রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর একটি পরিবহন বিমান ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। ক্রাইমিয়ার রাজধানী সিমফেরোপোলের নিকটবর্তী পাহাড়ি বনাঞ্চলে বিমানটি বিধ্বস্ত হলে এতে থাকা ২৯ জন আরোহীর সবাই প্রাণ হারিয়েছেন। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের তথ্য অনুযায়ী, বিধ্বস্ত এএন-২৬ (An-26) মডেলের বিমানটিতে ৬ জন ক্রু এবং ২৩ জন যাত্রী ছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাউকেই জীবিত উদ্ধার করতে পারেনি। রাশিয়ার তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ মঙ্গলবার স্থানীয় সময় অনুযায়ী ক্রিমিয়া প্রজাতন্ত্রের বাখচিসারাই জেলার কুইবিশেভো গ্রামের কাছে বিমানটি উড্ডয়নরত অবস্থায় বিধ্বস্ত হয়। যদিও তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, তবে ঠিক কী কারণে বিমানটি ভূপাতিত হলো সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি। বর্তমানে দুর্ঘটনাস্থলে বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে এবং ব্ল্যাক বক্স উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইস্টার উপলক্ষে প্রস্তাবিত সাময়িক যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করেছে রাশিয়া। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি-এর দেওয়া এ প্রস্তাবকে ‘অস্পষ্ট’ বলে মন্তব্য করেছে ক্রেমলিন। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, এই প্রস্তাবে স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধ বন্ধ করার প্রয়োজন ইউক্রেনেরই বেশি বলে দাবি করেন তিনি। এর আগে সোমবার অর্থোডক্স ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আসন্ন ১২ এপ্রিলের ইস্টার উপলক্ষে সাময়িক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান জেলেনস্কি। তিনি এই উদ্যোগকে ‘আপসের একটি পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করা জরুরি। তবে রাশিয়ার মতে, এমন প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়। পেসকভ দাবি করেন, রুশ বাহিনী বর্তমানে বিভিন্ন ফ্রন্টে অগ্রসর হচ্ছে কোথাও দ্রুত, কোথাও ধীরগতিতে। এ অবস্থায় ইউক্রেনের নেতৃত্বকে সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার ভাষায়, দেরি হলে সেই সিদ্ধান্তের মূল্য আরও বেড়ে যাবে। রাশিয়ার এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, তারা বর্তমান সামরিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ইউক্রেনের ওপর চাপ ধরে রাখতে চায়। গত বছর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একতরফাভাবে ইস্টার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও, উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে তা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। তখন জেলেনস্কি ওই বিরতি ৩০ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ৩০ দিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করেননি পুতিন। এবার জেলেনস্কি জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ রাখারও প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে বৈশ্বিক তেল-গ্যাস বাজারে চাপ কমানো যায়। তবে এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি পেসকভ। তিনি শুধু জানান, রাশিয়া তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করেছে। বিশেষ করে বাল্টিক সাগর অঞ্চলের উস্ত-লুগা ও প্রিমোরস্ক বন্দরে ধারাবাহিক আঘাত হানা হয়েছে। এর মাধ্যমে রাশিয়ার জ্বালানি আয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে কিয়েভ। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। ফলে আন্তর্জাতিক মহল এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বর্তমানে নিজের দেশেই অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছেন তেহরানে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত অ্যালেক্সেই দেদভ। তিনি জানিয়েছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে খামেনি জনসমক্ষে উপস্থিত হচ্ছেন না। রুশ গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেদভ বলেন, “জনগণের বোঝা উচিত, তার জনসমক্ষে না আসার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ইরান সরকার বারবার জানিয়েছে, নতুন নেতা দেশে আছেন। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে জনসমক্ষে আসা থেকে বিরত আছেন।” তিনি আরও বলেন, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিই মূল কারণ। এখনও পর্যন্ত খামেনির সঙ্গে তার কোনো সরাসরি বৈঠক হয়নি। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নতুন নেতাকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন এবং তেহরানের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করেছেন। এর আগে বিভিন্ন মহলে খামেনির অবস্থান নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। জনসমক্ষে না আসায় এমন গুঞ্জন ছড়ায় যে, তার বেঁচে থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে তেহরান স্পষ্ট করেছে, দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বেঁচে আছেন এবং বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
ইউক্রেন–এর বিভিন্ন অঞ্চলে রাশিয়া–র বোমা হামলায় অন্তত ৫ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও কমপক্ষে ১৪ জন। অন্যদিকে, রাশিয়ার সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ এলাকায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় একজন নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে মস্কো। রোববার (২৯ মার্চ) স্থানীয় সময় দোনেৎস্ক অঞ্চলের ক্রামাতোরস্ক শহরে রুশ বাহিনী গ্লাইড বোমা হামলা চালায়। এতে হতাহতের পাশাপাশি কয়েকটি বহুতল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিয়েভের আঞ্চলিক প্রশাসনের অভিযোগ, বেসামরিক এলাকাগুলোকে লক্ষ্য করেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে। একই দিনে ওডেসা শহরে মাতৃসদন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাও ঘটে, যেখানে বেশ কয়েকজন হতাহত হন। এর জবাবে ইউক্রেন রাশিয়ার ভেতরে হামলার তৎপরতা বাড়িয়েছে। বাল্টিক সাগরের উস্ত-লুগা বন্দর এলাকায় ড্রোন হামলার পর আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থার দাবি, এসব হামলা রাশিয়ার জ্বালানি ও রপ্তানি সক্ষমতা দুর্বল করার কৌশলের অংশ। এদিকে বেলগোরোদ অঞ্চলেও ইউক্রেনের ড্রোন হামলার দাবি করেছে রাশিয়া। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় রুশ বাহিনী ইউক্রেনের দিকে শত শত ড্রোন ও একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। কিয়েভের দাবি, এর মধ্যে অধিকাংশ ড্রোন প্রতিহত বা ভূপাতিত করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ এখন দুই পক্ষের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে এক নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়েছে রাশিয়া এবং সেই তথ্য তুলে দেওয়া হয়েছে ইরানের হাতে। জেলেনস্কির দাবি অনুযায়ী, রুশ স্যাটেলাইটগুলো চলতি সপ্তাহে অন্তত সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার ছবি তুলেছে এবং তথ্য সংগ্রহ করেছে। এই নজরদারির তালিকায় কুয়েত, সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন ও ব্রিটিশ ঘাঁটিসহ ভারত মহাসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেই ইরান দিয়েগো গার্সিয়া লক্ষ্য করে দুটি মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছিল। যদিও মিসাইলগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে, তবে এটি ইরানের দীর্ঘপাল্লার হামলার সক্ষমতা বিশ্বের সামনে স্পষ্ট করে তুলেছে। টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলেনস্কি বলেন, "এটি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক যে একদিকে রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হচ্ছে, আর অন্যদিকে সেই আক্রমণকারী দেশটিই এমন দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে যারা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বলছে।" ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সম্প্রতি রাশিয়ার তেলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সাময়িক শিথিলতার দিকেই তিনি ইঙ্গিত করেছেন। পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, রাশিয়া ইরানকে কেবল মার্কিন সামরিক সম্পদের অবস্থান বা গতিবিধিই জানাচ্ছে না, বরং শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে হামলা চালানোর কৌশলগত পরামর্শও দিচ্ছে। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন গোয়েন্দা সংক্রান্ত এই স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে রাশিয়ার দাগেস্তান প্রজাতন্ত্র থেকে ইরানে পৌঁছেছে প্রায় ১৫০ টন খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর একটি বিশাল মানবিক সহায়তা চালান। দাগেস্তানের গভর্নর সের্গেই মেলিকভ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গভর্নর জানান, এই সহায়তা সামগ্রীগুলো ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কাছে হস্তান্তর করা হবে, যারা পরবর্তীতে এগুলো দেশটির দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণ করবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি দাগেস্তান পরিবহন মন্ত্রণালয়, মাখাচকালায় অবস্থিত রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যালয় এবং ‘পিওর হার্ট’ চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের যৌথ সমন্বয়ে সম্পন্ন হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এর আগে রাশিয়ার জরুরি পরিস্থিতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, আজারবাইজানের আস্তারা সীমান্ত দিয়ে প্রায় ৩০০ টনেরও বেশি ওষুধ ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রাশিয়ার এই ধারাবাহিক মানবিক সহায়তা দুই দেশের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান ও রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতা নিয়ে নতুন আলোচনা সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, মস্কো তেহরানকে কিছুটা সহায়তা দিচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সহায়তা সরাসরি যুদ্ধ অংশগ্রহণ নয়; বরং গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়া উন্নত স্যাটেলাইট তথ্যের মাধ্যমে ইরানকে মার্কিন নৌ ও বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণে সহায়তা করছে। এ কাজে রাশিয়ার “লিয়ানা” নামে পরিচিত একটি গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ব্যবস্থার ব্যবহার হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সহায়তায় উৎক্ষেপিত ইরানের “খৈয়াম” স্যাটেলাইটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই স্যাটেলাইট উচ্চমানের ছবি সরবরাহ করতে পারে, যা দুই দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানকে আরও কার্যকর করে তুলছে। অন্যদিকে, পেন্টাগন মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার খবর অস্বীকার করেছে। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রাশিয়ার দেওয়া এই গোয়েন্দা সহায়তা সংঘাতের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে। রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা একমুখী নয়। ২০২২ সাল থেকে ইরান রাশিয়াকে ড্রোন ও গোলাবারুদ সরবরাহ করে আসছে। এখন সেই প্রযুক্তির উন্নত সংস্করণ আবার ইরানের কাছেই ফিরে আসছে। উদাহরণ হিসেবে, সাম্প্রতিক এক হামলায় ব্যবহৃত ইরানি ড্রোনে রাশিয়ার তৈরি এমন একটি নেভিগেশন প্রযুক্তি পাওয়া গেছে, যা ইলেকট্রনিক বাধা বা জ্যামিং এড়াতে সক্ষম। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত কৌশলের মতোই এই প্রযুক্তি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে সাহায্য করছে। তবে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা থাকলেও রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই কারণে মস্কো সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা কম।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা বৈশ্বিক রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করলেও, ক্রেমলিনের জন্য তা এক অভাবনীয় আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত কেবল তেলের দামই বাড়াচ্ছে না, বরং রাশিয়ার ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতি ও ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ মেটানোর এক মোক্ষম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তেলের বাজারে রাশিয়ার দাপট দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া তাদের অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজার পর তেলের বৈশ্বিক দাম বেড়ে যাওয়ায় পুতিন প্রশাসন এখন পূর্ণ বাজারমূল্যে তেল বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর জ্যেষ্ঠ সহযোগী বেন কাহিল জানান, এই সংঘাতের ফলে রাশিয়ার অর্থনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। যেখানে রাশিয়ার বাজেট ঘাটতি নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল, সেখানে এখন উপচে পড়ছে ভ্লাদিমির পুতিনের রাজকোষ। কেবল তেল নয়, লক্ষ্য গ্যাস ও সার ইরান সংকটের ফলে বিশ্ববাজারে কেবল জ্বালানি তেল নয়, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং সারের সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যেহেতু রাশিয়া এই দুটি পণ্যের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক, তাই বিশ্বজুড়ে হাহাকার তৈরি হওয়ায় রাশিয়ার মুনাফা লাভের পথ আরও প্রশস্ত হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির ‘সবচেয়ে বড় বিজয়ী’ হলো রাশিয়া। খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো অর্থনীতি কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের ফেলো আলেকজান্দ্রা প্রোকোপেনকো জানান, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে রাশিয়া এক ভয়াবহ বাজেট সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি কাঠামোগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা পুতিনকে ‘সময় কিনে’ দিয়েছে। রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, চলতি বছরে যে ব্যয় সংকোচনের পরিকল্পনা ছিল, তা এখন ২০২৭ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, রাশিয়ার অর্থনীতির পালে তত বেশি হাওয়া লাগবে—এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদরা।
বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের আভাস দিয়ে সরাসরি ইরানকে সামরিক ও খাদ্য সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানকে ড্রোন, উন্নতমানের ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য সরবরাহ করছে মস্কো। ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের তৈরি ড্রোন রাশিয়া ব্যবহার করার পর থেকে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এবার রাশিয়া পাল্টা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাশিয়ার এই সহায়তা কেবল সামরিক খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ইরানের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে ক্রেমলিন। গতকাল প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। রাশিয়ার এমন পদক্ষেপকে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তখন মস্কোর এই প্রকাশ্য অবস্থান তেহরানকে নতুন করে শক্তি জোগাবে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও ইরানের এই গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্ব মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে। দুই দেশের মধ্যে এই বিনিময় প্রথা বা 'পারস্পরিক সহযোগিতা' আগামী দিনে যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে। একদিকে রাশিয়া যেমন ইরানের কাছ থেকে ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে ইউক্রেন ফ্রন্টে সুবিধা পাচ্ছে, অন্যদিকে ইরানও রাশিয়ার উন্নত মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম ও রসদ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। এই জোটবদ্ধতা বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন ব্লকের জন্ম দিচ্ছে যা দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
সাইপ্রাসকে সুরক্ষা দিতে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ 'ড্রাগন' পৌঁছাতে দীর্ঘ বিলম্ব হওয়ায় লন্ডনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কেলিন। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ব্রিটেনের তথাকথিত 'মিলিটারি আমব্রেলা' বা সামরিক সুরক্ষা বলয় পুরোপুরি অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। রাশিয়ান সংবাদ সংস্থা তাস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কেলিন জানান, ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের মুখে ব্রিটিশ পরিকল্পনাকারীরা কার্যত অপ্রস্তুত ছিলেন। স্থানীয় রাজনীতিকরাও সরকারের এই সামরিক অদূরদর্শিতার কড়া সমালোচনা করছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাইপ্রাসের মতো দেশগুলো ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ দেয় এই আশায় যে, সংকটের সময় লন্ডন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করেছে, প্রয়োজনের সময় ব্রিটিশদের এই সুরক্ষা ব্যবস্থা কোনো কাজেই আসছে না। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের এই 'সতর্ক অবস্থান' মূলত তাদের সামরিক সীমাবদ্ধতাকেই বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা দ্রুত নিরসনে অবিলম্বে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি-এর সঙ্গে ফোনালাপে তিনি এই আহ্বান জানান। পরে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করে। বিবৃতিতে বলা হয়, লাভরভ জোর দিয়ে বলেছেন—বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত সংঘাত বন্ধ করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এ সময় ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক হামলাগুলোকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বলে মন্তব্য করেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, চলমান সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে ক্যাস্পিয়ান সাগর অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে—এ নিয়ে দুই দেশের পক্ষ থেকেই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র যেন ইরানের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য রাশিয়া ও চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সোমবার রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নতুন প্রস্তাবের মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, “নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলো, বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনসহ যারা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তাদের উচিত এই পরিষদের অপব্যবহার রোধ করা।” আরাগচি আরও জানান, ইরান তার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় অটল রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর যেকোনো হামলা ‘যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার’ শামিল হবে এবং এর জবাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘অবৈধ হামলা’ মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ-নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি দিলেও পরে সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন। তিনি দাবি করেন, দুই দেশের মধ্যে ‘গঠনমূলক আলোচনা’ চলছে এবং পরিস্থিতির অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে হামলার পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালার প্রতি মস্কো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সূত্র: প্রেস টিভি
ইরানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, একনিষ্ঠ বন্ধু ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে মস্কো তেহরানের পাশে রয়েছে। শনিবার ইরানের নওরোজ বা ফারসি নববর্ষ উপলক্ষে পাঠানো এক শুভেচ্ছা বার্তায় এই মন্তব্য করেন তিনি বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। বার্তায় পুতিন ইরানের জনগণের প্রতি শুভকামনা জানিয়ে বলেন, বর্তমান কঠিন পরিস্থিতি তারা সম্মানের সঙ্গে অতিক্রম করবে বলে তিনি আশা করেন। ক্রেমলিনের ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও চাপ সৃষ্টি করেছে। এ সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-এর হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে পুতিন এটিকে ‘নৃশংস’ বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি শর্ত দিয়েছিল রাশিয়া। তবে এ প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ক্রেমলিন। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধিতে রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। যদিও রাশিয়া স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করে—সে অবস্থানেই রয়েছে মস্কো। উল্লেখ্য, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব থাকলেও এতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কোনো ধারা নেই।
ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঠিক পাশেই ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, কেন্দ্রের অত্যন্ত কাছে একটি ‘প্রজেক্টাইল’ বা ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। যদিও এই ঘটনায় কোনো প্রাণহানি বা কাঠামোগত বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবে বিষয়টি নিয়ে এখন বৈশ্বিক উত্তাপ তুঙ্গে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা এই ঘটনাকে "দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য" হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সচল পারমাণবিক চুল্লির মাত্র কয়েক মিটার দূরত্বে এই হামলা চালানো হয়েছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের তেজস্ক্রিয় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত। মস্কো জানিয়েছে, বুশেহর কেন্দ্রে এখনও রুশ বিশেষজ্ঞরা কর্মরত আছেন এবং তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সতর্ক করা হয়েছিল। জাখারোভার বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, এই হামলাকে রাশিয়া অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং একে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি মনে করছে। আইএইএ সতর্ক করে বলেছে যে, পারমাণবিক স্থাপনার এত কাছে এ ধরনের সামরিক তৎপরতা আন্তর্জাতিক আইন ও নিরাপত্তার পরিপন্থী। সামান্য এদিক-সেদিক হলেই তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়িয়ে পড়তে পারত, যার প্রভাব কেবল ইরানে নয়, বরং পুরো অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় সৃষ্টি করত।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার একমাত্র উপায় হলো কূটনৈতিক আলোচনা। এর আগে ইরানের হুমকি ও জাহাজে হামলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে সব ধরনের সামুদ্রিক চলাচল স্থগিত করা হয়েছিল। রাশিয়া আশা করছে, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করলে নিরাপদে জাহাজ চলাচল আবার শুরু করা সম্ভব হবে।
ভারতের পর এবার পাকিস্তানকেও কম দামে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। পাকিস্তানে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত অ্যালবার্ট খোরেভ জানিয়েছেন, ইসলামাবাদ যদি আনুষ্ঠানিকভাবে আগ্রহ দেখায়, তাহলে মস্কো দেশটিকে হ্রাসকৃত মূল্যে জ্বালানি তেল বিক্রি করতে প্রস্তুত। সংবাদ সম্মেলনে খোরেভ বলেন, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো জ্বালানি খাত। এই খাতে যে কোনো অগ্রগতি ইসলামাবাদের উদ্যোগের ওপর নির্ভর করবে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান পরিস্থিতি ‘জটিল ও অপ্রত্যাশিত’। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির অবরোধের কারণে পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই জ্বালানি তেলের যোগান নিশ্চিত করতে সমস্যার মুখে পড়েছে। এর প্রভাব সাধারণ ভোক্তা পর্যায়েও পড়েছে; পাকিস্তান ইতিমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বাড়িয়েছে। খোরেভ বলেন, বর্তমান উত্তেজনা কখন এবং কীভাবে শেষ হবে তা পূর্বানুমান করা কঠিন।
ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি রাশিয়ায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যে খবর ছড়িয়েছে, তা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে তেহরান। মস্কোয় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি এই প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস (TASS) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল যে, ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি একটি মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন। ওই একই হামলায় তার বাবা নিহত হয়েছিলেন বলেও সেই অসমর্থিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আরও দাবি করা হয় যে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় মস্কো নেওয়া হয়েছে। তবে এই স্পর্শকাতর বিষয়ে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানি রাষ্ট্রদূত জালালি এই পুরো বিষয়টিকে গুজব হিসেবে আখ্যা দিয়ে সত্যতা নাকচ করেছেন।
ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ইসরায়েলি হামলায় আহত হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে নেওয়া হয়েছে—এমন দাবি করেছে আন্তর্জাতিক কয়েকটি গণমাধ্যম। কুয়েতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জারিদার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষ রুশ সামরিক বিমানে করে তাকে গোপনে মস্কোতে নেওয়া হয়। সেখানে তার পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই খবর আসে যে ওই হামলায় তিনিও আহত হয়েছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল ও দ্য সান আল জারিদার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্টের উদ্যোগে মস্কোর একটি বিশেষ স্থানে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হামলায় তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি কিছু অসমর্থিত সূত্রে বলা হয়েছে, তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ওয়াশিংটনের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হতে পারেন। তবে ইরান সরকার এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। ফলে তার বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে তাদের সামরিক সহযোগিতা রয়েছে। শনিবার (১৪ মার্চ) মার্কিন গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই দুই দেশ ইরানের কৌশলগত অংশীদার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে সহযোগিতা চলছে। তবে সামরিক সহায়তার নির্দিষ্ট বিবরণ তিনি প্রকাশ করেননি। একই সাক্ষাৎকারে আরাঘচি অভিযোগ করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে। তার দাবি, দুবাই ও রাস আল-খাইমাহর মতো জনবহুল এলাকা থেকে এসব রকেট হামলা পরিচালনা করা হয়েছে, যা তিনি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির সরকার এক বিবৃতিতে আরাঘচির বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করে জানায়, তারা সন্ত্রাসী আগ্রাসনের মুখে আত্মরক্ষার অধিকার রাখে। একই সঙ্গে আমিরাত কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলেও জানায়। হরমুজ প্রণালি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপাতত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পুরোপুরি বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে এমন সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক তেলের বাজারে ইতোমধ্যেই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি খার্গ দ্বীপের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়টিও তিনি গুরুত্ব কমিয়ে দেখান। উল্লেখ্য, ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। আরাঘচি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের তেল ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়, তাহলে পারস্য উপসাগরজুড়ে জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানো হতে পারে। বিশেষ করে যেসব স্থাপনায় মার্কিন কোম্পানির মালিকানা বা অংশীদারত্ব রয়েছে, সেগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এদিকে কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরবের অভিযোগ—ইরানের হামলায় বেসামরিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এ বিষয়েও তিনি নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যে দাবি করেছেন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আহত হয়েছেন—সে দাবিও আরাঘচি নাকচ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মোজতবা খামেনি সুস্থ আছেন এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলছে।
রাশিয়া ও ইরানকে ঘিরে নতুন এক বিতর্ক সামনে এনেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি দাবি করেছেন, রাশিয়ার তৈরি শাহেদ ড্রোন ইরান ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও ইসরাইল সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ক্ষেত্রে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এ সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক ফরিদ জাকারিয়ার সঙ্গে আলাপকালে জেলেনস্কি বলেন, ইরান যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির বিরুদ্ধে রাশিয়ার তৈরি শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করেছে—এ বিষয়ে তিনি “সম্পূর্ণ নিশ্চিত”। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক কিছু হামলার ক্ষেত্রেও এই ধরনের ড্রোন ব্যবহারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যদিও সব ঘটনায় ড্রোনগুলো ঠিক কোথায় তৈরি হয়েছে তা স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। শাহেদ ড্রোন মূলত ইরানেই প্রথম তৈরি হয়। তুলনামূলক কম খরচে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হওয়ায় এগুলো ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২০২২ সালের শেষ দিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের সময় এই ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। ইউক্রেনের দাবি অনুযায়ী, তখন থেকে রুশ বাহিনী হাজার হাজার শাহেদ ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। প্রথমদিকে ইরান থেকে এসব ড্রোন সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে রাশিয়া নিজস্ব কারখানায় একই ধরনের ড্রোন তৈরি করছে বলে জানা গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য দেশও তাদের সামরিক কার্যক্রমে এই ধরনের ড্রোন ব্যবহার শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইরানকে ঘিরে চলমান অভিযানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ড্রোন ব্যবহারের ঘটনা দেখা গেছে। তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।
চলমান সংঘাতের মধ্যে রাশিয়া প্রথম দেশ হিসেবে মানবিক সহায়তা পাঠিয়ে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে প্রায় ১৩ টন ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম বহনকারী একটি বিশেষ বিমান ইতিমধ্যে ইরানে পৌঁছেছে। রাশিয়ার এই পদক্ষেপ মূলত ইরানের হাসপাতালে গড়ে ওঠা সংকট মোকাবিলায় নেয়া হয়েছে। ক্রেমলিনের তরফে বলা হয়েছে, তেহরানের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুরোধের প্রেক্ষিতে এই জরুরি সহায়তা পাঠানো হয়েছে। রাশিয়ার জরুরি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আই-৭৬ বিমানের মাধ্যমে প্রথমে আজারবাইজানে অবতরণ করা হয় সামগ্রীগুলো। সেখান থেকে সড়কপথে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংঘাতের কারণে ইরান ও রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। চলতি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায়ও রাশিয়ার সমর্থন ছিল। যুদ্ধের প্রভাবে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল ব্যাহত হলেও আজারবাইজানের মধ্য দিয়ে চলাচলরত স্থলপথটি ইরানের জন্য এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা হিসেবে কাজ করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাশিয়ার এই মানবিক সহায়তা শুধু রোগীদের জন্যই নয়, ইরানের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে একটি গুরুত্বপুর্ন বার্তা হিসেবে কাজ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। গত ৪৮ থেকে ৫৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৬টি চীনা 'ওয়াই-২০' (Y-20) সামরিক কার্গো বিমান তাদের ট্রান্সপন্ডার বা সিগন্যাল বন্ধ রেখে ইরানের আকাশে প্রবেশ করেছে বলে খবর ছড়িয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়াই এই তথ্যটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই বিমানগুলো বেসামরিক রাডার থেকে আড়াল থাকতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছিল। নেটিজেন ও সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, চীন হয়তো ইরানকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম বা জ্যামিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। যদি এটি সত্যি হয়, তবে মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান বা নৌ-অভিযানের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সরাসরি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও দেখছেন। তবে এই উত্তেজনার মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের কোনো অস্বাভাবিক ফ্লাইটের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৬টি ভারী সামরিক কার্গো বিমানের মতো বিশাল বহরকে রাডার বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক গভীর হলেও, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে বিশ্লেষকরা একে আপাতত ‘সুপরিকল্পিত গুজব’ বা মিসইনফরমেশন হিসেবেই দেখছেন। তেহরান বা বেইজিং—কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের উপর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, আবার কিছু ভিসা চালু থাকলেও শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নিচে সহজভাবে সব ভিসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রথমেই ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের ভিসার কথা বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুবিধার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি, তাই নতুন করে যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে। এই স্থগিতাদেশের কারণে পরিবার স্পন্সর ভিসা, গ্রিন কার্ড, ডাইভারসিটি ভিসা এবং কর্মসংস্থান ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের ভিসা ইস্যু এখন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা দেরিতে হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস কিছু ক্যাটাগরির জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারে, কিন্তু স্থগিতাদেশ চলাকালীন ভিসা ইস্যু নাও করা হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারভিউ দিলেও ভিসা হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। অন্যদিকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন ট্যুরিস্ট ও বিজনেস ভিসা (B1/B2), সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী কিছু আবেদনকারীকে ভিসা পাওয়ার আগে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হতে পারে, যা কনস্যুলার অফিসার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করবেন। এই নিয়ম বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা (F-1, M-1, J-1) এবং ওয়ার্ক ভিসা (H-1B, H-2B, L-1 ইত্যাদি) বর্তমানে চালু রয়েছে এবং এগুলোর উপর সরাসরি কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তবে নতুন নিরাপত্তা যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা পরীক্ষা এবং স্পন্সর যাচাইয়ের কারণে প্রসেসিং সময় আগের তুলনায় বেশি লাগছে। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত থাকলেও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলো পুরোপুরি বন্ধ নয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব ধরনের ভিসা আবেদন বর্তমানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য আপডেট না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রিন কার্ড বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এখন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, ট্যুরিস্ট ভিসা চালু আছে কিন্তু কড়াকড়ি বেড়েছে, আর স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসা চালু থাকলেও যাচাই-বাছাই অনেক কঠোর হয়েছে। তাই নতুন করে আবেদন করার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া এখন খুবই জরুরি।
এপস্টেইন ফাইল: দাবি, বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করে ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের সাথে যুক্ত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নথি ত্রাঞ্চে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একটি ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই নথিগুলি, যা আনক্লাসিফায়েড ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) রেকর্ডের একটি বিশাল ডেটা রিলিজের অংশ, “চার্লস” নামে একজনের ক্ষুব্ধ ইমেইল অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং অন্তর্বর্তী ফাইলিং কোড EFTA00173266 থেকে EFTA00173273 পর্যন্ত চিহ্নিত। এই ইমেইলগুলো তৃতীয় পক্ষের যোগাযোগের মধ্যে পাওয়া গেছে, যা জেফরি এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিস্তৃত ফেডারেল তদন্তের সময় সংগ্রহ করা হয়েছিল। এপস্টেইন সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনার মতো এখানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য নয়, বরং চরম ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবিগুলো রয়েছে। ক্লোন তত্ত্বের উল্লেখ “চার্লস” ইমেইলগুলো এপ্রিল ২০২১-এ একজন এফবিআই এজেন্টকে ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, যাকে লাল করা প্রেরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রেরক দাবি করেছিলেন যে এটি একটি প্রযুক্তি সংস্থার এক ক্ষুব্ধ প্রাক্তন কর্মচারী বা সহযোগীর মেসেজ। ইমেইলগুলিতে গালাগালি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখানে “কোয়ান্টাম” প্রযুক্তি, গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল, এবং “বাইডেন আপনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নন” এমন দাবির উল্লেখ রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে ২০১৯ সালে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে একজন অভিনেতা বা ক্লোন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রমাণ হিসেবে “মাস্কের ত্রুটি” দেখানো হয়েছে। তবে এই দাবিগুলোর সঙ্গে কোনো শারীরিক প্রমাণ, চিকিৎসা নথি বা সঙ্গত সাক্ষ্য নেই। “বাইডেন ক্লোন” দাবি অনলাইনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি পরিচিত অংশ। তত্ত্বটি সাধারণত ধরে যে “বাস্তব” জো বাইডেনকে গোপনে জনমঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রায়শই ২০১৯ বা ২০২০ সালে, এবং তাকে চেহারা মিলানো লোক বা ক্লোন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অনুগামীরা প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করে, চেহারার পরিবর্তন যেমন আলোর পরিবর্তন, বয়সের প্রভাব বা ক্যামেরার ত্রুটিকে কৃত্রিমভাবে আড়াল করার প্রমাণ হিসেবে দেখান। এ পর্যন্ত কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা প্রতিস্থাপিত হয়েছেন। এই দাবিগুলি সম্পূর্ণভাবে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে রয়ে গেছে। সূত্র: Royanews
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য কঠোর হচ্ছে নিয়মাবলী। আগামী ৩০ মার্চ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন ভিসা রুলস, যেখানে আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই বা স্ক্রিনিং করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই নিয়ম মূলত অ-অভিবাসী (Non-immigrant) এবং অভিবাসী (Immigrant) উভয় ধরণের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা এবং কাজের সন্ধানে এইচ-১বি (H-1B) ভিসার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ইউজার আইডি বা হ্যান্ডেল নাম ফর্মে উল্লেখ করতে হবে। ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকবে। তবে পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। মূলত আবেদনকারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পূর্ববর্তী কোনো উসকানিমূলক বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড আছে কি না, তা যাচাই করতেই এই পদক্ষেপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থেই এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ বা আইনবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩০ মার্চের পর যারা আবেদন করবেন, তাদের অবশ্যই গত ৫ বছরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে তা স্থায়ীভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
দাম বাড়ানোর ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে এক লাফে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। নতুন দাম রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় ভরিপ্রতি এক লাফে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯০ টাকা। নতুন দাম অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়বে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩২৭ টাকা। এ নিয়ে চলতি বছর দেশের বাজারে মোট ২৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করলো বাজুস। এরমধ্যে ১৭ বারই দাম বাড়ানো হয়েছে। আর দাম কমেছে মাত্র ১০ বার। অন্যদিকে গতবছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যেখানে ৬৪ বারই দাম বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালে ২৯ বার কমানো হয়েছিল স্বর্ণের দাম।