- প্রচ্ছদ
- Topic
ইরান যুদ্ধ
ইরানের সঙ্গে পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এতে ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রাশিয়া বা চীনের মতো বড় সামরিক শক্তির সঙ্গে সংঘাত হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের ৪ আগস্টের প্রতিবেদনে তিনজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনী আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম এবং প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইলের মতো দূরপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক মজুতের প্রায় পুরোটাই ব্যবহার করেছে। একই সময়ে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ৬৫ শতাংশ এবং থাড ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ৩৮ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে। নৌবাহিনীর টমাহক ক্রুজ মিসাইলের মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। নিউইয়র্ক টাইমসও এ বিষয়ে প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরান যুদ্ধের চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যান্য অঞ্চল, বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার সামরিক মজুত থেকেও অস্ত্র সরিয়ে নিতে হয়েছে। এতে সম্ভাব্য অন্য সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পত্রিকাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কম থাকলে রাশিয়া ও চীন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে নতুন করে হিসাব করতে পারে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত টমাহক, থাড ও প্যাট্রিয়টের মতো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক বছর লাগতে পারে। সংস্থাটির হিসাবে, এসব অস্ত্রের কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধপূর্ব মজুত পুনর্গঠনে তিন বছর বা তারও বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে। এই পরিস্থিতির কৌশলগত প্রভাব সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে চীন ও রাশিয়াকে ঘিরে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এসব অস্ত্রের মজুত কমে গেলে একই সময়ে একাধিক সামরিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রতিপক্ষরা নতুন করে হিসাব করতে পারে। তবে এর অর্থ রাশিয়া বা চীন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে এমন নয়। উদ্বেগটি মূলত সামরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট ধরনের অস্ত্রের মজুত দীর্ঘ সময় কম থাকলে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষরা ভবিষ্যৎ সংঘাতের ঝুঁকি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা মূল্যায়নের সময় বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। গত মাসে লকহিড মার্টিনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্য সর্বোচ্চ ৫৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি দেওয়া হয়েছে। কোম্পানিটি ২০৩০ সালের মধ্যে প্যাট্রিয়ট উৎপাদন সক্ষমতা তিন গুণ করার পরিকল্পনা জানিয়েছে। তবে উৎপাদন বাড়ালেই দ্রুত ঘাটতি পূরণ হবে না। রাইনমেটালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরমিন প্যাপারগার জানিয়েছেন, এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় লাগবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মজুত পুনর্গঠনে দুই বছরের বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ৬ আগস্ট বলেছেন, কিছু শক্তিশালী মার্কিন অস্ত্রের সরবরাহ এখনো পর্যাপ্ত থাকলেও কয়েকটি অস্ত্রের ক্ষেত্রে মজুত কমে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো উৎপাদন বাড়াচ্ছে। . ফলে ইরান যুদ্ধ এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের বিষয় নয়। দীর্ঘ সংঘাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র কত দ্রুত ব্যবহার হয়ে যেতে পারে এবং সেই মজুত পুনর্গঠনে কত সময় লাগে, সেটিও ওয়াশিংটনের জন্য বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। মজুত দ্রুত পুনর্গঠন করা না গেলে ভবিষ্যতে রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা আরও জটিল হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি শ্লথ হয়ে পড়েছে। সদ্য প্রকাশিত একটি সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতির ব্যাপক ঊর্ধ্বমুখিতার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জুন মাসে শেষ হওয়া দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি বার্ষিক ১.৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগের প্রান্তিকের ২.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশ ধীর। এই প্রবৃদ্ধির হার অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের চেয়েও কম। তবে, ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসের ০.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় বর্তমান পরিসংখ্যানটি কিছুটা স্বস্তিদায়ক। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজারে যে ঐতিহাসিক সংকট তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই অর্থনীতিতে। এএএ (AAA)-এর তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের জাতীয় গড় মূল্য ৪.৫৬ ডলারের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছিল; যদিও গত মাসে একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তির পর তা কিছুটা কমে আসে। এছাড়া, বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ফেডারেল রিজার্ভের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। এতসব প্রতিকূলতা ও ব্যবসার খরচ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও, দেশটির শ্রমবাজার ও কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কার চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশই এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের ফলে। জেপি মর্গান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে মার্কিন জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে এআই খাতের ব্যয়ের কারণে, যা সাধারণ ভোক্তাদের অবদানকেও ছাড়িয়ে গেছে। এদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং শক্তিশালী শ্রমবাজারের কারণে সুদের হার বৃদ্ধির জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে, জিডিপি তথ্য প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা আগে ফেডারেল রিজার্ভ তাদের সুদের হার ৩.৫% থেকে ৩.৭৫% এর ঘরেই অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের ওপর উচ্চমূল্যের চাপ কমাতে তারা যেকোনো মূল্যে বাজারে দামের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর।
ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাতে মার্কিন সেনাদের হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের মুখে নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন)। সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে আরও ১৪০ জনের বেশি আহত সেনার তথ্য যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে গত সপ্তাহের হামলায় নিহত চার মার্কিন সেনার তথ্যও আবার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পেন্টাগনের ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেম (ডিসিএএস)-এ প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, 'অপারেশন এপিক ফিউরি'-এর আওতায় ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর পর এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৬২৪ জন আহত হয়েছেন। এর আগে গত সপ্তাহে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ডিসিএএসের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানায়, ওয়েবসাইটে আহত সেনার সংখ্যা ৪৮২ দেখানো হচ্ছিল। নতুন হালনাগাদে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পেন্টাগন ৭ জুলাই থেকে ডিসিএএসে "ওভারসিজ অপারেশনস" নামে একটি নতুন বিভাগও যুক্ত করেছে। তবে এই নতুন বিভাগের আওতায় ৭ জুলাইয়ের আগে ও পরে সংঘটিত কোন কোন সামরিক ঘটনার তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। প্রকাশিত তালিকায় জর্ডানে ইরানের হামলায় নিহত তিন মার্কিন সেনা এবং উত্তর ইরাকে ইরানি ড্রোন হামলার সময় নিহত আরও এক সেনার নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। হতাহতের তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে পেন্টাগনের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যমের পাশাপাশি কংগ্রেসের আইনপ্রণেতারাও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মার্কিন সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটির ১২ জন ডেমোক্র্যাট সদস্য গত বৃহস্পতিবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে হতাহতের হিসাবের অসামঞ্জস্যের ব্যাখ্যা চান। পরে পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত প্রেস সচিব জোয়েল ভালদেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করেন, ডিসিএএস ওয়েবসাইটে "সাময়িক তথ্যসংক্রান্ত ত্রুটি" দেখা দেওয়ায় এ অসঙ্গতি তৈরি হয়েছিল। তবে কী ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। এদিকে সিএনএন জানিয়েছে, তারা বিষয়টি নিয়ে পেন্টাগনের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইলেও রোববার পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব পায়নি। এই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট নিয়েও নতুন আলোচনা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসে পাঠানো এক নোটিশে দাবি করেছেন, ৭ জুলাই থেকে ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে। প্রশাসনের মতে, এর আগে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির কারণে ৬০ দিনের আইনি সময়সীমার হিসাব নতুনভাবে শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্ট ৬০ দিনের বেশি সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারেন না। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেছেন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের একাধিক আইনপ্রণেতা। রিপাবলিকান সিনেটর লিসা মুরকস্কি সম্প্রতি এক শুনানিতে বলেন, যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সময়সীমা পুনর্গণনার এই ব্যাখ্যা প্রশাসনকে কংগ্রেসের সাংবিধানিক নজরদারি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে। অন্যদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মে মাসে হোয়াইট হাউসে এক ব্রিফিংয়ে ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্টকে "সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক" বলে মন্তব্য করেন। হতাহতের হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশের পরও তথ্য ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং যুদ্ধসংক্রান্ত সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে চলমান মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ সামরিক অভিযানে নিহত ৪ মার্কিন সেনা সদস্যের নাম তাদের দাপ্তরিক ক্যাজুয়ালটি বা হতাহতের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগন। গত সপ্তাহে শেষ হওয়া সংঘাতে ওই সেনারা প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং গত বুধবার স্বশরীরে ডোভার এয়ারফোর্স বেসে তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে পেন্টাগনের ওয়েবসাইটে ওই চারজনের নাম তালিকাভুক্ত না করায় মার্কিন রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যমে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। পেন্টাগনের ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালিসিস সিস্টেমের (ডিসিএএস) ওয়েবসাইট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত বুধবার তালিকাটি হালনাগাদ করার পরও 'অপারেশন এপিক ফিউরি'-তে নিহত মোট মার্কিন সেনার সংখ্যা ১৪ তে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই ওয়েবসাইটের অপর একটি নিহতদের নামের তালিকায় বর্তমানে মাত্র ১৩ জন সেনা সদস্যের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার পেন্টাগনের ওয়েবসাইটে ইরান যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা ১৮ জন দেখানো হচ্ছিল। তবে বৃহস্পতিবার সেই সংখ্যা কমিয়ে ১৪ জন করে পেন্টাগন। জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত তিন সেনা এবং ইরাকের এরবিল বিমান ঘাঁটিতে ইরানি ড্রোনের নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের সময় নিহত চতুর্থ সেনার নাম তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়ায় এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর এই চার সেনার মৃত্যু হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন তাদের মূল তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত এপ্রিলে ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন এবং জুন মাসে চুক্তি স্বাক্ষর হলেও পরবর্তীতে দুই পক্ষই পুনর্নবীকরণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এদিকে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য থমাস ম্যাসি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করে লিখেছেন, পেন্টাগন ভান করছে যেন এখানে সংক্ষিপ্ত একটি যুদ্ধবিরতি দিয়ে দুটি আলাদা ইরান যুদ্ধ ঘটেছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ৯০ দিনের বেশি যুদ্ধ চালিয়ে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ আইন ভঙ্গ করছেন এবং তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত বলে দাবি করেন ম্যাসি। তবে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল তথ্য গোপনে বা বিকৃতির অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি জানান, ওয়েবসাইটের ডেটা প্রক্রিয়াজাতকরণে সাময়িক যান্ত্রিক ত্রুটি বা বিঘ্ন ঘটার কারণে এই অসঙ্গতি তৈরি হয়েছিল, যা দ্রুত সমাধান করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, পেন্টাগনের ওয়েবসাইট থেকে নাম সরানোর ঠিক একদিন আগেই সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডেলাওয়্যারের ডোভার এয়ারফোর্স বেসে উপস্থিত হয়ে দেশে ফেরত আনা ওই চার সেনার কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। এর পরপরই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি চার্ট প্রকাশ করে দাবি করেন যে, ভিয়েতনাম, কোরিয়া কিংবা আফগানিস্তানের দীর্ঘদিনের সংঘাতের তুলনায় তার মেয়াদে ইরান যুদ্ধে প্রাণহানির সংখ্যা অত্যন্ত কম। ভিয়েতনামে ২ লাখ মার্কিন সেনা মারা যাওয়ার দাবি করেন ট্রাম্প, যদিও সরকারি হিসাবে সেই সংখ্যা ছিল ৫৮,২২০ জন। ইরান যুদ্ধের সার্বিক সামরিক অভিযানের স্বচ্ছতা এবং নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ নিয়ে পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের ভূমিকা এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের প্রস্তাবিত ৯৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বাজেট প্রস্তাব অল্প ব্যবধানে পাস হয়েছে। ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক অভিযানের অর্থায়ন এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেশ কয়েকটি অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে আনা এ প্রস্তাব ২১৬–২১৪ ভোটে অনুমোদন পায়। এখন এটি পরবর্তী বিবেচনার জন্য সিনেটে যাবে। বাজেট প্রস্তাবটি রিপাবলিকানদের সমর্থনেই পাস হয়েছে। সব ডেমোক্র্যাট সদস্য এর বিপক্ষে ভোট দেন। পাশাপাশি দুই রিপাবলিকান সদস্য এবং একজন স্বতন্ত্র সদস্যও বিরোধিতা করেন। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন এটিকে রিপাবলিকানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনগত উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন এবং বাজেট পুনর্মিলন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি এগিয়ে নেওয়ার কৌশল নেন, যাতে সিনেটে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিল পাসের পথ সহজ হয়। প্রস্তাবিত অর্থের মধ্যে ৬০ বিলিয়ন ডলার পেন্টাগনের জন্য এবং ১৩ বিলিয়ন ডলার অন্যান্য জাতীয় নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় ১২ বিলিয়ন ডলার এবং ভোটার নিবন্ধন সংক্রান্ত কঠোর বিধান অন্তর্ভুক্ত ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’-সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে ১০ বিলিয়ন ডলার রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এ প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, যুদ্ধের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর মতো অভ্যন্তরীণ খাতে অর্থ ব্যয় করা উচিত। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা দাবি করছেন, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার, কৃষকদের সহায়তা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য এই অর্থায়ন প্রয়োজন। তবে প্রতিনিধি পরিষদে পাস হলেও সিনেটে বিলটির ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। রিপাবলিকানদের মধ্যেও ব্যয় বৃদ্ধির বিপরীতে ব্যয় কমানোর ব্যবস্থা না থাকায় আপত্তি রয়েছে। সিনেটের কয়েকজন সদস্য ভোটার নিবন্ধনসংক্রান্ত কিছু বিধান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে প্রস্তাবটি সিনেটে সংশোধনের মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই বাজেট প্রস্তাব চূড়ান্ত আইন নয়। এটি সংশ্লিষ্ট কংগ্রেসীয় কমিটিগুলোকে পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের নির্দেশনা দেবে। সেই খসড়া পরে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে ভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হলে তবেই এটি আইনে পরিণত হবে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা তহবিলের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন অ্যারিজোনার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান ইয়াসামিন আনসারি। তিনি বলেছেন, নতুন সামরিক অর্থায়নের প্রস্তাব এলে ডেমোক্র্যাটদের জবাব হবে “হেল নো” এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে এ যুদ্ধের জন্য “আর এক ডলারও” বরাদ্দের পক্ষে নন। ক্যাপিটল ভবনের সামনে সাংবাদিক স্কট ম্যাকফারলেনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আনসারি বলেন, “নতুন পেন্টাগন তহবিলের প্রস্তাবের জবাব হবে ‘হেল নো’। কোনো ডেমোক্র্যাট এই নীতিকে সমর্থন করবে না।” তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন একাধিকবার যুদ্ধ শেষ হওয়া বা সমঝোতা আসন্ন বলে দাবি করলেও বাস্তবে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। একই সাক্ষাৎকারে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মানসিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তবে ট্রাম্পের ডিমেনশিয়া রয়েছে—এমন কোনো চিকিৎসাগত বা সরকারি প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। এ মন্তব্য আনসারির ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত। যুদ্ধের মানবিক মূল্য তুলে ধরে আনসারি বলেন, মার্কিন সেনারা এমন এক সংঘাতে জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন, যার উদ্দেশ্য তিনি স্পষ্টভাবে দেখতে পান না। তাই তিনি এ যুদ্ধের জন্য নতুন অর্থ বরাদ্দের বিরোধিতা করছেন। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসে রাজনৈতিক উত্তেজনা ইতোমধ্যে বেড়েছে। গত সপ্তাহে ডেমোক্র্যাটরা ইরান যুদ্ধ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ১ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বার্ষিক প্রতিরক্ষা নীতিমালা বিলের অগ্রগতি আটকে দেয়। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, কংগ্রেসের পর্যাপ্ত অনুমোদন ও সুস্পষ্ট কৌশল ছাড়াই ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে এই সংঘাতে জড়িয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় ৬০ ভোটের পরিবর্তে বিলটি ৫০–৪৬ ভোট পেয়ে প্রক্রিয়াগতভাবে আটকে যায়। এদিকে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদের বাজেট কমিটি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ৯৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ব্যয় পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়েছে। এতে আগামী এক দশকে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের জন্য ৭৩ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। পরিকল্পনাটি প্রতিনিধি পরিষদে ভোটের জন্য তোলা হতে পারে। নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে আনসারি সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি ২০২৬ অর্থবছরের ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্টের বিরুদ্ধেও ভোট দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, দেশের জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজন থাকলেও তা যেন জনকল্যাণমূলক খাতের ব্যয় কমিয়ে বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে না হয়। ইরান যুদ্ধের ব্যয়, কৌশল এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে, অন্যদিকে বিরোধীরা যুদ্ধের মানবিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পাশাপাশি সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা এ বিষয়গুলো নিয়ে পৃথক আলোচনা করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে হামলা ও জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় ন্যাটোর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ন্যাটো সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামুদ্রিক নজরদারি, আঞ্চলিক অংশীদারদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কূটনৈতিক সমন্বয়ের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। এদিকে জোটের সদস্য দেশগুলো আন্তর্জাতিক নৌপথে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অবনতির আগে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বানও জানানো হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের বড় একটি অংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এ অঞ্চলে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে মার্কিন কংগ্রেস। সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে অথবা যুদ্ধ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে, এমন একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মার্কিন সিনেট। মঙ্গলবার রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত সিনেটে ৫০-৪৮ ভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়। ভোটাভুটিতে কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটরও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে অবস্থান নেন, যা ইরান যুদ্ধ নিয়ে দুই দলের মধ্যেই বাড়তে থাকা উদ্বেগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে জুন মাসে প্রতিনিধি পরিষদেও একই প্রস্তাব পাস হয়েছিল। সেখানে চারজন রিপাবলিকান সদস্য ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিয়ে প্রস্তাবটি অনুমোদনে সহায়তা করেন। প্রতিনিধি পরিষদে ভোটের ফল ছিল ২১৫-২০৮। তবে প্রস্তাবটি আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে না। কারণ এটি এমন একটি সমসাময়িক প্রস্তাব (কনকারেন্ট রেজুলেশন), যা প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হয় না এবং আইনে পরিণত হওয়ার সুযোগও নেই। তবুও রাজনৈতিকভাবে এর গুরুত্ব অনেক বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজুলেশন’ কার্যকর হওয়ার পর এই প্রথম কোনো সামরিক অভিযান বন্ধ বা সীমিত করার আহ্বান জানিয়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ একই ধরনের প্রস্তাব অনুমোদন করল। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজুলেশন’-এর আওতায় কোনো সামরিক অভিযান ৬০ দিনের বেশি চালিয়ে যেতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, গত ৭ এপ্রিল কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি নতুন করে সময় গণনার সুযোগ তৈরি করেছে। ফলে আইনি সীমা লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠছে না। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। তাই এমন কোনো সক্রিয় যুদ্ধ পরিস্থিতি নেই, যেখান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, দুই রিপাবলিকান সিনেটর অনুপস্থিত থাকায় প্রস্তাবটি পাস হয়েছে। অনুপস্থিত ছিলেন মিচ ম্যাককনেল ও ডেভ ম্যাককরমিক। সিনেটে রিপাবলিকান সিনেটর র্যান্ড পল, লিসা মারকাওস্কি, সুসান কলিন্স এবং বিল ক্যাসিডি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট শিবির থেকে শুধু জন ফেটারম্যান প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে মতপার্থক্যের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির বিরুদ্ধেও কিছু রিপাবলিকান সদস্য অবস্থান নিয়েছেন। ইরান যুদ্ধ নিয়ে জনমতও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুদ্ধের প্রভাব হিসেবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। ফলে সংঘাত দ্রুত শেষ করার জন্য হোয়াইট হাউসের ওপর চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদিকে মঙ্গলবারই পেন্টাগন কংগ্রেসের কাছে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের আবেদন জানিয়েছে, যার বড় অংশ ইরান-সংক্রান্ত সামরিক ব্যয় মেটানোর জন্য ব্যবহার করা হবে বলে জানা গেছে। বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। গত সপ্তাহে দুই দেশের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরিত ওই সমঝোতা অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের বিষয়ে একটি বিস্তৃত চুক্তিতে পৌঁছাতে উভয় পক্ষের হাতে ৬০ দিন সময় রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, কংগ্রেসের সর্বশেষ এই ভোট আইনি পরিবর্তন না আনলেও এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। বিশেষ করে যুদ্ধ, সামরিক ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগ যে বাড়ছে, এই ভোট তারই প্রতিফলন।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনা পুরো অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে বলে এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। ব্রিটিশ ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই–এর ওই বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত শুধু সামরিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো, জোট রাজনীতি এবং কৌশলগত অংশীদারত্বে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। বিশ্লেষণে বলা হয়, অতীতের মতোই বড় আকারের যুদ্ধ একাধিক ক্ষেত্রে পুরো অঞ্চলকে নতুনভাবে গঠন করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত আক্রমণ এবং ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের কথা উল্লেখ করা হয়, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করেছিল। বর্তমান ইরান সংঘাতও একই ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। পাশাপাশি এটি আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে নতুনভাবে সহযোগিতা ও সমন্বয়ের পথ খুঁজতে বাধ্য করছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তানের মধ্যে কৌশলগত সমন্বয়ের প্রবণতা বাড়ছে। একই সময়ে ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, গ্রিস, সাইপ্রাস ও ইথিওপিয়ার মধ্যে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা কাঠামোর সীমাবদ্ধতাও এই যুদ্ধের মাধ্যমে সামনে এসেছে বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ালেও তা সব সময় আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব থেকে দেশগুলোকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়নি। উদাহরণ হিসেবে কাতারে ইরানের হামলার প্রসঙ্গ তুলে বলা হয়, ওই ঘটনায় দেশটির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি সক্ষমতার একটি অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, যা অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে। তবে বিশ্লেষণে এটিও উল্লেখ করা হয় যে, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার দিকে যাচ্ছে না। বরং তারা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অংশীদার ও বিকল্প কাঠামোর দিকে ঝুঁকছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের কৌশলগত অংশীদারত্ব নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এতে বলা হয়, হর্ন অব আফ্রিকা থেকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর এবং ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি নতুন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতকে এই নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে ভারতকে আইটু-ইউটু এবং প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডরের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে অস্ত্র বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতের অংশ ছিল ইসরায়েলের অস্ত্র রপ্তানির একটি বড় অংশ। এ ছাড়া গ্রিস, সাইপ্রাস, ইথিওপিয়া ও সোমালিল্যান্ডকেও পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। লোহিত সাগর ও দক্ষিণ লোহিত সাগর অঞ্চলে নৌপথ নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে বলেও বিশ্লেষণে বলা হয়। বিশ্লেষণে শেষ পর্যন্ত বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য সরাসরি দুটি কঠোর জোটে বিভক্ত হচ্ছে এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং অঞ্চলটি নমনীয় ও আংশিকভাবে ওভারল্যাপ করা অংশীদারত্বের নেটওয়ার্কের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্রগুলো পরিস্থিতি অনুযায়ী সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতায় যুক্ত হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ এবং অন্যান্য অ-যুদ্ধকালীন ব্যয় সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের অতিরিক্ত ৮ হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন বলে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের জানানো হয়েছে। উপ-প্রতিরক্ষা সচিব স্টিফেন ফেইনবার্গ সম্প্রতি কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে এক ফোনালাপে এই তথ্য উপস্থাপন করেন বলে জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আইনপ্রণেতাদের কাছে একটি সম্পূরক বাজেট প্রস্তাব পাঠানো হতে পারে। এই প্রস্তাবে শুধু পেন্টাগনের তহবিলই নয়, কৃষি খাত ও দুর্যোগ সহায়তার মতো অপ্রতিরক্ষামূলক খাতের অর্থায়নের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসও এ নিয়ে কোনো মন্তব্য দেয়নি। এর আগে এপ্রিল মাসে পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা জানান, ইরান যুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। এটিই ছিল যুদ্ধের প্রথম আনুষ্ঠানিক হিসাব হিসেবে প্রকাশিত তথ্য। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ওই যুদ্ধের মোট ব্যয় কত—এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর আগে যুদ্ধ ব্যয় মেটাতে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রাথমিক প্রস্তাব আইনপ্রণেতাদের বিরোধিতার মুখে পড়ে। বাজেট বিতর্কের মধ্যে গত এপ্রিল মাসে প্রতিনিধি পরিষদের বাজেট কমিটির শুনানিতে হোয়াইট হাউসের বাজেট পরিচালক রাসেল ভট বলেন, যুদ্ধ ব্যয়ের কোনো নির্দিষ্ট হিসাব তার কাছে নেই। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলারের সামরিক বাজেট প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান জানান। এই বিশাল সামরিক বাজেটকে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই তাদের লক্ষ্য। তবে যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধের আর্থিক চাপ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ইরানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ ১৫ সপ্তাহের সামরিক সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তার মতে, বিপুল অর্থ ব্যয়, সামরিক চাপ এবং প্রাণহানির পরও এই সংঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্র কোনো কৌশলগত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। শুক্রবার (১৯ জুন) মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওবামা এসব কথা বলেন। শিকাগোতে নির্মিত ওবামা প্রেসিডেনশিয়াল সেন্টারের উদ্বোধনের প্রাক্কালে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, ইরান নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেন। ওবামা বলেন, কয়েক মাসের এই সংঘাতে শত শত কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। সামরিক বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। কিন্তু এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র যে লক্ষ্য অর্জনের কথা বলেছিল, বাস্তবে তা অর্জিত হয়নি। তার ভাষায়, “আমরা শেষ পর্যন্ত আবার সেই জায়গাতেই ফিরে এসেছি, যেখানে সংঘাত শুরুর আগে ছিলাম। বরং অনেক ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল এবং উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।” সাবেক এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশেষভাবে সমালোচনা করেন ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ইরানের পারমাণবিক চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তের। তিনি বলেন, তার প্রশাসনের সময় ইরানের সঙ্গে হওয়া যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) চুক্তির মাধ্যমে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছিল। ওবামার দাবি, ইরান তখন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ায় পরিস্থিতি উল্টো আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং ইরান তার পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ পায়। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে ইরানের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, সেটিকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক স্থগিত হওয়ায় ভবিষ্যৎ আলোচনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে যেকোনো আলোচনায় তেহরানের নির্ধারিত সীমারেখা বা ‘রেড লাইন’ মেনে চলতে হবে। অন্যথায় ইরান কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন। যুদ্ধের অন্যতম বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জ্বালানি খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান এক্সন মবিলের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট নিল চ্যাপম্যান সতর্ক করে বলেছেন, যদি কৌশলগত মজুত সংকটজনক পর্যায়ে নেমে আসে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ থেকে ১৬০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এমন পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সাক্ষাৎকারের শেষ অংশে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ওবামা। তিনি বলেন, দেশটিতে রাজনৈতিক বিভাজন ক্রমেই বাড়ছে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা ক্ষয়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী রাখতে নাগরিকদের আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় রাখা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চা করা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান নিয়ে বিতর্ক আগামী দিনগুলোতেও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে থাকবে। ওবামার এই মন্তব্য সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সময় নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা দমনের বিষয়ে তার প্রচেষ্টায় তারা কোনো বাধা সৃষ্টি করেননি। ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু তাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই, কারণ তাদের জন্য পরিস্থিতি আরো উন্নত হয়েছে।’ ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেঁ শহরে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলন শেষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, এই সংঘাত থেকে দূরে থাকার জন্য তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি কৃতজ্ঞ। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চীনের প্রেসিডেন্ট জিনপিংকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমি তার সঙ্গেই ছিলাম। তিনি নিরপেক্ষ, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ছিলেন এবং আমি এর প্রশংসা করি। আমি ভ্লাদিমির পুতিনকেও ধন্যবাদ জানাতে চাই; তিনি খুবই নিরপেক্ষ ছিলেন। তারা আমাদের জন্য পরিস্থিতি আরো অনেক কঠিন করে তুলতে পারতেন।’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, চীন ও রাশিয়া চাইলে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারত। তবে তারা তা না করে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। সূত্র: মিডল ইস্ট আই
ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে সৃষ্ট ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রে মে মাসে মূল্যস্ফীতির গতি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। দেশটির ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই) বার্ষিক ৪.২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এপ্রিল মাসে ছিল ৩.৮ শতাংশ। এর মাধ্যমে মার্কিন মুলুকে মূল্যস্ফীতি ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাল। আর্থিক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টসেটের জরিপে অর্থনীতিবিদরা মে মাসে মূল্যস্ফীতি বার্ষিক ৪.২ শতাংশে পৌঁছানোর যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, তা এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে মিলে গেল। মূলত জ্বালানির দাম বৃদ্ধিই মূল্যস্ফীতিকে এই পর্যায়ে নিয়ে গেছে। মে মাসের সিপিআই বৃদ্ধির ৬০ শতাংশেরও বেশি অবদান ছিল এই জ্বালানি খাতের। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ২.৪ শতাংশ থাকলেও ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে তা এখন তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে মার্কিন বাজারে পেট্রল থেকে শুরু করে বিমান ভাড়া পর্যন্ত সবকিছুর দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। শ্রম বিভাগের মে মাসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আগের বছরের তুলনায় পেট্রলের দাম ৪০.৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে জুন মাসে এসে জ্বালানির দাম কিছুটা কমেছে, যা মে মাসের এই উপাত্তে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এছাড়া খাদ্য ও জ্বালানির মতো উদ্বায়ী খাত বাদে মূল বা ‘কোর’ মূল্যস্ফীতি মে মাসে বার্ষিক ২.৯ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা এপ্রিলে ছিল ২.৮ শতাংশ।
ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই বড় ধরনের বিরোধিতার মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বুধবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ ক্ষমতা আইনের অধীনে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে, যেখানে হোয়াইট হাউসকে ইরানের বিরুদ্ধে সব ধরনের সামরিক তৎপরতা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে মার্কিন সিনেটেও এই সংক্রান্ত বিলটি এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ভোট পড়ে। বিগত সময়ের ব্যর্থ চেষ্টাগুলোর চেয়ে এবারের ভোটাভুটি সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ এবার ট্রাম্পেরই দলের বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। নিজের দলের এই দলছুট বা বিদ্রোহীদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে একটি 'অর্থহীন ভোট' এবং আইনপ্রণেতাদের এই পদক্ষেপকে 'অদেশপ্রেমিক কাজ' বলে আখ্যা দিয়েছেন। এর আগে ভেনিজুয়েলা ইস্যুতেও দলের বিদ্রোহীদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই হুমকির কৌশল এবার আর কাজ করবে না, কারণ ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ মার্কিন অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে। মার্কিন সামরিক হামলায় ইরানের ক্ষতি হলেও তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করাসহ মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই যুদ্ধে ইতিমধ্যে তেরো জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের বড় অংশই এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ৬৮ শতাংশ মার্কিনি ইরানের সাথে দ্রুত শান্তি চুক্তি চান। নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ভয়েই মূলত রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা এখন ট্রাম্পের পাশ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। এই প্রস্তাবটি আইনিভাবে ট্রাম্পকে বাধ্য করতে না পারলেও, এর মাধ্যমে স্পষ্ট যে দেশের মাটিতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান এবং ইরানের ওপর তাঁর প্রভাব অনেকটাই কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধের ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে ৭ জুন (রোববার)। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এই সংঘাতের প্রতি জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার রিপাবলিকান পার্টি রাজনৈতিকভাবে চাপে পড়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুদ্ধকে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক দেশের স্বার্থবিরোধী ও অপ্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচনা করছেন। ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ডের শান্তি ও উন্নয়ন বিষয়ক অধ্যাপক শিবলি তেলহামির বরাতে জানা যায়, খুব কম মার্কিন নাগরিকই মনে করেন ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে। তার মতে, জনমতের এই অবস্থান রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ডের সাম্প্রতিক ‘ক্রিটিক্যাল ইস্যুজ পোল’ অনুযায়ী, মাত্র ১৬ শতাংশ ভোটার মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জয়ী হচ্ছে বা জয়ী হওয়ার পথে রয়েছে। জরিপে আরও দেখা যায়, ৩৩ শতাংশ ভোটার যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য নেতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে মাত্র ১২ শতাংশ উত্তরদাতা যুদ্ধের প্রভাবকে ইতিবাচকের চেয়ে বেশি ইতিবাচক বলে মনে করেন। অধ্যাপক শিবলি তেলহামি বলেন, রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা শুরু করে। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন, পাশাপাশি বহু বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। ৬ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পারস্য উপসাগরে সীমিত সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে অবরোধ বজায় রেখেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে বাধা ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়ছে, যা সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের জরিপ অনুযায়ী, ৫৮ শতাংশ উত্তরদাতা ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার বিরোধিতা করেছেন। মাত্র ২৪ শতাংশ মনে করেন, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রকে আরও নিরাপদ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ এবং জ্বালানি সংকট আসন্ন নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা প্রতিরোধই এই সংঘাতের মূল লক্ষ্য। তিনি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবক হিসেবে বিবেচনা করেন না বলেও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, তিনি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিষয়কে অগ্রাধিকার দেন এবং নির্বাচনী প্রভাব তার নীতিতে পরিবর্তন আনবে না। অধ্যাপক শিবলি তেলহামির মতে, প্রশাসনের এই অবস্থান আলোচনায় কৌশলগত ভূমিকা রাখলেও জনমতের চাপকে উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে। জরিপগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হচ্ছে। অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বর্তমান অবস্থায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ইরান যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি এবং ধর্মীয় নেতাকে ঘিরে বিতর্ক- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে তীব্র চাপের মুখে পড়েছেন। রয়টার্স-ইপসসের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, তার জনপ্রিয়তা বর্তমান মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ছয় দিনব্যাপী জাতীয় এই জরিপে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন ৩৬ শতাংশে স্থির রয়েছে, যা এক মাস আগের মতোই। তবে এটি তার মেয়াদকালের সর্বনিম্ন অবস্থানের কাছাকাছি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার সর্বোচ্চ অনুমোদন ছিল ৪৭ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরুর পর জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। জরিপে দেখা যায়, জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় ট্রাম্পের অনুমোদন মাত্র ২৬ শতাংশ, যা তার অন্যতম সর্বনিম্ন স্কোর। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার প্রতি জনসমর্থনও সীমিত। জরিপে ৩৬ শতাংশ উত্তরদাতা এ হামলাকে সমর্থন করেছেন, তবে মাত্র ২৬ শতাংশ মনে করেন, এটি ব্যয়ের তুলনায় সার্থক হয়েছে। জরিপে ট্রাম্পের আচরণ ও মানসিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মাত্র ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা তাকে “শান্ত স্বভাবের” নেতা হিসেবে দেখেন। গত এক বছরে তার মানসিক তীক্ষ্ণতা কমেছে বলে মনে করেন ৫১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। এদিকে ইরান যুদ্ধের সমালোচনা করায় পোপ লিওকে নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জরিপে দেখা যায়, ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা পোপ লিও সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন, যেখানে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এ হার ৩৬ শতাংশ। নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মাত্র ২৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ দেশটিকে আরও নিরাপদ করবে। একইসঙ্গে অধিকাংশই ন্যাটো জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ধারণার বিরোধিতা করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে বিতর্ক এই তিনটি বড় ইস্যুতে একসঙ্গে চাপে পড়েছেন ট্রাম্প। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় এই পরিস্থিতি হোয়াইট হাউসের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং হরমুজ প্রণালি-এ অচলাবস্থার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশে নামিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এতে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জ্বালানি, খাদ্যপণ্য এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হয়েছে। তবে এই সংকটের মধ্যেও কিছু খাত উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে। আল জাজিরা-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমন পাঁচটি খাত— বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় ওয়াল স্ট্রিটের বড় ব্যাংকগুলো লাভবান হয়েছে। মর্গান স্ট্যানলি, গোল্ডম্যান স্যাকস এবং জেপি মর্গান চেজ—সবগুলোই ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগকারীদের ঘন ঘন লেনদেনই এই মুনাফার মূল কারণ। ক্রিপ্টো-ভিত্তিক পূর্বাভাস প্ল্যাটফর্ম পলিমার্কেট যুদ্ধকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তার সুযোগে ব্যাপক আয় করছে। ব্যবহারকারীরা যুদ্ধ, রাজনীতি বা অর্থনৈতিক ঘটনার ফলাফল নিয়ে বাজি ধরায় প্ল্যাটফর্মটির আয় দ্রুত বেড়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির ফলে এই খাতেও বড় উত্থান দেখা গেছে। ‘এমএসসিআই ওয়ার্ল্ড অ্যারোস্পেস অ্যান্ড ডিফেন্স ইনডেক্স’ অনুযায়ী, এই খাতে প্রায় ৩২ শতাংশ পর্যন্ত নিট মুনাফা হয়েছে, যা বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের গড় প্রবৃদ্ধিকেও ছাড়িয়ে গেছে। সংকটের মধ্যেও এআই খাতের প্রবৃদ্ধি থেমে নেই। চিপ রপ্তানি বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত চাহিদা বাড়ায় তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো রেকর্ড আয় করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যত প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে এআই গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবেই থাকবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনেক দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানিয়েছে, শতাধিক দেশে এ খাতে নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে ‘ভুল’ বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের চ্যান্সেলর রাচেল রিভস। তিনি বলেছেন, এই সংঘাত বিশ্বকে আগের তুলনায় নিরাপদ করেছে—এমনটা তিনি মনে করেন না। বুধবার ওয়াশিংটনে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে রিভস এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, চলমান সংকট নিরসনে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা ছিল এবং আলোচনাও চলছিল। সেই প্রক্রিয়া বন্ধ করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ছিল একটি বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত। রিভস আরও বলেন, ইরান সরকারকে পছন্দ বা অপছন্দ করার বিষয়টি এখানে মুখ্য নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনার সঠিক পদ্ধতি কী। যদিও ব্যক্তিগতভাবে তিনি ইরান সরকারকে অপছন্দ করেন বলেও উল্লেখ করেন। ব্রিটিশ চ্যান্সেলরের মতে, যুদ্ধের পর বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে—এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই। বরং সংঘাতের কারণে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি বেড়েছে বলেই ইঙ্গিত দেন তিনি। তার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, সামরিক অভিযানে ইরান ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রিভসের এই মন্তব্য যুক্তরাজ্যের নীতিনির্ধারণী মহলে ইরান যুদ্ধ নিয়ে বিদ্যমান মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দেয়। এর আগে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও এই সংঘাতে যুক্তরাজ্যের অবস্থান নিয়ে সতর্ক অবস্থান নেন। ওয়াশিংটনের মাটিতে দেওয়া রিভসের এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য সম্পর্কেও নতুন করে টানাপড়েন তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ইরান–সংঘাতের অর্থনৈতিক অভিঘাতে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সোমবার (১৩ এপ্রিল) জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায়। সংস্থাটির মতে, চলমান এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে ‘ত্রিমুখী ধাক্কা’র মুখে ফেলেছে—যার মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সংকট, খাদ্য সংকট এবং মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সংকট বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিনের উন্নয়নমূলক অগ্রগতিকে উল্টে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে এর প্রভাব হবে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। সংস্থাটির প্রশাসক এবং বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডি ক্রু বলেন, এ ধরনের সংঘাত উন্নয়নকে বহু বছর পেছনে ঠেলে দেয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, এমনকি যদি এখনই যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায়, তবুও এর নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি ও সমাজে পড়ে গেছে এবং এর প্রভাব দীর্ঘদিন স্থায়ী হবে। তেহরানে সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জ্বালানি সংকট শুধু বিদ্যুৎ বা পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সার উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন এবং বৈশ্বিক পণ্য পরিবহনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। কৃষি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সারের ঘাটতি ও উচ্চমূল্যের কারণে আগামী দিনে বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্য উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা নতুন করে খাদ্য সংকট ডেকে আনতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দ্রুত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়া না হলে অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দায় পড়তে পারে। ইতোমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণ সংকটে থাকা দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু যুদ্ধবিরতি এই সংকট সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়; দারিদ্র্য মোকাবিলায় বৈশ্বিক সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় গত এক দশকে অতি দারিদ্র্য হ্রাসে যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাত ৪০ দিনে এসে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। সর্বশেষ পরিস্থিতিতে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে ইরানে। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে। লেবাননেও ইসরায়েলি হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যেখানে নিহতদের মধ্যে শিশু, সাংবাদিক ও চিকিৎসাকর্মীও রয়েছেন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী সদস্যরাও প্রাণ হারিয়েছেন। ইরাকে সংঘাত শুরুর পর থেকে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলে ইরান ও লেবানন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বেসামরিক নাগরিক ও সেনাসহ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এ যুদ্ধে তাদের ১৩ জন সেনা নিহত এবং তিন শতাধিক আহত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলোর ওপর হামলার ফলে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও সৌদি আরবেও পৃথক হামলা ও দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যেও এর প্রভাব পড়েছে। উত্তর ইরাকে হামলায় একজন ফরাসি সেনা নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও এই সংঘাতের প্রভাব পড়েছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এই যুদ্ধের মধ্যে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয়জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। ৪০ দিনের এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে।
ইরানের সাথে চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক বিষ্ফোরক হুমকিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার সময়সীমা (ডেডলাইন) বেঁধে দিয়ে ট্রাম্প জানিয়েছেন, দাবি মানা না হলে ইরানের ‘পুরো সভ্যতা’ গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। ট্রাম্পের এমন যুদ্ধংদেহী মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তাকে ‘মানসিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন বিরোধী ডেমোক্র্যাট দলীয় আইনপ্রণেতারা। মার্কিন সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার এক কড়া বিবৃতিতে বলেন, “তিনি (ট্রাম্প) একজন চরম অসুস্থ ব্যক্তি। যেসব রিপাবলিকান এই অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের বিরুদ্ধে ভোট দিতে অস্বীকার করছেন, তারা এর প্রতিটি ভয়াবহ পরিণতির জন্য দায়ী থাকবেন।” অন্যদিকে হাউজ লিডার হাকিম জেফরিস সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্প আমাদের তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার আগেই কংগ্রেসকে ইরানের বিরুদ্ধে এই বেপরোয়া যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। এখন সময় রিপাবলিকানদের দলপ্রীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশপ্রেমের পরিচয় দেওয়ার।” কংগ্রেসম্যান জেসন ক্রো ট্রাম্পের হুমকিকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংসের ডাক দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেবল বৈধ নির্দেশই পালন করা উচিত। একইভাবে কংগ্রেসম্যান জিম ম্যাকগভার্ন ট্রাম্পের এই অবস্থানকে ‘শুদ্ধ শয়তানি’ বলে বর্ণনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগস্ট ২০২৬ সালের ভিসা বুলেটিন প্রকাশ করেছে। নতুন এই আপডেটে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য নির্ধারিত এফ২এ ক্যাটাগরিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, পরিবারভিত্তিক কয়েকটি ক্যাটাগরিতে অপেক্ষার সময় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এফ২এ ক্যাটাগরির অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের জন্য এফ১ ক্যাটাগরি এবং অন্যান্য পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ বা প্রায়োরিটি ডেট অনুযায়ীই পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ হবে। ভিসা বুলেটিনে বলা হয়েছে, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার সংখ্যা প্রতিবছর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। তাই কোনো ক্যাটাগরিতে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষার সময় বাড়তে পারে এবং কম হলে তারিখ এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন রয়েছে। বিশেষ করে কিছু এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত ভিসা সংখ্যার কারণে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের কাছে ভিসা বুলেটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, কোন আবেদনকারীরা গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং কারা এখনও অপেক্ষার তালিকায় থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই পরিবর্তন অনেক পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীর জন্য আশার খবর হলেও, প্রতিটি আবেদনকারীর পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের আবেদন জমার তারিখ, দেশভিত্তিক সীমা এবং ভিসা ক্যাটাগরির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষার তালিকা বড় একটি বিষয় হয়ে আছে। নতুন ভিসা বুলেটিনে পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য অগ্রগতি দেখা গেলেও, সব আবেদনকারী একইভাবে সুবিধা পাবেন না।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।