প্রায় পাঁচ দশক পর বিদেশিদের জন্য ভিসা ফি বড় ধরনের পুনর্নির্ধারণ করল জাপান সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের ভিসার ফি সর্বোচ্চ পাঁচ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আগামী ১ জুলাই থেকে এই নতুন হার কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জাপানের সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসার ফি ৩ হাজার ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ১৫ হাজার ইয়েন করা হয়েছে, যা ডলারে প্রায় ১৮.৬৯ থেকে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জানা গেছে, ১৯৭৮ সালের পর এই প্রথমবারের মতো ভিসা ফি পুনর্বিবেচনা করল টোকিও। জাপান সরকারের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের দরপতন কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি চলে যাওয়াও এই পদক্ষেপের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানে পর্যটকদের ক্রমবর্ধমান চাপও এই সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করেছে। দেশটিতে পর্যটকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ায় অবকাঠামো ও জনসেবায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। জেমস কুক বিশ্ববিদ্যালয়ের হসপিটালিটি ও ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সিনিয়র লেকচারার জিলমিয়াহ কাম্বলে বলেন, “বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পুরোনো ফি কাঠামো ধরে রাখা আর লাভজনক ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে ইয়েনের অবমূল্যায়নও এতে ভূমিকা রেখেছে।” তবে তিনি মনে করেন, এই ফি বৃদ্ধি সরাসরি পর্যটকের সংখ্যা কমানোর জন্য নয়। বরং প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয়ের একটি অংশ মেটানোর লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিকে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিতসু মোতেগি জানিয়েছেন, ভিসা ফি বৃদ্ধির ফলে পর্যটন খাতে বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। একই সঙ্গে সব ভ্রমণকারীর জন্য ডিপার্চার ট্যাক্সও ১ হাজার ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ইয়েন করা হয়েছে। ডেলয়েট তোহমাতসু গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইউকি মাসুজিমা বলেন, জাপান থেকে যাত্রীদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকের অংশ এখন প্রায় ৭৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০১৩ সালে ‘আবেনোমিক্স’ চালুর আগে ছিল মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। তার মতে, এই পরিবর্তন জাপানের পর্যটন খাতের দ্রুত সম্প্রসারণেরই প্রতিফলন। তিনি আরও বলেন, বিদেশি পর্যটকেরা জাপানে কেনাকাটায় সেলস ট্যাক্স রিফান্ড সুবিধা পান। ফলে সংশ্লিষ্ট খরচের একটি অংশ সরকারকে বহন করতে হয়। ভিসা ফি ও ডিপার্চার ট্যাক্স বাড়িয়ে সেই ঘাটতি আংশিক পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কর ও ফি বৃদ্ধি সত্ত্বেও পর্যটকদের আগ্রহ কমবে না। কারণ জাপান ইতোমধ্যেই একটি জনপ্রিয় এবং পুনরায় ভ্রমণের উপযোগী গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ডেন্টসুর ‘জাপান ব্র্যান্ড সার্ভে ২০২৫’-এ দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ১২ হাজার ৪০০ জনের মধ্যে ৫২.৭ শতাংশই আবার জাপানে ভ্রমণের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। জরিপে আরও উঠে এসেছে, দুর্বল ইয়েনের চেয়ে জাপানের খাবার, সংস্কৃতি ও পণ্যের আকর্ষণই পর্যটকদের বেশি টানছে। ফলে এই জনপ্রিয়তা সাময়িক নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এদিকে, ভিসা ফি বৃদ্ধির পাশাপাশি অভিবাসন সংক্রান্ত অন্যান্য খরচও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মে মাসে জাপানের উচ্চকক্ষ পার্মানেন্ট রেসিডেন্সির আবেদন ফি-র সর্বোচ্চ সীমা ১০ হাজার ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ইয়েন করার আইন পাস করেছে। একই সঙ্গে রেসিডেন্সি স্ট্যাটাস পরিবর্তনের ফি-র ঊর্ধ্বসীমাও ১ লাখ ইয়েন নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য একদিকে বাড়তি প্রশাসনিক ব্যয় সামাল দেওয়া, অন্যদিকে দক্ষ ও উচ্চমানের মানবসম্পদ আকর্ষণ করা। সব মিলিয়ে, পর্যটন ও অভিবাসন নীতিতে জাপান এখন এক নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।
সব শঙ্কা, স্নায়ুচাপ আর নাটকীয়তার অবসান ঘটল শেষ মুহূর্তের এক দুর্দান্ত আক্রমণে। নির্ধারিত সময়ের খেলা যখন ১-১ সমতায় শেষ হয়ে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর অপেক্ষায়, ঠিক তখনই যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির জয়সূচক গোলে জাপানকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করল ব্রাজিল। হিউস্টনে অনুষ্ঠিত ম্যাচের শুরুটা অবশ্য ছিল জাপানের দখলে। ২৯ মিনিটে ব্রাজিলের রক্ষণভাগের ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কাইশু সানো দুর্দান্ত এক দূরপাল্লার শটে জাপানকে এগিয়ে দেন। গোলের পর কোচ হাজিমে মোরিয়াসু দলকে আরও রক্ষণাত্মক করে তোলেন। ৫-৪-১ ছকে গড়ে ওঠা জাপানের শক্ত রক্ষণে প্রথমার্ধজুড়ে ছন্দ খুঁজে পায়নি ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রসহ ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে কার্যকরভাবে আটকে রাখে ব্লু সামুরাইরা। বিরতির পর বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে ব্রাজিল। ৫৬ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মাগালাইয়েসের নিখুঁত ক্রস থেকে কাসেমিরো দুর্দান্ত এক হেডে গোল করে সমতায় ফেরান পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। গোলের পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে সেলেসাওরা। ৫৮ মিনিটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দারুণ প্রচেষ্টা গোলরক্ষক জিওন সুজুকির স্পর্শে পোস্টে লেগে ফিরে আসে। এরপরও একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও জাপানের রক্ষণ ভাঙতে পারছিল না ব্রাজিল। ম্যাচের শেষভাগে একের পর এক পরিবর্তন এনে আক্রমণে নতুন গতি যোগ করেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। ৬৫ মিনিটে মাতেউস কুনিয়ার পরিবর্তে মাঠে নামেন গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। এনদ্রিক ও রায়ানের গতিময় ফুটবলে ক্রমেই চাপে পড়ে জাপানের রক্ষণভাগ। ৮৫ মিনিটে রায়ানের ফ্রি-কিক এবং পরে ব্রুনো গিমারাইসের প্রচেষ্টা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে অতিরিক্ত সময়ই যেন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। এরই মধ্যে ৮৯ মিনিটে ইনজুরির কারণে মাঠ ছাড়েন কাসেমিরো। তার জায়গায় নামেন ফাবিনিও। তবে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষার অবসান ঘটে যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে। মাঝমাঠ থেকে ব্রুনো গিমারাইসের নিখুঁত পাস ধরে জাপানি ডিফেন্ডারদের ফাঁক গলে বক্সে ঢুকে ঠান্ডা মাথায় কোনাকুনি শটে বল জালে পাঠান মার্তিনেল্লি। জাপানের গোলরক্ষক সুজুকির কিছুই করার ছিল না। শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত আর সমতায় ফিরতে পারেনি জাপান। ২-১ গোলের নাটকীয় জয় নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে ব্রাজিল। নেইমারকে পুরো ম্যাচ বেঞ্চে রেখেই গুরুত্বপূর্ণ এই জয় তুলে নেয় কার্লো আনচেলত্তির দল।
জাপানের বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ নক-আউট লড়াইয়ে মাঠের রণকৌশলে কোনো রকম ঝুঁকি বা পরিবর্তন আনতে রাজি নন ব্রাজিলের ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে পাওয়া জয়ের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে আজ জাপানের বিরুদ্ধে হুবহু একই এবং অপরিবর্তিত একাদশ নিয়ে মাঠে নামছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এর আগে ফুটবল বিশ্লেষকদের আলোচনায় ব্রাজিলের রক্ষণভাগের যে ফুল-ব্যাক পজিশন নিয়ে দুর্বলতার কথা উঠেছিল, সেই দানিলো এবং দগলাস সান্তোসের ওপরই ফের আস্থা রেখেছেন আনচেলত্তি। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে মার্কিনহোস ও গাব্রিয়েলের শক্তিশালী জুটির সামনে গোলপোস্টের নিচে যথারীতি দেয়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছেন আলিসন বেকার। মিডফিল্ডে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে রাখতে কাসেমিরোর অভিজ্ঞতার সাথে খেলছেন ব্রুনো গিমারায়েস এবং লুকাস পাকেতা। আর আক্রমণভাগে চোট কাটিয়ে ফেরা নেইমারকে বেঞ্চে রেখে শুরুর একাদশে ভিনিসিউস জুনিয়র এবং মাথেউস কুনহার সাথে রাইট উইংয়ে থাকছেন তরুণ তুর্কি রায়ান। জাপানের গতিময় উইং-ব্যাক ও কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবলকে রুখে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে আনচেলত্তির এই চেনা ‘উইনিং কম্বিনেশন’ কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ব্রাজিলের শুরুর একাদশ: গোলরক্ষক: আলিসন বেকার ডিফেন্ডার: দানিলো, মার্কিনহোস, গাব্রিয়েল মাগালায়েস, দগলাস সান্তোস মিডফিল্ডার: ক্যাসেমিরো, ব্রুনো গিমারায়েস, লুকাস পাকেতা ফরোয়ার্ড: রায়ান, ম্যাথিউস কুনহা, ভিনি জুনিয়র
সাংহাইয়ের একটি স্পোর্টস বারে তখন উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ। বিশাল পর্দায় জাপানের আক্রমণ। মুহূর্তের মধ্যেই আয়াসে উয়েদার হেডে বল জড়িয়ে গেল জালে। তিউনিসিয়ার বিপক্ষে জাপানের চতুর্থ গোল। সঙ্গে সঙ্গে নীল জার্সি পরা সমর্থকদের চিৎকারে কেঁপে ওঠে পুরো বার। দৃশ্যটি হয়তো খুব স্বাভাবিক। বিশ্বকাপ কিংবা আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় আসরে এমন উন্মাদনা প্রায় সব দেশেই দেখা যায়। তবে এখানে একটি ব্যতিক্রম ছিল। যারা জাপানের গোল উদযাপন করছিলেন, তারা জাপানি নন; তারা চীনা। ইতিহাস, রাজনীতি ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে চীন ও জাপানের সম্পর্ক কখনোই খুব সহজ ছিল না। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের স্মৃতি, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সাম্প্রতিক নানা উত্তেজনা প্রায়ই সংবাদ শিরোনাম হয়। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো এমন একটি ক্ষেত্র তৈরি করে, যেখানে সীমান্ত, জাতীয়তা কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। সাংহাইয়ের সেই সমর্থকগোষ্ঠীর অন্যতম সংগঠক ফ্যান বলেন, তাদের জাপান-প্রেমের উৎস রাজনীতি নয়, শৈশবের স্মৃতি। তার ভাষায়, “আমাদের প্রজন্মের অনেকেই জাপানি অ্যানিমে দেখে বড় হয়েছি। বিশেষ করে ‘ক্যাপ্টেন সুবাসা’। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার শুরুটা সেখান থেকেই।” তবে শুধু অ্যানিমেই নয়, জাপানকে সমর্থনের পেছনে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ফ্যানের মতে, জাপান এখন এশিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে সফল প্রতীক। বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন কোনো এশীয় দল ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে সমানতালে লড়াই করে, তখন অনেক চীনা সমর্থকও নিজেদের স্বপ্ন ও প্রতিনিধিত্ব খুঁজে পান সেই দলে। এই অনুভূতির পেছনে বাস্তবতারও ভূমিকা রয়েছে। চীনের ফুটবল এখনো কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের দেখা পায়নি। দেশটি মাত্র একবার, ২০০২ সালে, বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলেছিল। সেই আসরে তিনটি ম্যাচেই পরাজিত হয়েছিল এবং একটি গোলও করতে পারেনি। অন্যদিকে জাপান নিয়মিত বিশ্বকাপ খেলছে, ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে খেলোয়াড় পাঠাচ্ছে এবং বিশ্বের সেরা দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। জাপান নিয়ে বই লেখা চীনা লেখক ফু জিনইউর মতে, দেশটির সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্তিশালী যুব উন্নয়ন কাঠামো এবং সুসংগঠিত ফুটবল সংস্কৃতি। তার ভাষায়, জাপান এখন এমন একটি দল, যারা ইউরোপীয় মানের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলতে সক্ষম। তবে চীনে জাপানকে সমর্থন করা সব সময় সহজ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাপানের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করার কারণে অনেক ভক্তকে সমালোচনা, বিদ্রূপ এবং অপমানের মুখোমুখি হতে হয়। কেউ কেউ তাদের ‘দেশদ্রোহী’ বলেও আখ্যা দেন। পূর্ব চীনের ৩০ বছর বয়সী আকি ইয়াং জাপান জাতীয় দলকে ঘিরে একটি জনপ্রিয় ফ্যান পেজ পরিচালনা করেন। অনুসারী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কটূক্তিও বেড়েছে। তবু তিনি থামেননি। কারণ তার বিশ্বাস, ফুটবল মানুষের মধ্যে বিভাজনের দেয়াল ভাঙতে পারে। একই বিশ্বাস পোষণ করেন ফ্যানও। তিনি বলেন, “আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বের একটি সেতু তৈরি করা।” কথাগুলো হয়তো আদর্শবাদী মনে হতে পারে। কিন্তু ফুটবলের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, এই খেলা এমন অনেক কিছু করতে পারে, যা রাজনীতি পারে না। এটি অপরিচিত মানুষকে বন্ধু বানায়, প্রতিপক্ষ দেশের পতাকাকেও সম্মান করতে শেখায় এবং কখনো কখনো পুরোনো বৈরিতার মধ্যেও একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার সুযোগ তৈরি করে। সাংহাইয়ের সেই উচ্ছ্বসিত বিকেল তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের গল্প নয়। এটি এমন এক মানবিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে মানুষ কখনো কখনো জাতীয়তার চেয়ে আনন্দ, প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে ভালোবাসা এবং রাজনীতির চেয়ে খেলাকে বড় করে দেখে।
ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর এবার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপান। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৬ দশমিক ৯। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে কোনো সুনামি সতর্কতাও জারি করা হয়নি। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল জাপানের ইওয়াতে প্রিফেকচারের কুজি শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৫১ দশমিক ৭ কিলোমিটার গভীরে। জাপানের সরকার ভূমিকম্পের পরপরই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে। কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক অবস্থায় থাকতে বলা হয়েছে। দেশটির মুখ্য মন্ত্রিসভা সচিব মিনোরু কিহারা জানান, ভূমিকম্পের ফলে সুনামির কোনো ঝুঁকি নেই। এখন পর্যন্ত কোথাও বড় ধরনের হতাহত বা উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও কোনো অস্বাভাবিকতা শনাক্ত হয়নি। নিরাপত্তার স্বার্থে ভূমিকম্পের পর ইস্ট জাপান রেলওয়ে কোম্পানি (জেআর ইস্ট) সাময়িকভাবে তাদের কয়েকটি বুলেট ট্রেন পরিষেবা স্থগিত করে। শিন-আওমোরি থেকে টোকিও পর্যন্ত রুটে চলাচলকারী দ্রুতগতির ট্রেনগুলো নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়। জাপান বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে প্রায়ই ছোট-বড় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এজন্য ভবন নির্মাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় জাপান বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরাঘাতের সম্ভাবনা মাথায় রেখে বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নতুন কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের তথ্য পাওয়া গেলে তা পর্যায়ক্রমে জানানো হবে।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় আগ্রহী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য জাপান থেকে এসেছে আকর্ষণীয় এক সুযোগ। দেশটির কোচি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (কেইউটি) ২০২৭ সালের স্পেশাল স্কলারশিপ প্রোগ্রামের আওতায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু করেছে। বিশ্বের যেকোনো দেশের যোগ্য শিক্ষার্থীরা এই বৃত্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি একটি পূর্ণ অর্থায়নের পিএইচডি কর্মসূচি। নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি, নিবন্ধন ফি এবং সম্পূর্ণ টিউশন ফি বহন করা হবে। পাশাপাশি জীবনযাপনের জন্য মাসিক ভাতা, গবেষণাসংক্রান্ত সহায়তা এবং যাতায়াত ব্যয়ের সুবিধাও দেওয়া হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আবেদন করতে কোনো ফি দিতে হবে না। গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যেই কোচি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি দীর্ঘদিন ধরে এই বিশেষ বৃত্তি কর্মসূচি পরিচালনা করছে। তিন বছর মেয়াদি এই পিএইচডি প্রোগ্রামে শিক্ষার্থীরা এপ্রিল অথবা অক্টোবর সেশনে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবেন। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কোচি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি জাপানের অন্যতম স্বনামধন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আধুনিক গবেষণা অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানটি বিশেষভাবে পরিচিত। এই বৃত্তির আওতায় ইন্টেলিজেন্ট মেকানিক্যাল অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ফোটোনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্কিটেকচার অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডিজাইন, ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স, ইনফরমেটিকস, ডেটা অ্যান্ড ইনোভেশন এবং ইকোনমিকস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার সুযোগ রয়েছে। আবেদনকারীদের অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি থাকতে হবে অথবা ডিগ্রি সম্পন্ন হওয়ার শেষ পর্যায়ে থাকতে হবে। ভর্তি কার্যক্রম শুরু হওয়ার সময় আবেদনকারীর বয়স ৩৫ বছরের মধ্যে হতে হবে। পাশাপাশি ভালো একাডেমিক ফলাফল, গবেষণার অভিজ্ঞতা এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, আবেদন করার আগে সম্ভাব্য সুপারভাইজারের অনুমোদন নিতে হবে। এজন্য প্রথমে নির্ধারিত গবেষণা প্রকল্প নির্বাচন করে সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজার বা প্রকল্প পরিচালকের কাছে প্রি-অ্যাপ্লিকেশন রিকোয়েস্ট ফরম পাঠাতে হবে। অনুমোদন পাওয়ার পর পূর্ণাঙ্গ আবেদন জমা দেওয়া যাবে। আবেদনের জন্য প্রয়োজন হবে অনলাইন আবেদনপত্র, বৈধ পাসপোর্টের কপি, জীবনবৃত্তান্ত, ইংরেজি ভাষা দক্ষতার সনদ, গবেষণা প্রস্তাবনা, কভার লেটার এবং ব্যক্তিগত বিবৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, পিএইচডি সম্পন্ন করতে শিক্ষার্থীদের তিন বছর অধ্যয়ন, নির্ধারিত ক্রেডিট অর্জন, চূড়ান্ত গবেষণা প্রতিরক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করা এবং অন্তত একটি স্বনামধন্য পিয়ার-রিভিউড জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে হবে। বিদেশে গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ খুঁজছেন এমন শিক্ষার্থীদের জন্য এই বৃত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী জাপানে প্রযুক্তি, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি বা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে গবেষণা করতে আগ্রহী, তাদের জন্য এটি হতে পারে একটি আকর্ষণীয় পথ। ২০২৭ সালের এই স্পেশাল স্কলারশিপ প্রোগ্রামে আবেদনের শেষ তারিখ ১৬ অক্টোবর ২০২৬। সূত্র: কোচি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, জাপান
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অর্থনৈতিক ও উন্নত প্রযুক্তির দেশ জাপান দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা ফি এক ধাক্কায় বিপুল পরিমাণে বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আগামী মাস অর্থাৎ জুলাই মাসের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অত্যন্ত কার্যকর এই নতুন নিয়মটি পুরোপুরি বলবৎ হবে বলে দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। গত শুক্রবার (১৯ জুন) জাপানের মন্ত্রিসভার এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই ফি পরিবর্তনের প্রস্তাবটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী ১ জুলাই বা তারপরে দেশটির দূতাবাসে জমা দেওয়া সমস্ত নতুন ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে বর্ধিত এই নতুন ফি কাঠামো বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর হবে। আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জাপানের এই বড় ধরণের নীতি পরিবর্তনের তথ্যটি নিশ্চিত করা হয়েছে। নতুন ফি কাঠামোর বিবরণ অনুযায়ী, এখন থেকে একবার প্রবেশের বা সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসার খরচ ৩,০০০ জাপানি ইয়েন থেকে এক লাফে ৫ গুণ বেড়ে সরাসরি ১৫,০০০ জাপানি ইয়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে, ব্যবসায়িক বা পর্যটনসহ বিভিন্ন কারণে যারা একাধিকবার প্রবেশের বা মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসার আবেদন করবেন, তাদের খরচ পূর্বের ৬,০০০ জাপানি ইয়েন থেকে দ্বিগুণ বেড়ে এখন থেকে ৩০,০০০ জাপানি ইয়েন নির্ধারিত হবে, যা বিদেশি পর্যটক ও অভিবাসীদের পকেটে বড় চাপ সৃষ্টি করবে। গত শুক্রবার টোকিওতে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জাপানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিতসু মোতেগি এই ফি বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, জাপানের বর্তমান ভিসা ফি কাঠামোটি সুদীর্ঘকাল পূর্বে অর্থাৎ ১৯৭৮ সালে নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিগত পাঁচ দশকে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রার বিনিময় হারের ব্যাপক ওঠানামা বিবেচনায় নিয়ে আমরা সম্প্রতি দীর্ঘ সময় পর এটি সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিষয় সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এর ফলে জাপানে বিদেশি পর্যটকের আগমনে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। জাপানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য জাপান টাইমসের এক প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের বরাতে জানানো হয়েছে, গত মাসে দেশটির পার্লামেন্টে অনুমোদিত একটি বিশেষ আইনের সূত্র ধরেই মূলত এই ফি বৃদ্ধি করা হচ্ছে। ওই নতুন আইনটি সরকারের জন্য অভিবাসন-সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের ফি বাড়ানোর আইনি সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমানে জাপানে বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সামগ্রিক অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নয়নের ব্যয় পূর্বের তুলনায় অনেক বেড়েছে। নতুন এই ফি থেকে আসা অতিরিক্ত রাজস্ব মূলত সেই বর্ধিত ব্যয় মেটাতে সরকারকে সরাসরি সহায়তা করবে। ভিসা ফি বৃদ্ধির পাশাপাশি জাপানে আবাসিক মর্যাদা পরিবর্তন এবং ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সাথে সম্পর্কিত ফি-র সর্বোচ্চ সীমাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হবে। একইসঙ্গে দেশটিতে স্থায়ী আবাসন বা পার্মানেন্ট রেসিডেন্সির আবেদন ফি-র সর্বোচ্চ সীমাও এক ধাক্কায় অনেক বাড়ানো হবে। সরকার আবাসিক মর্যাদা পরিবর্তন ও অবস্থানের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন ফি আবেদনের ধরন অনুযায়ী ১০,০০০ ইয়েন থেকে সর্বোচ্চ ৭০,০০০ ইয়েনের মধ্যে নির্ধারণের নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া স্থায়ী আবাসনের জন্য আবেদন ফি ১০,০০০ জাপানি ইয়েন থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ২ লাখ জাপানি ইয়েন পর্যন্ত করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জাপানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিপ্পন-এর এক বিশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের মার্চ মাসে শেষ হওয়া জাপানের চলতি অর্থবছরের আগেই সরকার এই সমস্ত কাঠামোগত পরিবর্তন সম্পূর্ণ কার্যকর করতে চায়। সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই খাত থেকে সংগৃহীত অতিরিক্ত তহবিল অভিবাসন আবেদন প্রক্রিয়া দ্রুত পরিচালনায় সহায়তা করবে, দেশটিতে জাপানি ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করবে এবং একই সাথে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যারা অবৈধভাবে অবস্থান করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করতে বড় ভূমিকা রাখবে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ জাপানে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা রেকর্ড ৪১ লাখ ৩০ হাজারে পৌঁছেছে।
প্রায় পাঁচ দশক পর বিদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপান সরকার। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন এই ফি কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। জাপানের মন্ত্রিসভা শুক্রবার এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ১ জুলাই বা এর পর জমা দেওয়া সব ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে সংশোধিত ফি প্রযোজ্য হবে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, একবার প্রবেশের (সিঙ্গেল এন্ট্রি) ভিসার ফি ৩ হাজার ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ১৫ হাজার ইয়েন করা হয়েছে। একইভাবে একাধিকবার প্রবেশের (মাল্টিপল এন্ট্রি) ভিসার ফি ৬ হাজার ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার ইয়েন নির্ধারণ করা হয়েছে। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বর্তমান ভিসা ফি সর্বশেষ ১৯৭৮ সালে নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তিত হয়েছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “বিভিন্ন বিষয় সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে জাপানে আগত পর্যটকের সংখ্যার ওপর তাৎক্ষণিক কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আমরা মনে করি না।” গত মাসে জাপানের পার্লামেন্টে একটি আইন পাস হয়, যার মাধ্যমে সরকারকে অভিবাসন ও আবাসন-সংক্রান্ত বিভিন্ন ফি বাড়ানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের মতে, বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রশাসনিক ব্যয়ও বেড়েছে। নতুন ফি থেকে পাওয়া অর্থ সেই ব্যয় মেটাতে সহায়তা করবে। জাপান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ভিসা ফিই নয়, আবাসিক মর্যাদা পরিবর্তন, ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং স্থায়ী বসবাসের আবেদন সংক্রান্ত ফিও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, আবাসিক মর্যাদা পরিবর্তন এবং অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন ফি আবেদনভেদে ১০ হাজার থেকে ৭০ হাজার ইয়েন পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া স্থায়ী বসবাসের অনুমতির আবেদন ফি বর্তমান ১০ হাজার ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ইয়েন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। জাপানি সংবাদমাধ্যম নিপ্পনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মার্চে চলতি অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই এসব পরিবর্তন কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে। সরকার বলছে, অতিরিক্ত রাজস্ব অভিবাসন সেবা উন্নয়ন, জাপানি ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে কার্যক্রম জোরদারে ব্যয় করা হবে। জাপানের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশটিতে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা রেকর্ড ৪১ লাখ ৩০ হাজারে পৌঁছেছে। কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা এবং দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বৃদ্ধির কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জাপান দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে কম অভিবাসন ফি বজায় রেখেছিল। তবে নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশটি উন্নত অর্থনীতির অন্যান্য দেশের সঙ্গে ফি কাঠামোর সামঞ্জস্য আনতে চাচ্ছে। অনেক উন্নত দেশে ভিসা ও আবাসন-সংক্রান্ত আবেদন ফি জাপানের তুলনায় অনেক বেশি। নতুন ফি কাঠামো কার্যকর হলে জাপানে ভ্রমণ, পড়াশোনা বা দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের পরিকল্পনা থাকা বিদেশি নাগরিকদের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মধ্যে ‘বর্ধিত পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা’ (এক্সটেন্ডেড নিউক্লিয়ার ডিটারেন্স) জোরদার করার সাম্প্রতিক উদ্যোগ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চীন। বেইজিং কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও টোকিওর এই নীতি পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার এবং বিশ্বজুড়ে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তুরস্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আনাদোলু এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বেইজিংয়ে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এই বিষয়ে মুখ খোলেন। তিনি সাফ জানান, ‘বর্ধিত প্রতিরোধ’ মূলত শীতল যুদ্ধের সময়কার একটি পুরোনো ও বিপজ্জনক ধারণা। কিছু দেশ নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এই পারমাণবিক সহযোগিতার পথ বেছে নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে চরম অস্থিরতা তৈরি করছে। সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও টোকিওর মধ্যে উচ্চপর্যায়ের ‘বর্ধিত প্রতিরোধ’ সংলাপ এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে যুক্ত করে নিউক্লিয়ার কনসালটেশন গ্রুপের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকেই যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে জানায়, জাপানকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে তারা নিজেদের সব ধরনের সামরিক সক্ষমতা, এমনকি প্রয়োজন হলে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। মূলত আমেরিকার এই প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতির পরই কড়া প্রতিক্রিয়া দেখালো চীন। মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, "পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT) পর্যালোচনা সম্মেলনগুলোতে বিশ্বের বহু দেশ এই ধরনের ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করেছে। অথচ কিছু দেশ পারমাণবিক বলয় তৈরি করে বিশ্বে নতুন করে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা শুরু করতে চাইছে।" এ সময় জাপানের দ্বিমুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করে চীনা মুখপাত্র বলেন, টোকিও একদিকে মুখে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত শান্তিময় বিশ্বের কথা বলে, অন্যদিকে গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়ে ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। জাপানকে এনপিটি-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, "জাপানের উচিত ‘তিনটি অ-পারমাণবিক নীতি’ অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করা এবং কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা না করা।" উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র হিসেবে কাজ করছে। তবে টোকিওর যেকোনো ধরনের পারমাণবিক বা সামরিক অগ্রগতিকে বেইজিং তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি বড় হুমকি হিসেবে দেখে থাকে।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় মুদ্রা ইয়েনের ধারাবাহিক পতন ঠেকাতে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদের হার বাড়িয়ে ১ শতাংশে উন্নীত করেছে। মঙ্গলবার ব্যাংক অব জাপান এই সিদ্ধান্ত নেয়, যা ১৯৯৫ সালের পর দেশটির সবচেয়ে উচ্চ সুদের হার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে ২০২৪ সাল থেকে শুরু হওয়া আর্থিক নীতি স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হলো। এর আগে গত ডিসেম্বরে সুদের হার বাড়িয়ে ০.৭৫ শতাংশ করা হয়েছিল। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়ানো হয়, যা পরিচালনা পর্ষদের ৭–১ ভোটে অনুমোদিত হয়। একমাত্র ভিন্নমত দেন বোর্ড সদস্য তোইচিরো আসাদা, যিনি বর্তমান হার অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে মত দেন। সুদের হার বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হিসেবে মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং ইয়েনের দুর্বলতা উল্লেখ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় জাপানের বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে দুর্বল ইয়েন আমদানিকৃত পণ্যের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক প্রায় ০.৪৬ শতাংশ বেড়ে যায়। পাশাপাশি মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইয়েন সামান্য শক্তিশালী হয়ে ১৬০.২২ পর্যায়ে পৌঁছায়। দেশটির ১০ বছরের সরকারি বন্ডের ইল্ডও ৩ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ২.৬১৫ শতাংশে দাঁড়ায়। ব্যাংক অব জাপান জানিয়েছে, তারা প্রতি প্রান্তিকে ২০০ বিলিয়ন ইয়েন করে সরকারি বন্ড কেনা কমাবে। পাশাপাশি ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে ২ ট্রিলিয়ন ইয়েনের বন্ড কেনা বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সরকার ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, যার ফলে ভোক্তা মুদ্রাস্ফীতি এখনো ২ শতাংশের নিচে রয়েছে। তবে অপরিশোধিত তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব দ্রুতই উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে পণ্য ও সেবার দামে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। মে মাসে জাপানের উৎপাদক মূল্য সূচক ৬.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে। জেপি মরগান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রধান বাজার কৌশলবিদ তাই হুই বলেন, সুদের হার বৃদ্ধি বাজারের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও নীতি প্রণয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর মতে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্যদিকে ইয়েনের ধারাবাহিক দুর্বলতা নিয়ন্ত্রণে বারবার বাজারে হস্তক্ষেপ করেও স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায়নি বলে মনে করছেন টোকিওভিত্তিক বিশ্লেষকরা। মনেক্স গ্রুপের বিশেষজ্ঞ জেসপার কোল বলেন, নীতিগত পরিবর্তন ছাড়া কেবল বাজারে হস্তক্ষেপ কার্যকর নয়। মুদ্রাস্ফীতির চাপ সামাল দিতে জাপান সরকার ইতোমধ্যে ৩ ট্রিলিয়ন ইয়েনের সম্পূরক বাজেট অনুমোদন করেছে। যদিও কর সংস্কার ও শিক্ষা খাতে ব্যয়ের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা কমে ১.৪ শতাংশে নেমেছে, তা মূলত সাময়িক প্রভাব বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশ্লেষকদের মতে, সুদের হার বৃদ্ধি জাপানের অর্থনীতিতে মূল্য স্থিতিশীলতার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও ইয়েনের দুর্বলতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক পরিবারের ন্যায়বিচারের সংগ্রাম নতুন মোড় নিয়েছে জাপানে। হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করা হিরোমু সাকাহারার মৃত্যুর ১৫ বছর পর তার মামলার পুনর্বিচারের অনুমতি দিয়েছে দেশটির আদালত। এই সিদ্ধান্তকে যুদ্ধ-পরবর্তী জাপানের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় মরণোত্তর পুনর্বিচারের ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে আদালতের এই রায় আসার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন সাকাহারা। ২০১১ সালে কারাগারে থাকা অবস্থায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়। ফলে নিজের নির্দোষ প্রমাণের সম্ভাবনা সামনে এসেও তা দেখে যেতে পারেননি তিনি। জাপানের গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮৪ সালে জাপানের শিগা প্রিফেকচারের হিনো শহরের একটি মদের দোকানের ব্যবস্থাপককে হত্যা ও ডাকাতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় হিরোমু সাকাহারাকে। তদন্তের সময় পুলিশ তাকে শারীরিক নির্যাতন এবং পরিবারের ক্ষতির হুমকি দিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করেছিল বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে তার পরিবার। সাকাহারার ছেলে কোজি সাকাহারা, বর্তমানে যার বয়স ৬৪ বছর, জানান, তার বাবা শুরু থেকেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। এরপর জীবনের শেষ ২৪ বছর কারাগারেই কাটাতে হয় তাকে। মামলার রায় ঘোষণার বহু বছর পরও সাকাহারার পরিবার সামাজিকভাবে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। পরিবারের সদস্যদের অনেকেই ‘খুনির পরিবার’ পরিচয়ে অপমানের শিকার হন। কোজি সাকাহারার ভাষ্য অনুযায়ী, তার মাকেও দীর্ঘদিন ফোন করে কটূক্তি করা হতো। সমাজের চোখে অপরাধীর পরিবারের তকমা বহন করতে হয়েছে তাদের। তবে বাবার মৃত্যুর পরও হাল ছাড়েননি কোজি। আইনজীবীদের সহায়তায় তিনি মামলাটি পুনরায় খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে পুলিশের সংরক্ষিত একটি পুরোনো নেগেটিভ ফিল্ম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে সামনে আসে। আইনজীবীরা দাবি করেন, ওই আলোকচিত্রের প্রমাণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তদন্তের সময় পুলিশই সাকাহারাকে মৃতদেহের অবস্থান সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়েছিল। অর্থাৎ তদন্তে ব্যবহৃত কিছু তথ্যকে স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকারোক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে সেগুলো পুলিশি প্রভাবের ফল ছিল বলে সন্দেহের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। এই নতুন প্রমাণের ভিত্তিতেই আদালত মামলাটির পুনর্বিচারের নির্দেশ দিয়েছে। যদিও পুনর্বিচারের চূড়ান্ত ফলাফল এখনো আসেনি, তবুও আদালতের এই সিদ্ধান্তকে সাকাহারা পরিবারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি আবারও জাপানের বিচারব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। দেশটিতে ৯৯ শতাংশেরও বেশি ফৌজদারি মামলায় আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়। মানবাধিকার সংগঠন ও আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, জাপানে সন্দেহভাজনদের অনেক সময় আইনজীবীর উপস্থিতি ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সমালোচকেরা এই পদ্ধতিকে ‘জিম্মি বিচার’ বা ‘হোস্টেজ জাস্টিস’ বলে আখ্যায়িত করেন। সাকাহারার মামলাটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন জাপানে ভুল রায় সংশোধনের প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে। দেশটির পার্লামেন্টে বর্তমানে একটি সংস্কার বিল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যার মাধ্যমে পুনর্বিচারের অনুমতি পাওয়ার পর প্রসিকিউটরদের ধারাবাহিক আপিল করে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার সুযোগ সীমিত করা হতে পারে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এই সংস্কার উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ভুল রায়ের কারণে কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে বিচার মন্ত্রণালয় এই প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, আপিলের সুযোগ সীমিত করা হলে কিছু ক্ষেত্রে প্রমাণ যাচাই ও বিচারিক প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। টোকিওর মেইজি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানে ভুল রায় সংশোধনের জন্য প্রায়ই কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হয়। এতে শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তি নন, তার পুরো পরিবার সামাজিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের মতে, বিচার ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সত্য উদ্ঘাটন, শুধুমাত্র মামলায় জয়লাভ নয়। আদালতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কোজি সাকাহারা। তিনি বলেন, “এই রায় যদি বাবা জীবিত অবস্থায় পেতেন, তাহলে হয়তো তার জীবনের শেষ সময়টা অন্যরকম হতো। আমি চাই না ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো এত দীর্ঘ সময় ধরে ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষা করতে হোক।” চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আইনি লড়াই এখন শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি জাপানের বিচারব্যবস্থার জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং ভুল রায় সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
জাপানের কিয়োটো প্রিফেকচারের ইয়াওয়াটা সিটির ৩৫ বছর বয়সী মেয়র শোকো কাওয়াতা সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ২০২৩ সালে নির্বাচিত এই মেয়রের সিদ্ধান্ত দেশটির স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ব্যতিক্রমী নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে। কাওয়াতা জানিয়েছেন, তিনি আনুমানিক সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তার প্রথম সন্তানের জন্ম দেবেন। এ উপলক্ষে সন্তান জন্মের আগে ও পরে মোট ১৬ সপ্তাহ, অর্থাৎ ৮ সপ্তাহ করে ছুটিতে থাকবেন। নির্বাচিত কোনো মেয়রের ক্ষেত্রে এ ধরনের দীর্ঘ মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার ঘটনা জাপানে এটিই প্রথম বলে ধারণা করা হচ্ছে। জাপানের বিদ্যমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান থাকলেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নিয়ম নেই। ফলে বিষয়টি প্রশাসনিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে ধূসর পরিসরে অবস্থান করছে। কাওয়াতা জানিয়েছেন, তার অনুপস্থিতিতে সিটি প্রশাসনের দায়িত্ব সামলাতে একজন ডেপুটি নিয়োগ দেওয়া হবে। তিনি আংশিকভাবে ই-মেইল ব্যবহারের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখবেন বলেও উল্লেখ করেছেন। তার এই সিদ্ধান্ত জাপানে কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য, লিঙ্গসমতা এবং জন্মহার সংকট নিয়ে নতুন করে জাতীয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাপানের কর্মসংস্কৃতি ও রাজনৈতিক কাঠামো এখনো অনেকাংশে পুরুষকেন্দ্রিক। পরিবর্তনের গতি ধীর হওয়ায় নারীদের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন ও মাতৃত্বকালীন সহায়তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। জাপানে দীর্ঘদিন ধরে কম জন্মহার, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং নারীদের ক্যারিয়ার ও পারিবারিক দায়িত্বের দ্বৈত চাপে জনসংখ্যা সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় আট দশক ধরে জাপানের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হয়ে আছে তার শান্তিবাদী সংবিধান। বিশেষ করে সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ, যা দেশটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধক্ষমতা সম্পন্ন সামরিক বাহিনী গঠন থেকে বিরত রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং ডানপন্থী শক্তির উত্থানের ফলে সেই ঐতিহাসিক অবস্থান এখন বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন শিবির সংবিধান সংশোধনের পক্ষে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিনিধি পরিষদ নির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার পর তার সমর্থকরা এখন পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষেও দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে বহুদিন ধরে আলোচিত সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া এবার বাস্তবে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের রক্ষণশীল রাজনীতিকরা দীর্ঘদিন ধরেই সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের চেষ্টা করে আসছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন, জনমত এবং সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে তারা সফল হতে পারেননি। এবার সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। রেইতাকু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং অধ্যাপক এবং রক্ষণশীল চিন্তাকেন্দ্র জাপান ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ফান্ডামেন্টালসের জ্যেষ্ঠ সদস্য সুতোমু নিশিওকা বলেন, “সংবিধান সংশোধনের পক্ষে আবারও গতি তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা।” জাপানের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন জোটে থাকা শান্তিবাদী অবস্থানের জন্য পরিচিত কোমেইতো পার্টির প্রভাব কমেছে। তাদের জায়গায় উঠে এসেছে জাপান ইনোভেশন পার্টি, যারা জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্নে অনেক বেশি কঠোর অবস্থানের সমর্থক। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও জাপানের রাজনৈতিক আলোচনাকে নতুন দিকে ঠেলে দিয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন, উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিষয়গুলো জাপানি জনগণের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন এনেছে। টোকিওর ব্যবসায়ী কেন কাতো, যিনি সংবিধান সংশোধনের সমর্থক, বলেন, “আগে মানুষ মনে করত সামরিক বাহিনী থাকলে সংঘাত বাড়বে। এখন অনেকে মনে করেন, আত্মরক্ষার যথেষ্ট সক্ষমতা না থাকলে অন্যরা সেই দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে। তাই প্রতিরোধক্ষমতা জরুরি।” যদিও বাস্তবে জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনী বা সেলফ-ডিফেন্স ফোর্স বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও সুসজ্জিত বাহিনীর একটি। কয়েক দশক ধরেই তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে সংবিধানের ব্যাখ্যার মাধ্যমে এই বাহিনীর অস্তিত্ব বৈধ করা হয়েছে। রক্ষণশীলদের দাবি, বাস্তবতা ও আইনি অবস্থানের মধ্যে এই বৈপরীত্য দূর করতে হবে। নিশিওকার মতে, বর্তমান সংবিধান আজকের বাস্তবতা কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই সংশোধনের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। সংসদের নিম্নকক্ষে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান এবং ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) আইনপ্রণেতা কেইজি ফুরুয়া মনে করেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এখন তাদের হাতে রয়েছে। সম্প্রতি জাপান ফরওয়ার্ডকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন নিয়ে গণভোট আয়োজনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তার হিসাব অনুযায়ী, এলডিপি, জোটসঙ্গী দল, ছোট ডানপন্থী দল এবং কয়েকজন স্বতন্ত্র সদস্যের সমর্থন মিলিয়ে সংসদে সংশোধনী উত্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ভোটসংখ্যা অর্জন করা সম্ভব। ফুরুয়ার মতে, এতদিন ধরে এই প্রশ্নে জনগণের মতামত নেওয়া না হওয়াটা সংসদের ব্যর্থতা। তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ সংবিধান নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ সাধারণ নাগরিকদের প্রাপ্য। তবে সংশোধনের পথ যে পুরোপুরি মসৃণ, তা নয়। জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে দীর্ঘ সময় ধরে সংবিধান পরিবর্তনের চেষ্টা করেও সফল হননি। তার উত্তরসূরি ফুমিও কিশিদাও এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেননি। টোকিওর সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক তাদাশি আন্নো মনে করেন, বর্তমান উদ্দীপনার মধ্যে কিছুটা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস কাজ করছে। তার ভাষায়, “তাকাইচি এখন জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু ইরান সংকট, জাপানে মূল্যস্ফীতি, ইয়েনের অবমূল্যায়ন এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক চাপ ভবিষ্যতে সেই সমর্থন কমিয়ে দিতে পারে।” আন্নো নিজেও সংবিধান সংশোধনের পক্ষে, তবে এলডিপির প্রস্তাবিত পদ্ধতির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তিনি সংবিধানের ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে বিবাহকে একজন নারী ও একজন পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তার মতে, এই ধরনের পুরোনো ভাষা আধুনিক সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। তবে ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ নিয়ে তিনি সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। ২০১২ সালে এলডিপি যে খসড়া সংবিধান প্রস্তাব করেছিল, তা অত্যন্ত রক্ষণশীল ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, জাপানি জনগণের বড় অংশ হয়তো এমন পরিবর্তন সমর্থন করবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর ১৯৪৭ সালে মিত্রবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রণীত জাপানের সংবিধান দেশটির শান্তিবাদী রাষ্ট্রপরিচয়ের ভিত্তি হয়ে ওঠে। সেই সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ যুদ্ধকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। কিন্তু বিশ্বরাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ফলে সেই ঐতিহাসিক অনুচ্ছেদ এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে। ফলে জাপান কি সত্যিই তার যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী অবস্থান থেকে সরে আসতে যাচ্ছে, নাকি সীমিত কিছু পরিবর্তনের মধ্যেই নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যে এশিয়ার দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে জাপান। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অপরিশোধিত তেল আমদানি সহায়তায় ১০ বিলিয়ন ডলার তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটি। বুধবার এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠক শেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এশিয়ার দেশগুলো পারস্পরিকভাবে সরবরাহ ব্যবস্থার (সাপ্লাই চেইন) সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে একটি অঞ্চলের সংকট অন্য অঞ্চলেও প্রভাব ফেলছে। জাপান সরকারের এ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সংগ্রহে সহায়তা করা, সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং প্রয়োজনীয় মজুত গড়ে তুলতে সহায়তা করা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা ও অবরোধের কারণে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় এ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই অর্থায়ন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সদস্যদের প্রায় এক বছরের অপরিশোধিত তেল আমদানির সমপরিমাণ ব্যয় মেটাতে সক্ষম। এ তহবিল বিভিন্ন উৎস থেকে আসবে, যার মধ্যে রয়েছে জাপানের রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা। বাংলাদেশসহ ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়া এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নেতারা মনে করছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে জাপান সরকার আশ্বস্ত করেছে, এই সহায়তা কর্মসূচির ফলে তাদের নিজস্ব জ্বালানি সরবরাহে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। দেশটির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহারের প্রস্তুতিও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে এশিয়ার জ্বালানি নির্ভর অর্থনীতিগুলো বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে জাপানের এই সহায়তা উদ্যোগ আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তজনা নিরসনে একজোট হয়ে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। টোকিও’র আকাসাকা প্রাসাদে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই বিশ্বনেতা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জাপান সফররত ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ জানান, ফ্রান্স ও জাপান উভয় রাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। তিনি বলেন, আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য হলো শান্তি ফিরিয়ে আনা। আমরা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, স্থিতিশীলতা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার পক্ষে জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির নাজুকতা তুলে ধরে বলেন, সংঘাতের দ্রুত প্রশমন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে দুই দেশ একমত হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানের এই কঠিন আন্তর্জাতিক পরিবেশে ফ্রান্স ও জাপানের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা গভীর হওয়া অত্যন্ত অর্থবহ। দুই নেতাই মনে করেন, হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিরাপত্তা বজায় রাখা বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
জাপানের বৃহত্তম দ্বীপ হনশু-এর পূর্ব উপকূলে ৬ দশমিক ২ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাতে এই কম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্প সংক্রান্ত তথ্য নিশ্চিত করেছে জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস। সংস্থাটির বিবৃতিতে জানানো হয়, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। এখন পর্যন্ত কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর আগের দিন বুধবার রাতেও একই অঞ্চলে ৪ দশমিক ২ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়। সেই কম্পনের কেন্দ্র ছিল প্রায় ২০ কিলোমিটার গভীরে। একদিনের ব্যবধানে দুই দফা ভূমিকম্পে এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সূত্র: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, জাপানের জাহাজসহ অন্যান্য নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ চলাচলে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত তেহরান। জাপানের একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা প্রণালিটি বন্ধ করিনি, এটি উন্মুক্ত রয়েছে।” একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরান শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়; বরং সংঘাতের একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী অবসান চায়। আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ না করলেও যেসব দেশ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলায় জড়িত, তাদের জাহাজের ওপর নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে অন্যান্য দেশের জাহাজ চলাচলে সহায়তার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে তেহরান। তিনি আরও জানান, জাপানের মতো দেশগুলো যদি ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে, তাহলে তাদের জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব। উল্লেখ্য, জাপানের অপরিশোধিত তেল আমদানির বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে এবং এর অধিকাংশ পরিবহন হয় এই প্রণালি দিয়ে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের এ অবস্থান আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে, যদিও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো অস্থির। তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।