ইরান সংঘাতের প্রভাব এবং সৌদি আরবের ভিসা বিধিনিষেধ কঠোর হওয়ার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো কমেছে। এর ফলে চলতি বছরের প্রথমার্ধে সামগ্রিক বিদেশগামী কর্মসংস্থান কমলেও ইউরোপে বৈধভাবে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত ১৮ হাজার ২২০ জন বাংলাদেশি বৈধভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৪৪৫ জন। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ইউরোপে বৈধ অভিবাসন বেড়েছে ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগ ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ কমে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৬৭ জনে নেমেছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ১৭ হাজার ৩৪৩। ফলে বাংলাদেশের মোট বিদেশগামী কর্মসংস্থানও বছরওয়ারি হিসাবে প্রায় ২৮ শতাংশ কমেছে। বিএমইটির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ইউরোপে বৈধ অভিবাসনে বড় ধরনের পুনরুদ্ধারের ধারা চলতি বছরও অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালে ইউরোপে ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন বাংলাদেশি বৈধভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, যা ২০২৪ সালে ছিল ২২ হাজার ২৭১ জন। এর আগে ২০২৩ সালের ৪৬ হাজার ৪৫৫ জন থেকে ২০২৪ সালে ইউরোপমুখী বৈধ অভিবাসন অর্ধেকেরও বেশি কমে গিয়েছিল। বিএমইটির মতে, ইরান সংঘাত এবং সৌদি আরবের ভিসা নীতির কড়াকড়ি উপসাগরীয় শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেললেও ইউরোপে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা স্থিতিশীল রয়েছে। ইউরোপে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে ইতালিকে কেন্দ্র করে। মানবপাচার প্রতিরোধ এবং বৈধ অভিবাসন উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ও ইতালি সরকারের যৌথ উদ্যোগের পর দেশটি বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজারে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইতালি ৪ হাজার ৬৪৫ জন বাংলাদেশি কর্মী নিয়েছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৩৬৫ জন, যেখানে ২০২৪ সালে ছিল মাত্র ১ হাজার ১৬২। ইতালি মূলত কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতে মৌসুমি কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে। এ ছাড়া পর্তুগাল, সার্বিয়া, রোমানিয়া, রাশিয়া ও বেলারুশেও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ বেড়েছে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর বাইরে শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণের সরকারি প্রচেষ্টা এগোচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতালির সাফল্যের পর সরকার সার্বিয়া, গ্রিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল ও রাশিয়াসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে শ্রম অভিবাসন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পর উপসাগরীয় শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৫ এপ্রিল সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার ইউরোপে বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজে বের করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগ কমে যাওয়া এবং মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রায় দুই বছর ধরে সীমিত থাকায় ইউরোপে এই প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক। তবে বাংলাদেশের মোট বিদেশগামী কর্মসংস্থানে ইউরোপের অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে কম। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপে গেছেন ১৮ হাজার ২২০ জন বাংলাদেশি, যা মোট বিদেশগামী কর্মসংস্থানের মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি। শ্রম রপ্তানিকারকরা বলছেন, দক্ষ কর্মীর ঘাটতি, নথি জালিয়াতির কারণে ভিসা অনুমোদনের হার কমে যাওয়া এবং নিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাসের কারণে ইউরোপের বাড়তে থাকা শ্রমিক চাহিদার পুরো সুযোগ নিতে পারছে না বাংলাদেশ। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, কসোভো, আলবেনিয়া ও মন্টেনেগ্রোর মতো দেশগুলোর অনেক নিয়োগকারী বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, অনেক কর্মী গন্তব্য দেশে পৌঁছে পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপে বেশি মজুরির চাকরির উদ্দেশ্যে চলে যান। তবে পর্তুগাল, সাইপ্রাস, মলদোভা, বেলারুশ, সার্বিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মতো উদীয়মান শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে। ইউরোপে কর্মী পাঠানো প্রতিষ্ঠান ইনফিনিটি এইচসিএম লিমিটেড চলতি বছর মলদোভায় ৩৭ জন কর্মী পাঠিয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯ জন কংক্রিট শ্রমিক, ছয়জন পেভিং স্টোন ইনস্টলার এবং চারজন কৃষি শ্রমিক রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, মলদোভায় ওয়েল্ডার, মেকানিক, ভারী যন্ত্রপাতি চালক এবং নির্মাণ ও কৃষি খাতে দক্ষ ও অদক্ষ উভয় ধরনের কর্মীর চাহিদা রয়েছে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মাসিক বেতন সাধারণত ৫০০ থেকে ১ হাজার ডলারের বেশি হয়ে থাকে। ইনফিনিটি এইচসিএম লিমিটেডের চেয়ারম্যান শারমিন আফরোজ সুমি বলেন, হাতে-কলমে দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মীদেরই নিয়োগকারীরা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তবে প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীর ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, কিছু কর্মী গন্তব্য দেশে পৌঁছে অবৈধভাবে অন্য ইউরোপীয় দেশে চলে যাওয়ার চেষ্টা করায় নিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও কঠোর হয়েছে। ইউরোপে বৈধ অভিবাসনের পাশাপাশি অনিয়মিত অভিবাসনও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সমুদ্র ও স্থলপথে ২৪ হাজার ৩১৮ জন বাংলাদেশি অনিয়মিতভাবে ইউরোপে পৌঁছেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৯ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে যুক্তরাজ্যে থাকা বাংলাদেশিরা প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যদিও সেখানে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা যুক্তরাজ্যের প্রায় দ্বিগুণ। আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইউরোপে প্রায় ৯ লাখ ৪৪ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করছিলেন। এর মধ্যে ৬ লাখ ৫২ হাজার ছিলেন যুক্তরাজ্যে। অনানুষ্ঠানিক হিসাবে ইউরোপে বাংলাদেশির সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ। উপসাগরীয় দেশগুলোতে এ সংখ্যা ৬০ লাখের বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে ইউরোপ থেকে। একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবদান ছিল ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি বছরের ২৫ জুন পর্যন্ত কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়া ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫০ জন বাংলাদেশির মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশ গেছেন উপসাগরীয় দেশগুলোতে। ইউরোপে গেছেন মাত্র ৫ শতাংশ। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি, পরিবহন, আতিথেয়তা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে শ্রমিকের চাহিদা বাড়লেও দক্ষ কর্মী তৈরি এবং নিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে না পারলে বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় এই বাজারের পূর্ণ সুবিধা নিতে পারবে না। বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীমা আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, গন্তব্য দেশে পৌঁছে কিছু কর্মীর অবৈধভাবে অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঘটনায় অনেক দেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই আরও কঠোর করেছে। তিনি বলেন, অনেক কর্মী প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা ও কাজের মানে নিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন না, যা ভবিষ্যৎ নিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি আরও জানান, ইউরোপের কয়েকটি দেশের ভিসা আবেদন বাংলাদেশে নয়, ভারতে অবস্থিত দূতাবাসের মাধ্যমে প্রক্রিয়া করা হয়। ভারতের ভিসা পেতে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হয়।
ইউরোপজুড়ে বইছে স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ দাবদাহ। গত ২১ জুন থেকে শুরু হওয়া এই চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ায় এখন পর্যন্ত ১,৩০০-রও বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রাণহানির পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বনাঞ্চলে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে, গলে যাচ্ছে সড়কের পিচ এবং ব্যাহত হচ্ছে রেল ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি পরিষেবাগুলোকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে, যার ফলে বিভিন্ন দেশে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা। দাবদাহের এই তাণ্ডবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফ্রান্স, যেখানে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রায় এক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, তাপপ্রবাহের সবচেয়ে চরম দিনগুলোতে দেশটিতে দৈনিক মৃত্যুর গড় সংখ্যা স্বাভাবিক ৯০০ থেকে লাফিয়ে ১,৪০০ ছাড়িয়ে যায়। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে সেখানে অতিরিক্ত এক হাজার মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়, যাঁদের ৮৫ শতাংশেরই বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে, ফ্রান্সের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকায় সর্বোচ্চ 'রেড অ্যালার্ট' জারি করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে জার্মানিতেও ভেঙে গেছে তাপমাত্রার অতীত সব রেকর্ড। মকার্ন-ড্রেউইটজে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং কুবশুৎজে রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৯.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে পড়া মানুষদের চিকিৎসা দিতে বার্লিনে অতিরিক্ত ৫০০টি অ্যাম্বুলেন্স নামাতে হয়। এমনকি ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের কাছে জড়ো হওয়া সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের শরীর ঠান্ডা রাখতে পুলিশকে জলকামান দিয়ে পানি ছিটাতেও দেখা গেছে। জার্মানির বনাঞ্চলগুলোতে অতিরিক্ত গরমের কারণে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। ট্রাইসেনের বনে আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের চরম বিপাকে পড়তে হয়, কারণ সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কিছু অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ আগুনের তাপে বিস্ফোরিত হতে শুরু করে। পরে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তাপে মহাসড়কের কংক্রিট ফেটে যাওয়ার পাশাপাশি হামবুর্গ থেকে প্রাগগামী একটি ট্রেনের বিদ্যুৎ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিকল হয়ে গেলে ৬০০ যাত্রীকে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়া হয়। এই বিরূপ আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ সুইডেন, ডেনমার্ক এবং গ্রিসেও। সুইডেনের একটি পার্কে বজ্রপাতে আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন, ডেনমার্কে বয়ে গেছে তীব্র ঝড় এবং গ্রিসের একাধিক অঞ্চলে দাবানলের নতুন সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেউসুস এই পরিস্থিতিকে একটি 'নীরব ঘাতক' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশ, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ এই চরম তাপমাত্রার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। একসময় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এমন দাবদাহের দেখা মিললেও, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তা এখন প্রায় প্রতি বছরই আঘাত হানছে। ইউরোপীয় জলবায়ু বিজ্ঞানীদের সংগঠন ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন-এর বিশ্লেষণ বলছে, মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়া কার্যত অসম্ভব ছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, ৫০ বছর আগে এমন দাবদাহের কথা কল্পনাও করা যেত না, যা আজ থেকে ২০ বছর আগের তুলনায় বর্তমানে প্রায় ২০০ গুণ বেশি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলে শত শত মানুষের মৃত্যুর পর এবার তীব্র তাপদাহ বা হিটওয়েভ পূর্ব ইউরোপের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। পোল্যান্ড, চেকিয়া (চেক প্রজাতন্ত্র) এবং স্লোভাকিয়ায় তাপমাত্রা রেকর্ড ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তীব্র গরমের কারণে জার্মানি থেকে হাঙ্গেরি পর্যন্ত ইউরোপের প্রায় ১৯ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ বর্তমানে ৩৫ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হচ্ছেন। পোল্যান্ডে ১৯২১ সালের পর এবারই প্রথম সর্বোচ্চ তাপমাত্রার শত বছরের রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশটির সরকারি নিরাপত্তা সংস্থা নাগরিকদের তীব্র রোদ ও কঠোর পরিশ্রম এড়িয়ে চলার পাশাপাশি প্রচুর পানি পানের পরামর্শ দিয়েছে। চেকিয়ার আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, অনেক স্থানেই তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং সেখানে রাতকালীন তাপমাত্রাও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। জার্মানিতেও তীব্র গরমের কারণে রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। বার্লিনে নাগরিকদের স্বস্তি দিতে পুলিশ জলকামান দিয়ে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করেছে এবং রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। স্লোভাকিয়ার আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, ১৮৭১ সালের পর দেশটিতে এবারই প্রথম টানা তিন দিন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে থাকতে পারে। এদিকে ফ্রান্সে এই তাপদাহে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। দেশটির জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত ১,০০০ মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই ৬৫ বছরের বেশি বয়সী এবং অনেকে ঘরে একা থাকা অবস্থায় মারা গেছেন। এছাড়া স্পেনেও তাপদাহের কারণে ৩০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তীব্র এই গরমের মাঝেই উত্তর ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামে আকস্মিক ও শক্তিশালী ঝড় আঘাত হেনেছে। ঝোড়ো হাওয়া ও বজ্রপাতের কারণে বহু গাছপালা উপড়ে গেছে এবং ৬০ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের কাছে চলন্ত গাড়ির ওপর গাছ ভেঙে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বজ্রপাতের কারণে সৃষ্ট আগুনে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে ফ্রান্সে অতিরিক্ত অন্তত ১ হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে। রোববার দেশটির জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা স্যঁতে পাবলিক প্রকাশিত এক প্রাথমিক পরিসংখ্যানে এ তথ্য জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, তাপপ্রবাহজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় আরও অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের তথ্য এখনো পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। সংস্থাটি অতিরিক্ত মৃত্যুর প্রাথমিক হিসাব তুলে ধরে জানিয়েছে, নিহতদের বেশিরভাগই বয়স্ক মানুষ। কেয়ার হোম ও ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে ঘটে যাওয়া মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তথ্য হাতে এলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কোটি কোটি মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ইতোমধ্যে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে অতীতের বিভিন্ন তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিভিন্ন অবকাঠামোও ক্ষতির মুখে পড়ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, গত ২০ জুন থেকে শুরু হওয়া এই তাপপ্রবাহ ইউরোপের ইতিহাসে রেকর্ড করা সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি। তারা বলছেন, বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ইউরোপের জলবায়ু আরও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যার ফলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে। ফ্রান্সের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, তাপপ্রবাহ ধীরে ধীরে দেশটির পূর্বাঞ্চলের দিকে সরে যাচ্ছে। দেশের বেশিরভাগ এলাকায় চরম গরম কিছুটা কমলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি অঞ্চল এখনও তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তার আওতায় রয়েছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্তেফানি রিস্ট বলেছেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও এই তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যগত প্রভাব প্রায় ১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। দেশটির টেলিভিশন চ্যানেল বিএফএমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "এই দুর্যোগ এখনও শেষ হয়ে যায়নি।" স্যঁতে পাবলিক জানিয়েছে, মৃতদের অধিকাংশের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি। তবে তীব্র গরমের স্বাস্থ্যঝুঁকি সব বয়সী মানুষের ওপরই প্রভাব ফেলেছে। সূত্র: এএফপি
পশ্চিম ইউরোপে এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। এই পরিস্থিতি নতুন করে সামনে এনেছে এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা—গত তিন দশকে বিশ্বের অন্য যেকোনো মহাদেশের তুলনায় সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়েছে ইউরোপ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপারনিকাসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ইউরোপের গড় তাপমাত্রা প্রতি দশকে প্রায় ০.৫৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বেড়েছে। এই হার বৈশ্বিক গড় উষ্ণায়নের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমনই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ। তবে ইউরোপে তাপমাত্রা অন্য অঞ্চলের তুলনায় দ্রুত বাড়ার পেছনে আরও কয়েকটি আঞ্চলিক ও ভৌগোলিক কারণও কাজ করছে। ইউরোপের উত্তরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রের বরফে আচ্ছাদিত ছিল। কিন্তু তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সেই বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে। বরফ সরে যাওয়ায় উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে সাগরের গাঢ় রঙের জলরাশি, যা বরফের তুলনায় অনেক বেশি সূর্যতাপ শোষণ করে। ফলে উত্তর ইউরোপ ও আর্কটিক সংলগ্ন অঞ্চলে উষ্ণায়ন আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে ‘আর্কটিক অ্যামপ্লিফিকেশন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ইউরোপে শিল্প দূষণ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এতে বাতাসে অ্যারোসল নামে পরিচিত সূক্ষ্ম কণার পরিমাণ কমেছে। অ্যারোসল সূর্যের কিছু তাপ মহাকাশে প্রতিফলিত করতে সাহায্য করে। ফলে এই কণার পরিমাণ কমে যাওয়ায় অপেক্ষাকৃত বেশি সৌর বিকিরণ পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছাচ্ছে এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপে তুষারপাতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কোপারনিকাসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সর্বোচ্চ তুষারপাতের মৌসুমেও তুষারের পরিমাণ গড়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম ছিল। তুষারের সাদা আবরণ সাধারণত সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। কিন্তু তুষার কমে যাওয়ায় উন্মুক্ত মাটি বেশি তাপ শোষণ করছে। বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং রাশিয়ার ইউরোপীয় অংশে এর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। ইউরোপের দ্রুত উষ্ণায়নের সঙ্গে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণকারী ‘জেট স্ট্রিম’-এর পরিবর্তনেরও সম্পর্ক রয়েছে। উত্তর গোলার্ধের আবহাওয়া অনেকাংশে নির্ভর করে উষ্ণ নিরক্ষীয় অঞ্চল এবং শীতল উত্তর মেরুর তাপমাত্রার পার্থক্যের ওপর। কিন্তু মেরু অঞ্চলে দ্রুত উষ্ণায়নের কারণে এই পার্থক্য কমে আসছে। ফলে জেট স্ট্রিমের স্বাভাবিক গতিপথ বদলে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছে, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘ডাবল জেট’ প্যাটার্ন বলে উল্লেখ করেন। এর ফলে উচ্চচাপের গরম বায়ু দীর্ঘ সময় ধরে একটি এলাকায় আটকে থাকতে পারে এবং কয়েক দিনের গরম রূপ নিতে পারে সপ্তাহব্যাপী তীব্র তাপপ্রবাহে। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিম ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোর তীব্র ও পুনরাবৃত্ত তাপপ্রবাহের অন্যতম কারণ এই ‘ডাবল জেট’ প্যাটার্ন। বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন যে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি এই প্যাটার্নের ঘনঘন উপস্থিতির জন্য দায়ী কি না। তবে তারা একমত যে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০০৩ সালের ভয়াবহ তাপপ্রবাহে ইউরোপজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সে সময় ‘ডাবল জেট’ প্যাটার্ন প্রায় এক মাস স্থায়ী ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, চলমান তাপপ্রবাহ হয়তো তত দীর্ঘস্থায়ী হবে না, কিন্তু ইতোমধ্যেই বহু অঞ্চলে তাপমাত্রার পুরোনো রেকর্ড বড় ব্যবধানে ভেঙে গেছে। ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী লিজি কেন্ডনের ভাষায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড সৃষ্টি হওয়া এখন স্বাভাবিক ঘটনা। তবে চলতি তাপপ্রবাহে যে মাত্রায় পুরোনো রেকর্ড ভাঙছে, তা সত্যিই অভূতপূর্ব।
ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলে চলমান তীব্র দাবদাহকে এযাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিস্তৃত বলে আখ্যায়িত করেছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের কারণেই এই চরম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তাঁরা নিশ্চিত করেছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানায়, ইউরোপের প্রায় অর্ধেক বড় শহরের মানুষ বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ‘হিট স্ট্রেস’ বা গরম ও আর্দ্রতার যৌথ যন্ত্রণার মুখোমুখি হচ্ছেন। আর্দ্রতা বেশি থাকায় শরীরে ঘাম শুকোচ্ছে না, যা এই দাবদাহকে মানুষের শরীরের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছে। বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক সংগঠন 'ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন' (ডাব্লিউডাব্লিউএ) তাদের নতুন বিশ্লেষণে দেখিয়েছে যে বায়ুমণ্ডলে কার্বন দূষণ বৃদ্ধির ফলে চরম তাপমাত্রা কতটা দ্রুত ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত ৫০ বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা মাত্র ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেও জুনের এই দাবদাহ জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। এমনকি ২০০৩ সালের তুলনায় বর্তমানের রাতের বেলার তাপমাত্রা মানুষের ঘুমের যে ক্ষতি করছে, তার ঝুঁকি প্রায় ১০০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জরুরি জলবায়ু পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ গ্রীষ্মগুলো আরও বেশি চরম আকার ধারণ করবে বলে সতর্ক করেছেন লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষক ড. থিওডোর কিপিং। এই তীব্র দাবদাহের কারণে ইতিমধ্যে পুরো ইউরোপজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রা ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বহু স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, হাসপাতালগুলো রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে এবং মহাদেশজুড়ে ট্রেন ও বিমান চলাচল বাতিল করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যে জুনের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। তীব্র গরমের কারণে পশ্চিমা ইউরোপজুড়ে চিকিৎসা সংক্রান্ত জরুরি পরিস্থিতি এবং মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর আগে ২০২২ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপে তীব্র গরমে ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সাইমন স্টিল এই পরিস্থিতির বিষয়ে বলেন, কয়লা, তেল এবং গ্যাসের প্রতি বিশ্বের অতিরিক্ত আসক্তির কারণেই জলবায়ু পরিবর্তন এখন আমাদের ওপর তাণ্ডব চালাচ্ছে। এর একমাত্র সমাধান হলো দ্রুত পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে ধাবিত হওয়া এবং বনাঞ্চল রক্ষা করা। লন্ডনে গত বুধবার একদিনেই জীবনঝুঁকিতে থাকা রেকর্ড ৬৪১টি জরুরি কল এসেছে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রতি মিনিটে একজন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যা মানব সভ্যতার জন্য এক চরম সতর্কবার্তা।
ইউরোপের দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গ্রীষ্মকালীন দাবদাহ দিন দিন মারাত্মক রূপ ধারণ করায় এয়ার কন্ডিশনার বা এসি কেনার রেকর্ড হিড়িক পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয়রা এসি-কে একটি অপ্রয়োজনীয়, অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিলাসিতা মনে করলেও বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সেই দীর্ঘদিনের ধারণা দ্রুত পাল্টাচ্ছে। তীব্র গরমে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঠেকাতে ইউরোপজুড়ে এখন ঘরে ঘরে এসি সংগ্রহের ধুম লেগেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ মহাদেশে প্রতি বছর অতিরিক্ত গরমের কারণে গড়ে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ মারা যান। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নিজের ও পরিবারের জীবন বাঁচাতে এসি এখন বিলাসিতা থেকে অন্যতম এক জরুরি পণ্যে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন চিকিৎসা ও পরিবেশ বিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘরের ভেতরে সঠিক উপায়ে এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবহার গরমজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারে। এত বড় সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ইউরোপের মাত্র ২০ শতাংশ পরিবারে এসি রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। ইউরোপে এতদিন এসির ব্যবহার কম থাকার পেছনে মূল কারণ ছিল তাদের ঐতিহ্যগত সহনশীলতা এবং প্রাচীন ঘরবাড়ির বিশেষ স্থাপত্যশৈলী। মহাদেশের দক্ষিণের দেশগুলোতে মোটা সাদা দেয়াল ও ছোট জানালার মাধ্যমে ঘর ঠান্ডা রাখা হতো, আর উত্তরের দেশগুলোতে গ্রীষ্মকালে কখনোই এমন তীব্র গরম অনুভূত হতো না। এছাড়া ইউরোপের দেশগুলোতে গ্যাসের উচ্চমূল্য এবং কম গড় বেতনের কারণে বিদ্যুৎ বিলের অতিরিক্ত খরচও এসি কেনার পেছনে একটি বড় সামাজিক বাধা হিসেবে কাজ করত। তবে বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে ইউরোপ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ গতিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। চলতি সপ্তাহে ফ্রান্সে ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে এবং গরমে অতিষ্ঠ মানুষ একটু স্বস্তির খোঁজে নদী বা বিভিন্ন জলাশয়ে নামায় অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তীব্র গরমের কারণে প্যারিস ও এর আশপাশের দোকানগুলোতে সাধারণ এসি পুরোপুরি বিক্রি হয়ে গেছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যও তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত জুন মাস পার করছে। সেখানে গত ৩ বছরের তুলনায় এসি ব্যবহারের হার দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৪০ লাখ পরিবারে পৌঁছেছে। লন্ডনের স্থানীয় এসি সরবরাহকারী ও টেকনিশিয়ানরা জানিয়েছেন, করোনা মহামারীর পর থেকে এসির চাহিদা প্রতি বছর ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়লেও এবারের গরমের মতো এত ব্যস্ত সময় তারা গত ২৫ বছরে আর কখনো দেখেননি। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইতালিতে ২০০৩ সালের এক ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী দাবদাহের পর এসির ব্যবহার প্রথম ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ওই সময়ে দেশটির মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়িতে এসি থাকলেও ২০২৪ সালের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী তা বেড়ে ৫৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট এসি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের এক-তৃতীয়াংশই একা ব্যবহার করে ইতালি। আন্তর্জাতিক রেফ্রিজারেশন ইনস্টিটিউটের এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে সামগ্রিকভাবে পুরো ইউরোপে এয়ার কন্ডিশনারের সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে অন্তত দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এমনকি জার্মানি এবং উত্তরের অন্যান্য তুলনামূলক ঠান্ডা দেশগুলোতেও এখন ধীরে ধীরে এসির ব্যবহার এবং বিক্রির পরিমাণ বাড়ছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সতর্ক করেছেন যে কয়লা বা গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে এসি চালালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রায় ৪ শতাংশ আসে কেবল এসি থেকে, যা বৈশ্বিক বিমান শিল্পের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ। এই পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা সাধারণ এসি বাদ দিয়ে আধুনিক এবং কম বিদ্যুৎসাশ্রয়ী 'হিট পাম্প' প্রযুক্তি ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন। একই সাথে এসির বিদ্যুৎ সরবরাহ সোলার বা সৌরবিদ্যুৎ থেকে নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০৫০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ কার্বনমুক্ত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করায় স্পেন, ইতালি ও গ্রিসের মতো দেশগুলো ইতিমধ্যেই সরকারি ভবনগুলোতে গ্রীষ্মকালে এসি ব্যবহারের ওপর নির্দিষ্ট সীমা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।
জার্মানির বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যার ভবিষ্যৎ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০৯০-এর দশকের শুরুর দিকে অবসরের বয়সসীমা ধাপে ধাপে ৭০ বছর করার একটি নতুন সুপারিশে সমর্থন দিয়েছেন দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ। জার্মান পেনশন ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিশন মঙ্গলবার তাদের ৩৩ দফা সুপারিশ পেশ করার পর চ্যান্সেলর এই ঘোষণা দেন। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের ভঙ্গুর পেনশন ব্যবস্থাকে ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করা এবং তরুণ প্রজন্মের ওপর থেকে বিপুল আর্থিক চাপ কমিয়ে আনা। বর্তমানে জার্মানির নিয়ম অনুযায়ী ২০৩০-এর দশকের শুরুতে যারা অবসরে যাবেন, তাদের বয়সসীমা নির্ধারণ করা আছে ৬৭ বছর। তবে বিশেষজ্ঞ প্যানেল জানিয়েছে, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই বয়সসীমা পর্যায়ক্রমে বাড়াতে হবে, যা ২০৯০-এর দশকের মধ্যে ৭০ বছরে গিয়ে ঠেকবে। চ্যান্সেলর মের্জ আশ্বস্ত করে বলেছেন, "কোনো নাগরিকেরই উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।" এই সংস্কারের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক চুক্তি আরও জোরালো হবে এবং তরুণরা ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হতে পারবে। কমিশনের অন্যতম প্রধান সুপারিশ হলো—শ্রমিক ও নিয়োগকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবদানের অর্থ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা, যাতে তহবিলটির আর্থিক মূল্য সুরক্ষিত থাকে এবং বৃদ্ধি পায়। এছাড়া সিভিল সারভেন্ট বা সরকারি আমলা এবং স্বনির্ভর পেশাজীবীদেরও এই বাধ্যতামূলক পেনশন অবদানের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি, যারা একটানা ৪৫ বছর কাজ করার পর ৬৩ বছর বয়সে কোনো পেনশন কর্তন ছাড়াই আগাম অবসরের সুবিধা পেতেন, সেই বিশেষ সুযোগটি পুরোপুরি বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া জনসংখ্যার দেশগুলোর মধ্যে জার্মানি অন্যতম। বর্তমানে দেশটিতে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা কমছে, অন্যদিকে দীর্ঘজীবী অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তবে এই সংস্কারের কিছু প্রস্তাব নিয়ে ইতিমধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন এবং বামপন্থী জোটের সদস্যদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, আগাম অবসর বাতিলের সিদ্ধান্তটি নির্মাণ শ্রমিক বা কেয়ারারদের মতো কঠোর পরিশ্রমী ও স্বল্প আয়ের মানুষদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এছাড়া শেয়ার বাজারের ওপর পেনশনের নির্ভরতা জার্মানির সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ ভীতির কারণে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে তারা মনে করছেন। উল্লেখ্য, ১৮৮৯ সালে চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্কের হাত ধরে জার্মানিতে বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্রীয় পেনশন ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। সে সময় অবসরের বয়স ৭০ বছরই নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা তৎকালীন গড় আয়ুর তুলনায় অনেক বেশি ছিল। প্রায় দুই শতাব্দী পর, ২০২১ সালের পর জন্ম নেওয়া জার্মান নাগরিকদের জন্য অবসরের বয়স আবারও সেই ৭০ বছরেই ফিরে যেতে চলেছে। চ্যান্সেলর মের্জ আগামী মাসের সংসদীয় ছুটির আগেই এই ঐতিহাসিক সংস্কার বিলটি সংসদে পাস করার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
তীব্র ও রেকর্ডব্রেক দাবদাহে পুড়ছে সমগ্র ইউরোপ। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়েছে ফ্রান্স। প্রচণ্ড গরম থেকে একটু স্বস্তি পেতে নদী বা জলাশয়ে সাঁতার কাটতে গিয়ে গত এক সপ্তাহে দেশটিতে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নু জানিয়েছেন, পানিতে ডুবে মারা যাওয়া এই ব্যক্তিদের মধ্যে বেশিরভাগই তরুণ ও কম বয়সী। এই আকস্মিক ও নৃশংস আবহাওয়ায় ইউরোপের লাখ লাখ মানুষের জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফ্রান্সের ক্রীড়া ও যুব বিষয়ক মন্ত্রী মারিনা ফেরারি এক সাক্ষাৎকারে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে বলেছেন, দাবদাহের এই কঠিন সময়ে লাইফগার্ড বা নজরদারিবিহীন বিপজ্জনক জলাশয়গুলোতে সাঁতার কাটা কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। দেশটির আবহাওয়া অধিদপ্তর 'মেতেও ফ্রান্স' জানিয়েছে, চলমান এই চরম আবহাওয়া অন্তত সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ফ্রান্সের প্রায় অর্ধেক অঞ্চল বা ৫৪টি বিভাগে ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ সতর্কতাসূচক 'রেড অ্যালার্ট' জারি করা হয়েছে। প্যারিসের ঐতিহাসিক আইফেল টাওয়ার তীব্র গরমের কারণে তাদের স্বাভাবিক সময়সূচি পরিবর্তন করে রাতে খোলা রাখার পরিবর্তে বিকেলেই বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া ফ্রান্সের অধিকাংশ ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত এয়ার কন্ডিশনিং বা এসি ব্যবস্থা না থাকায় বহু স্কুল, গণপরিবহন এবং ক্রীড়া অনুষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ বা স্থগিত রাখা হয়েছে। সোমবার ফ্রান্সে ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত দিন ও রাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং অনেক জায়গায় তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ছাড়িয়ে ১০৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফ্রান্সের পাশাপাশি ইতালি, স্পেন ও যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশও এই তীব্র গরমে পুড়ছে। স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়ায় তাপমাত্রা ১১১ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কায় রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে গ্রীষ্মকালের প্রথাগত সময়ের বাইরেও ঘন ঘন এবং দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহ আঘাত হানছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস'-এর মতে, ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশ। এদিকে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তরও বুধবার ও বৃহস্পতিবারের জন্য তীব্র দাবদাহের রেড ওয়ার্নিং জারি করেছে। সেখানে তাপমাত্রা ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত ওঠার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যার ফলে রেললাইন গলে যাওয়ার বা বিকল হওয়ার ঝুঁকিতে একাধিক ট্রেন অপারেটর তাদের সেবা বাতিল করেছে। জাতিসংঘের জলবায়ু সংস্থার বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, মানুষের তৈরি পরিবেশ দূষণ ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আগামী পাঁচ বছরে গরমের এই ধরনের আরও অনেক রেকর্ড ভাঙতে পারে, যা জনস্বাস্থ্য ও বনের দাবানলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে ইউরোপজুড়ে আবারও তীব্র তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। মহাদেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই অস্বাভাবিক গরম পরিস্থিতি জুন মাসের আগের সব তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদেরা। ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, বেলজিয়ামসহ একাধিক দেশে ইতোমধ্যে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কোথাও জনসমাগমে মদ্যপান নিষিদ্ধ, কোথাও আবার ক্রীড়া আয়োজন স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন কর্তৃপক্ষ। গত মে মাসেই ইউরোপের কয়েকটি দেশে রেকর্ড তাপপ্রবাহ দেখা গিয়েছিল। তার এক মাস না পেরোতেই আবারও চরম আবহাওয়ার মুখোমুখি হয়েছে অঞ্চলটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক দিনে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, এমন ঘন ঘন তাপপ্রবাহ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি প্রভাব। জীবাশ্ম জ্বালানি—বিশেষ করে কয়লা, তেল ও গ্যাসের অতিরিক্ত ব্যবহারই এর প্রধান কারণ। ভবিষ্যতে এ ধরনের তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা। ফ্রান্সে রোববার তাপপ্রবাহের কারণে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি থাকা এলাকাগুলোতে জনসমাগমে মদ্যপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ‘ফেত দে লা মিউজিক’ উৎসব চললেও প্যারিসের ল্যুভর পিরামিডের নিচে একটি বড় কনসার্ট বাতিল করা হয়েছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিসোস শহরে তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। ইতোমধ্যে দেশের এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল ‘রেড অ্যালার্ট’-এর আওতায় আনা হয়েছে। জার্মানির রাজধানী বার্লিনেও তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির ওপরে ওঠে। তীব্র বজ্রঝড়ের কারণে বার্লিন ওপেন টেনিস টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। নিরাপত্তার জন্য দর্শক ও খেলোয়াড়দের সরিয়ে নেওয়া হয়। বেলজিয়ামে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে এবং আগামী সপ্তাহে দেশটিতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আবহাওয়াবিদেরা। প্রচণ্ড গরমে রেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় কিছু ট্রেন চলাচল বাতিল করেছে দেশটির রেল কর্তৃপক্ষ। স্পেনে চলতি বছরের প্রথম আনুষ্ঠানিক তাপপ্রবাহ ঘোষণা করা হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। গরমের কারণে মাদ্রিদে বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচের সরাসরি প্রদর্শনী বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্পেন ও পর্তুগালের সমুদ্রসৈকতগুলোতে মানুষের ভিড় বেড়েছে। সুইজারল্যান্ডেও তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। নিম্নাঞ্চলে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বলকান অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারির প্রস্তুতি চলছে। ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, বসনিয়া ও আশপাশের এলাকাগুলোতে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি ছাড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জনগণকে পর্যাপ্ত পানি পান এবং সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যেও চরম গরমের সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। দেশটির কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে, যা জুন মাসের আগের রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, রাতেও তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকবে—যাকে ‘ট্রপিক্যাল নাইটস’ বলা হয়। রয়্যাল মেটিওরোলজিক্যাল সোসাইটির প্রধান নির্বাহী লিজ বেন্টলি বলেন, এ সপ্তাহে যুক্তরাজ্যে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। একইসঙ্গে ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের গবেষক অক্ষয় দেওরাস সতর্ক করেছেন, এই তাপপ্রবাহ জনস্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও জরুরি সেবায় বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের এই পরিস্থিতি শুধু একটি মৌসুমি ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট সংকেত। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এমন চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে। সূত্র: এএফপি
ইউরোপের অন্যতম অভিজাত ও সুরক্ষিত আবাসিক এলাকা স্পেনের লা জাগালেতা। মারবেলার কাছাকাছি পাহাড়ঘেরা এই এলাকায় বিশ্বের ধনী ব্যবসায়ী, রাজপরিবারের সদস্য এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। তবে এখানকার একটি বিশাল প্রাসাদকে ঘিরে বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক মহলে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এটি কি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের গোপন ভিলা? স্থানীয়ভাবে অনেকে প্রাসাদটিকে ‘শাতো পুতিন’ নামে চেনেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সম্পত্তিটির সঙ্গে পুতিনের নাম জড়িয়ে আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত তার মালিকানার কোনো প্রত্যক্ষ ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত প্রাসাদটি আয়তন ও বিলাসিতার দিক থেকে এলাকাটির অন্যতম আলোচিত স্থাপনা। প্রায় সাড়ে চার একর জমির ওপর নির্মিত এই এস্টেট থেকে ভূমধ্যসাগর, জিব্রাল্টার প্রণালী এবং পরিষ্কার দিনে উত্তর আফ্রিকার উপকূল পর্যন্ত দেখা যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাড়িটিতে একাধিক সুইমিং পুল, ব্যক্তিগত সিনেমা হল, ব্যায়ামাগার, হেলিপ্যাড এবং বহু গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া ভবনের নিচে বিস্তৃত ভূগর্ভস্থ অংশ ও উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথাও বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাড়িটির বিলাসবহুল বৈশিষ্ট্য যতটা আলোচনায় এসেছে, তার চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে মালিকানার রহস্য। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সম্পত্তিটি রুশ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এর ফলে প্রকৃত মালিক কে, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েক বছর ধরে ইউরোপীয় অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং দুর্নীতিবিরোধী কর্মীরা সম্পত্তিটি নিয়ে তদন্ত চালিয়েছেন। রুশ বিরোধী নেতা আলেক্সেই নাভালনির দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনও একসময় বিষয়টি খতিয়ে দেখেছিল। তবে তাদের অনুসন্ধানেও ভ্লাদিমির পুতিনের সরাসরি মালিকানার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের গোপন সম্পদ নিয়ে জনসাধারণের আগ্রহের কারণে এমন সম্পত্তিগুলোকে ঘিরে নানা জল্পনা তৈরি হয়। কিন্তু গুঞ্জন ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। কোনো সম্পত্তির সঙ্গে কারও নাম জড়ালেই সেটি তার মালিকানাধীন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। এ কারণেই স্পেনের এই রহস্যময় পাহাড়চূড়ার প্রাসাদ এখনো কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। বিলাসিতা, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের গোপনীয়তার কারণে এটি ইউরোপের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিগত এস্টেটগুলোর একটি হলেও, এটি সত্যিই ভ্লাদিমির পুতিনের ‘গোপন ভিলা’ কি না—সেই প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর এখনো মেলেনি।
যুক্তরাজ্যের বেডফোর্ডের দক্ষিণে দুটি যাত্রীবাহী ট্রেনের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত এবং অন্তত ৮৯ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটের দিকে রাজধানী লন্ডন থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশ। ইস্ট মিডল্যান্ডস রেলওয়ের দুটি ট্রেন এই দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। সংঘর্ষের পর একটি ট্রেনের সামনের অংশ অন্য ট্রেনের পেছনের অংশের সঙ্গে আটকে যায়। তবে প্রাথমিকভাবে পাওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বগিগুলো রেললাইনের ওপর সোজা অবস্থাতেই ছিল। ঘটনার পরপরই বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান শুরু করে জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো। ইস্ট অব ইংল্যান্ড অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে ২০টির বেশি অ্যাম্বুলেন্স এবং ছয়টি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন করা হয়। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলেই একজনের মৃত্যু হয়। আহতদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর, ২২ জন গুরুতর এবং ৫৬ জন তুলনামূলকভাবে কম গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন। দুর্ঘটনার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি নিহত ব্যক্তির পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উপপ্রধান কর্মকর্তা স্টুয়ার্ট ক্যান্ডি বলেন, কীভাবে এই সংঘর্ষ ঘটেছে তা উদঘাটনে জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। একজন আহত যাত্রী ও চিকিৎসক পিটার নাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি হঠাৎ প্রবল ধাক্কা অনুভব করেন। তার মতে, একটি বগি রেললাইন থেকে ছিটকে পড়ে এবং তিনি সামান্য আহত হন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে রেল নিরাপত্তা ও সংকেত ব্যবস্থার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
ফ্রান্সের ৫৩টি প্রশাসনিক এলাকাকে তাপপ্রবাহের সতর্কতার আওতায় এনেছে দেশটির আবহাওয়া দপ্তর মেটেও-ফ্রান্স। শুক্রবার দুপুর থেকে এসব এলাকায় কমলা সতর্কতা কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে ২৬টি এলাকায় কমলা সতর্কতা ঘোষণা করা হয়েছিল। একদিনের ব্যবধানে আরও ২৭টি এলাকা এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে। মেটেও-ফ্রান্স জানিয়েছে, চলতি বসন্ত মৌসুমে এটি দেশটির দ্বিতীয় তাপপ্রবাহ। আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, এই তাপপ্রবাহ ব্যাপক এলাকা জুড়ে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, শুক্রবার ফ্রান্সের পশ্চিমাঞ্চলের মাসিফ সেন্ট্রাল থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৪ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে। তবে ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা ও কর্সিকা অঞ্চলের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে রাজধানী প্যারিস ও ইলে-দ্য-ফ্রান্স অঞ্চলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে মেটেও-ফ্রান্স। প্রচণ্ড গরমে স্বস্তি খুঁজতে প্যারিসের বিভিন্ন খোলা স্থান ও জলাশয়ের আশপাশে মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে। ক্যানাল সেন্ট-মার্টিনের তীরেও অনেককে সময় কাটাতে দেখা গেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মতো ফ্রান্সও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘন ঘন তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। সূত্র: ডয়চে ভেলে বাংলা
অবৈধ অভিবাসীদের আটক ও বহিষ্কারের ক্ষমতা বাড়াতে নতুন ও কঠোর অভিবাসননীতির চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে যাচ্ছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। বুধবার স্ট্রাসবুর্গে অনুষ্ঠিত ভোটে অনুমোদন পেলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরে ‘ডিপোর্টেশন সেন্টার’ বা নির্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের পথও উন্মুক্ত হবে। দীর্ঘ আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া শেষে এই সংস্কার এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি এবং ইউরোপজুড়ে জনমতের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। ইইউর অভিবাসনবিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার বলেন, “এই আইন স্পষ্টভাবে বার্তা দিচ্ছে যে পাচারকারীরা নয়, বরং আমরাই সিদ্ধান্ত নেব ইউরোপীয় ইউনিয়নে কে থাকতে পারবে এবং কাকে চলে যেতে হবে।” নতুন আইনে এমন বিধান রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে ‘রিটার্ন হাব’ বা বহিষ্কার কেন্দ্র স্থাপন করা যাবে। যেসব অভিবাসীর ইউরোপে থাকার বৈধ অধিকার নেই, তাদের এসব কেন্দ্রে পাঠানোর সুযোগ থাকবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে এই পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে। তবে ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া, গ্রিস, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসসহ বেশ কয়েকটি দেশ এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি ইইউভুক্ত দেশগুলোর একটি বড় অংশ এসব কেন্দ্র পরিচালনায় ইউরোপীয় অর্থায়নের উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে। যদিও ফ্রান্স ও স্পেন এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে। গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোটাকিস বলেছেন, “আমাদের লক্ষ্য ২০২৬ সালের মধ্যে এসব কেন্দ্র স্থাপনের প্রথম চুক্তি সম্পন্ন করা, যাতে ২০২৭ সাল থেকে এগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়।” ইউরোপীয় দেশগুলোতে অভিবাসন ইস্যুতে জনমত ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে ডানপন্থি রাজনৈতিক দলের উত্থানের ফলে সরকারগুলোও অভিবাসন নীতিতে আরও কড়াকড়ি আরোপের পথে হাঁটছে। ২০২৫ সালে ইউরোপে অভিবাসীর আগমন কিছুটা কমে এলেও ব্রাসেলস এখন মূলত প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। বর্তমানে ইউরোপ থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ পাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ নিজ দেশে ফিরে গেছে। ইইউ কর্মকর্তাদের মতে, নতুন আইন কার্যকর হলে অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত প্রত্যাবাসন এবং বহিষ্কার প্রক্রিয়া আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
ইউরোপে ন্যাটোর (ন্যাটো) সামরিক অভিযানে নিয়োজিত মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনীর বড় একটি অংশ প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের এই শক্তিশালী সামরিক জোটের প্রতি মার্কিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের মনে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস'-এর এক প্রতিবেদনের বরাতে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ন্যাটোতে নিয়োজিত ফাইটার জেট ও সামুদ্রিক নজরদারি বিমানের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সাথে ইউরোপে মোতায়েন করা একটি সাবমেরিন, একটি বিমানবাহী রণতরী (এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার) এবং বেশ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ অন্য অঞ্চলে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং আমেরিকা অঞ্চলে নিজেদের সামরিক শক্তি পুনঃবিন্যাস করার কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে তাদের এই সামরিক উপস্থিতি কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ন্যাটোতে বরাদ্দকৃত এফ-১৬ এবং এফ-১৫ই ফাইটার জেটের সংখ্যা ১৫০টি থেকে কমিয়ে ১০০টিতে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি সামুদ্রিক নজরদারি বিমান ২৬টি থেকে কমিয়ে ১৫টি করা হচ্ছে এবং ৮টি আকাশসীমায় জ্বালানি সরবরাহকারী (এয়ার রিফুয়েলিং) বিমান পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। এছাড়া, ইউরোপের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত দুটি বোম্বার টাস্ক ফোর্সের একটিকে অন্য অঞ্চলে স্থানান্তর করা হবে এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম একটি সাবমেরিন ও একটি বিমানবাহী রণতরীকেও অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। রাশিয়ার কাছ থেকে সম্ভাব্য সামরিক হুমকির মুখে যখন পুরো ইউরোপ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, ঠিক তখনই মার্কিন এই সামরিক সংকোচন ন্যাটোর নজরদারি এবং দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তবে ন্যাটোর পক্ষ থেকে মার্কিন এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট আনাদোলু নিউজ এজেন্সিকে জানিয়েছেন, জোটটি যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত এবং এটি মূলত দীর্ঘমেয়াদী টেকসই ব্যবস্থার একটি অংশ। তিনি বলেন, এই পরিবর্তন একক কোনো মিত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং এটি জোটের অভ্যন্তরে একটি বৃহত্তর পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। তবে মার্কিন জেনারেল অ্যালেক্স গ্রিনকেভিচ বার্লিনে এক এয়ারশোতে জানান, সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলোকে এখন নিজস্ব ড্রোন এবং দূরপাল্লার সমরাস্ত্রের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটোর সমালোচনা করে আসছেন এবং তিনি ইউরোপীয় ও এশীয় মিত্রদের প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ৩.৫ শতাংশে উন্নীত করার আহ্বান জানিয়েছেন। আগামী ৭-৮ জুলাই তুরস্কে অনুষ্ঠেয় ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্পের যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে, যাকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ন্যাটোর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বলে অভিহিত করেছেন।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান অস্থিরতার মধ্যেও ইউরোপে জেট ফুয়েল রপ্তানি বাড়িয়েছে সৌদি আরব। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলার এবং ভরটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে ইউরোপে সৌদির জেট ফুয়েল সরবরাহ হরমুজ প্রণালি খোলা থাকার সময়ের তুলনায়ও বেশি হয়েছে। কেপলারের তথ্য বলছে, জুনের প্রথম সপ্তাহে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলীয় ইয়ানবু বন্দর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ব্যারেল জেট ফুয়েল রপ্তানি হয়েছে। এটি ২০২৫ সালের আগস্টের পর সর্বোচ্চ রপ্তানি প্রবাহ। অন্যদিকে ভরটেক্সারের হিসাব অনুযায়ী এই সময়কালে রপ্তানির পরিমাণ আরও বেশি, দৈনিক প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল পর্যন্ত পৌঁছেছে। কেপলারের পরিসংখ্যানে আরও বলা হয়, চলতি বছরের শুরুতে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ মাসিক সরবরাহ ছিল জানুয়ারিতে, তখন দৈনিক গড় রপ্তানি ছিল ৭৭ হাজার ব্যারেল। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো ইউরোপে জেট ফুয়েল রপ্তানি বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ব্যারেল জেট ফুয়েল সরবরাহ হতো, যা ইউরোপের প্রধান জোগানদাতাদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যকে শীর্ষে রেখেছিল। ওই সময়ে ভারত, নাইজেরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরোপে মোট আমদানি ছিল প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৫ লাখ ব্যারেল। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে বিকল্প রুট হিসেবে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার বাড়িয়েছে সৌদি আরব। এতে ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়তা মিলছে বলে বাজার পর্যবেক্ষকদের ধারণা। এদিকে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্র ও নাইজেরিয়া থেকেও জেট ফুয়েল আমদানি বাড়িয়েছে। মে মাসে এই দুই দেশ থেকে ইউরোপে দৈনিক গড়ে প্রায় ২ লাখ ব্যারেল জেট ফুয়েল সরবরাহ করা হয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর অভিবাসন নীতির কড়া সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ইউরোপে অভিবাসীদের আগমনকে ‘আক্রমণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন, যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি অধিকৃত ইউরোপকে মুক্ত করতে মিত্রবাহিনীর ঐতিহাসিক নরম্যান্ডি অভিযান স্মরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি ইউরোপের বর্তমান অভিবাসন পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেন। হেগসেথ বলেন, দুঃখজনকভাবে আজ ইউরোপের বিভিন্ন উপকূলে ভিন্ন ভিন্ন বিপজ্জনক মতাদর্শের মানুষ প্রবেশ করছে। তার ভাষায়, স্পেন, ইতালি, গ্রিস ও বুলগেরিয়ার মতো দেশের উপকূলে নৌকায় করে মানুষের আগমন ঘটছে এবং ইউরোপ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো কবে এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। তার এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, কারণ ইউরোপজুড়ে অভিবাসন ইস্যু ইতোমধ্যেই অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়। বিভিন্ন দেশে জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, কঠোর অভিবাসন নীতির পক্ষে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সমর্থনও বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, নরম্যান্ডির মতো ঐতিহাসিক স্মরণ অনুষ্ঠানে এ ধরনের বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। সূত্র: বিবিসি
স্পেনে বসবাসরত অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য বড় ধরনের সুযোগ নিয়ে আসছে দেশটির সরকার। ‘নিয়মিতকরণ প্রকল্প ২০২৬’-এর আওতায় যোগ্য অভিবাসীদের আইনিভাবে বসবাস ও কাজের সুযোগ দেওয়া হবে। সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো দেশের ভেতরে থাকা অনিয়মিত জনশক্তিকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা। প্রকল্পের আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে অভিবাসীরা বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে অভিবাসীরা বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি পাবেন। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে শ্রমবাজারে তাদের অংশগ্রহণ আরও সুসংগঠিত হবে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসবে। বৈধতা পাওয়ার পর অভিবাসীরা ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেম-এর আওতায় সরকারি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারবেন, যা সাধারণ নাগরিকদের মতোই কার্যকর হবে। এ ছাড়া বৈধতার পর শেঙেন এলাকাভুক্ত দেশগুলোতে ১৮০ দিনের মধ্যে ৯০ দিন পর্যন্ত ভ্রমণের সুযোগ মিলবে। তবে এই অনুমতি কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও থাকবে। এটি মূলত একটি জাতীয় পারমিট, যার মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য কোনো দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস বা কাজ করা যাবে না। অন্য দেশে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করলে তার ব্যয় স্পেন বহন করবে না। একইভাবে অন্য কোনো দেশে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন আইন অনুযায়ী আলাদা আবেদন করতে হবে। শ্রমবাজারের চাহিদা মেটাতে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ একই ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। ইতালি ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ অ-ইউরোপীয় নাগরিককে কাজের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে জার্মানি দক্ষ কর্মী ও কেয়ারগিভার নিয়োগে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী পপুলিস্ট নেতাদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক কিছু বৈশ্বিক ইস্যু বিশেষ করে ইরানের সাথে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং পোপের প্রতি ট্রাম্পের সমালোচনামূলক অবস্থান এই সম্পর্কের রসায়নকে এক নাজুক পর্যায়ে নিয়ে ঠেকিয়েছে। এতদিন ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদী নেতারা ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে নিজেদের রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। জার্মানির এএফডি (AfD) পার্টির নেতারা ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে ট্রাম্প প্রশাসনের হামলার তীব্র সমালোচনা করে একে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমনকি ইতালির উপ-প্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি, যিনি একসময় ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন, তিনিও পোপ লিও-র ওপর ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক মন্তব্যের পর দূরত্ব বজায় রাখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় এই নেতারা এখন বুঝতে পারছেন যে ট্রাম্পের উগ্রপন্থা তাদের নিজ দেশের ভোটারদের কাছে জনপ্রিয়তা কমানোর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরাজয় এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। পপুলিজমের এই আন্তর্জাতিক বলয় এখন এক গভীর সংকটের মুখে, যেখানে মিত্ররাই এখন ট্রাম্পের নীতি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে শুরু করেছে।
বর্তমান সময়ে মার্কিন নাগরিকদের বসবাসের পছন্দের তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় গন্তব্য পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোকে পেছনে ফেলে অনেক আমেরিকান এখন থাকার জন্য বেছে নিচ্ছেন মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে। সম্প্রতি সিএনএন ট্রাভেলের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই নতুন প্রবণতার চিত্র। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি এবং চেক প্রজাতন্ত্রের মতো দেশগুলোতে মার্কিনীদের এই অভিবাসনের পেছনে মূলত জীবনযাত্রার ব্যয় এবং নিরাপত্তার বিষয়টি কাজ করছে। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে আকাশচুম্বী বাড়ি ভাড়া এবং জীবনযাত্রার খরচে হিমশিম খেয়ে অনেক আমেরিকান এখন ওয়ারশ, বুদাপেস্ট বা প্রাগের মতো শহরগুলোকে অধিক সাশ্রয়ী মনে করছেন। প্রতিবেদনে জানানো হয়, উচ্চমানের নাগরিক সুবিধা এবং আধুনিক অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও এসব দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় আমেরিকার অনেক শহরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। বিশেষ করে যারা রিমোট জব বা ফ্রিল্যান্সিং করেন, তাদের জন্য এই অঞ্চলগুলো 'স্বর্গ' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমেরিকানদের মতে, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক মূল্যবোধ অত্যন্ত প্রবল। অনেক মার্কিন নাগরিক জানিয়েছেন, তারা আমেরিকার ব্যস্ত এবং যান্ত্রিক জীবন থেকে মুক্তি পেতে এই শান্ত ও নিরাপদ পরিবেশ বেছে নিয়েছেন। এছাড়া এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিও তাদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করছে। বিশেষ করে পোল্যান্ডের কথা উল্লেখ করে অনেক অভিবাসী জানিয়েছেন, দেশটির ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং চমৎকার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা তাদের মুগ্ধ করেছে। অন্যদিকে, হাঙ্গেরির স্থাপত্যশৈলী এবং সাশ্রয়ী জীবনযাত্রার কারণে আমেরিকানদের সংখ্যা সেখানে দিন দিন বাড়ছে। তবে এই নতুন ঠিকানায় থিতু হওয়া খুব একটা সহজ নয়। স্থানীয় ভাষা রপ্ত করা এবং দীর্ঘমেয়াদী ভিসার জটিলতা অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তা সত্ত্বেও, একটি সুন্দর এবং চাপমুক্ত জীবনের আশায় হাজার হাজার আমেরিকান প্রতি বছর তাদের ব্যাগ গুছিয়ে পাড়ি জমাচ্ছেন ইউরোপের এই প্রান্তে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা চলতে থাকলে আগামী কয়েক দশকে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের জনতাত্ত্বিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। সূত্র: সিএনএন ট্রাভেল
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। এখন থেকে ইউরোপের দেশগুলোতে প্রবেশের জন্য পাসপোর্টে কোনো প্রথাগত সিল বা স্ট্যাম্পের প্রয়োজন হবে না। পরিবর্তে চালু হচ্ছে উন্নত ‘এন্ট্রি-এক্সিট সিস্টেম’ (ইইএস), যেখানে ভ্রমণকারীদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং ফেসিয়াল স্ক্যান বা বায়োমেট্রিক নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, ইসরায়েলি নাগরিকসহ ইইউ বহির্ভূত সব দেশের পর্যটকদের প্রথমবার ইউরোপে প্রবেশের সময় ডিজিটাল নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে। এই তথ্য ইইউ-এর তথ্যভাণ্ডারে পরবর্তী তিন বছর সংরক্ষিত থাকবে। মূলত সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং জালিয়াতি রোধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভ্রমণকারীদের এই নতুন পদ্ধতির সাথে অভ্যস্ত করতে ‘ট্রাভেল টু ইউরোপ’ নামের একটি অ্যাপ ইতিমধ্যে বড় বড় বিমানবন্দরগুলোতে চালু করা হয়েছে। যাত্রীরা তাদের গন্তব্যে পৌঁছানোর ৭২ ঘণ্টা আগেই পাসপোর্টের তথ্য ও ছবি এই অ্যাপের মাধ্যমে জমা দিতে পারবেন। প্রাথমিকভাবে নিবন্ধনের সময় কিছুটা বাড়তি ভিড় বা দীর্ঘ লাইনের আশঙ্কা থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজ করবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইইউ আরও একটি ডিজিটাল সিস্টেম ‘ইটিআইএএস’ (ETIAS) চালুর পরিকল্পনা করেছে। এর মাধ্যমে ভিসা-মুক্ত প্রবেশাধিকার থাকা দেশগুলোর নাগরিকদেরও ইউরোপ ভ্রমণের আগে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে অগ্রিম অনুমোদন নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের জৈবিক বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ঘটনায় দোষ স্বীকার করা এক ব্যক্তিকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী তরুণীর মা ক্যালিফোর্নিয়ার যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ক্যালিফোর্নিয়া পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল বলেন, তার মেয়ে মাকাইলা রেনে সেটলসের নামে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলায় আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নয়। আমি আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করব, যাতে আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী মাকাইলা রেনে সেটলস ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলিনা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মুরপার্কে তার জৈবিক বাবা স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজের কাছে থাকতে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেখানে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের পর শাভেজ বাড়িতে ফেরার পথে আরও মদ কেনেন। পরে বাড়িতে তিনি তার মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘটনার পর মাকাইলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় অভিযুক্তের ডিএনএর উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর মাকাইলা আত্মহত্যা করেন। ৪১ বছর বয়সী স্টিফেন ভিনসেন্ট শাভেজ ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফেলনি ইনসেস্ট’ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ককে মদ সরবরাহের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। তিনি আদালতে আরও স্বীকার করেন যে, একজন বাবা হিসেবে বিশ্বাসের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন এবং ভুক্তভোগী বিশেষভাবে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের অঙ্গরাজ্য কারাদণ্ড চাইলেও আদালত তাকে এক বছরের ভেনচুরা কাউন্টি জেল, তিন বছরের ফেলনি প্রবেশন এবং ২০ বছর যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার নির্দেশ দেন। রায়ের পর ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, তারা মনে করে মামলার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের কারাগারে আরও দীর্ঘ সাজাই উপযুক্ত ছিল। মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে ভেনচুরা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, একাধিক জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর ও বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান আইন ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইনসেস্ট’-এর অভিযোগই আনা সম্ভব ছিল; ধর্ষণের অভিযোগ আইনি মানদণ্ড পূরণ করেনি। রায়ের পর ক্যারোলিনা স্যান্ডোভাল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি যৌন অপরাধ-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, বর্তমান আইনে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে, তা ভুক্তভোগীদের জন্য যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গর্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বাংলাদেশি মালিকানাধীন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাদের দ্বিতীয় ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রবাসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও আচার্য আবুবকর হানিফ—যিনি বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—তার দূরদর্শী নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তার সহধর্মিণী ফারহানা হানিফ, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নতুন এই ক্যাম্পাস যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট পরিসর এখন প্রায় ২ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে, যা সম্পূর্ণভাবে একটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়—এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি। উদ্বোধনী বক্তব্যে আবুবকর হানিফ বলেন, “আজকের দিনটি শুধু একটি ঘোষণা নয়—এটি একটি অনুভবের মুহূর্ত। আমরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে—ভবন নয়, মানুষই সফলতা তৈরি করে।” বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ল্যাব—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রভিত্তিক ল্যাব। শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে একটি রোবটিক্স ল্যাব, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও বাড়াবে। এছাড়াও, প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুটের একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে পারবে। এখানে একটি সাধারণ ধারণা থেকে একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চলতি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক বাধা ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, আবুবকর হানিফ দীর্ঘদিন ধরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে স্থাপন করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি এবং তারা বছরে এক লক্ষ ডলারেরও বেশি আয় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনা, আত্মনির্ভরতা এবং সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই অর্জন প্রমাণ করে—প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশিরা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দুই তরুণী বোন। দিনদুপুরে ক্যারোলিন ‘কারো’ পেনা নামের ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত নারী পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্তদের চেহারায় অনুশোচনার সামান্যতম ছাপ তো ছিলই না, উল্টো তাদের মুখে পৈশাচিক হাসি দেখা গেছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছের শহর দেল রিও থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আরও পড়ুন... ‘ফোনটা ধরতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম’- টেক্সাসে পাঁচ সন্তানের মাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, দুই বোনসহ তিনজন গ্রেপ্তার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত ক্যারোলিনকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার পরপরই গুরুতর জখম অবস্থায় ভাল ভার্দে রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। তার শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি সনিক ড্রাইভ-থ্রু রেস্তোরাঁর বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যারোলিন তার তিন হামলাকারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সান আন্তোনিওর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং প্রায় ৩৫ হাজার বাসিন্দার শহর দেল রিওতে অভিযান চালিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী কিটি মিয়া দিয়াজ খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে মৃদু হাসছেন। কিটি নিজেও এক শিশুপুত্রের মা। অন্যদিকে, তার ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন আমায়া কুকি দিয়াজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁত বের করে হাসতে থাকেন। ▶️ টেক্সাসে নিজের মাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুই মেয়ে | এমনকি ভিডিও ধারণকারীকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ‘রেকর্ড করা বন্ধ করো’ বলেও চিৎকার করতে শোনা যায় তাকে। দেল রিও পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২১ বছর বয়সী কায়ান্দ্রা রেনি ফাজ নামের তৃতীয় আরেক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ৪০ তলা বিশিষ্ট আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে শান্তা হোল্ডিংস। ৫০০ ফুট উচ্চতার এই আইকনিক ভবনটি এখন দেশের সর্বোচ্চ সম্পন্ন হওয়া ইমারত। গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভবনের ৪০তম তলায় আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান খন্দকার মনির উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্থপতি এহসান খানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভূমি মালিক এবং গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক প্রযুক্তি:‘শান্তা পিনাকল’ শুধুমাত্র উচ্চতার কারণেই অনন্য নয়, বরং এটি আধুনিক নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম ভবন যা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের জন্য আন্তর্জাতিক ‘লিড প্ল্যাটিনাম’ (LEED Platinum) স্বীকৃতি পেয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘মেইনহার্ট’ (Meinhardt) এর সহায়তায় ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ: উন্নত লিফট ব্যবস্থা: ভবনটিতে রয়েছে ৮টি দ্রুতগামী লিফট, যা প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার উচ্চতায় উঠতে সক্ষম। এটি দেশের দ্রুততম ভার্টিক্যাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। পরিবেশ ও সুরক্ষা: ভবনে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৬ মিমি পুরুত্বের ডাবল গ্লেজড গ্লাস, যা তাপ ও শব্দ নিরোধক। এছাড়া এটি দেশের প্রথম ‘উইন্ড টানেল টেস্ট’ করা ভবন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আইবিএমএস প্রযুক্তি: পুরো ভবনটি একটি ইন্টেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (iBMS) দ্বারা পরিচালিত, যা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে। অগ্নি নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক এনএফপিএ (NFPA) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে এখানে অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘শান্তা পিনাকল’ হস্তান্তর দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। এটি শুধুমাত্র তেজগাঁও নয়, বরং পুরো ঢাকার বাণিজ্যিক পরিবেশকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার অ্যালুমিনিয়াম ফর্মওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র সাত দিনে এক একটি তলার ছাদ ঢালাইয়ের রেকর্ড গড়ে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার আকাশসীমায় নতুন এই ল্যান্ডমার্ক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিক নগরায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।