালায় বারবার আঘাত করতে এবং পরিচয়পত্র দেখতে চাইতে দেখা যায়। দূরে লাঠি হাতে আরও কয়েকজনকে এগিয়ে আসতেও দেখা যায়। ওরফালির দাবি, মুখোশধারীরা তাঁদের হত্যার হুমকি দিয়েছিল। ঘটনার পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী একে গুরুতর সহিংসতার ঘটনা বলে নিন্দা জানায়। তবে তাদের বক্তব্য, কূটনীতিকদের এই সফরের বিষয়ে আগে থেকে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি এবং হামলার সময় ঘটনাস্থলে কোনো সেনা সদস্য ছিলেন না। ইসরায়েলি পুলিশও তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছে। তদন্তে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সারও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি ইসরায়েলি দাঙ্গাকারীদের সহিংসতাকে গুরুতর বলে উল্লেখ করেন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে তাঁর মন্ত্রণালয় যোগাযোগ রাখছে বলেও জানান। তবে পরে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর ঘটনাটি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানায়। দপ্তরের বক্তব্যে ইসরায়েলকে হেয় করার উদ্দেশ্যে সমন্বিত প্রচারণা চালানোর আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়। এই হামলার আগের দিন, শুক্রবার, পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহ করতে যাওয়া ফিলিস্তিনি কৃষক ও তাঁদের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে গুরুতর আহত হন দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর আলোকচিত্রী হেইডি লেভিন। তিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলে সাংবাদিকতা করছেন। শনিবার হাসপাতালের শয্যা থেকে দেওয়া বক্তব্যে লেভিন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে তিনি আগে কখনো এমন অবস্থায় দেখেননি। তাঁর ওপর হামলার ঘটনাকে নেতানিয়াহু কথিত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করায় তিনি বিস্মিত ও অপমানিত বোধ করেছেন বলেও জানান। নেতানিয়াহু অতীতে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার জন্য অল্পসংখ্যক বিশৃঙ্খলাকারীকে দায়ী করেছেন। তবে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় গাড়িতে আগুন দেওয়া, জলপাইগাছের ক্ষতি করা এবং মানুষকে আহত করার ঘটনা ঘটছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। চলতি মৌসুমকে কেউ কেউ সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক জলপাই সংগ্রহের মৌসুম বলেও বর্ণনা করছেন। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিষয়টি নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। দেশটির জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহুর সরকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণ নিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে। নির্বাচনে তাঁর দীর্ঘদিনের ক্ষমতা ধরে রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটও এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, অল্প কয়েকজন অপরাধীর কর্মকাণ্ড ইসরায়েল রাষ্ট্রের অবশিষ্ট গ্রহণযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বিরোধের বিষয়। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ এসব বসতিকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ বলে বিবেচনা করে। সেখানে অনেক বসতি এখন উন্নত আবাসিক এলাকার রূপ নিয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েলি সরকারের অনুমোদন ছাড়াই শত শত নতুন বসতি-চৌকি গড়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এসব এলাকায় বসতি স্থাপনকারীরা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সুরক্ষা পেলেও ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয় না। ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে। ফিলিস্তিনিরা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য এসব ভূখণ্ড দাবি করে আসছে। পশ্চিম তীর এখনো ইসরায়েলি সামরিক শাসনের অধীনে রয়েছে। সম্প্রতি চীনও পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগকে পশ্চিম তীরে জোর করে বসতি স্থাপনের কার্যক্রম বন্ধ ও প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন বলে চীনা পক্ষের একজন মুখপাত্র জানান। জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে কৃষক, সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনা পশ্চিম তীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বেলজিয়ামসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা যায় কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিমতীরে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে উগ্র ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছেন প্রখ্যাত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর ফটোসাংবাদিক হাইডি লেভিন। জলপাই সংগ্রহকারী ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর চালানো এই অতর্কিত হামলায় লেভিনসহ বেশ কয়েকজন কৃষক মারাত্মক আহত হয়ে বর্তমানে রামাল্লাহর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিমতীরের আবু ফালাহ নামক একটি গ্রামে। জানা গেছে, ফিলিস্তিনি কৃষকরা যখন তাদের বাগানে আনন্দের সঙ্গে জলপাই সংগ্রহ করছিলেন এবং সাংবাদিক লেভিন সেখানে ছবি তোলার কাজে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক তখনই মুখ ঢাকা একদল ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের দিকে ধেয়ে আসে। প্রাণ বাঁচাতে সবাই পালানোর চেষ্টা করলেও হামলাকারীরা লেভিনকে ধরে মাটিতে ফেলে দেয়। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আবেগঘন কণ্ঠে এই মার্কিন সাংবাদিক জানান, হামলাকারীরা প্রায় ১০ মিনিট ধরে তাকে মাটিতে ফেলে একের পর এক লাথি মারতে থাকে। তার গায়ে সাংবাদিক পরিচয়ের স্পষ্ট চিহ্ন থাকা সত্ত্বেও তারা তার ক্যামেরা ও ব্যাগ ভেঙে ফেলে এবং মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। এই অমানবিক আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো মানুষ অন্যের ওপর এমন নারকীয় অত্যাচার চালাতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, হামলাকারীরা কেবল মারধর করেই ক্ষান্ত হয়নি; তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর পাথর নিক্ষেপ করে, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে এবং জলপাই গাছে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই তাণ্ডবে ৬৩ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা ও ৪০ বছরের এক পুরুষ কৃষকও গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। হামলার সময় কাছাকাছি থাকা ইসরায়েলি সেনাদের নীরব ভূমিকা নিয়েও ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন (এফপিএ) এবং ওয়াশিংটন পোস্ট অবিলম্বে দোষীদের শাস্তির দাবি করেছে। বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে ইসরায়েলি পুলিশ ও সামরিক বাহিনী ঘটনার তদন্তের আশ্বাস দিলেও, অতীতের দৃষ্টান্ত টেনে ভুক্তভোগীরা আশঙ্কা করছেন যে এবারও হয়তো অপরাধীরা বিনা শাস্তিতে পার পেয়ে যাবে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ফিলিস্তিনিদের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করে গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞ ও রক্তপাতের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গাজার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি যেকোনো মানুষের মনকেই ব্যথিত করবে। সম্প্রতি উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত সাংবাদিক সুসান ম্যাককের সঙ্গে আলাপকালে তিনি গাজা যুদ্ধ নিয়ে নিজের ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ওবামা মনে করেন, বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা বঞ্চনা ও ক্ষোভ থেকেই আজকের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অনুষ্ঠানে ওবামা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ইসরায়েল ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের জমি দখল করার পাশাপাশি ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করেছে। তাই নিজেদের হারানো ভিটেমাটি ফিরে পাওয়ার জন্য ফিলিস্তিনিদের এই লড়াইকে তিনি একেবারেই স্বাভাবিক বলে আখ্যায়িত করেন। ইউরোপে ইহুদিদের ওপর হওয়া ঐতিহাসিক নিপীড়নের কথা মেনে নিয়েও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, নিজেদের মাতৃভূমি হারিয়ে ফিলিস্তিনিরাও কোনো অংশে কম অন্যায়ের শিকার হয়নি। ফিলিস্তিনিদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং তাদের ভূমি কেড়ে নেওয়ার কারণে ইসরায়েল বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব নৈতিক অবস্থান হারিয়ে ফেলেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বর্তমান ইসরায়েলি সরকারকে আরও বেশি বাস্তবমুখী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে ওবামা সতর্ক করেন, কেবল সামরিক শক্তির দাপট দেখিয়ে কখনোই স্থায়ী শান্তি অর্জন করা যায় না। প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ‘যা খুশি তা-ই করব’—ইসরায়েল সরকারের এমন দাম্ভিক মানসিকতা তাদের সাময়িক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে নৈতিক পতন ডেকে আনছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, প্রায় ৭০ লাখ ফিলিস্তিনি কখনোই এই ভূখণ্ড ছেড়ে কোথাও যাবে না। তাই নিজেদের জন্য যা মেনে নেওয়া অসম্ভব, তা ফিলিস্তিনিদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে কখনোই শান্তি ফেরানো সম্ভব নয়।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের কার্যক্রম বন্ধ করে ইতিমধ্যে নেওয়া পদক্ষেপগুলো ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে বৈঠকে এ আহ্বান জানান। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে এশিয়ায় সহযোগিতা ও আস্থা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতার বৈঠক হয়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, বৈঠকে ওয়াং ই পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি স্থাপনকে ‘জোরপূর্বক বসতি প্রতিষ্ঠা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি ইসরায়েলকে এ কার্যক্রম বন্ধ করার পাশাপাশি ইতিমধ্যে নেওয়া পদক্ষেপগুলো ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি রয়েছে। চীনের সর্বশেষ বক্তব্যে সেই অবস্থান আবারও স্পষ্ট হয়েছে। বৈঠকে ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের অবস্থানও তুলে ধরেন ওয়াং ই। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ফিলিস্তিন প্রশ্নকে এ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবিচার হিসেবে বর্ণনা করেন। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের বৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ বন্ধের আহ্বান সেই নীতিরই ধারাবাহিকতা। পশ্চিম তীর ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েলের দখলে রয়েছে। সেখানে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও সম্প্রসারণ ফিলিস্তিনিদের ভূমি, বসবাস এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাবে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের কোনো আইনি বৈধতা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের নীতির আইনি পরিণতি নিয়ে মতামত দিয়েছে। এসব কারণে বসতি সম্প্রসারণের বিষয়টি শুধু ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার বিরোধ নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আজারবাইজানে ওয়াং ই ও হারজগের বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্টের দপ্তরের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে বাণিজ্য, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয়েছে। হারজগ ইসরায়েলের সামনে থাকা নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন, বিশেষ করে ইরান ও দেশটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ফলে বৈঠকে দুই পক্ষের আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও গুরুত্ব পেয়েছে। চীন দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটের সমাধানে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান জানিয়ে আসছে। এ ব্যবস্থায় স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র এবং ইসরায়েল পাশাপাশি অবস্থান করবে। বেইজিংয়ের মতে, রাজনৈতিক সংলাপ ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন। পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও জটিল হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে ওয়াং ইয়ের আহ্বানের বিষয়ে ইসরায়েলি পক্ষ থেকে পৃথক কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা চীনের বিবৃতি ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি। পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ বন্ধে চীনের এই বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক অবস্থান কীভাবে এগোয়, তা এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়। সূত্র: রয়টার্স, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন এবং এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জেরে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় অন্তত ৭৬ জন শিক্ষক ও শিক্ষাবিদকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে এ পর্যন্ত পশ্চিমা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের কারণে শিক্ষাবিদদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য জানিয়েছে পশ্চিম এশিয়া স্টাডিজ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে শিক্ষাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্মীদের বিরুদ্ধে মোট ১৯৬টি শাস্তিমূলক পদক্ষেপের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৬ জনকে সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া ৫৯টি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাময়িক বরখাস্ত কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৩৫টি ঘটনায় প্রশাসনিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে শিক্ষাবিদদের। পার্সটুডে ও ইরনার বরাতে জানা যায়, ইসরায়েলি দখলদারিত্বের সমালোচনা, ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষার বিবৃতিতে স্বাক্ষর কিংবা ফিলিস্তিনের সমর্থনে আয়োজিত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণেই মূলত তাদের বিরুদ্ধে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, শাস্তিমূলক পদক্ষেপের শিকার হওয়া এসব ঘটনার ৫৪ শতাংশই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সংঘটিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এসব কর্মসূচি মূলত শ্রেণিকক্ষের বাইরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পশ্চিম এশিয়া স্টাডিজ অ্যাসোসিয়েশন এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্ক করেছে যে, এ ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার শিক্ষাঙ্গনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে পশ্চিমা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমন কঠোর অবস্থান শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে প্রতিবেদনটিতে এও বলা হয়েছে যে, নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিদ্ধান্তের সুনির্দিষ্ট কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ঘটনাভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
অধিকৃত ফিলিস্তিনের পবিত্র আল-আকসা মসজিদে সদ্য সমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসে ইসরায়েলি বাহিনী ও অবৈধ বসতিস্থাপনকারীরা অন্তত ২৬ বার অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। একই সময়ে মসজিদটিতে অন্তত ১৫০ বার আজান দেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনের ধর্ম ও ওয়াকফ মন্ত্রণালয়। এছাড়া ইহুদি ছুটির দিনগুলোর অজুহাতে হেবরনের ঐতিহাসিক ইব্রাহিমি মসজিদও মোট ছয় দিন সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছিল দখলদার কর্তৃপক্ষ। অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সামরিক অভিযান, বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধের প্রেক্ষাপটেই মুসলিমদের এই স্পর্শকাতর পবিত্র স্থানগুলোতে চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ফিলিস্তিনের ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সরকারি বার্তা সংস্থা ওয়াফা (WAFA) জানায়, আল-আকসা প্রাঙ্গণে নিয়মিত ইহুদিদের ধর্মীয় আচার ও প্রকাশ্য প্রার্থনার হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ানো হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ঐতিহাসিক স্থিতাবস্থা বা ‘স্ট্যাটাস কো’ অনুযায়ী, এই চত্বরে কেবল মুসলিমদেরই নামাজ আদায়ের অধিকার রয়েছে এবং অমুসলিমরা নির্দিষ্ট সময়ে কেবল পরিদর্শনের জন্য প্রবেশ করতে পারেন। কিন্তু উগ্র ডানপন্থী ইহুদি গোষ্ঠীগুলো এখন সেখানে শনিবারও প্রবেশের অধিকার দাবি করছে। মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, এই ধরনের বেপরোয়া দাবির মূল উদ্দেশ্য হলো পবিত্র আল-আকসা প্রাঙ্গণের স্থান ও সময় ভাগ করে এক নতুন ও বিতর্কিত বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়া। অন্যদিকে, হেবরনের ঐতিহাসিক ইব্রাহিমি মসজিদেও বিধিনিষেধের মাত্রা তীব্রতর করা হয়েছে। ১৯৯৪ সালে এক চরমপন্থী ইহুদির গুলিতে ২৯ জন ফিলিস্তিনি মুসল্লি নিহত হওয়ার পর থেকে এই মসজিদটি মুসলিম ও ইহুদিদের আলাদা অংশে বিভক্ত করে রাখা হয়েছে। ইউনেস্কোর ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত এই অঞ্চলের মসজিদটির পূর্ব প্রবেশদ্বার এবং জানালাগুলো ২০২৫ সালের শুরু থেকেই ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে। শুধু আল-আকসা বা ইব্রাহিমি মসজিদই নয়, সেপ্টেম্বর মাসে পশ্চিম তীরের অন্যান্য মুসলিম উপাসনালয়গুলোতেও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরায়েলিরা। মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাবলুসের ইমাদ আল-দিন জেঙ্গি মসজিদে অগ্নিসংযোগ করে দেওয়ালে বর্ণবাদী স্লোগান লিখে দেয় ইহুদি বসতিস্থাপনকারীরা। এছাড়া মাদানার একটি নতুন মসজিদে ঢুকে মুসল্লিদের ওপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয় এবং জেরিকোর আল-জিফতলিক এলাকার আল-দুআইসাত নামাজ কক্ষটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
কান চলচ্চিত্র উৎসবে ফ্যাশনের মাধ্যমে নিজের ফিলিস্তিনি শিকড়কে সামনে এনেছিলেন সুপারমডেল বেলা হাদিদ। ২০২৪ সালের ২৩ মে ফ্রান্সের কানে তাকে লাল ও সাদা কেফিয়েহ দিয়ে তৈরি একটি ভিনটেজ পোশাকে দেখা যায়। ফিলিস্তিনি পরিচয় ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত কেফিয়েহর এই ব্যবহার তার পোশাকটিকে কেবল একটি ফ্যাশন মুহূর্তে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দৃশ্যমান প্রকাশে পরিণত করেছিল। ভোগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেলা হাদিদের পরা পোশাকটি ডিজাইনার মাইকেল অ্যান্ড হুশির তৈরি। পোশাকটির নকশা করা হয়েছিল ২০০১ সালে। লাল ও সাদা কেফিয়েহ দিয়ে তৈরি পোশাকটিতে ছিল সরু স্ট্র্যাপ এবং অসমান হেমলাইন। বহু বছর আগের এই ডিজাইন বেলা হাদিদের মাধ্যমে আবারও আন্তর্জাতিক ফ্যাশন আলোচনায় উঠে আসে। দ্য গার্ডিয়ানও সে সময় জানায়, কান চলচ্চিত্র উৎসব চলাকালে সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় বেলাকে লাল ও সাদা কেফিয়েহ দিয়ে তৈরি পোশাক পরে হাঁটতে দেখা যায়। পরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ফ্যাশন সাময়িকীগুলো তার এই উপস্থিতিকে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি এবং নিজের পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করে। কেফিয়েহ মধ্যপ্রাচ্যের একটি ঐতিহ্যবাহী মাথার কাপড় হলেও দীর্ঘদিন ধরে এটি ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কালো সাদা এবং লাল সাদা নকশার কেফিয়েহ বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনি সংস্কৃতি ও সংহতির সঙ্গে পরিচিত। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত কান উৎসবে কেফিয়েহ দিয়ে তৈরি পোশাকে বেলা হাদিদের উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক নজর কাড়ে। বেলা হাদিদের বাবা মোহাম্মদ হাদিদ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। বেলাও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে নিজের ফিলিস্তিনি পারিবারিক শিকড়ের কথা বলেছেন। ভোগ তার ২০২৪ সালের এই পোশাককে সেই ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করে। কানের মতো বিশ্বব্যাপী প্রচার পাওয়া আয়োজনে এমন একটি পোশাক পরার কারণে মুহূর্তটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক ফ্যাশন সংবাদে ছড়িয়ে পড়ে। পোশাকটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এর ভিনটেজ পরিচয়। নতুন করে তৈরি কোনো পোশাকের পরিবর্তে দুই দশকেরও বেশি পুরোনো মাইকেল অ্যান্ড হুশি ডিজাইন বেছে নিয়েছিলেন বেলা। ২০২৪ সালের কান উৎসবে তিনি আরও কয়েকটি আর্কাইভাল ও ভিনটেজ ডিজাইনের পোশাক পরেছিলেন। তবে কেফিয়েহ পোশাকটি তার ফিলিস্তিনি পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় সবচেয়ে আলোচিত লুকগুলোর একটি হয়ে ওঠে। কান চলচ্চিত্র উৎসব বহু বছর ধরেই শুধু সিনেমা নয়, আন্তর্জাতিক ফ্যাশনেরও অন্যতম বড় মঞ্চ। তারকাদের পোশাক প্রায়ই সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা ব্যক্তিগত বার্তা বহন করে। বেলা হাদিদের ২০২৪ সালের কেফিয়েহ পোশাক সেই ধারারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যেখানে ভিনটেজ ফ্যাশনের সঙ্গে মিলেছিল তার ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যের দৃশ্যমান প্রকাশ।
গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র সামনে এনে ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। গুগল আর্থের সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করে যুদ্ধের আগে ও পরের গাজার বিভিন্ন এলাকার চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন তিনি। শনিবার ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করা পোস্টে জোলি গাজার রাফাহ, খান ইউনিস ও গাজা সিটির কয়েকটি এলাকার আগের ও বর্তমান চিত্র পাশাপাশি তুলে ধরেন। ছবিগুলোতে আগে ঘনবসতিপূর্ণ বিভিন্ন এলাকা এখন ব্যাপকভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখা যায়। তিনি লিখেছেন, এখন গুগল আর্থ খুললেই গাজায় কী ঘটেছে, তার একটি চিত্র দেখা সম্ভব। জোলি বলেন, গাজার পুরো পুরো মহল্লা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বাড়িঘর, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, সড়ক, পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত অথবা ধ্বংস হয়েছে। তবে স্যাটেলাইট ছবিতে শুধু ভৌত ধ্বংসই দেখা যায়, এর আড়ালে থাকা মানুষের দুর্ভোগ, নিহত পরিবার কিংবা বেঁচে থাকা মানুষের প্রতিদিনের সংগ্রাম ছবিতে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। জাতিসংঘের স্যাটেলাইট সেন্টার ইউএনওস্যাটের তথ্য তুলে ধরে জোলি জানান, ২০২৬ সালের ১৬ জুন পর্যন্ত গাজার প্রায় ৮২ শতাংশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ইউএনওস্যাটের হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার সংখ্যা দুই লাখের বেশি। শীত ঘনিয়ে আসায় গাজার মানবিক পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে বলেও সতর্ক করেছেন জোলি। তাঁর শেয়ার করা তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার মানুষ, যা গাজার জনসংখ্যার প্রায় ৯৪ শতাংশ, আশ্রয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সহায়তা প্রয়োজন। অথচ ত্রাণ ও আশ্রয় তৈরির প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এখনও নানা ধরনের বাধা ও বিলম্ব রয়েছে। জোলি বলেন, শীত আসার আগেই মানুষের নিরাপদ আশ্রয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী বেসামরিক মানুষের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি গাজার মানুষের বাড়িঘর, স্কুল, হাসপাতাল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনর্গঠনের পরিবেশ তৈরিরও আহ্বান জানান। গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে এর আগেও সরব হয়েছেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। দীর্ঘদিন জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকা এই অভিনেত্রী চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিসরের দিক থেকে রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি মিসরীয় রেড ক্রিসেন্টসহ মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং গাজার জন্য প্রস্তুত রাখা ত্রাণ ও চিকিৎসাসামগ্রীও দেখেন। সেই সফরেও জোলি গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের পথ নিরাপদ ও ধারাবাহিক রাখার পাশাপাশি ত্রাণ, জ্বালানি ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। এবার স্যাটেলাইট ছবির মাধ্যমে ধ্বংসের পরিসর তুলে ধরে তিনি আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি গাজার বেসামরিক মানুষের জরুরি প্রয়োজনের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করলেন।
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত বিমান হামলায় এবার প্রাণ হারালেন ফিলিস্তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাল্টিমিডিয়া বিভাগের প্রধান ড. ইয়াসমিন খামিস আল-বুবো। শনিবার ভোরে পশ্চিম গাজার একটি আবাসিক ভবনে চালানো এই হামলায় ড. ইয়াসমিনসহ মোট পাঁচজন নিহত হয়েছেন। মর্মান্তিক এই ঘটনায় নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজনই নারী বলে জানা গেছে। ড. ইয়াসমিন খামিস আল-বুবো দীর্ঘ সময় ধরে ফিলিস্তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে, তিনি শুধু মাল্টিমিডিয়া বিভাগেই শিক্ষকতা করতেন না, বরং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ওই বিভাগের প্রধানের দায়িত্বও পালন করে আসছিলেন। একজন মেধাবী শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁর কম্পিউটার সায়েন্স, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ব্যবস্থাপনা বিষয়ে একাধিক উচ্চতর ডিগ্রি ছিল। তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে ফিলিস্তিনের শিক্ষাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শনিবার ভোরে চালানো ওই প্রাণঘাতী হামলায় ড. ইয়াসমিনের সঙ্গে তাঁর ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ মা হালুম মাহমুদ আল-বুবোও শাহাদাতবরণ করেন। একই অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসরত অপর দুই খ্রিষ্টান ফিলিস্তিনিও এই হামলায় নিহত হন, যারা সম্পর্কে মা ও মেয়ে ছিলেন। গাজায় চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনে বেসামরিক নাগরিক, নারী ও শিক্ষাবিদদের এভাবে প্রাণ হারানোর ঘটনা উপত্যকাটির মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহ চিত্রকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে বড় মসজিদগুলোর একটির নেতা সালাহ সারসুরকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে দেশ থেকে বহিষ্কার করা যেতে পারে বলে রায় দিয়েছেন একজন অভিবাসন বিচারক। বুধবার শিকাগো ইমিগ্রেশন কোর্টের বিচারক জেমি সালিনার্দি সারসুরকে বহিষ্কারযোগ্য বলে ঘোষণা করেন। তবে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে করা একটি পৃথক অভিযোগ, তিনি অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন, তা খারিজ করে দিয়েছেন বিচারক। সালাহ সারসুর উইসকনসিনের ইসলামিক সোসাইটি অব মিলওয়াকির সভাপতি। ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার জন্য তিনি পরিচিত। চলতি বছরের মার্চে মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার কর্মকর্তারা তাকে মিলওয়াকি থেকে আটক করেন। পরে জুনে মার্কিন জেলা আদালতের বিচারক জেমস প্যাট্রিক হ্যানলন তাকে মুক্তির নির্দেশ দেন। আদালত তখন বলেছিল, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে সারসুরের বক্তব্যের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন তাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে কি না, সে বিষয়ে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দাবি রয়েছে। তবে বুধবারের অভিবাসন আদালতের রায়ে সারসুরকে বিদেশনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত ভিত্তিতে বহিষ্কারযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়েছে। সারসুর এই সিদ্ধান্তকে ‘গভীরভাবে হতাশাজনক’ বলে জানিয়েছেন এবং রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা বলেছেন। এক বিবৃতিতে সারসুর বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে, তা রক্ষার জন্য তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে যে দেশকে নিজের বাড়ি হিসেবে বিবেচনা করেছেন, সেখানে থাকার অধিকার নিয়েও তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। মার্কিন সরকারের আইনজীবীরা সারসুরের বিরুদ্ধে মূলত ইসরায়েলে কয়েক দশক আগের কিছু দণ্ডের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাদের দাবি, এসব ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা তাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সরকার আরও দাবি করেছিল, সারসুর গ্রিন কার্ডের আবেদনে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন এবং ভোট দেওয়ার সময় নিজেকে মার্কিন নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তবে বিচারক অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগটি গ্রহণ করেননি। মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ এক বিবৃতিতে বলেছে, অবৈধভাবে অবস্থানকারী প্রত্যেক ব্যক্তিই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ পান। কোনো অভিবাসন বিচারক যদি মনে করেন যে কোনো ব্যক্তির যুক্তরাষ্ট্রে থাকার আইনগত অধিকার নেই, তাহলে তাকে বহিষ্কার করা হবে বলে বিভাগটি জানিয়েছে। সারসুরের জন্ম ইসরায়েলের দখলাধীন পশ্চিম তীরের এলাকায়। ১৯৮৮ সালে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দিকে পাথর ছোড়ার অভিযোগে তিনি ইসরায়েলে কারাগারে ছিলেন এবং ওই ঘটনায় দণ্ডিত হন। মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ বলেছে, ওই সময় একটি পেট্রোলবোমা নিক্ষেপের অভিযোগেও তিনি দণ্ডিত হয়েছিলেন। তবে সারসুরের আইনজীবীরা বলছেন, পেট্রোলবোমা নিক্ষেপের অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করা হলেও ওই অভিযোগে তিনি দণ্ডিত হননি। ১৯৯৫ সালে অস্ত্র রাখার চেষ্টা সংক্রান্ত একটি মামলায়ও সারসুর দণ্ডিত হন। তিনি এসব অপরাধ করার কথা অস্বীকার করেছেন। তার আইনজীবীদের দাবি, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাকে নির্যাতন করে এবং চাপ প্রয়োগ করে স্বীকারোক্তি আদায় করেছিল। সারসুর ১৯৯৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং দেশটিতে তার কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই বলে তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর থেকেই মার্কিন সরকার তার ইসরায়েলি দণ্ডের বিষয়টি জানত। সারসুরের আশঙ্কা, তাকে পশ্চিম তীরে ফেরত পাঠানো হলে তার জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। মঙ্গলবার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে তিনি বলেন, পশ্চিম তীরে ফেরত পাঠানো তার জন্য জীবনের সমাপ্তির মতো হবে। তার আইনজীবী প্যাট্রিক টরেলও দাবি করেছেন, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হাতে সারসুরের অতীত অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে তার জন্য কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তার একটি ইঙ্গিত দেয়। বহিষ্কারের আদেশে সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি অঞ্চল ছাড়াও জর্ডানের নাম রয়েছে। বুধবারের শুনানিতে টরেল বিচারকের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করার অনুরোধ করেন। তার যুক্তি, জর্ডানের সঙ্গে সারসুরের কোনো সম্পর্ক নেই এবং সেখানে তার বসবাসের অধিকারও নেই। সারসুরকে একটি অভিবাসন ফরমে জর্ডানকে নিজ দেশের নাম হিসেবে লিখতে বলা হয়েছিল, কারণ ‘ফিলিস্তিন’কে পূর্ণাঙ্গ ও একীভূত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখানোর বিষয়টি মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থায় জটিল। বিচারক অবশ্য বহিষ্কারের গন্তব্য নির্দিষ্ট করে দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন, বিষয়টি আপিলের সময় বিবেচনা করা যেতে পারে। সারসুরের আইনজীবী আরও বলেছেন, তাকে জর্ডানে পাঠানো হলেও সেখান থেকে দ্রুত ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। এই মামলায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নেওয়া একটি বিশেষ অভিবাসন পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের জুনে রুবিও একটি তুলনামূলকভাবে বিরল অভিবাসন আইনি বিধান ব্যবহার করে সারসুরকে বিদেশনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তিতে বহিষ্কারের পথ তৈরি করেন বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। একই ধরনের বিধান ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার মাহমুদ খলিল ও মোহসেন মাহদাওয়ির ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসন ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ বলেছে, রুবিওর কাছে সারসুরের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। বিভাগটি আরও দাবি করেছে, সারসুর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন অথবা কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনকে সমর্থন করেছেন। তবে সারসুরের আইনজীবীরা এসব অভিযোগের বিরোধিতা করেছেন। সারসুরের পক্ষে আগস্টে সাক্ষ্য দেওয়া আইনজীবী জাওয়াদ বুলুস বলেন, ইসরায়েলে সারসুরকে চাপ প্রয়োগ করে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। তার দাবি, সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো অভিযোগে সারসুরকে দণ্ডিত করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের সদস্যরা সারসুরকে নির্যাতন করেছিলেন। মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ অবশ্য এই নির্যাতনের দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফিলিস্তিনি বন্দিদের ইসরায়েলি কারাগারে আচরণ এবং ইসরায়েলি সামরিক আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও বিভিন্ন সময় মানবাধিকার সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষজ্ঞরা জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা না থাকার অভিযোগের বিষয়েও সাক্ষ্য দিয়েছেন। ইসরায়েল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে থাকে। এর আগে জুনে মার্কিন জেলা বিচারক হ্যানলন সারসুরকে অভিবাসন হেফাজত থেকে মুক্তির নির্দেশ দেওয়ার সময় বলেছিলেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পেছনে সুরক্ষিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি ভূমিকা রেখেছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। বিচারক আরও বলেন, কয়েক দশক ধরে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পর হঠাৎ তাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করার কারণ সরকার যথেষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। ট্রাম্প প্রশাসন ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। সারসুরের শারীরিক অবস্থার বিষয়টিও মামলায় উঠে এসেছে। তার আইনজীবীদের দাবি, আটক থাকার সময় তিনি ৩০ পাউন্ডের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১৪ কেজি ওজন হারিয়েছেন। তিনি টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার রক্তে শর্করার মাত্রা মাসে মাত্র একবার পরীক্ষা করা হয়েছে বলে আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন। তাদের মতে, এতে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। কেএফএফ হেলথ নিউজ ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক যৌথ অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৩৩টি অঙ্গরাজ্যে শত শত আটক ব্যক্তি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে ফেডারেল আদালতে মামলা করেছেন। তবে এসব মামলার সব অভিযোগের সত্যতা আদালতের চূড়ান্ত রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন দাবি করা হয়নি। সারসুরের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের রায়ের পর এখন তার আইনি লড়াই অব্যাহত থাকবে। রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের নোটিশ দেওয়ার জন্য তার হাতে ৩০ দিন এবং আইনি সুরক্ষা চেয়ে আবেদন করার জন্য ৬০ দিন সময় রয়েছে। সব ধরনের আইনি সুযোগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকার তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করতে পারবে না। মামলাটি পরবর্তী সময়ে বিচারক ক্রেইগ ডিফোর তত্ত্বাবধানে চলবে। সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP), যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ।
শরণার্থীদের জন্য স্থগিত থাকা ‘ইউকে রিসেটেলমেন্ট স্কিমে’ নতুন সুপারিশ গ্রহণ আবার শুরু করেছে যুক্তরাজ্য। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কর্মসূচিতে সুপারিশ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ হবেন আফগান নারী ও বালিকা এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থী। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও ইন্টারন্যাশনাল রিফিউজি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্টের সঙ্গে অংশীদারত্বে তাঁদের শনাক্ত ও সুপারিশ করা হবে। সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর লিভারপুলে লেবার পার্টির সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এ ঘোষণা দেন। সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, নতুন সুপারিশ গ্রহণ শুরু হয়েছে এবং এ পথে প্রথম শরণার্থীদের চলতি বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর কথা। ‘এক-চতুর্থাংশ’ হলো সুপারিশের প্রত্যাশিত অনুপাত; ইতিমধ্যে পৌঁছানো শরণার্থীদের হিসাব নয়। এই পুনর্বাসন কর্মসূচির পাশাপাশি তিনটি নতুন স্পন্সরশিপ পথ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। অক্টোবর থেকে দাতব্য ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো কমিউনিটি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক স্পন্সরশিপের জন্য আবেদন করতে পারবে। এসব পথে শরণার্থীদের প্রথম আগমন প্রত্যাশিত ২০২৭ সালের শরতে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানভিত্তিক স্পন্সরশিপের আবেদন শুরু হওয়ার কথা ২০২৭ সালের বসন্তে; এর প্রথম আগমনও ওই বছরের পরের দিকে হতে পারে। স্পন্সরদের আবাসন ও নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সহায়তা দিতে হবে। সরকার বলছে, পুনর্বাসন ও নতুন তিনটি স্পন্সরশিপ পথ মিলিয়ে শুরুতে কয়েক শ শরণার্থী আসতে পারেন। পরে অনিয়মিত অভিবাসন কমার সঙ্গে সংখ্যা কয়েক হাজারে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিবছর একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হবে, তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা এখনো ঘোষণা করা হয়নি। এসব পথে আসা শরণার্থীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতির জন্য পাঁচ বছরের পথ দেওয়া হবে। শাবানা মাহমুদের বক্তব্য, যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালানো মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পারাপার কমাতে সরকার নিয়ন্ত্রিত আইনি পথ রাখতে চায়। তবে নতুন কর্মসূচির আকার এত ছোট হলে তা নৌকায় আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিবাসন গবেষকেরা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরির পরিচালক ম্যাডেলিন সাম্পশন বলেছেন, এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত কতজনকে নেওয়া হয়, তার ওপর নির্ভর করবে। রিফিউজি কাউন্সিল নতুন নিরাপদ পথ তৈরির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে সংস্থাটির প্রধান নীতিবিশ্লেষক জন ফিটনবির মতে, মানবপাচারকারীদের ওপর প্রভাব ফেলতে হলে কয়েক শ নয়, হাজার হাজার মানুষের জন্য এসব পথ চালু করতে হবে। অন্যদিকে কনজারভেটিভ পার্টি ও রিফর্ম ইউকে নতুন পথ চালুর সমালোচনা করেছে। ব্রিটিশ রেড ক্রস পৃথকভাবে শরণার্থীদের পারিবারিক পুনর্মিলনের পথ কবে আবার চালু হবে, তা জানাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পুনর্বাসনের এই ঘোষণা যুক্তরাজ্যে যেতে ইচ্ছুক সবার জন্য সরাসরি আবেদনের সুযোগ নয়। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির নিজের আবেদন করার ব্যবস্থা নেই; সুরক্ষার প্রয়োজন বিচার করে সংস্থাটি শরণার্থী শনাক্ত ও সুপারিশ করে, আর গ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় সংশ্লিষ্ট দেশ। পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কেউ অর্থ চাইলে তা-ও সতর্কতার বিষয়, কারণ এই প্রক্রিয়া শরণার্থীর জন্য বিনামূল্যে।
গাজায় প্রায় তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে ফিলিস্তিনি নি হ তের সংখ্যা ৭৪ হাজার ছাড়িয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাবে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৭৪ হাজার ১৬ জন ফিলিস্তিনি নি হ ত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬৮ জন আ হ ত হয়েছেন। শনিবার প্রকাশিত সর্বশেষ হিসাবে বলা হয়েছে, আগের ৪৮ ঘণ্টায় গাজার হাসপাতালগুলোতে আরও সাতজনের ম র দে হ পৌঁছেছে। তাদের মধ্যে ছয়জন নতুন করে নি হ ত হয়েছেন এবং একজন আগের আ ঘা তে মা রা গেছেন। একই সময়ে আরও ৩৮ জন আ হ ত হয়েছেন বলে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে ধ্বং স স্তূপের নিচে এবং বিভিন্ন এলাকায় এখনো অনেক ম র দে হ পড়ে থাকার কথা জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। উদ্ধারকারী ও অ্যাম্বুলেন্স দল সব জায়গায় পৌঁছাতে না পারায় প্রকৃত হ তা হ তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে তাদের দাবি। গত বছরের অক্টোবরে যু দ্ধ বি রতি কার্যকর হওয়ার পর বড় আকারের লড়াই কমে এলেও গাজায় হা ম লা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ইসরায়েল বলছে, নিরাপত্তা হু ম কি বা হা ম লার জবাবে তারা বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে অভিযান চালাচ্ছে। রোববারও মধ্য ও দক্ষিণ গাজায় ইসরায়েলি হা ম লায় অন্তত দুই ফিলিস্তিনি নি হ ত এবং কয়েকজন আ হ ত হয়েছেন বলে হাসপাতাল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। গাজা সিটিতে একটি গাড়িতে হা ম লায় একজন নি হ ত হন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, সেখানে একজন সামরিক অপারেটিভকে লক্ষ্য করা হয়েছিল। খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় আরেক হা ম লায় একজন নি হ ত ও তিনজন আ হ ত হন। ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে হামাসের একজন সদস্যকে লক্ষ্য করার কথা জানিয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হা ম লায় নি হ তদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও যোদ্ধাদের আলাদা হিসাব দেয় না। তবে তাদের বিস্তারিত হ তা হ তের নথিকে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংগঠন সাধারণভাবে নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করে। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে নি হ তদের প্রায় অর্ধেক নারী ও শিশু। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক মানবিক প্রতিবেদনেও গাজার পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংকটজনক বলা হয়েছে। ব্যাপক ধ্বং স, চলমান হা ম লা, জরুরি সরঞ্জাম প্রবেশে সীমাবদ্ধতা এবং অর্থসংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবাসহ মৌলিক সেবা মারাত্মক চাপে রয়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় থাকার ঝুঁকিও বাড়ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস নেতৃত্বাধীন যোদ্ধাদের ইসরায়েলে হা ম লায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নি হ ত হন, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক, এবং ২৫১ জনকে জি ম্মি করা হয়। এরপর গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যু দ্ধ বি রতির পরবর্তী ধাপও অনেকটাই স্থবির। ইসরায়েলি বাহিনী এখনো গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যু দ্ধ বি রতি কার্যকর হওয়ার পরও ১ হাজার ১৪৫ জন ফিলিস্তিনি নি হ ত হয়েছেন। একই সময়ে ৪ হাজার ৯৫৩ জন আ হ ত হয়েছেন বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। ৭৪ হাজার ১৬ জন নি হ তের এই সংখ্যা গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট করা হিসাব। যু দ্ধ চলমান থাকায় এবং ধ্বং স স্তূপের নিচে ও দুর্গম এলাকায় বহু মানুষ পড়ে থাকার কথা জানানোয় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, আরব নিউজ
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ফিলিস্তিনের শাসনভার ফিলিস্তিনিদের হাতেই ন্যস্ত থাকার বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে চীন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া এক ভাষণে দেশটির উপ-রাষ্ট্রপতি হান ঝেং এই জোরালো বার্তা প্রদান করেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে জানান, ফিলিস্তিনিরাই নিজেদের দেশ পরিচালনা করবে এবং এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই পশ্চিম তীরের সার্বিক উন্নয়ন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার পুনর্গঠন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। ফিলিস্তিন সংকটের একটি চিরস্থায়ী ও কার্যকর সমাধানের জন্য যত দ্রুত সম্ভব 'দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক' সমাধানের ফর্মুলায় ফিরে যাওয়ার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন তিনি। জাতিসংঘ বা নিরাপত্তা পরিষদের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে এককভাবে কোনো দেশের ওপর হামলা চালানোকে চরম অন্যায় আখ্যা দিয়ে হান ঝেং বলেন, যেকোনো বিরোধ কেবল আলোচনার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি করা বুদ্ধিমানের কাজ। বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বৃহৎ শক্তিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি প্রসঙ্গে চীনের উপ-রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সবার শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি রক্ষার্থে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ চেইন সচল রাখার বিষয়েও তিনি জোর দেন। ফিলিস্তিন ইস্যুর পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের সংকট নিয়েও অধিবেশনে কথা বলেন চীনের এই শীর্ষ নেতা। তিনি জানান, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে চীন নিজস্ব উদ্যোগে শান্তি ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া কিউবার ওপর থেকে সব ধরনের একতরফা ও অন্যায় নিষেধাজ্ঞা এবং হুমকি অবিলম্বে তুলে নেওয়ারও জোরালো দাবি জানান তিনি। আধুনিক প্রযুক্তির প্রসঙ্গে হান ঝেং বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর যুগে প্রযুক্তির বিকাশ ও ব্যবহার যেন কেবল মানবকল্যাণেই নিবেদিত হয়। বিশ্বে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যকার ডিজিটাল বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমান সুযোগ ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করারও তাগিদ দেন তিনি।
ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের কোনো বিকল্প নেই বলে আবারও আন্তর্জাতিকভাবে ঐকমত্য পোষণ করেছে ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর দ্য ইমপ্লিমেন্টেশন অব দ্য টু-স্টেট সলিউশন’। গত ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে জোটের কো-চেয়ারদের একটি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ‘নিউইয়র্ক ঘোষণাপত্র’ গ্রহণের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই বৈঠকে ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী এবং গাজার বোর্ড অব পিস-এর উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিসহ প্রায় ১০০টি রাষ্ট্র ও সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই সমাধানের পেছনে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। তবে পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হওয়ায় সমাধানের পথ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। বৈঠক শেষে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ, উচ্ছেদ, বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং চরমপন্থি বসতি স্থাপনকারীদের নজিরবিহীন সহিংসতা দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এসব বেআইনি কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করার এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে পবিত্র স্থানগুলোতে ঐতিহাসিক ও আইনি স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে জোটটি। বিবৃতিতে ফিলিস্তিন নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পুনরায় ব্যক্ত করে বলা হয়, গাজা এবং পশ্চিম তীরসহ পূর্ব জেরুজালেম মূলত একটি একক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড। গাজাকে কোনোভাবেই পশ্চিম তীর থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না এবং একটি বৈধ ফিলিস্তিনি সরকারের অধীনে এর পুনরেকত্রীকরণ অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এই অঞ্চলে প্রকৃত শান্তি ও নিরাপত্তা আনা সম্ভব। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ওপর চলমান আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ নিয়েও বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আটকে রাখা সব রাজস্ব তহবিল ফিলিস্তিনকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং দাতা সংস্থাগুলোকে সরাসরি সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা রক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে। গাজায় দ্রুত ও নিরাপদে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং জাতিসংঘ ও এর সংস্থাগুলোর, বিশেষ করে ইউএনআরডব্লিউএ-এর (UNRWA) মাধ্যমে পুনর্গঠন কাজ শুরু করার ওপর জোর দিয়েছে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স। গাজায় যুদ্ধবিরতি সুসংহত করার পাশাপাশি হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণ এবং ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। সবশেষে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল উভয়ের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অঙ্গীকার যেমন অটুট রয়েছে, তেমনি ইসরায়েলকে বুঝতে হবে যে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের পথে বাধা সৃষ্টি করে কখনোই দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা অর্জন করা সম্ভব নয়।
ফিলিস্তিনিরা তাদের নিজেদের মাতৃভূমি কোনোভাবেই ছাড়বে না এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতিও মেনে নেবে না বলে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। একই সঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়া হবে না বলেও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় টানা দ্বিতীয়বারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সশরীরে যোগ দিতে পারেননি আব্বাস। তবে অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বিশ্বনেতাদের সামনে ফিলিস্তিনি জনগণের পক্ষে এই জোরালো বার্তা তুলে ধরেন তিনি। ভাষণে আব্বাস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে আরব ও ইসলামি দেশগুলোর নেতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল বা সংযুক্তিকরণ রোধ এবং ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। ইসরায়েলের অব্যাহত ভূমি দখলের তীব্র সমালোচনা করে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট বলেন, ফিলিস্তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করা এবং নিজেদের ভূমিতে টিকে থাকার সক্ষমতা ধ্বংস করার সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই এই দখলদারিত্ব চালানো হচ্ছে। গাজায় চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনকে ‘গণহত্যামূলক যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে মাহমুদ আব্বাস বলেন, দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক অবিচারের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিরা হত্যা, ধ্বংস ও অনাহারের শিকার হচ্ছে। গাজা উপত্যকায় নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, সেখানকার আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল থেকে শুরু করে মসজিদ-গির্জাসহ সবকিছু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, যা একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। গাজার পাশাপাশি পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট। সেখানে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, পশ্চিম তীরকে খণ্ডিতকরণ এবং দখলদার বাহিনীর ছত্রচ্ছায়ায় বসতি স্থাপনকারীদের অব্যাহত সহিংসতার চিত্র তুলে ধরেন তিনি। উল্লেখ্য, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মাহমুদ আব্বাসের এই ভার্চুয়াল বক্তব্য প্রদানের অনুমোদনের পক্ষে ১৫২টি দেশ ভোট দেয়, বিপক্ষে ভোট পড়ে ৩টি এবং ৪টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।